ইট-কংক্রিটের জাঁকজমকপূর্ণ এই রাজধানীতে মানুষ যখন একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে রাতের আকাশে চোখ রাখে, তখন অনেক নির্মাণাধীন উঁচু ভবনের ছাদে ঘনায় অপরাধের অন্ধকার। এগুলো হয়ে ওঠে এলাকার কিশোর গ্যাং, মাদক কারবারি ও অপরাধী চক্রের নিরাপদ আস্তানা।
তাই এই অরক্ষিত ছাদগুলো এখন নগরবাসীর জন্য এক নতুন আতঙ্ক। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র ও অপরাধ বিশ্লেষকদের কথায় উঠে এসেছে এ-সম্পর্কিত নানা তথ্য। নির্মাণাধীন এসব ভবনে দিনে দেখা যায় ইট, বালু, রড ও সিমেন্টের স্তূপ। শ্রমিকদের ব্যস্ততা। আর সন্ধ্যা নামতেই এই কর্মকোলাহল থেমে গেলে তৈরি হয় অন্য পরিবেশ। সে সময় অনেক ভবনে দেখা মেলে না পাহারাদার কিংবা আলোর।
থাকে না দরজাও। এই সুযোগে ভবনের অন্ধকার সিঁড়ি কিংবা খোলা ছাদে জমে ওঠে অপরাধীদের আড্ডা। বিশ্লেষক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, নগরীর বিভিন্ন আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকার নির্মাণাধীন ভবনের ছাদগুলো বর্তমানে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে; বিশেষ করে দিনের বেলা ভবন মালিক বা নিরাপত্তাকর্মীদের কড়া নজরদারি না থাকায় এবং রাতে ছাদের দরজা বন্ধ রাখার সুযোগ না থাকায় সেখানে অপরাধীরা সুরক্ষিত পরিবেশ পায়।
অধিকাংশ ভবনে ছাদের চাবি থাকে না, আবার থাকলেও সেটা থাকে কেয়ারটেকার বা নিরাপত্তারক্ষীদের কাছে। তবে তারাও অপরাধীদের ভয়ে গেট খুলে দেন। অনেক সময় নগদ কিছু টাকা নিয়ে অপরাধীদেরই ফুটফরমাস খাটেন। অনেক ভবনে সেটাও থাকে না, পুরোটাই অরক্ষিত। এই অবাধ সুযোগেই কিশোর গ্যাংগুলো অনায়াসে সেখানে আড্ডা জমায়। স্কুল-কলেজপড়ুয়া বিপথগামী তরুণ-কিশোরেরা সেখানে সিগারেট, ভেপ থেকে শুরু করে মাদকের প্রথম পাঠ নেয়।
এ ছাড়া এলাকাভিত্তিক আধিপত্য বিস্তার বা স্কুল-কলেজের জুনিয়রদের ডেকে নিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানোর নিরাপদ জোন হিসেবেও ব্যবহার হয় ছাদগুলো। রাজধানীর হাজারীবাগের কালুনগর এলাকার বাসিন্দা হাজি তোরাব আলী রূপালী বাংলাদেশকে জানান, রাস্তায় বা গলিতে পুলিশের চেকপোস্ট ও গোয়েন্দা নজরদারি এড়াতে স্থানীয় মাদক কারবারিরা এখন এলাকার অনেক নির্মাণাধীন ভবনের ছাদকে ডেলিভারি পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করছে।
ক্রেতা ও বিক্রেতা ছাদের সিঁড়িতে বা কার্নিশে দাঁড়িয়ে খুব দ্রুত লেনদেন সারে। এ ছাড়া ছিনতাই বা চুরির ছোটখাটো মালামাল (যেমন মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ) লুকিয়ে রাখার গোপন গুদাম হিসেবেও এসব ছাদ বা ভবন ব্যবহৃত হয়। শুধু নির্মাণাধীন ভবনই নয়, এলাকার অনেক আবাসিক ভবনের ছাদও এরা ভয় দেখিয়ে বা দারোয়ানকে কবজা করে ব্যবহার করে। বহু ভবনে দেখা যায় ছাদের নিরাপত্তাপ্রাচীর বা প্যারাপেট ওয়াল বেশ নিচু।
