ভালো জীবন, বেশি আয় আর নিরাপদ ভবিষ্যতের আশায় প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কারো লক্ষ্য পশ্চিম ইউরোপের উন্নত দেশ, আবার কেউ তুলনামূলক কম খরচে পূর্ব ইউরোপের কোনো দেশে গিয়ে কাজ শুরু করার স্বপ্ন দেখেন।
এই স্বপ্নকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে বড় একটি দালালচক্র ও অনিয়মের বাজার। ‘ওয়ার্ক পারমিট’, ‘জব ভিসা’ কিংবা ‘ভিসা কনভার্সন’Ñএমন নানা আকর্ষণীয় শব্দ ব্যবহার করে অনেকের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে বিপুল পরিমাণ অর্থ। কিন্তু কাগজপত্র হাতে পাওয়ার পর দূতাবাসে আবেদন করতে গিয়ে কেউ জানতে পারেন, নথি ভুয়া।
কেউ আবার বৈধ ভিসা নিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে দেখেন, যে প্রতিষ্ঠানে চাকরির কথা বলা হয়েছিল, বাস্তবে সেখানে সেই চাকরি বা প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বই নেই। ফলে ইউরোপ যাওয়ার স্বপ্ন অনেকের জন্য পরিণত হচ্ছে ঋণ, অনিশ্চয়তা, বেকারত্ব এবং কখনো কখনো অবৈধ অভিবাসনের ঝুঁকিতে। ইউরোপ মানেই উচ্চ বেতন নয় বাংলাদেশে ইউরোপ বলতে সাধারণত জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে কিংবা নেদারল্যান্ডসের মতো উন্নত দেশগুলোকেই বোঝানো হয়।
কিন্তু ইউরোপের অর্থনৈতিক বাস্তবতা একরকম নয়। পশ্চিম ও উত্তর ইউরোপের তুলনায় পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের বেশ কিছু দেশে মজুরি ও জীবনযাত্রার মান তুলনামূলকভাবে কম। তাই কোনো একটি দেশে ‘ইউরোপের বেতন’ কতÑএমন একটি সাধারণ ধারণা বাস্তব পরিস্থিতি বোঝার জন্য যথেষ্ট নয়। একই ধরনের কাজের জন্য জার্মানি বা অস্ট্রিয়ার মতো দেশে যে মজুরি পাওয়া যেতে পারে, হাঙ্গেরি, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া কিংবা সার্বিয়ার মতো দেশে তার চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কম আয় হতে পারে।
আবার বেতন থেকে কর, সামাজিক নিরাপত্তা, আবাসন ও অন্যান্য খরচ বাদ দেওয়ার পর হাতে থাকা অর্থ আরও কমে যেতে পারে। এ কারণে শুধু ‘ইউরোপে চাকরি’ শুনেই সম্ভাব্য আয় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। ‘ওয়ার্ক পারমিট’ ঘিরে প্রতারণার অভিযোগ বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলোÑ ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর কাগজপত্র।
বিভিন্ন সময় অভিযোগ পাওয়া যায়, কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান বিপুল অর্থের বিনিময়ে চাকরির অফার, ইনভাইটেশন লেটার কিংবা ওয়ার্ক পারমিটের কাগজ দেওয়ার কথা বলে। কিন্তু দূতাবাসে আবেদন করার পর দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট নথির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একই ধরনের নথিতে শুধু নাম ও ব্যক্তিগত তথ্য পরিবর্তন করে একাধিক ব্যক্তির কাছে কাগজ দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
আরও গুরুতর সমস্যা হলোÑকিছু প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র ও অনলাইন উপস্থিতি থাকলেও বাস্তবে সেখানে বিদেশি কর্মী নিয়োগের মতো কার্যক্রম নাও থাকতে পারে। ফলে বিদেশে পৌঁছানোর পর কর্মী জানতে পারেন, প্রতিশ্রুত চাকরি বাস্তবে নেই। এরপর শুরু হয় নতুন সংকট। বৈধ ভিসা নিয়ে প্রবেশ করলেও চাকরি না থাকায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় রেসিডেন্স বা ওয়ার্ক পারমিটের শর্ত পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
