জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর ৫০ মিলিয়ন ডলারের তহবিল ঘোষণা এবং বাংলাদেশের স্টার্টআপ ব্যবসার টেকসই পরিবর্তন: সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও করণীয়। বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হতে পারে তরুণ সমাজের মেধা ও উদ্ভাবনী শক্তি।
দেশের এই বিশাল জনসংখ্যাগত লভ্যাংশকে সঠিক দিশা দিতে এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে সরকার এক সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের জন্য চলতি অর্থবছরে ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬০০ কোটি টাকা) সমমানের বিশেষ তহবিল বরাদ্দের ঘোষণা দিয়েছেন।
এই উদ্যোগ কেবল একটি সাধারণ অনুদান নয়, বরং দেশের প্রারম্ভিক ব্যবসা বা স্টার্টআপ খাতের গতিপ্রকৃতি বদলে দেওয়ার এক সুদূরপ্রসারী দিকনির্দেশনা। স্টার্টআপ খাতের বর্তমান চিত্র, মাঠপর্যায়ের প্রভাব ও অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় দৈনিক ও অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাত বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক স্পর্শ করেছে।
ফিনটেক, লজিস্টিকস, ই-কমার্স, এগ্রিটেক, এডটেক এবং হেলথটেকের মতো প্রধান খাতগুলোতে বর্তমানে এক হাজার দুশোর বেশি সক্রিয় স্টার্টআপ কাজ করছে। বিগত কয়েক বছরে দেশের লজিস্টিকস ও ফিনটেক খাতের উদীয়মান কিছু স্টার্টআপ শূন্য থেকে শুরু করে আজ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হাজার হাজার তরুণের কর্মসংস্থান তৈরি করেছে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে ডিজিটাল সেবা পৌঁছে দিয়েছে।
বিগত বছরগুলোতে দেশের স্টার্টআপ খাত দেশি-বিদেশি মিলিয়ে প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি ভেঞ্চার ক্যাপিটাল এবং এঞ্জেল ইনভেস্টমেন্ট আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। প্রতি বছর শ্রমবাজারে প্রবেশ করা লক্ষাধিক তরুণের জন্য প্রথাগত চাকরির বাইরে কর্মসংস্থান সৃষ্টির অন্যতম ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছে এই স্টার্টআপগুলো। তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং মূলধনের সংকটের কারণে অনেক সম্ভাবনাময় স্টার্টআপ মাঝপথে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল।
সরকারের এই ৫০ মিলিয়ন ডলারের তহবিল সেই সংকটে বড় ধরনের অক্সিজেনের জোগান দেবে। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও অন্যান্য দেশের তুলনামূলক চিত্র প্রতিবেশী ভারত, ভিয়েতনাম কিংবা ইস্তোনিয়ার মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতে স্টার্টআপ খাতের দ্রুত বিকাশের পেছনে সরকারি নীতিমালার ভূমিকা অত্যন্ত জোরালো।
ভারতের ‘স্টার্টআপ ইন্ডিয়া’ মডেলে সরকার সরাসরি তহবিলের পাশাপাশি ‘ফান্ড অব ফান্ডস’ কাঠামোর মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি রুপি বেসরকারি ভেঞ্চার ক্যাপিটালের সঙ্গে যুক্ত করেছে, যার ফলে আজ দেশটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ স্টার্টআপ হাবে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে, ভিয়েতনাম সরকার প্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপগুলোর জন্য কর অবকাশ বা ট্যাক্স হলিডে এবং সহজ ক্রস-বর্ডার পেমেন্ট ব্যবস্থা নিশ্চিত করায় আন্তর্জাতিক ভেঞ্চার ক্যাপিটালগুলো সেখানে আকৃষ্ট হয়েছে।
আমাদের দেশের এই ৫০ মিলিয়ন ডলারের তহবিলটিকে যদি ভারতের বা ভিয়েতনামের মতো কো-ইনভেস্টিং এবং নমনীয় কর কাঠামোর সঙ্গে সঠিকভাবে মেলানো যায়, তবে বাংলাদেশও বৈশ্বিক স্টার্টআপ র‍্যাঙ্কিংয়ে দ্রুত এগিয়ে যাবে। সরকারি নীতিমালা এবং মন্ত্রণালয়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা এই বিশাল অঙ্কের তহবিল যাতে সুচারুভাবে পরিচালিত হয়, সেজন্য সরকারের একাধিক নীতিনির্ধারক সংস্থা একটি সমন্বিত কাঠামোর অধীনে কাজ করছে।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ফ্ল্যাগশিপ ভেঞ্চার ক্যাপিটাল কোম্পানি ‘স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেড’ এই তহবিলের মূল ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। সরকারের ‘ফান্ড অব ফান্ডস’ কৌশলের আওতায় সরাসরি অর্থ বিতরণের চেয়ে পেশাদার ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্মগুলোর মাধ্যমে কো-ইনভেস্টিং করা হবে, যা ব্যবস্থাপনার ঝুঁকি কমাবে।
ফিনটেক এবং প্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপগুলোর জন্য ক্রস-বর্ডার পেমেন্ট, বিদেশি বিনিয়োগ আনা এবং বৈদেশিক মুদ্রার নিয়মনীতি সহজ করতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ সার্কুলার ও নমনীয় রেগুলেটরি স্যান্ডবক্স তৈরি করেছে। পাশাপাশি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের নিবন্ধকের কার্যালয়ের মাধ্যমে স্টার্টআপগুলোর নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং করপোরেট কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করার কাজ চলছে।
