আজ সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
১২ আশ্বিন, ১৪৩৩ | ১৫ রবিউস সানি ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
২৯°C
সর্বোচ্চ: ৩৫°C
সর্বনিম্ন: ২৮°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৫৩%

আগাম আন্দোলনে বিতর্কে ১১ দল

  • MIT ERP
  • Update Time : 11:04:27 pm, Saturday, 26 September 2026
  • 19

আগাম আন্দোলনে বিতর্কে ১১ দল

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

বর্তমান বিএনপি সরকারের সাত মাস না পেরোতেই রাজপথের কঠোর কর্মসূচি ঘিরে একধরনের বিতর্কে কিংবা প্রশ্নের মুখে পড়েছে প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। অল্প সময়ের ব্যবধানে বিভাগীয় মহাসমাবেশ, সচিবালয় ঘেরাও ও লংমার্চের মতো শক্ত কর্মসূচিতে যাওয়াকে অযৌক্তিক মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

তবে জামায়াত জোটের নেতাদের দাবি, জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ জনস্বার্থ রক্ষায় সরকারের ব্যর্থতার কারণেই বাধ্য হয়ে রাজপথে নামতে হয়েছে। পাশাপাশি সরকার ও বিএনপির নেতারা বলছেন, জুলাই সনদের প্রতিটি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সরকার দায়বদ্ধ। তবে এ অবস্থায় বিরোধী দলের কঠোর অবস্থানের ফলে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হলে পতিত শক্তি সুযোগ পাবে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন; গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন; জুলাই গণহত্যার বিচার; জনগণের ন্যায্য দাবি আদায়; বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সারের সংকট নিরসন; নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ; আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধের দাবিতে কর্মসূচি পালন করছে দলগুলো। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এসব বিষয় সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

তার পরও বিরোধী দল তাদের আন্দোলনে অনড়। সর্বশেষ গত ১৯ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় দফায় ঢাকা থেকে রংপুর পর্যন্ত লংমার্চ করেছে তারা। সেখানে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ শীর্ষ নেতারা সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর হুশিয়ারি দেন। দাবি না মানলে এক দফা সরকারপতনের আন্দোলনের ইঙ্গিত দেওয়া হয়।

জামায়াতের আমির বলেন, জনদাবি মেনে নিন। মনে রাখবেন, আট দফা যেকোনো সময় এক দফায়ও পরিণত হতে পারে। আর এক দফা যখন হবে, তখন পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহতার দিকে যাবে। ১১ দলের অন্যতম শরিক এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, তারেক রহমান সম্মানজনকভাবে নাকি হেলিকপ্টারে বিদায় নেবেন, সেই চিন্তা করতে হবে। এদিকে, পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির পর দায়িত্ব নেওয়া নির্বাচিত বিএনপি সরকারের জন্য মাত্র ছয় মাস সময়কে কার্যক্রম মূল্যায়নের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সময় নয় বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

তাদের মতে, নতুন সরকারের নীতি ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের বাস্তব প্রভাব দৃশ্যমান হতে আরও সময় প্রয়োজন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শামসুল আলম সেলিম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সরকারকে দায়িত্ব পালনের জন্য ন্যূনতম সময় দেওয়ার চর্চা থাকা উচিত। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ছয়-সাত মাসের মধ্যেই বিরোধী দল সরকারপতনের হুমকি দিয়ে মাঠে নেমেছে।

অথচ তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটসহ অনেক সমস্যা তারা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। বৈশ্বিক পরিস্থিতিও নাজুক। তাই সংকটগুলো সমাধানে সরকারকে সময় দেওয়ার পাশাপাশি সংসদে আলোচনা ও জবাবদিহির মাধ্যমে চাপ তৈরি করা প্রয়োজন। বিরোধী দল সংসদীয় কার্যক্রম, জাতীয় সনদ ও সংবিধান সংশোধনসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনায় সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে। রাজপথের কর্মসূচিও গণতান্ত্রিক নিয়মে হতে হবে।

জনগণ সংঘাত, জ্বালাও-পোড়াও নয়; শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমঝোতা চায়। তাই হুমকি-ধমকির বদলে আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সংকট সমাধানের পথেই এগোনো উচিত। জামায়াতের শীর্ষ নেতারা বলছেন, জাতীয় সংসদে বিরোধী দল হিসেবে জনগণের কষ্টের কথা তুলে ধরেও সংকট সমাধানে কিছু করতে না পেরে রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছে। আমরা যখন তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ সংকটের কথা বলি, সরকার তখন স্বৈরাচার ফিরে আসবে বলে হুমকি ও ভয়ভীতি দেখায়।

