আজ বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬
২৩ আশ্বিন, ১৪৩৩ | ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৮
ঢাকা
পরিষ্কার আকাশ
২৫°C
সর্বোচ্চ: ৩৪°C
সর্বনিম্ন: ২৬°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ১০০%

মানিকগঞ্জের ঘিওর হাটে শালুক বিক্রি করছেন নৃ-জনগোষ্ঠীর তিন নারী

  • MIT ERP
  • Update Time : 10:48:02 pm, Thursday, 8 October 2026
  • 11
Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

মানিকগঞ্জের ঘিওর হাটে শালুকের স্তূপ সামনে নিয়ে বসে আছেন মালা বিশ্বাস, মায়া বিশ্বাস ও ঊর্মিলা বিশ্বাস। নৃ-জনগোষ্ঠীর তিন নারী। তাদের সঙ্গে আছে দাঁড়িপাল্লাও। প্রত্যেকের চটের বস্তায় ২৫ থেকে ৩০ কেজি করে শালুক।

চার-পাঁচ দিন ধরে খাল-বিল, নালা ও জলাশয় থেকে কুড়িয়ে আনা এসব শালুক বিক্রি করে সংসারের খরচ মেটানোর চেষ্টা তাদের। প্রতি কেজি শালুক বিক্রি করছেন ১০০ থেকে ১৫০ টাকায়। তারা জানান, সাধারণ শালুক ১০০ টাকা কেজি। সিন্ধি শালুকের দাম একটু বেশি, ১৫০ টাকা কেজি। সিন্ধি শালুক খেতেও বেশ সুস্বাদু। এই শালুক বিক্রি তাদের নিয়মিত জীবিকা নয়, মৌসুমি কাজ।

অন্য সময় ভিন্ন কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে হয় তাদের। অনিশ্চিত এই জীবন তাদের কাছে এক দুঃখের গাথা। মানিকগঞ্জের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ঘিওর হাটে গতকাল বুধবার কথা হয় শালুক বিক্রেতা এই তিন নারীর সঙ্গে। তাদের বাড়ি ঘিওর উপজেলার পয়লা ইউনিয়নের তেরশ্রী-সিধুনগরে। এই গ্রামে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে আসছে আদিবাসী নৃ-জনগোষ্ঠী। ঘিওর সদর ইউনিয়নের গোলাপনগর-কুঠিবাড়ি এলাকায়ও এই জনগোষ্ঠীর বসতি রয়েছে।

এ ছাড়া উপজেলার আরও কয়েকটি এলাকায় স্বল্প পরিসরে এই সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করে আসছে। মূলত বর্ষার শেষদিকে শুরু হয় শালুক সংগ্রহ। মালা বিশ্বাসরা জানান, বুধবারের হাট সামনে রেখে চার-পাঁচ দিন ধরে বানিয়াজুরী ইউনিয়নের খাল এলাকা, নালী ইউনিয়নের বিভিন্ন জলাশয় এবং পাশের দৌলতপুর উপজেলার বরুরিয়া-বড়বিলাসহ বিভিন্ন জলাশয়, খাল ও বিল থেকে শালুক সংগ্রহ করেন তারা।

এরপর বাছাই করা, বহন করে হাটে আনা— সব মিলিয়ে কয়েক দিনের শ্রম। মালা বিশ্বাস বলেন, ‘শালুক বিক্রি করে যা আয় হয়, তা দিয়েই সংসারের প্রয়োজন মেটাই। আমাদের জন্য এটা ব্যবসা নয়, বেঁচে থাকার চেষ্টা। ’ এক হাট থেকে আরেক হাটে : ঘিওর হাটে বুধবার বিক্রির পর বৃহস্পতিবার তাদের যেতে হয় বরংগাইল হাটে। সেখানে বৃহস্পতি ও সোমবার— সপ্তাহে দুদিন হাট বসে।

এ ছাড়া ঘিওর বাসস্ট্যান্ড, বানিয়াজুরী বাসস্ট্যান্ড এবং মানিকগঞ্জ জেলা শহরের বাসস্ট্যান্ড ও কাঁচাবাজারেও শালুক নিয়ে বসেন তারা। এই তিন নারীর মতো অন্য শালুক সংগ্রহকারীরা জানান, সাধারণত দুই থেকে তিন মাস থাকে শালুকের মৌসুম। ভোর কিংবা দিনের শুরুতেই কেউ কেউ জলাশয়ে নামেন। শালুক সংগ্রহের পাশাপাশি কুঁচো মাছও ধরেন অনেকে। পরে সেসব নিয়ে ছুটতে হয় হাট-বাজারে।

