অভিনয়ের দক্ষতা ও বৈচিত্র্যময় চরিত্র দিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নাটক, চলচ্চিত্র এবং ওটিটি মাধ্যমে নিজের আলাদা স্থান তৈরি করে নিয়েছেন সুষমা সরকার। মঞ্চ থেকে উঠে আসা এই শিল্পী যেকোনো চরিত্রেই নিজেকে ভেঙে নতুনভাবে ফুটিয়ে তুলতে সিদ্ধহস্ত।
‘দেনা পাওনা’ ধারাবাহিক নাটকে তার অনবদ্য অভিনয় দর্শকদের গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। দীপ্ত টিভির নতুন ধারাবাহিক ‘পরম্পরা’র শুটিং, পাশাপাশি বহুল আলোচিত ‘বকুলপুর’ সিজন ৩ এবং বৈচিত্র্যময় নাটক এবং ওটিটি কাজ নিয়ে তার ব্যস্ত সময় কাটছে। কাজ ও নানা প্রসঙ্গে এই অভিনেত্রী কথা বলেছেন রূপালী বাংলাদেশের সঙ্গে।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রকিবুল ইসলাম আফ্রিদি বর্তমান ব্যস্ততা কী নিয়ে? বর্তমানে দীপ্ত টেলিভিশনের ধারাবাহিক নাটক ‘পরম্পরা’র শুটিং করছি। আগামী দিনে আরও কিছু নাটকের কাজ রয়েছে। মূলত এসব কাজ নিয়েই বর্তমান ব্যস্ততা কাটছে। ‘বকুলপুর’ সিজন প্রচারে এসেছে। কেমন লাগছে এবং এবারের গল্পটি কেমন? খুবই ভালো লাগছে। যেহেতু অনেক জনপ্রিয় একটি কাজ, এখন আবার ২০২৬ এর প্রেক্ষাপটে তৈরি হচ্ছে।
এবারের গল্পতে অনেক নতুন চরিত্র যুক্ত হয়েছে। এবারের কাহিনিও পরিবর্তন হয়েছে। যে জনপ্রিয় চরিত্রগুলো নেই, তাদের খুব মিস করছি। সবকিছু মিলিয়ে আশা করি, এক অন্যরকম বকুলপুর দর্শক আগামীতে দেখতে পাবে। নতুন সিজনে পূর্বের নির্মাতা কায়সার আহমেদ নেই। নির্মাতা কেন পরিবর্তন হয়েছে? আমরা মূলত অভিনয়শিল্পী, অভিনয় করাটাই আমাদের কাজ। এখন কেন নির্মাতা পরিবর্তন হয়েছে, সেটি আসলে আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়।
তবে এর আগেও আমার কয়েকটি কাজের ক্ষেত্রে এমনটা ঘটেছে, তাই বিষয়টি একেবারেই স্বাভাবিক। ‘দেনা পাওনা’ নাটকে আপনার চরিত্র এতটাই বিশ্বাসযোগ্য হয়েছে যে, দর্শকরা রাস্তায় দেখেও রাগান্বিত প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। একজন অভিনেত্রী হিসেবে এই প্রতিক্রিয়াকে কীভাবে উপভোগ করেছেন? অবশ্যই উপভোগ করি। কারণ একটি নেতিবাচক চরিত্র দেখে দর্শকরা যখন ক্ষোভ প্রকাশ করেন কিংবা গালি দেন, সেটিই কিন্তু সেই চরিত্রের আসল সফলতা।
এর মানে হলোÑ আমি চরিত্রটি সঠিকভাবে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছি, যা দর্শকরা সত্যি বলে বিশ্বাস করেছেন। গালিগালাজ বা বিরূপ প্রতিক্রিয়া না পেলে হয়তো চরিত্রটির গভীরে পৌঁছাতেই পারতাম না। ঠিক একইভাবে ‘পরম্পরা’ নাটকের ‘বিপাশা’ চরিত্রটি আবার অত্যন্ত ইতিবাচক। সেটি দেখে যখন দর্শকরা বলেনÑ ‘বিপাশা এত কাঁদে কেন?