অথচ দেশের মানুষ কষ্ট পাচ্ছে। আমরা সংসদে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এই সংকট সমাধানে টেকনিক্যাল এক্সপার্টদের নিয়ে গঠিত একটি টিম দিয়ে সহযোগিতা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সরকার আমাদের প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। এদিকে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশকে পাশ কাটিয়ে বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগকে ইতোমধ্য ‘প্রত্যাখ্যান’ করেছে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য।

তাদের দাবি, আদেশ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বারবার জানানো হচ্ছে, জুলাই সনদের প্রতিটি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে দায়বদ্ধ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক বক্তব্যে বলেন, রাজনৈতিক দল যে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছিল, তার প্রতিটি দফা বাস্তবায়নে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একই সঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেভাবেই বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

চলমান আন্দোলনের বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন ও সরকারের সমালোচনা করা গণতান্ত্রিক অধিকার। তবে এমন কোনো কর্মকাণ্ড করা উচিত নয়, যার সুযোগ নিয়ে পরাজিত শক্তি আবারও রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকতে পারে; কিন্তু দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক পরিবেশের প্রশ্নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ ও সতর্ক থাকতে হবে।

তিনি বলেন, দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করে রাজনৈতিকভাবে পরাজিত শক্তিকে পুনর্বাসনের চেষ্টা চলছে। জুলাই সনদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জুলাই সনদ প্রয়োজনীয়। এটা নিয়ে সরকার বা সরকারি দল এবং বিরোধী দলগুলো আলোচনা করতে পারে। সেখানে যদি আরও কিছু কথা বলার বা সংযোজন করার থাকে, তাহলে তা করতে অসুবিধা কোথায়? সেগুলো আলোচনা করে যেসব বিষয় আইনীকরণ করা দরকার, তা পার্লামেন্টে করে এবং যেগুলো সংবিধান সংশোধন করা দরকার তা সম্পন্ন করে আমাদের জুলাই সনদ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

কিন্তু সেটার জন্য তো একটি টেবিলে বসতে হবে, কথা বলে ঠিক করতে হবে এবং আইনীকরণ সম্পন্ন করতে হবে। এই কাজগুলো দ্রুতই করা দরকার। কারণ নানা ছিদ্রপথে গণতন্ত্রবিরোধী শক্তির পুনরুত্থান ঘটতে পারে। এদিকে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, সরকারই ১১ দলকে রাজপথে নামতে বাধ্য করেছে। গণভোট ও জুলাই সনদের মাধ্যমে জনগণ যে সংস্কার এজেন্ডা অনুমোদন করেছে, সরকার তা পুরোপুরি উপেক্ষা করেছে।

এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হলে বিরোধী দলগুলোর রাজপথে নামার কোনো প্রয়োজন হতো না। তিনি বলেন, সরকার মৌলিক সংস্কারের পথে না গিয়ে কেবল সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। এ ধরনের পদক্ষেপ দেশকে আবারও কর্তৃত্ববাদের দিকে ঠেলে দিতে পারে। দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি তুলে ধরে গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকারের একটি অংশ ও প্রশাসনে ঘাপটি মেরে থাকা ফ্যাসিবাদের দোসররা আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফেরানোর ইন্ধন দিচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও প্রশাসন সক্রিয় থাকা সত্ত্বেও একই সময়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় নিষিদ্ধ ঘোষিত একটি দলের নেতাকর্মীরা কীভাবে মিছিল করার সুযোগ পেল, সেটিও তদন্তের বিষয়। জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, জুলাই সনদের প্রতিশ্রুত সংস্কারগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।

অন্যথায় জনগণের মধ্যে নতুন করে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে। তিনি বলেন, ইতিহাসে কোনো স্বৈরাচারী সরকার জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেনি, ভবিষ্যতেও পারবে না। অতীতে দেশের মানুষ ভোটাধিকার হরণ, একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করার নানা ঘটনার সাক্ষী হয়েছে।

একটি জবাবদিহিমূলক, বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনে জনগণের প্রত্যাশা বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। তবে শক্ত আন্দোলনের জন্য এখনই পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি উল্লেখ করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মুহাম্মদ কামরুজ্জামান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির পর নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে।

ছয় মাস পেরিয়ে এখন সপ্তম মাস চলছে। তবে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে লংমার্চ বা সরকারপতনের মতো চূড়ান্ত পর্যায়ের আন্দোলনের পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। বিরোধী দলের কর্মসূচি গণতান্ত্রিক অধিকার; তারা বিক্ষোভ, স্মারকলিপি, উঠান বৈঠক বা এলাকাভিত্তিক কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সমালোচনা ও জনমত গড়ে তুলতে পারে। একই সঙ্গে সরকারের ভুল-ত্রুটি তুলে ধরে তাকে জবাবদিহির মধ্যে রাখা এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সহযোগিতা করাও বিরোধী দলের দায়িত্ব।