তারা আরও জানান, শালুক সংগ্রহ ও বিক্রির সঙ্গে যুক্ত অধিকাংশই আদিবাসী নৃ-জনগোষ্ঠীর। তাদের কারো নিজস্ব জমি নেই। কেউ খাসজমিতে, কেউ অন্যের আশ্রয়ে বাস করেন। শালুকের মৌসুম শেষ হলে জীবিকার ধরনও বদলে যায় তাদের। কেউ কৃষি শ্রমিকের কাজ করেন, কেউ গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করেন। কেউ অফিস-আদালত বা বাসাবাড়িতে শ্রম দেন। আবার কেউ গরু, ছাগল বা ভেড়া চরিয়ে আয় করেন।

দুই-তিন মাসে বাড়তি আয়ের সুযোগ : শালুক সংগ্রহের দুই-তিন মাস কিছু পরিবারের জন্য বাড়তি আয়ের একটি সুযোগ তৈরি করে। এই আয় দিয়ে দৈনন্দিন খাবার, পোশাক কিংবা সন্তানদের পড়াশোনার খরচ মেটানোর চেষ্টা করেন তারা। তবে এই মৌসুমি আয় দিয়ে সারা বছরের প্রয়োজন মেটানো কঠিন। শালুকের মৌসুম শেষ হলে অন্য কাজের ওপর নির্ভর করতে হয় তাদের। শালুক সংগ্রহের দলে অনেকেই রয়েছেন যাদের বয়স ৬০ থেকে ৭০ বছর বা এরও বেশি।

এই কাজ পরিশ্রমসাধ্য, পানিতে থাকতে হয় দীর্ঘ সময়। এতে অনেকের হাত-পাসহ সারা শরীরে চুলকানি, চর্মরোগ ও এলার্জি দেখা দেয়। কয়েকজন শালুক সংগ্রহকারী জানান, তাদের পরিবারে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শাপলা-শালুক সংগ্রহ ও বিক্রি করে আসছে। জলাশয় থেকে খাবার সংগ্রহ এবং তা বিক্রি করে আয় করার এই পদ্ধতি এখনো তাদের কয়েকটি পরিবারের জীবিকার অংশ।

তবে আর্থিক সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় এ ক্ষেত্রে সরকারি সহায়তা প্রত্যাশা করেন তারা। কয়েকজনের অভিযোগ, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতাসহ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা পাওয়ার নিয়ম ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে তারা সব সময় যথেষ্ট তথ্য পান না। ফলে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কেউ কেউ সুবিধার বাইরে থেকে যান। তাদের দাবি, স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা নিয়মিত খোঁজ নিলে এবং যাচাই-বাছাই করে যোগ্য ব্যক্তিদের সরকারি সহায়তার আওতায় আনার উদ্যোগ নিলে, জীবনযাপনের চাপ কিছুটা কমতে পারে।

শালুক শুধু খাবার নয় : গ্রামবাংলার পরিচিত জলজ উদ্ভিদ শাপলার কন্দ বা রাইজোম জাতীয় অংশ শালুক নামে পরিচিত। বাংলাদেশে সাদা ও লাল শাপলার শালুক বেশি দেখা যায়। কিছু এলাকায় নীল শাপলার শালুকও পাওয়া যায়। স্বাদ ও জনপ্রিয়তার কারণে সাদা শাপলার শালুকের চাহিদা বেশি। শালুক কাঁচা, সেদ্ধ কিংবা পুড়িয়ে খাওয়া যায়। খোসা ছাড়িয়ে মাছ, শুঁটকি বা অন্যান্য উপকরণের সঙ্গে রান্না করেও খাওয়া হয়।

গ্রামীণ এলাকায় অনেকে এটি আলু বা মিষ্টি আলুর বিকল্প হিসেবেও খেয়ে থাকেন। পুষ্টির দিক থেকেও শালুকে শর্করা, প্রোটিন, আঁশ ও ক্যালসিয়ামসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান রয়েছে। ফলে এটি শুধু মৌসুমি খাবার নয়, পুষ্টিকর খাদ্যের একটি স্থানীয় উৎস হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের সংসদীয় সম্পর্ক জোরদারের আহ্বান রাষ্ট্রপতির

