চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে সমুদ্র উপকূলজুড়ে ছোট-বড় প্রায় ৪০টি জাহাজভাঙা শিল্প রয়েছে। আর এ শিল্পের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল শত শত অক্সিজেন কারখানা। কিন্তু বর্তমানে এই শিল্পে নেমে এসেছে চরম ধস।
জাহাজভাঙা শিল্পে মন্দা, ঘন ঘন লোডশেডিং এবং উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিক বৃদ্ধির ফলে একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে অক্সিজেন কারখানাগুলো। এই সংকট সরাসরি প্রভাব ফেলছে স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের ওপর। একদিকে লোকসানের মুখে পড়ে কারখানা বন্ধ করছেন মালিকরা, অন্যদিকে কর্মহীন হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন শত শত শ্রমিক। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এক সময় চাহিদা ও শিপইয়ার্ডগুলোর ইস্পাত শিল্পের অক্সিজেনের জোগান দিতে এলাকায় গড়ে উঠেছিল অন্তত ১৫টি কারখানা।
জাহাজ কাটার প্রক্রিয়ায় অক্সিজেন অপরিহার্য হওয়ায় এ কারখানাগুলোর ব্যবসায়িক সাফল্য ছিল আকাশচুম্বী। কিন্তু এ শিল্পে ভাটা পড়ায় পরিস্থিতি আমূল পাল্টে গেছে। শিপইয়ার্ডগুলোতে জাহাজ আসা কমে যাওয়ায় অক্সিজেনের চাহিদা এখন অর্ধেকে নেমে এসেছে। গত চার বছরে সীতাকু-ের ১৫টির মধ্যে অন্তত ৮টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।
বন্ধ হওয়া কারখানাগুলোর তালিকায় রয়েছে- রিগ্যাল অক্সিজেন, এআরএল অক্সিজেন, এসএল অক্সিজেন, মাজুন অক্সিজেন, রাইজিং অক্সিজেন, ব্রাদার্স অক্সিজেন, সীমা অক্সিজেন, ফয়জন অক্সিজেন, গোল্ডেন অক্সিজেন, মানতি অক্সিজেন, রিফাত অক্সিজেন, পাখিজা অক্সিজেন ও শীতলপুর অক্সিজেন। পাঁচ বছর আগে বন্ধ হওয়া ব্রাদার্স অক্সিজেন লিমিটেডে একসময় মাসে প্রায় আড়াই হাজার সিলিন্ডার অক্সিজেন উৎপাদিত হতো, যা আজ কেবলই অতীত।
বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে টিকে আছে মাত্র চারটি কারখানাÑ কেআর অক্সিজেন, মাস্টার অক্সিজেন লিমিটেড, জিরি সুবেদার অক্সিজেন ও অক্সিকো অক্সিজেন। এ ছাড়া আবুল খায়ের, কেএসআরএম ও বিএসআরএম গ্রুপ কেবল নিজেদের শিল্প কারখানার প্রয়োজনে উৎপাদন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। শিল্প-সংশ্লিষ্টরা জানান, পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের বিধিনিষেধে শিপইয়ার্ডগুলো ‘কমলা’ থেকে ‘লাল’ শ্রেণিতে উন্নীত হওয়ার পর থেকে জাহাজভাঙা কার্যক্রম অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে।
ইয়ার্ড বন্ধ থাকায় অক্সিজেনের চাহিদায় ব্যাপক ধস নেমেছে। সীতাকু-ের অক্সিকো অক্সিজেন লিমিটেডের চিত্রই বলে দেয় পরিস্থিতি কতটা নাজুক। প্রতিষ্ঠানটিতে আগে প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ৭০০ সিলিন্ডার অক্সিজেন উৎপাদন হলেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে ৯০০ থেকে ১ হাজার সিলিন্ডারে। ফলে প্রতি মাসে প্রতিষ্ঠানটি ১৫-২০ লাখ টাকা লোকসান গুনছে এবং শ্রমিক সংখ্যা ১০০ থেকে অর্ধেকে নেমে এসেছে।
কারখানার ফিল্ড ম্যানেজার সিরাজ জানান, জাহাজ কাটিংয়ের প্রতিটি ধাপে অক্সিজেনের ওপর নির্ভরশীলতা প্রবল। আগে একটি ইয়ার্ডে জাহাজ কাটতে ৫-১০ হাজার সিলিন্ডার অক্সিজেন প্রয়োজন হতো, যা এখন ১-৩ হাজারে নেমে এসেছে। অন্যদিকে, পরিচালনায় মাসিক ব্যয় ৬০-৬৫ লাখ টাকা হওয়ায় উৎপাদন কমার ফলে লোকসানের বোঝা ভারী হচ্ছে। বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়েও চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
কারখানার ব্যবস্থাপক আব্দুল হালীম জানান, বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও লোডশেডিং এই শিল্পের মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা। ২০২৪ সালে বিদ্যুৎ সংকটের কারণে প্রায় ৬০ লাখ এবং ২০২৫ সালে ৮৫ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। মাসের অন্তত ১০ দিন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকায় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। শিপইয়ার্ডে কাজ করা শ্রমিকরা জানান, জাহাজ কাটিং বন্ধ থাকায় তাদের দৈনন্দিন আয় বন্ধ হয়ে গেছে।
অক্সিজেন কারখানাগুলো বন্ধ হলে তারা বিকল্প কোনো কাজের সুযোগও পাচ্ছেন না। শিল্প বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জাহাজভাঙা শিল্প সচল না হলে অক্সিজেন খাত পুরোপুরি ধসে পড়ার দ্বারপ্রান্তে। দ্রুত নীতিগত সহায়তা এবং পরিবেশগত জটিলতা নিরসন করা না হলে সীতাকু-ের এই গুরুত্বপূর্ণ শিল্পখাতটি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানÑউভয় দিক থেকেই সংকুচিত হয়ে পড়বে, যা স্থানীয় অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত।


