একপর্যায়ে কেউ কেউ বৈধ অবস্থান হারিয়ে অনিয়মিত অভিবাসীতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েন। কাগজে এক বেতন, বাস্তবে আরেক বিদেশে যাওয়ার আগে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় বেতনের অঙ্ককে। কিন্তু বিজ্ঞাপনে বা মৌখিকভাবে যে বেতন বলা হয়, কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার পর বাস্তব আয় তার চেয়ে কম হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এর কারণ হতে পারে চুক্তিতে ভিন্ন বেতন, কর ও সামাজিক নিরাপত্তা বাবদ কর্তন, আবাসন বা খাবারের খরচ কিংবা কাজের সময় ও পারিশ্রমিকের মধ্যে পার্থক্য।
বিশেষ করে কম মজুরির দেশের ক্ষেত্রে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরিÑকাগজে উল্লেখ করা মোট বেতন আর মাস শেষে কর্মীর হাতে থাকা অর্থ এক নয়। তাই বিদেশে যাওয়ার আগে শুধু মাসিক বেতন কত, তা জানলেই হবে না। জানতে হবে কর কাটার পর কত থাকবে, আবাসন কে দেবে, খাবারের খরচ কত, যাতায়াতের ব্যয় কে বহন করবে এবং অতিরিক্ত কাজের জন্য কী হারে পারিশ্রমিক দেওয়া হবে।
কম দক্ষতার শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা পূর্ব ইউরোপের কয়েকটি দেশে নির্মাণ, কৃষি, উৎপাদন, ওয়েল্ডিং, প্লাম্বিং কিংবা বিভিন্ন কারিগরি কাজে বিদেশি শ্রমিকের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে যেকোনো অদক্ষ শ্রমিকের জন্য সেখানে সহজেই স্থায়ী কাজের সুযোগ তৈরি হবে। অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তারা নির্দিষ্ট দক্ষতা, অভিজ্ঞতা কিংবা শারীরিক সক্ষমতা চান।
ভাষাজ্ঞানও কর্মক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশ থেকে যাওয়া কোনো কর্মী যদি প্রতিশ্রুত কাজের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা না রাখেন, তাহলে চাকরিতে টিকে থাকা কঠিন হতে পারে। এমনকি নিয়োগকর্তা তাকে বাদও দিতে পারেন। ফলে বিদেশে যাওয়ার আগে ‘কাজটি পাওয়া যাবে কি না’Ñএর পাশাপাশি ‘আমি কাজটি করতে পারব কি না’Ñএই প্রশ্নটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বৈধ পথে যাওয়া আর বৈধভাবে থাকাÑ এক বিষয় নয় অনেকের ধারণা, একবার ইউরোপের কোনো দেশে বৈধ ভিসায় প্রবেশ করতে পারলেই ভবিষ্যৎ নিরাপদ। বাস্তবে বিষয়টি এত সহজ নয়। ওয়ার্ক পারমিট সাধারণত নির্দিষ্ট নিয়োগকর্তা, পেশা, চুক্তি কিংবা সময়সীমার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। চাকরি চলে গেলে বা চুক্তির শর্ত পূরণ না হলে কর্মীর বৈধ অবস্থানও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
তাই ভিসা পাওয়া মানেই দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের নিশ্চয়তা নয়। একইভাবে একটি দেশের ওয়ার্ক পারমিট পাওয়া মানেই ইউরোপের অন্য দেশে অবাধে কাজ করার অধিকার পাওয়া নয়। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য নয়Ñএমন দেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও পরিষ্কারভাবে বোঝা প্রয়োজন। একটি দেশে বৈধভাবে প্রবেশ বা কাজ করার অনুমতি অন্য দেশে গিয়ে কাজ করার স্বয়ংক্রিয় অধিকার তৈরি করে না।
‘এক দেশ থেকে আরেক দেশে চলে যাব’Ñ বিপজ্জনক ধারণা দালালদের কাছ থেকে অনেক সময় এমন ধারণা দেওয়া হয় যে কোনোভাবে পূর্ব ইউরোপের একটি দেশে ঢুকতে পারলেই পরে সেখান থেকে পশ্চিম ইউরোপের উন্নত দেশে যাওয়া যাবে। এই ধারণা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। একটি দেশের বৈধ ভিসা বা রেসিডেন্স পারমিট অন্য দেশের কাজের অনুমতি নয়। সীমান্ত পেরিয়ে অবৈধভাবে অন্য দেশে প্রবেশের চেষ্টা করলে আটক, বহিষ্কার, আটক কেন্দ্রে অবস্থান কিংবা ভবিষ্যতে ইউরোপে প্রবেশের ক্ষেত্রে জটিলতার মতো পরিণতি হতে পারে।
অনেকে পশ্চিম ইউরোপে যাওয়ার আশায় সীমান্তবর্তী অঞ্চল, জঙ্গল বা দুর্গম পথ ব্যবহার করেন। এই যাত্রায় শারীরিক বিপদের পাশাপাশি পাচারকারী, দালাল ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নানা ঝুঁকিও থাকে। কয়েক লাখ টাকা খরচ করেও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ বিদেশ যাওয়ার জন্য বাংলাদেশে অনেক পরিবার জমি বিক্রি করে, ঋণ করে কিংবা সঞ্চয় ভেঙে অর্থ জোগাড় করে। ফলে বিদেশে গিয়ে প্রত্যাশিত চাকরি না পাওয়া শুধু ব্যক্তিগত হতাশা নয়; পুরো পরিবারের ওপর এর অর্থনৈতিক প্রভাব পড়ে।