’ কিংবা ‘বিপাশা এত ভালো কেন? ’, তখন বোঝা যায় তারা চরিত্রটি সেভাবেই গ্রহণ করেছেন। একজন অভিনেত্রী হিসেবে দর্শক যখন প্রতিটি চরিত্রকে এভাবে আপন করে নেন, তখন সত্যিই ভীষণ ভালো লাগে। নাটকটি শেষ হওয়ার পর দর্শকরা সিজন ২-এর জন্য সরব হয়েছেন। আপনার মতে, ওটিটির থ্রিলার ও অ্যাকশনের যুগে দেনা পাওনার মতো পারিবারিক ঘরানার নাটকে দর্শকরা কেন এত গভীরভাবে যুক্ত হতে পারল?
আমার মনে হয়, অনেক দিন পর এমন একটি পারিবারিক নাটকের উপস্থাপন দর্শকদের স্পর্শ করেছে। বাংলাদেশের দর্শকরা মূলত পারিবারিক গল্প দেখতে ভালোবাসেন। রোমান্টিক বা প্রেমের নাটক তারা পছন্দ করেন ঠিকই, তবে তার পাশাপাশি পারিবারিক গল্পের প্রতি তাদের আলাদা টান রয়েছে। আমার কাছে মনে হয়েছে, ‘দেনা পাওনা’ নাটকের গল্প, চরিত্র, সংলাপ এবং ঘটনাগুলো মানুষের দৈনন্দিন জীবনের এতটাই কাছাকাছি ছিল যে দর্শকরা এর সঙ্গে খুব সহজেই একাত্ম হতে পেরেছেন।
যেমনÑ নাটকে আমার স্বামীর চরিত্রটির সঙ্গে হয়তো বাস্তব জীবনের অনেকের মিল রয়েছেÑ একটি যৌথ পরিবারে শাশুড়ি ও স্ত্রীর টানাপোড়েনের মাঝে পড়ে ছেলেদের যে, কিছুই করার থাকে না, সেই চিত্রটি ফুটে উঠেছে। এই বিষয়গুলো আমাদের আশপাশের প্রায় প্রতিটি পরিবারেই ঘটে থাকে। মূলত এই চেনা জীবনকে পর্দায় দেখতে পেয়েছেন বলেই দর্শকরা এত গভীরভাবে নাটকটির সঙ্গে যুক্ত হতে পেরেছেন এবং এটি এত জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
মূল পর্ব শেষের পর দর্শকাগ্রহের কারণে বিশেষ ৭ পর্ব তৈরি করতে হয়েছিল। ব্যক্তি সুষমা কী মনে করেন এই নাটকের সিক্যুয়েল নিয়ে আসা উচিত? অবশ্যই আসা উচিত। একজন অভিনয়শিল্পী হিসেবে বলব, আমি নিজে এই নাটকের শুটিং সেট এবং পুরো টিমকে ভীষণ মিস করি। প্রায় দেড় বছরেরও বেশি সময় আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি, ফলে আমাদের মধ্যে চমৎকার একটি আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।
সেই জায়গা থেকে একজন শিল্পী হিসেবে আমারও যেমন বারবার ইচ্ছে করে যে নতুন সিজন কবে আসবে, তেমনি দর্শকরাও এখনো বিপুল আগ্রহ নিয়ে এটি দেখতে চান। এখনো কোথাও গেলে তারা জানতে চান, সিজন ২ কবে আসবে? এটি একজন শিল্পীর জন্য অত্যন্ত আনন্দের একটি বিষয়। তাই দর্শকদের এমন আগ্রহ ও চাওয়াকে অবশ্যই গুরুত্ব দেওয়া উচিত বলে মনে করি। বর্তমানে মূলধারার চলচ্চিত্র এবং ওয়েব কন্টেন্টÑউভয় মাধ্যমেই আপনাকে বৈচিত্র্যময় চরিত্রে দেখা যাচ্ছে।
চিত্রনাট্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে আপনার প্রধান মানদ- কী থাকে? চিত্রনাট্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমার প্রথম মানদ- হলোÑ গল্প। সেই গল্পে আমার চরিত্রটির ব্যাপ্তি এবং অবস্থান ঠিক কেমন, তা আগে দেখি। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোÑ পরিচালক কে। আমি মনে করি অভিনয়ের ক্ষেত্রে পরিচালকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আমরা যারা অভিনয়শিল্পী, তারা মূলত পরিচালকের দিকনির্দেশনায় কাজ করি।