এ ক্ষেত্রে উন্নত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মতো গঠনমূলক বিরোধী রাজনীতির চর্চা জরুরি।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হকের নেতৃত্বে মৌলভীবাজারে সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশ ও মিছিল

আগাম আন্দোলনে বিতর্কে ১১ দল

Update Time : 11:04:27 pm, Saturday, 26 September 2026

বর্তমান বিএনপি সরকারের সাত মাস না পেরোতেই রাজপথের কঠোর কর্মসূচি ঘিরে একধরনের বিতর্কে কিংবা প্রশ্নের মুখে পড়েছে প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। অল্প সময়ের ব্যবধানে বিভাগীয় মহাসমাবেশ, সচিবালয় ঘেরাও ও লংমার্চের মতো শক্ত কর্মসূচিতে যাওয়াকে অযৌক্তিক মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

তবে জামায়াত জোটের নেতাদের দাবি, জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ জনস্বার্থ রক্ষায় সরকারের ব্যর্থতার কারণেই বাধ্য হয়ে রাজপথে নামতে হয়েছে। পাশাপাশি সরকার ও বিএনপির নেতারা বলছেন, জুলাই সনদের প্রতিটি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সরকার দায়বদ্ধ। তবে এ অবস্থায় বিরোধী দলের কঠোর অবস্থানের ফলে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হলে পতিত শক্তি সুযোগ পাবে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন; গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন; জুলাই গণহত্যার বিচার; জনগণের ন্যায্য দাবি আদায়; বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সারের সংকট নিরসন; নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ; আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধের দাবিতে কর্মসূচি পালন করছে দলগুলো। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এসব বিষয় সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

তার পরও বিরোধী দল তাদের আন্দোলনে অনড়। সর্বশেষ গত ১৯ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় দফায় ঢাকা থেকে রংপুর পর্যন্ত লংমার্চ করেছে তারা। সেখানে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ শীর্ষ নেতারা সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর হুশিয়ারি দেন। দাবি না মানলে এক দফা সরকারপতনের আন্দোলনের ইঙ্গিত দেওয়া হয়।

জামায়াতের আমির বলেন, জনদাবি মেনে নিন। মনে রাখবেন, আট দফা যেকোনো সময় এক দফায়ও পরিণত হতে পারে। আর এক দফা যখন হবে, তখন পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহতার দিকে যাবে। ১১ দলের অন্যতম শরিক এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, তারেক রহমান সম্মানজনকভাবে নাকি হেলিকপ্টারে বিদায় নেবেন, সেই চিন্তা করতে হবে। এদিকে, পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির পর দায়িত্ব নেওয়া নির্বাচিত বিএনপি সরকারের জন্য মাত্র ছয় মাস সময়কে কার্যক্রম মূল্যায়নের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সময় নয় বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

তাদের মতে, নতুন সরকারের নীতি ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের বাস্তব প্রভাব দৃশ্যমান হতে আরও সময় প্রয়োজন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শামসুল আলম সেলিম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সরকারকে দায়িত্ব পালনের জন্য ন্যূনতম সময় দেওয়ার চর্চা থাকা উচিত। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ছয়-সাত মাসের মধ্যেই বিরোধী দল সরকারপতনের হুমকি দিয়ে মাঠে নেমেছে।

অথচ তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটসহ অনেক সমস্যা তারা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। বৈশ্বিক পরিস্থিতিও নাজুক। তাই সংকটগুলো সমাধানে সরকারকে সময় দেওয়ার পাশাপাশি সংসদে আলোচনা ও জবাবদিহির মাধ্যমে চাপ তৈরি করা প্রয়োজন। বিরোধী দল সংসদীয় কার্যক্রম, জাতীয় সনদ ও সংবিধান সংশোধনসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনায় সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে। রাজপথের কর্মসূচিও গণতান্ত্রিক নিয়মে হতে হবে।

জনগণ সংঘাত, জ্বালাও-পোড়াও নয়; শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমঝোতা চায়। তাই হুমকি-ধমকির বদলে আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সংকট সমাধানের পথেই এগোনো উচিত। জামায়াতের শীর্ষ নেতারা বলছেন, জাতীয় সংসদে বিরোধী দল হিসেবে জনগণের কষ্টের কথা তুলে ধরেও সংকট সমাধানে কিছু করতে না পেরে রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছে। আমরা যখন তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ সংকটের কথা বলি, সরকার তখন স্বৈরাচার ফিরে আসবে বলে হুমকি ও ভয়ভীতি দেখায়।

অথচ দেশের মানুষ কষ্ট পাচ্ছে। আমরা সংসদে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এই সংকট সমাধানে টেকনিক্যাল এক্সপার্টদের নিয়ে গঠিত একটি টিম দিয়ে সহযোগিতা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সরকার আমাদের প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। এদিকে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশকে পাশ কাটিয়ে বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগকে ইতোমধ্য ‘প্রত্যাখ্যান’ করেছে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য।