তহবিল পাওয়ার মানদ-, বাছাই প্রক্রিয়া ও নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ অতীতে সরকারি অনুদান বা তহবিল বিতরণ নিয়ে নানা মহলে সমালোচনা ছিল। সেই অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে এবার অত্যন্ত কঠোর ও স্বচ্ছ কমপ্লায়েন্স কাঠামো অনুসরণ করা হচ্ছে। আবেদনকারী স্টার্টআপটিকে অবশ্যই বাংলাদেশে নিবন্ধিত একটি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি হতে হবে এবং হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স, ভ্যাট ও ট্যাক্স রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রমাণ থাকতে হবে।
কেবল ধারণার ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং সেই ব্যবসার প্রসারণ ক্ষমতা এবং সমাজে বা অর্থনীতিতে তার দৃশ্যমান প্রভাব মূল্যায়ন করা হবে। আমাদের স্টার্টআপ খাতের একটি বড় ঘাটতি হলোÑ নারী উদ্যোক্তাদের সহজে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল না পাওয়া। তাই এই তহবিলে নারী-চালিত স্টার্টআপগুলোর জন্য বিশেষ অগ্রাধিকার ও কোটার ব্যবস্থা রাখা জরুরি। এককালীন পুরো টাকা না দিয়ে, ব্যবসার অগ্রগতি এবং নির্ধারিত লক্ষ্য বা মাইলস্টোন অর্জনের সাপেক্ষে ধাপে ধাপে কিস্তিতে অর্থ ছাড় করা হবে।
তহবিলের অপব্যবহার রোধে স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে কঠোর আর্থিক নিরীক্ষা এবং প্রতিষ্ঠাতা দলের ব্যাকগ্রাউন্ড স্ক্রিনিং করা হবে। নীতির ক্ষেত্রে ঘাটতি ও কাঠামোগত সংস্কার স্টার্টআপ খাতের টেকসই প্রসারের জন্য শুধু আর্থিক সহায়তা যথেষ্ট নয়, নীতিগত কাঠামোর আরও কিছু সংস্কার প্রয়োজন। স্টার্টআপগুলোর জন্য কর অবকাশের সময়সীমা বাড়ানো এবং করপোরেট ট্যাক্স হারের ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা করা দরকার।
এ ছাড়া স্থানীয় সফটওয়্যার এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন সুরক্ষার জন্য কঠোর পেটেন্ট আইন কার্যকর করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বেসরকারি ভেঞ্চার ক্যাপিটাল, বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং গ্লোবাল মেন্টরশিপ কেবল সরকারি অনুদান নয়, বরং দেশি-বিদেশি বেসরকারি ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ও করপোরেট হাউসগুলোকে এই তহবিলের অংশীদার করা, যাতে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের পথ সুগম হয়।
দেশে সফল হওয়া বড় ব্যবসায়ী ও প্রবাসীদের নিয়ে একটি আনুষ্ঠানিক এঞ্জেল ইনভেস্টর নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, যা তরুণ উদ্ভাবকদের প্রারম্ভিক পর্যায়ে অর্থায়ন করবে। সিলিকন ভ্যালি বা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সফল বাংলাদেশি প্রবাসীদের নিয়ে একটি মেন্টরশিপ নেটওয়ার্ক তৈরি করা, যাতে স্টার্টআপগুলো বিশ্বমানের প্রযুক্তিগত ও ব্যাবসায়িক দিকনির্দেশনা লাভ করতে পারে।
গ্রামীণ অর্থনীতি ও প্রান্তিক পর্যায়ে উদ্ভাবনী এই উদ্যোগ শুধু ঢাকা বা চট্টগ্রামভিত্তিক না রেখে দেশের পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইনোভেশন হাব বা ইনকিউবেশন সেন্টার স্থাপন করা। আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষির সঙ্গে প্রযুক্তিকে যুক্ত করতে এগ্রিটেক এবং ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশনভিত্তিক স্টার্টআপগুলোকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া।
স্বচ্ছতা ও নজরদারি সেল গঠন তহবিল বরাদ্দের জন্য প্রযুক্তিবিদ, অর্থনীতিবিদ এবং ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ স্ক্রিনিং কমিটি গঠন করা। কোন কোন স্টার্টআপ তহবিল পেল, তাদের অগ্রগতির প্রতিবেদন কী এবং কর্মসংস্থান কতটুকু বাড়লÑ তা সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত রাখতে একটি ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড চালু করা।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং অর্থনৈতিক পরিবর্তন অর্থনীতিবিদ ও প্রযুক্তি খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, ৫০ মিলিয়ন ডলারের এই তহবিল যদি পুরোপুরি মেধা, যোগ্যতা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে সঠিক স্টার্টআপগুলোর হাতে পৌঁছায়, তবে তা দেশের অর্থনীতিতে এক বিরাট বিপ্লব ঘটবে। এটি আমাদের প্রারম্ভিক ও গ্রোথ স্টেজের মূলধন সংকট দূর করবে। ফলে একদিকে যেমন লাখ লাখ বেকারের কর্মসংস্থান নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে একটি আত্মনির্ভরশীল ও প্রযুক্তিনির্ভর ‘আধুনিক নেশন’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।






