একেকজন পরিচালকের কাজের শৈলীতে আমরা একেকভাবে নিজেকে ফুটিয়ে তুলি। তাই গল্প, চরিত্র এবং পরিচালক, এই তিনটি বিষয়ই আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং কাজ নির্বাচনের ক্ষেত্রে সবসময় এই দিকগুলোকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকি। আপনার ক্যারিয়ারে গ্ল্যামারাস চরিত্রের চেয়ে সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা সম্পন্ন চরিত্রে অভিনয় বেশি প্রশংসিত হয়েছে।
কমার্শিয়াল ও প্যারালাল সিনেমার মধ্যবর্তী এই ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখেন? দিনশেষে আমরা মূলত অভিনয়টাই করি। একজন অভিনয়শিল্পীর কাজই হলোÑ চিত্রনাট্যে যে চরিত্রটি থাকবে, সেটির রূপ ধারণ করে অভিনয় করা। প্ল্যাটফর্ম কিংবা গল্পের ধরনভেদে চরিত্রও বিভিন্ন রকমের হয়। তাই নেতিবাচক চরিত্র হলে আমরা সেটি সেভাবেই ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করি, যার সঙ্গে পোশাক ও সাজসজ্জার বিষয়টিও যুক্ত থাকেÑ এসব কিছুর সমন্বয়েই মূলত পুরো বিষয়টি তৈরি হয়।
তাছাড়া আমি যেহেতু থিয়েটার থেকে এসেছি, তাই সুষমা সত্তা থেকে বের হয়ে অন্য একটি চরিত্রে রূপান্তরিত হওয়ার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করি। নিজের ব্যক্তি পরিচয় ধরে না রেখে নিজেকে ভেঙে পুরোপুরি সেই চরিত্রটি হয়ে ওঠার যে প্রচেষ্টা, সেটিই একজন অভিনেত্রী হিসেবে আমাকে এগিয়ে রাখে। ওটিটি প্ল্যাটফর্ম আসার পর চরিত্রাভিনেত্রীদের জন্য কাজের সুযোগ ও পরিধি কতটা বদলেছে বলে মনে করেন?
কাজের সুযোগ ও পরিধি অবশ্যই বেড়েছে। কারণ ওটিটি আসার পর গল্পের ধরনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। ওটিটি আসার আগে আমাদের দেশে এক ঘণ্টার নাটক বা ধারাবাহিকগুলোতে একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর অভিনয়শিল্পীদের, বিশেষ করে যারা নায়িকা চরিত্রে অভিনয় করতেন, তাদের কাজ করার তেমন সুযোগ থাকত না। অথচ বাইরের দেশগুলোতে কিন্তু একটা নির্দিষ্ট বয়সের পরেও শিল্পীদের কাজের অনেক সুযোগ থাকে।
ওটিটি প্ল্যাটফর্ম আসার পর সেই গ-ি বা সীমাবদ্ধতা ভেঙে গেছে। এখন বিভিন্ন বয়সের চরিত্র নিয়ে দুর্দান্ত সব গল্প তৈরি হচ্ছে এবং বৈচিত্র্যময় চরিত্রের সৃষ্টি হচ্ছে। সব মিলিয়ে বলব, ওটিটির কারণে চরিত্রাভিনেত্রীদের কাজের ক্ষেত্র অনেক প্রসারিত হয়েছে। কাজ করতে গেলে প্রায়ই ট্রোলের মুখে পড়তে হয়। ব্যক্তিগতভাবে এসব নেতিবাচক সমালোচনা কীভাবে সামলান এবং কাজে কোনো প্রভাব ফেলে?