তাদের দাবি, আদেশ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বারবার জানানো হচ্ছে, জুলাই সনদের প্রতিটি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে দায়বদ্ধ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক বক্তব্যে বলেন, রাজনৈতিক দল যে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছিল, তার প্রতিটি দফা বাস্তবায়নে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একই সঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেভাবেই বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

চলমান আন্দোলনের বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন ও সরকারের সমালোচনা করা গণতান্ত্রিক অধিকার। তবে এমন কোনো কর্মকাণ্ড করা উচিত নয়, যার সুযোগ নিয়ে পরাজিত শক্তি আবারও রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকতে পারে; কিন্তু দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক পরিবেশের প্রশ্নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ ও সতর্ক থাকতে হবে।

তিনি বলেন, দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করে রাজনৈতিকভাবে পরাজিত শক্তিকে পুনর্বাসনের চেষ্টা চলছে। জুলাই সনদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জুলাই সনদ প্রয়োজনীয়। এটা নিয়ে সরকার বা সরকারি দল এবং বিরোধী দলগুলো আলোচনা করতে পারে। সেখানে যদি আরও কিছু কথা বলার বা সংযোজন করার থাকে, তাহলে তা করতে অসুবিধা কোথায়? সেগুলো আলোচনা করে যেসব বিষয় আইনীকরণ করা দরকার, তা পার্লামেন্টে করে এবং যেগুলো সংবিধান সংশোধন করা দরকার তা সম্পন্ন করে আমাদের জুলাই সনদ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

কিন্তু সেটার জন্য তো একটি টেবিলে বসতে হবে, কথা বলে ঠিক করতে হবে এবং আইনীকরণ সম্পন্ন করতে হবে। এই কাজগুলো দ্রুতই করা দরকার। কারণ নানা ছিদ্রপথে গণতন্ত্রবিরোধী শক্তির পুনরুত্থান ঘটতে পারে। এদিকে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, সরকারই ১১ দলকে রাজপথে নামতে বাধ্য করেছে। গণভোট ও জুলাই সনদের মাধ্যমে জনগণ যে সংস্কার এজেন্ডা অনুমোদন করেছে, সরকার তা পুরোপুরি উপেক্ষা করেছে।

এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হলে বিরোধী দলগুলোর রাজপথে নামার কোনো প্রয়োজন হতো না। তিনি বলেন, সরকার মৌলিক সংস্কারের পথে না গিয়ে কেবল সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। এ ধরনের পদক্ষেপ দেশকে আবারও কর্তৃত্ববাদের দিকে ঠেলে দিতে পারে। দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি তুলে ধরে গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকারের একটি অংশ ও প্রশাসনে ঘাপটি মেরে থাকা ফ্যাসিবাদের দোসররা আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফেরানোর ইন্ধন দিচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও প্রশাসন সক্রিয় থাকা সত্ত্বেও একই সময়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় নিষিদ্ধ ঘোষিত একটি দলের নেতাকর্মীরা কীভাবে মিছিল করার সুযোগ পেল, সেটিও তদন্তের বিষয়। জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, জুলাই সনদের প্রতিশ্রুত সংস্কারগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।

অন্যথায় জনগণের মধ্যে নতুন করে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে। তিনি বলেন, ইতিহাসে কোনো স্বৈরাচারী সরকার জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেনি, ভবিষ্যতেও পারবে না। অতীতে দেশের মানুষ ভোটাধিকার হরণ, একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করার নানা ঘটনার সাক্ষী হয়েছে।

একটি জবাবদিহিমূলক, বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনে জনগণের প্রত্যাশা বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। তবে শক্ত আন্দোলনের জন্য এখনই পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি উল্লেখ করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মুহাম্মদ কামরুজ্জামান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির পর নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে।

ছয় মাস পেরিয়ে এখন সপ্তম মাস চলছে। তবে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে লংমার্চ বা সরকারপতনের মতো চূড়ান্ত পর্যায়ের আন্দোলনের পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। বিরোধী দলের কর্মসূচি গণতান্ত্রিক অধিকার; তারা বিক্ষোভ, স্মারকলিপি, উঠান বৈঠক বা এলাকাভিত্তিক কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সমালোচনা ও জনমত গড়ে তুলতে পারে। একই সঙ্গে সরকারের ভুল-ত্রুটি তুলে ধরে তাকে জবাবদিহির মধ্যে রাখা এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সহযোগিতা করাও বিরোধী দলের দায়িত্ব।

এ ক্ষেত্রে উন্নত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মতো গঠনমূলক বিরোধী রাজনীতির চর্চা জরুরি।