রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ যত গড়াচ্ছে, যুদ্ধের ধরনও ততটাই বদলে যাচ্ছে। প্রচলিত ট্যাংক, কামান ও গোলাবারুদের পাশাপাশি এখন শত শত মাইল দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে অন্যতম প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠেছে ড্রোন।
আকাশপথে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার এই প্রতিযোগিতায় দুই দেশই দ্রুত নিজেদের দূরপাল্লার ড্রোন সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রের পাশাপাশি বেসামরিক অবকাঠামোও ক্রমেই ঝুঁকির মুখে পড়ছে। ইউক্রেনের রাতভর ড্রোন হামলার প্রস্তুতি : ইউক্রেন নতুন ধরনের এফপি-২ হামলাকারী ড্রোন ব্যবহার করছে। এসব ড্রোন ১০০ কেজির বেশি বিস্ফোরক বহন করে ২০০ মাইলের বেশি দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে।
ইউক্রেনের দাবি, এসব হামলায় রাশিয়ার সরবরাহব্যবস্থা ও সামরিক অবকাঠামোয় চাপ তৈরি হয়েছে। বর্তমানে এক রাতে প্রায় ৩০০ ড্রোন ব্যবহারের সক্ষমতা রয়েছে ইউক্রেনের। ভবিষ্যতে এক রাতে এক হাজার ড্রোন উৎক্ষেপণের সক্ষমতা অর্জনই তাদের লক্ষ্য। তুলনামূলক কম খরচের ড্রোন দিয়ে প্রথমে প্রতিপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শনাক্ত করে পরে মূল লক্ষ্যবস্তুতে আঘাতের কৌশলও নেওয়া হচ্ছে।
রাশিয়ার জেটচালিত ড্রোন : পিছিয়ে নেই রাশিয়াও। ইরানের নকশায় তৈরি শাহেদ ড্রোনের উন্নত সংস্করণে জেট ইঞ্জিন যুক্ত করা হয়েছে। নতুন গেরান-৪ ঘণ্টায় প্রায় ৩০০ থেকে ৫৫০ কিলোমিটার এবং গেরান-৫ প্রায় ৬০০ কিলোমিটার গতিতে ছুটতে পারে। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের দাবি, এসব ড্রোনের ইঞ্জিন চীনে তৈরি। গতি বেড়ে যাওয়ায় নতুন ড্রোনগুলো আগের তুলনায় ইউক্রেনের প্রতিরোধব্যবস্থা ভেদ করতে বেশি সক্ষম হচ্ছে।
ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের হিসাবে, পুরোনো ড্রোন ঠেকানোর সাফল্য যেখানে ৯০ শতাংশের বেশি ছিল, নতুন মডেলের ক্ষেত্রে তা প্রায় ৬০ শতাংশে নেমে এসেছে। প্রাণঘাতী পালটাপালটি হামলা : ড্রোনযুদ্ধের পাশাপাশি দুই পক্ষের পালটাপালটি হামলায় বাড়ছে প্রাণহানি। সম্প্রতি এক দিনে রাশিয়া ও ইউক্রেনের হামলায় অন্তত ১৬ জন নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছে দুই দেশ।
ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলে রুশ হামলায় বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির খবর এসেছে। রাশিয়াও ইউক্রেনীয় হামলায় কয়েকজন নিহত হওয়ার দাবি করেছে। জাতিসংঘের কর্মকর্তারা যুদ্ধের কারণে বেসামরিক মানুষের হতাহতের সংখ্যা বাড়তে থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আলোচনা চললেও এখন পর্যন্ত বড় কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি।