যে অর্থ দিয়ে একজন কর্মী বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করেন, তার বড় অংশ যদি ভুয়া কাগজপত্র, অতিরিক্ত এজেন্সি ফি কিংবা দালালের পেছনে চলে যায়, তাহলে বিদেশে পৌঁছানোর পর হাতে প্রয়োজনীয় অর্থও থাকে না। চাকরি না পেলে তখন নতুন করে থাকার খরচ জোগাড় করা, বৈধ কাগজপত্র ঠিক রাখা কিংবা দেশে ফেরার ব্যয় বহন করাও কঠিন হয়ে পড়ে। তথ্য যাচাই করাই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা বিদেশে যাওয়ার আগে সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো তথ্য যাচাই করা।
কোনো এজেন্সি বা মধ্যস্থতাকারীর দেওয়া তথ্যকে চূড়ান্ত সত্য ধরে নেওয়া উচিত নয়। প্রথমেই দেখতে হবেÑ নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানটি বাস্তবে অস্তিত্বশীল কি না। চাকরির অফারটি সরাসরি প্রতিষ্ঠান থেকে এসেছে কি না। ওয়ার্ক পারমিট কোন কর্তৃপক্ষ ইস্যু করেছে। সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারি ওয়েবসাইটে নিয়োগ বা পারমিটের তথ্য যাচাই করা যায় কি না। চাকরির চুক্তিতে বেতন, কাজের সময়, ছুটি ও অন্যান্য সুবিধা কী লেখা আছে।
কর ও অন্যান্য কর্তন বাদ দেওয়ার পর প্রকৃত আয় কত। আবাসন ও খাবারের খরচ কে বহন করবে। চাকরি হারালে বা নিয়োগকর্তা পরিবর্তন করলে ভিসা বা রেসিডেন্সের ওপর কী প্রভাব পড়বে। এজেন্সিকে দেওয়া অর্থের বিনিময়ে কী সেবা পাওয়া যাচ্ছে এবং তার লিখিত প্রমাণ আছে কি না। সম্ভব হলে মধ্যস্থতাকারীর পরিবর্তে সরাসরি নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে তথ্য নিশ্চিত করা উচিত।
দক্ষতা থাকলে সুযোগের ধরনও বদলে যায় ইউরোপের শ্রমবাজারে দক্ষ কর্মীদের জন্য সুযোগ অদক্ষ শ্রমিকদের তুলনায় ভিন্ন। কারিগরি শিক্ষা, পেশাগত প্রশিক্ষণ, কাজের অভিজ্ঞতা এবং ভাষাজ্ঞান একজন কর্মীর বৈধভাবে বিদেশ যাওয়ার সম্ভাব্য পথ বাড়াতে পারে। ইলেকট্রিশিয়ান, ওয়েল্ডার, প্লাম্বার, মেশিন অপারেটর, কেয়ারগিভিং, আইটি, ইঞ্জিনিয়ারিংসহ বিভিন্ন পেশায় দেশভেদে দক্ষ কর্মীর চাহিদা থাকতে পারে।
তবে প্রতিটি পেশার যোগ্যতা, লাইসেন্স ও নিয়োগের নিয়ম আলাদা। তাই শুধু ‘ইউরোপ যেতে চাই’Ñএই লক্ষ্য না রেখে কোন পেশায় দক্ষতা অর্জন করে কোন দেশের বৈধ শ্রমবাজারে প্রবেশ করা সম্ভব, সেটি আগে নির্ধারণ করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপের স্বপ্ন থাকুক, কিন্তু সিদ্ধান্ত হোক তথ্যের ভিত্তিতে ইউরোপে কাজের সুযোগ নেই বিষয়টি এমন নয়।
আবার ওয়ার্ক পারমিট পেলেই ভালো বেতন, স্থায়ী চাকরি কিংবা উন্নত জীবন নিশ্চিতÑ এটিও সত্য নয়। বাস্তবতা হলো, দেশভেদে শ্রমবাজার, মজুরি, জীবনযাত্রার ব্যয়, অভিবাসননীতি এবং বিদেশি কর্মীদের জন্য সুযোগের ক্ষেত্রে বড় পার্থক্য রয়েছে। তাই বিদেশ যাওয়ার আগে দালালের কথার চেয়ে সরকারি তথ্য, নিয়োগদাতার লিখিত চুক্তি এবং সংশ্লিষ্ট দেশের অভিবাসন আইনের ওপর নির্ভর করা জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলোÑ অবৈধ পথে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা না করা। কারণ একটি ভুল সিদ্ধান্তের মূল্য শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়; বৈধ অভিবাসনের ভবিষ্যৎ সুযোগও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন বাস্তব হতে পারে। তবে সেই স্বপ্নের ভিত্তি হতে হবে সঠিক তথ্য, যাচাই করা নিয়োগ, বৈধ কাগজপত্র এবং বাস্তবসম্মত প্রত্যাশা।
তাহলেই ‘ওয়ার্ক পারমিট’ একটি প্রতারণার ফাঁদ না হয়ে বৈধভাবে নতুন জীবনের সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।






