শোবিজে ট্রোলিং ও অনলাইন বুলিং একটি বড় সমস্যা। ব্যক্তিগতভাবে বড় কোনো ট্রোলের শিকার না হলেও সহশিল্পীদের প্রতিনিয়ত তা সহ্য করতে দেখি। মূলত ব্যক্তিজীবন ও পেশাগত জীবন আলাদা হলেও সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে অনেকে এ দুটোকে এক করে ফেলেন, যার ফলেই এই ট্রোলিংয়ের সৃষ্টি হয়। অচেনা কারো কাছ থেকে কটূক্তি বা গালি শুনলে যে কারো মন খারাপ হওয়াটাই স্বাভাবিক।
বর্তমান সোশ্যাল মিডিয়ায় কাউকে প্রশংসা করার চেয়ে কে, কাকে কতটা ছোট বা নোংরাভাবে আক্রমণ করতে পারেÑ সেই প্রতিযোগিতাই বেশি চলে। বিশেষ করে নারীদের পোশাক বা ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে মন্তব্য করা এখন অহরহ দেখা যায়। এই ধরনের নেতিবাচক আচরণ এবং বুলিং শিল্পীদের ব্যক্তিগত জীবনে অবশ্যই গভীর প্রভাব ফেলে। নাটক-সিনেমা-ওটিটিতে সিন্ডিকেট নিয়ে কী বলবেন?
আমি এটিকে ‘সিন্ডিকেট’ বলতে চাই না, বরং ‘স্বাচ্ছন্দ্যের জায়গা’ বা ‘কমফোর্ট জোন’ হিসেবে দেখতে চাই। বর্তমানে অনেকেই একটি স্বাচ্ছন্দ্যের জায়গায় থেকে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এখন আমার আশপাশের পরিবেশ বা যাদের সঙ্গে কাজ করি, আমি যদি তাদের নিয়ে কাজ করতে পছন্দ করিÑ সেটিকে কেউ যদি সিন্ডিকেট বলেন, তবে বলতে পারেন।
আর যদি বলেন এটি একটি স্বাচ্ছন্দ্যের জায়গা, তবে সেটিও ঠিক। আমি বিষয়টিকে এভাবেই দেখতে পছন্দ করি যে, আমার স্বাচ্ছন্দ্যের জায়গায় থেকে কাজ করছি এবং এই শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছি। শুধু আমি নই, সব পরিচালক কিংবা অভিনয়শিল্পীই মূলত একটি নিজস্ব বলয়ের মধ্যে কাজ করেন, যেখানে তারা কাজ করতে পছন্দ করেন। বিষয়টি আসলে এমনই।
নতুন সিনেমায় কাজ করছেন? বর্তমানে কোনো নতুন চলচ্চিত্রের কাজে যুক্ত নই। তবে পূর্বে আমার অভিনীত কয়েকটি চলচ্চিত্রের কাজ শেষ করা আছে, যেগুলো কবে নাগাদ মুক্তি পাবে তা এ মুহূর্তে জানা নেই। নতুন সিনেমা নিয়ে এখনো কোনো আলোচনা চলছে না, আপাতত নাটক নিয়েই ব্যস্ত আছি। এমন কোনো স্বপ্নের চরিত্র আছে, যা এখনো পর্দায় ফুটিয়ে তোলার সুযোগ পাননি?
আমার কাছে প্রতিটি চরিত্রই স্বপ্নের চরিত্র। আমরা তো প্রতিনিয়ত নতুন নতুন চরিত্র নিয়ে কাজ শুরু করি, তাই আলাদা করে নির্দিষ্ট কোনো স্বপ্নের চরিত্র নেই, আবার এক অর্থে সব চরিত্রই বিশেষ। এমন কোনো চরিত্রে কাজ করা হয়নি যা করার পর মনে হতে পারে যেÑ এই কাজটির পর জীবনে আর অভিনয় না করলেও চলবে! ফলে এই অর্থে এখনো তেমন কোনো চরিত্রে অভিনয় করা হয়ে ওঠেনি, তাই প্রতিটি নতুন চরিত্রকেই নতুনভাবে ফুটিয়ে তোলার স্বপ্ন দেখি।


