মানিকগঞ্জের ঘিওর হাটে শালুক বিক্রি করছেন নৃ-জনগোষ্ঠীর তিন নারী

Update Time : 10:48:02 pm, Thursday, 8 October 2026

মানিকগঞ্জের ঘিওর হাটে শালুকের স্তূপ সামনে নিয়ে বসে আছেন মালা বিশ্বাস, মায়া বিশ্বাস ও ঊর্মিলা বিশ্বাস। নৃ-জনগোষ্ঠীর তিন নারী। তাদের সঙ্গে আছে দাঁড়িপাল্লাও। প্রত্যেকের চটের বস্তায় ২৫ থেকে ৩০ কেজি করে শালুক।

চার-পাঁচ দিন ধরে খাল-বিল, নালা ও জলাশয় থেকে কুড়িয়ে আনা এসব শালুক বিক্রি করে সংসারের খরচ মেটানোর চেষ্টা তাদের। প্রতি কেজি শালুক বিক্রি করছেন ১০০ থেকে ১৫০ টাকায়। তারা জানান, সাধারণ শালুক ১০০ টাকা কেজি। সিন্ধি শালুকের দাম একটু বেশি, ১৫০ টাকা কেজি। সিন্ধি শালুক খেতেও বেশ সুস্বাদু। এই শালুক বিক্রি তাদের নিয়মিত জীবিকা নয়, মৌসুমি কাজ।

অন্য সময় ভিন্ন কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে হয় তাদের। অনিশ্চিত এই জীবন তাদের কাছে এক দুঃখের গাথা। মানিকগঞ্জের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ঘিওর হাটে গতকাল বুধবার কথা হয় শালুক বিক্রেতা এই তিন নারীর সঙ্গে। তাদের বাড়ি ঘিওর উপজেলার পয়লা ইউনিয়নের তেরশ্রী-সিধুনগরে। এই গ্রামে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে আসছে আদিবাসী নৃ-জনগোষ্ঠী। ঘিওর সদর ইউনিয়নের গোলাপনগর-কুঠিবাড়ি এলাকায়ও এই জনগোষ্ঠীর বসতি রয়েছে।

এ ছাড়া উপজেলার আরও কয়েকটি এলাকায় স্বল্প পরিসরে এই সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করে আসছে। মূলত বর্ষার শেষদিকে শুরু হয় শালুক সংগ্রহ। মালা বিশ্বাসরা জানান, বুধবারের হাট সামনে রেখে চার-পাঁচ দিন ধরে বানিয়াজুরী ইউনিয়নের খাল এলাকা, নালী ইউনিয়নের বিভিন্ন জলাশয় এবং পাশের দৌলতপুর উপজেলার বরুরিয়া-বড়বিলাসহ বিভিন্ন জলাশয়, খাল ও বিল থেকে শালুক সংগ্রহ করেন তারা।

এরপর বাছাই করা, বহন করে হাটে আনা— সব মিলিয়ে কয়েক দিনের শ্রম। মালা বিশ্বাস বলেন, ‘শালুক বিক্রি করে যা আয় হয়, তা দিয়েই সংসারের প্রয়োজন মেটাই। আমাদের জন্য এটা ব্যবসা নয়, বেঁচে থাকার চেষ্টা। ’ এক হাট থেকে আরেক হাটে : ঘিওর হাটে বুধবার বিক্রির পর বৃহস্পতিবার তাদের যেতে হয় বরংগাইল হাটে। সেখানে বৃহস্পতি ও সোমবার— সপ্তাহে দুদিন হাট বসে।

এ ছাড়া ঘিওর বাসস্ট্যান্ড, বানিয়াজুরী বাসস্ট্যান্ড এবং মানিকগঞ্জ জেলা শহরের বাসস্ট্যান্ড ও কাঁচাবাজারেও শালুক নিয়ে বসেন তারা। এই তিন নারীর মতো অন্য শালুক সংগ্রহকারীরা জানান, সাধারণত দুই থেকে তিন মাস থাকে শালুকের মৌসুম। ভোর কিংবা দিনের শুরুতেই কেউ কেউ জলাশয়ে নামেন। শালুক সংগ্রহের পাশাপাশি কুঁচো মাছও ধরেন অনেকে। পরে সেসব নিয়ে ছুটতে হয় হাট-বাজারে।