এই নির্জন পরিবেশ কাজে লাগিয়ে নানা ধরনের অসামাজিক কার্যকলাপ তো বটেই, এমনকি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়ার জন্য কিশোরদের ঝুঁকিপূর্ণ স্ট্যান্টবাজি বা সেলফি তোলার প্রবণতাও দুর্ঘটনা ডেকে আনছে। এই অভিনব অপরাধপ্রবণতা এবং এর পেছনের সামাজিক মনস্তত্ত্ব নিয়ে কথা বলেছেন দেশের বিশিষ্ট অপরাধবিজ্ঞানী ও নগর বিশেষজ্ঞরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘শহরের, বিশেষ করে নীরব এলাকার, নির্মাণাধীন বহুতল ভবনগুলো আজ মানুষের নিরাপদ আশ্রয়ের বদলে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো হয়ে গেছে। তদারকি না থাকায় অপরাধীরা সেখানে একধরনের সুরক্ষিত একচ্ছত্র অধিকার পেয়ে যায়।
কিশোর ও যুবসমাজ যখন পর্যাপ্ত খেলাধুলা বা সুস্থ বিনোদনের জায়গা পায় না, তখন এই অব্যবহৃত ছাদগুলোই তাদের বিপথগামী হওয়ার সবচেয়ে বড় ফাঁদ হয়ে দাঁড়ায়। এটি শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয় নয়, এটি আমাদের সামগ্রিক সামাজিক অবক্ষয়ের একটি অংশ। ’ তিনি আরও বলেন, নির্মাণাধীন ভবন শুধু অপরাধ সংঘটনের স্থান নয়; অপরাধের প্রস্তুতি কিংবা অপরাধের পর আত্মগোপনের জায়গাও হতে পারে।
অনেক অপরাধের পরিকল্পনাও এখানে হয়। এসব স্থানে অনেক নারীঘটিত অপরাধও সংঘটিত হয়। নগর পরিকল্পনাবিদ ও প্রকৌশলী আজহারুল ইসলাম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘ইমারত নির্মাণ বিধিমালা বা রাজউকের নিয়মে ছাদের ব্যবহার ও নিরাপত্তা নিয়ে পরিষ্কার নির্দেশনা থাকা দরকার। ভবন মালিকেরা শুধু ফ্ল্যাট বিক্রি বা ভাড়া দেওয়া নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, ছাদের পরিবেশ এবং এর সামাজিক দায়বদ্ধতা তারা পুরোপুরি এড়িয়ে যান।
ছাদগুলোকে যদি আমরা তালাবদ্ধ না রেখে ছাদবাগান কিংবা সামাজিক মিলনায়তন হিসেবে উন্মুক্ত রাখতাম, তবে অপরাধীরা সেখানে আস্তানা গড়ার সুযোগ পেত না। ’ রাজধানীর মোহাম্মদপুরের একটি অভিজাত অ্যাপার্টমেন্ট সোসাইটির সভাপতি মো. রফিকুল ইসলাম তার অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, শুধু নির্মানাধীণ ভবন নয়, মানুষ বাস করছে— এমন ভবনেও এই অপতৎপরতা বেড়েছে।
কিছুদিন আগে তাদের এক ভবনে হঠাৎ গভীর রাতে ছাদে অপরিচিত যুবকদের আনাগোনা দেখা যায়। পরে জানা যায়, ভবনের কেয়ারটেকারকে ম্যানেজ করে কিছু উঠতি বয়সি ছেলে ছাদকে মাদকের আড্ডা বানিয়েছে। এরপর তারা ছাদে সিসিক্যামেরা লাগান এবং ডিজিটাল অ্যাকসেস কন্ট্রোল চালু করেন। এরপরই ওই সমস্যার সমাধান হয়েছে। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, রাজধানীতে পুলিশের প্রচলিত টহলব্যবস্থা মূলত সড়ক, অলিগলি এবং বিপণিবিতানকেন্দ্রিক।
কোনো নির্মাণাধীন ভবনের ভেতরে বা ছাদে কী ঘটছে, সেটা তাদের নজর এড়িয়ে যায়। এ ছাড়া সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া সেখানে গিয়ে তল্লাশি চালানো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষেও কঠিন ও অনিরাপদ। অপরাধীরা এই সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিচ্ছে। অনেক সময় বড় কোনো অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর প্রকাশ্যে আসে ছাদের গোপন কর্মকাণ্ড। বিশ্লেষকদের মতে, নগরীর এসব ছাদ অপরাধের আখড়া থেকে বাঁচাতে এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিতে ছাদের প্রবেশদ্বারে সিসিক্যামেরা স্থাপন করতে হবে, যাতে কে কখন ছাদে উঠছে, এর স্থায়ী ডিজিটাল রেকর্ড থাকে।
