পরী তার সমস্ত নিত্যদিনের কাজকর্ম শেষ করে জানালার পাশে বসে। বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাইরের দৃশ্যগুলোকে অবলোকন করে। কথা বলে পাখির সঙ্গে, পাখি ও পাখি তোমার মতো দুটো পাখা দাও না আমাকে।
যেন তোমার মতো উড়তে পারি। আকাশকে বলে, আকাশ ও আকাশ আমাকে একটু আকাশে বেড়াতে নিয়ে যাও না। একদম তোমার শেষ সীমানায়। জান আমার না ইচ্ছে করে, তোমার শেষ সীমানা দেখতে। মেঘ ছুয়ে দেখতে। কে শোনে কার কথা। পরী বলে যায় পরীর কথা। পরীর এই চার দেয়ালের বন্দি জীবন ভালো লাগে না। রাস্তার ফুটপাতে অসংখ্য ছেলেমেয়ে প্রতিদিন দেখতে পায় পরী। মনে মনে, ভাবে ওরা কত্ত স্বাধীন।
পাখির মতো ঘুরে বেড়ায়। ওদের যখন মন চায় বাইরে বের হয়, যখন মন চায় ঘরে ঢোকে। ওদের কেউ বকুনি দেই না। পীঠে একটা ঝোলা নিয়ে অনেক কিছু কুড়িয়ে বেড়ায়। ওরা অনেক খেলনা কুড়িয়ে নিয়ে বাসায় খেলে নিশ্চয়। কত মজা করে। আর আমি সারাদিন বাসাবন্দি। স্কুলে যাওয়া-আসা, খাওয়া আর ঘুমানো। একদিন পরী ডাস্টবিনে একটা ছেলেকে ময়লা ঘাঁটাঘাঁটি করতে দেখে জিজ্ঞেস করল, এই ছেলে তুমি ডাস্টবিনে কি ঘাঁটাঘাঁটি করছো?
এখানে তো সব ময়লা। ছেলেটি বলল, এহানে অনেক খেলনা আছে। খাবার আছে তাই আমরা কুড়াইয়া নিই। কথা শুনে পরী তো অবাক। ওমা কি বলে ছেলেটা ময়লাতে আবার খাবার থাকে? পরী সোজা বাসা থেকে নিচে নেমে এলো ওরা কি করে তা কাছ থেকে দেখতে। ডাস্টবিনের সামনে গিয়ে দেখে বাপরে কি দুর্গন্ধ। দাঁড়ানোই যাচ্ছে না। তখন সে ছেলেটাকে বলল, এমন দুর্গন্ধ জায়গা থেকে কেউ খাবার খায়?
কথাটা শোনা মাত্রই ছেলেটা হেসে দিল। পরী বলল, আচ্ছা তোমার নাম কি? আমার নাম সূর্য। বাহ! এত সুন্দর নাম। কে রেখেছে? আমার মাই রাখছে। কিন্তু এহন আর এই নামে কেউ ডাহে না। কেন বল তো? আমাদের ঘর-বাড়ি নাই। রাস্তা ঘাঁটে ঘুমাই। ময়লা ঘাঁটি। খাইলে পাই না পাইলে উপাস থাহি। তাই মাইনসে আমাগো টোহাই ডাহে। পথ-শিশুও কয়। এসব শুনে পরীর মন খারাপ হয়ে গেল।
তোমরা এমন ময়লা জায়গা থেকে ময়লা খাবার খাও তোমাদের গন্ধ লাগে না। আপা কি কয় আমাদের আবার গন্ধ, খাবারই পাই না। এডাই আমাদের জন্য অনেক। আমাদের তো কেউ নেই আপা। আমাদের পেটে অনেক ক্ষিধা। আমরা কোনোদিন পেট ভইরা খাইতে পারি না। তাই তো মানুষ যা ফালায়ে দেয় তাই আমরা খাই। পরীর তো শুনেই বমি আসছে আর সূর্য কীভাবে এসব খাচ্ছে। ছোট্ট পরীর মাথায় আসছে না।
পরীর কান্না চলে আসল। তখন পরী তাকে একটু দাঁড়াও বলে দৌড় দিল। ঘর থেকে এনে সূর্যকে তার বিকেলের সব নাস্তা খেতে দিল। সূর্য এত ভালো নাস্তা দেখে কেঁদে ফেলল। বলল, আপা আমি কোনোদিন এমন ভালো নাস্তা খাইনি। ছোহে দেহাও তো দূরের কথা। পরী বলল, চিন্তা করো না আমি রোজ আমার খাবার তোমার সঙ্গে ভাগ করব। এভাবে প্রায় তারা নাস্তা ভাগ করে খায়। কিন্তু কয়দিন।
পথ-শিশুদের কেউ কী ভালো চোখে দেখে? মা একদিন পরীর এই কা- খেয়াল করল। প্লেট হাতে পরীকে ধরল। সূর্য আর পরী দুজনেই ভয় পেয়ে গেল। মা বলল, কি হচ্ছে এসব? মামনি আমি সূর্যকে খাবার দিচ্ছি। কি? সূর্য কে? এই যে তোমার সামনে দাঁড়িয়ে ছেলেটা। কি বললি, পথের ছেলেটা? ওকে পথের ছেলে বল না মামনি। ওতোও একজন শিশু। চুপ করো। তোমার আক্কেল জ্ঞান কিছু আছে?।
এসব পথের ছেলেদের সঙ্গে কেউ মিশে? তার নাম আবার সূর্য। যাও ঘরে যাও। পরীর মায়ের কথা শুনে সূর্য মন খারাপ করে আবার ডাস্টবিনে ময়লা ঘাঁটতে চলে গেল। আর পরী নীরবে কাঁদতে লাগল। মনে মনে বলল, একদিন বড় হয়ে আমি তাদের জন্য কিছু করব। ওদের আসল নাম ফিরিয়ে দিব।




















