দেশের প্রযুক্তি খাতে গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। মোবাইল যোগাযোগ, ডিজিটাল সেবা, ইন্টারনেট অবকাঠামো থেকে শুরু করে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসা— সব ক্ষেত্রেই বাড়ছে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার। উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে টেলিযোগাযোগ, ৪জি-৫জি নেটাওয়ার্ক, স্থানীয়ভাবে মোবাইল ফোন উৎপাদন ও স্মার্টফোনের বাজার। বেড়েছে ডাটা সেন্টার, ক্লাউড কম্পিউটিং ও স্মার্ট সেবার হারও।
তৈরি হয়েছে ই-কমার্স ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার নতুন সুযোগও। আর এই পরিবর্তনের সঙ্গে সরাসরি যে দেশটি যুক্ত রয়েছে, সেটি হলো বন্ধুপ্রতিম দেশ চীন। দেশটির প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, বিনিয়োগ ও দক্ষতা বিনিময় সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সহযোগিতা দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কতটা বাড়াচ্ছে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
প্রযুক্তি আমদানির পাশাপাশি জ্ঞান, দক্ষতা ও উদ্ভাবনের ভিত্তি কতটা তৈরি হচ্ছে, সেই প্রশ্নও থেকে যাচ্ছে। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে জানা যায়, দেশের ডিজিটাল রূপান্তরে চীনের প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ও বিনিয়োগ গত কয়েক দশকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো, মোবাইল ফোন উৎপাদন, জাতীয় আইসিটি নেটওয়ার্ক থেকে শুরু করে ডেটা সেন্টার, ক্লাউড কম্পিউটিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির নানা ক্ষেত্রে চীনা প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ ক্রমেই বিস্তৃত হয়েছে।
হুয়াওয়ে ও জেডটিইর মতো প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি দেশের টেলিযোগাযোগ খাতের সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে মোবাইল ফোন উৎপাদন ও ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নেও সহযোগিতা করছে। একই সঙ্গে ৫জি প্রযুক্তি, স্মার্ট সেবা, সেমি-কন্ডাক্টর শিল্প এবং প্রযুক্তিনির্ভর বিনিয়োগের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। ফলে চীন-বাংলাদেশ প্রযুক্তি সহযোগিতা এখন আর শুধু যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো সরবরাহে সীমাবদ্ধ নেই; বরং ডিজিটাল অর্থনীতি, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং স্থানীয় দক্ষ জনশক্তি তৈরির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
তবে প্রত্যন্ত অঞ্চলে নেটওয়ার্কের মান ও সেবার সাশ্রয়ী মূল্য নিশ্চিত করা এখনো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, স্থানীয়ভাবে মোবাইল হ্যান্ডসেট উৎপাদন ও সংযোজনের ফলে আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং তূলনামূলক সাশ্রয়ী দামে স্মার্টফোন সরবরাহের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ডিজিটাল অবকাঠামোর বিস্তার গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন ধরনের কাজ ও উদ্যোগের পথ খুলেছে।
ফেসবুকভিত্তিক ক্ষুদ্র ব্যবসা, ফ্রিল্যান্সিং এবং অনলাইন পণ্য সরবরাহের মতো কর্মকাণ্ডে যুক্ত হচ্ছেন অনেক তরুণ। স্থানীয় মোবাইল ফোন উৎপাদন ও সংযোজন কারখানাও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছে। তবে এসব উদ্যোগের প্রকৃত কর্মসংস্থান, স্থানীয় মূল্য সংযোজন এবং উৎপাদনের পরিমাণ নির্ধারণে হালনাগাদ তথ্য প্রয়োজন। চীন-বাংলাদেশ প্রযুক্তি সহযোগিতার বড় প্রশ্ন হলো— এই অংশীদারত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশ কতটা প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও সক্ষমতা অর্জন করছে।
স্থানীয়ভাবে মোবাইল ফোন সংযোজন এবং টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো স্থাপনের অভিজ্ঞতা তৈরি হলেও মূল প্রযুক্তি, নকশা, গবেষণা ও মেধাস্বত্বের বড় অংশ বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে থাকার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে বাংলাদেশ উৎপাদন ও পরিচালন পর্যায়ে দক্ষতা অর্জন করলেও গবেষণা, উদ্ভাবন এবং নিজস্ব প্রযুক্তি তৈরির সক্ষমতা কতটা বাড়ছে, তা আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
তবে এই সহযোগিতার ইতিবাচক দিকও রয়েছে। যৌথ প্রকল্প, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে স্থানীয় প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাপনা, ক্লাউড কম্পিউটিং ও ডেটা সেন্টার পরিচালনার মতো ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এই অভিজ্ঞতা দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে সহায়ক হতে পারে।