তারা আরও জানান, শালুক সংগ্রহ ও বিক্রির সঙ্গে যুক্ত অধিকাংশই আদিবাসী নৃ-জনগোষ্ঠীর। তাদের কারো নিজস্ব জমি নেই। কেউ খাসজমিতে, কেউ অন্যের আশ্রয়ে বাস করেন। শালুকের মৌসুম শেষ হলে জীবিকার ধরনও বদলে যায় তাদের। কেউ কৃষি শ্রমিকের কাজ করেন, কেউ গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করেন। কেউ অফিস-আদালত বা বাসাবাড়িতে শ্রম দেন। আবার কেউ গরু, ছাগল বা ভেড়া চরিয়ে আয় করেন।

দুই-তিন মাসে বাড়তি আয়ের সুযোগ : শালুক সংগ্রহের দুই-তিন মাস কিছু পরিবারের জন্য বাড়তি আয়ের একটি সুযোগ তৈরি করে। এই আয় দিয়ে দৈনন্দিন খাবার, পোশাক কিংবা সন্তানদের পড়াশোনার খরচ মেটানোর চেষ্টা করেন তারা। তবে এই মৌসুমি আয় দিয়ে সারা বছরের প্রয়োজন মেটানো কঠিন। শালুকের মৌসুম শেষ হলে অন্য কাজের ওপর নির্ভর করতে হয় তাদের। শালুক সংগ্রহের দলে অনেকেই রয়েছেন যাদের বয়স ৬০ থেকে ৭০ বছর বা এরও বেশি।

এই কাজ পরিশ্রমসাধ্য, পানিতে থাকতে হয় দীর্ঘ সময়। এতে অনেকের হাত-পাসহ সারা শরীরে চুলকানি, চর্মরোগ ও এলার্জি দেখা দেয়। কয়েকজন শালুক সংগ্রহকারী জানান, তাদের পরিবারে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শাপলা-শালুক সংগ্রহ ও বিক্রি করে আসছে। জলাশয় থেকে খাবার সংগ্রহ এবং তা বিক্রি করে আয় করার এই পদ্ধতি এখনো তাদের কয়েকটি পরিবারের জীবিকার অংশ।

তবে আর্থিক সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় এ ক্ষেত্রে সরকারি সহায়তা প্রত্যাশা করেন তারা। কয়েকজনের অভিযোগ, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতাসহ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা পাওয়ার নিয়ম ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে তারা সব সময় যথেষ্ট তথ্য পান না। ফলে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কেউ কেউ সুবিধার বাইরে থেকে যান। তাদের দাবি, স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা নিয়মিত খোঁজ নিলে এবং যাচাই-বাছাই করে যোগ্য ব্যক্তিদের সরকারি সহায়তার আওতায় আনার উদ্যোগ নিলে, জীবনযাপনের চাপ কিছুটা কমতে পারে।

শালুক শুধু খাবার নয় : গ্রামবাংলার পরিচিত জলজ উদ্ভিদ শাপলার কন্দ বা রাইজোম জাতীয় অংশ শালুক নামে পরিচিত। বাংলাদেশে সাদা ও লাল শাপলার শালুক বেশি দেখা যায়। কিছু এলাকায় নীল শাপলার শালুকও পাওয়া যায়। স্বাদ ও জনপ্রিয়তার কারণে সাদা শাপলার শালুকের চাহিদা বেশি। শালুক কাঁচা, সেদ্ধ কিংবা পুড়িয়ে খাওয়া যায়। খোসা ছাড়িয়ে মাছ, শুঁটকি বা অন্যান্য উপকরণের সঙ্গে রান্না করেও খাওয়া হয়।

গ্রামীণ এলাকায় অনেকে এটি আলু বা মিষ্টি আলুর বিকল্প হিসেবেও খেয়ে থাকেন। পুষ্টির দিক থেকেও শালুকে শর্করা, প্রোটিন, আঁশ ও ক্যালসিয়ামসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান রয়েছে। ফলে এটি শুধু মৌসুমি খাবার নয়, পুষ্টিকর খাদ্যের একটি স্থানীয় উৎস হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।