এ ছাড়া স্থানীয় বাসিন্দাদেরও কঠোর হতে হবে। ছাদগুলোয় পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা রাখতে হবে। রাজধানীর মোহাম্মদপুর, আদাবর, হাজারীবাগ ও ডেমরা এলাকায় সরেজমিনে অনুসন্ধান এবং ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে নির্মাণাধীন ভবনের ছাদগুলো অপরাধের আখড়া হয়ে ওঠার পেছনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ পাওয়া গেছে। অধিকাংশ নির্মাণাধীন ভবনে রাতের বেলা পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা থাকে না।
অনেক ভবনে কোনো স্থায়ী নিরাপত্তাকর্মী থাকে না, আর থাকলেও তাদের নজরদারি শুধু নিচতলার রড-সিমেন্ট পাহারা দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। সীমানাপ্রাচীর না থাকা বা প্রধান ফটক অরক্ষিত থাকার কারণে অপরাধীরা খুব সহজেই এসব ভবনে প্রবেশ করতে পারে। বহুতল ভবনের ছাদে সহজে নিচ থেকে কেউ দেখতে পায় না। ফলে অপরাধীরা সেখানে নির্বিঘ্নে তাদের কার্যক্রম চালাতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অন্ধকার নামলেই ছাদগুলোয় বসে মাদকের আসর। ফেনসিডিল, ইয়াবা, গাঁজা থেকে শুরু করে বিভিন্ন মাদক বেচাকেনা ও সেবন চলে। বিভিন্ন এলাকার কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা এসব ছাদে বসে আড্ডা দেয়, মারামারির পরিকল্পনা করে এবং সাধারণ পথচারীদের ছিনতাইয়ের পর টাকা ভাগাভাগি করে। নির্জনতার সুযোগ নিয়ে অনেক ভবনের ছাদে জুয়ার আসর বসে এবং বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডও হয়।
অপরাধ সংঘটনের পর অপরাধীরা সাময়িকভাবে তাদের অস্ত্র বা ছিনতাই করা মালামাল এসব ভবনের বিভিন্ন কোণ বা ছাদে লুকিয়ে রাখে। মোহাম্মদপুরের বসিলা এলাকার বাসিন্দা ইটভাটা ব্যবসায়ী সেকেন্দার আলী ব্যাপারী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, তাদের বাড়ির পাশেই একটা ভবনের কাজ দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ আছে। রাতে সেখান থেকে অপরিচিত যুবকদের চিৎকার, হাসাহাসি শোনা যায়।
প্রতিবাদ করতে গেলে উল্টো হুমকি-ধমকি খেতে হয়। সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে তারা সব সময় আতঙ্কে থাকেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্মাণাধীন ভবনে অন্তত রাতের নিরাপত্তাকর্মী, পর্যাপ্ত আলো, সিঁড়ি ও ছাদে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, সিসিটিভি এবং মূল ফটকে শক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। আশপাশের বাসিন্দাদেরও অস্বাভাবিক লোকজনের আনাগোনা সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে।
পুলিশের নিয়মিত টহলের আওতায়ও এসব স্থানকে আনা যেতে পারে; বিশেষ করে যেসব এলাকায় পাশাপাশি একাধিক ভবন নির্মাণাধীন, সেগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান হিসেবে চিহ্নিত করে রাতে টহল বাড়ানো দরকার। কারণ অপরাধীকে গ্রেপ্তার করার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে অপরাধ সংঘটনের সুযোগ বন্ধ করা অনেক বেশি কার্যকর। মনে রাখতে হবে, নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ শুধু একটি অসমাপ্ত স্থাপনার ওপরের অংশ নয়।
সঠিক নজরদারি না থাকলে সেটিই হয়ে উঠতে পারে অপরাধের প্রস্তুতিঘর, আড্ডাখানা কিংবা আত্মগোপনের স্থান।






