তবে উচ্চতর কারিগরি সিদ্ধান্ত, প্রযুক্তির নকশা ও জটিল সমস্যা সমাধানে স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণ না বাড়লে বিদেশি বিশেষজ্ঞনির্ভরতা কাটানো কঠিন হবে। চীনের সঙ্গে প্রযুক্তি সহযোগিতার সাফল্য শুধু কতটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হলো বা কত যন্ত্রপাতি দেশে এলো, তা দিয়ে বিচার করা যথেষ্ট নয়। প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে বাংলাদেশ কতটা প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জন করছে, স্থানীয় প্রকৌশলী ও প্রতিষ্ঠানকে কতটা সক্ষম করে তুলছে এবং নিজস্ব গবেষণা, উদ্ভাবন ও উৎপাদনের ভিত্তি কতটা শক্তিশালী করতে পারছে তার ওপর।
সহযোগিতা যদি প্রযুক্তি স্থানান্তর ও স্থানীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির পথ তৈরি করে, তাহলে তা বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ হবে। অন্যথায় অবকাঠামো সম্প্রসারণের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভরতাও বাড়তে পারে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সাবেক সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর বলেন, চীনা প্রযুক্তি আসার ফলে স্থানীয় বাজারে লজিস্টিকস, এআইচালিত সাপ্লাই চেইন এবং ই-কমার্স খাতের ব্যাপক বিকাশ ঘটেছে।
তবে বড় বড় চীনা ঠিকাদার সরাসরি কাজ পাওয়ায় স্থানীয় ছোট ও মাঝারি আইটি প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় বড় প্রকল্প থেকে বঞ্চিত হয়। এর সমাধান হিসেবে বাধ্যতামূলক ‘যৌথ উদ্যোগ’ বা স্থানীয় সাব-কন্ট্রাক্টিংয়ের নীতি চালু করতে হবে। যদিও স্থানীয় হাই-টেক পার্কগুলোতে চীনা বিনিয়োগের ফলে আমাদের তরুণদের ফ্রিল্যান্সিং ও মোবাইল ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্টে ব্যাপক কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে।
তবে আরও সুপরিকল্পিতভাবে এগুলো দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার বন্ধন আরও দৃঢ় হবে বলে আমি মনে করি। বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিসিআই) সাবেক সাধারণ সম্পাদক আল মামুন মৃধা বলেন, চীনা কোম্পানিগুলোর সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে বাংলাদেশের প্রকৌশলীরা প্রযুক্তি ব্যবহারের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন। দেশের বড় অবকাঠামো প্রকল্পে চীনের প্রকৌশলীদের পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রকৌশলীরা সরাসরি কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন।
এর ফলে আধুনিক প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি পরিচালনা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন কৌশল সম্পর্কে তাদের দক্ষতা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, সরকারি বিভিন্ন বড় প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অনেক বাংলাদেশি প্রকৌশলী এখন বড় পরিসরের প্রকল্প পরিচালনার সক্ষমতা অর্জন করেছেন। একইভাবে বেসরকারি খাতের বিভিন্ন প্রকল্পেও তারা আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার শিখছেন।
বাংলাদেশ-চীনের প্রযুক্তিগত সম্পর্কের দিক নিয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. এমদাদ উল বারী বলেন, দেশে মোবাইল অপারেটরদের সমন্বিত লাইসেন্স দেওয়ার মাধ্যমে ৫জি (৫এ) চালুর পথ সুগম হয়েছে। বিটিসিএলের বড় প্রকল্পগুলোতে হুয়াওয়ে ও জেডটিইর সাশ্রয়ী ও আধুনিক যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে দেশব্যাপী ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ দ্রুততর হয়েছে।
ডেটা সার্বভৌমত্ব ও তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিটিআরসি আন্তর্জাতিক সাইবার নিরাপত্তা প্রোটোকল কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। পাশাপাশি, দেশে প্রযুক্তিপণ্য সংযোজন ও স্মার্টফোন উৎপাদন উৎসাহিত করতে স্থানীয় কারখানাগুলোর জন্য শুল্ক ছাড় এবং নীতিগত সহায়তা অব্যাহত রাখা হয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষের কাছে ডিজিটাল সেবা সহজে পৌঁছায়।
হুয়াওয়ের আইসিটি একাডেমি বা চীনা বিভিন্ন বৃত্তির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ক্লাউড কম্পিউটিং, ডেটা সায়েন্স এবং ৫জি নেটওয়ার্কিংয়ের মতো আধুনিক ফ্রেমওয়ার্কের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে জানিয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসাইন বলেন, তবে অ্যাকাডেমিক গবেষণার জন্য বৈশ্বিক এই কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে মৌলিক ফান্ডিং বা ল্যাবরেটরি সহায়তার পরিমাণ আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
বাংলাদেশ যদি কেবল প্রযুক্তি ব্যবহারকারী না হয়ে নিজস্ব পেটেন্ট বা উদ্ভাবন তৈরি করতে চায়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসে শুধু ‘কোডিং বা নেটওয়ার্কিং’ শেখানোর বাইরে গিয়ে উন্নত ‘গবেষণা ও উন্নয়নের’ জন্যও সরকারি-বেসরকারি যৌথ তহবিল গঠন করা অত্যন্ত জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।






