ইন্টারনেট ও তথ্যকেন্দ্রও হামলার লক্ষ্য : যুদ্ধের নতুন আরেকটি ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে ইন্টারনেট ও তথ্য অবকাঠামো। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি অভিযোগ করেছেন, রাশিয়া দেশটির তথ্যকেন্দ্র ও ইন্টারনেট সরবরাহব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে হামলা বাড়িয়েছে। তার দাবি, এর ফলে মানুষের যোগাযোগ, পড়াশোনা ও কাজ ব্যাহত হচ্ছে। কিয়েভে একটি ব্যবসা কেন্দ্রে হামলায় একটি তথ্যকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর কয়েকটি এলাকায় ইন্টারনেট সেবা ব্যাহত হয়।
এর আগে রুশ হামলার কারণে কিয়েভ ও আশপাশের অঞ্চলের প্রায় এক লাখ পরিবার ইন্টারনেট সংযোগ হারিয়েছিল। শীতের আগে অবকাঠামোয় চাপ : শীত মৌসুম সামনে রেখে ইউক্রেনের জ্বালানি ও রেল অবকাঠামোয়ও রুশ হামলা বাড়ছে। অন্যদিকে ইউক্রেন রাশিয়ার তেল শোধনাগার ও সরবরাহকেন্দ্রে হামলা চালাচ্ছে। কিয়েভের দাবি, এসব স্থাপনা রাশিয়ার যুদ্ধ পরিচালনায় অর্থ জোগাতে ভূমিকা রাখে।
রুশ হামলায় ইউক্রেনের বৃহত্তম ইস্পাত কারখানাও বন্ধ হয়ে গেছে। পাঁচ সপ্তাহে চারবার হামলা এবং পাঁচ শ্রমিকের মৃত্যুর পর কারখানাটি পুরোপুরি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ইউক্রেনের রপ্তানি আয়ে ইস্পাত খাতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকায় এ ঘটনা দেশটির অর্থনীতিতেও চাপ বাড়াতে পারে। জার্মানি-রাশিয়া বৈঠকেও কাটেনি দূরত্ব : এদিকে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে জার্মানি ও রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে বৈঠক হয়েছে।
দুই দেশের মধ্যে ২০২২ সালের আগ্রাসনের পর এটিই ছিল এ ধরনের প্রথম বৈঠক। আলোচনায় ইউক্রেন যুদ্ধ, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং কৃষ্ণ সাগর দিয়ে শস্য রপ্তানির বিষয় উঠে আসে। জার্মানি রাশিয়াকে ইউরোপের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ানোর পথ থেকে সরে আসার আহ্বান জানালেও রাশিয়া তা প্রত্যাখ্যান করেছে। একই সঙ্গে কৃষ্ণ সাগরে নিরাপদ নৌ-চলাচল ও শস্য রপ্তানি পুনরায় সচল করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
শান্তির সম্ভাবনা, নাকি আরও দীর্ঘ যুদ্ধ? রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন সরাসরি শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরুর বিষয়টি ভেবে দেখার কথা বলেছেন। তবে একই সঙ্গে তিনি ইউক্রেনের হামলার জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন। অন্যদিকে কিয়েভও যুক্তরাষ্ট্রকে সঙ্গে নিয়ে ত্রিপক্ষীয় আলোচনায় বসার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে। ইউক্রেনের পক্ষ থেকে রাশিয়ার ওপর প্রভাব খাটিয়ে যুদ্ধ বন্ধে চীনকে উদ্যোগী করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
রাশিয়া অবশ্য ইউরোপের সঙ্গে সংঘাতে জড়ানোর কোনো পরিকল্পনা নেই বলে দাবি করেছে। সব মিলিয়ে যুদ্ধ এখন শুধু সীমান্তের মাটিতে সীমাবদ্ধ নেই। আকাশে ড্রোনের লড়াই, মাটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, সমুদ্রে বন্দর ও জাহাজের ওপর আঘাত এবং তথ্য অবকাঠামোতে হামলাÑ সব মিলিয়ে সংঘাতের পরিধি আরও বিস্তৃত হচ্ছে। শান্তি আলোচনার নানা উদ্যোগের মধ্যেও যুদ্ধ থামার স্পষ্ট পথ এখনো অনিশ্চিত।



















