টেলিভিশন নাটকের সোনালি যুগ থেকে শুরু করে আজকের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম—নিজের সাবলীল অভিনয়শৈলী দিয়ে কয়েক দশক ধরে দর্শকদের হৃদয়ে রাজত্ব করছেন জনপ্রিয় অভিনেতা আ খ ম হাসান। সালাউদ্দিন লাভলুর কালজয়ী নাটকগুলোতে গ্রামীণ প্রেক্ষাপটের হাসির চরিত্রের মধ্য দিয়ে যে জনপ্রিয়তার যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজ সময় বদলে ওটিটি এবং তরুণ প্রজন্মের ট্রেন্ডিং কনটেন্টেও সমানভাবে ভাস্বর।
সম্প্রতি কাজল আরেফিন অমির মেগা-হিট ফ্র্যাঞ্চাইজ ‘ব্যাচেলর পয়েন্ট সিজন ৫’-এর ১২০তম পর্বে ‘ইংলিশ লেবু’ নামে রহস্যময় গ্যাংস্টার রূপে উপস্থিত হয়ে পুরো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক তোলপাড় ফেলেছেন তিনি। টিভির গতানুগতিক হাসির চরিত্রের গ-ি পেরিয়ে একদিকে যেমন ‘লাইফলাইন’-এর মতো ওটিটি প্রোডাকশনে গম্ভীর ও শক্তিশালী চরিত্রে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করছেন, অন্যদিকে ‘জেন-জি’ বা নতুন প্রজন্মের দর্শকদের মাঝেও তৈরি করেছেন উন্মাদনা।
একাধিক প্রজন্মের রুচি ও ভাবনার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে অভিনয়ের এই নতুন দিগন্ত উন্মোচন এবং সাম্প্রতিক সাফল্য নিয়ে রূপালী বাংলাদেশের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন, এই গুণী শিল্পী। ‘ব্যাচেলর পয়েন্ট’-এ গ্যাংস্টার লুকে যুক্ত হওয়ার পর সামাজিক মাধ্যমে যে প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে, তা নিয়ে নিজের ভালো লাগার কথা ব্যক্ত করতে গিয়ে আ খ ম হাসান বলেন, ‘এই‌ ধরনের চরিত্র খুব কম করা হয়।
সেই জায়গা থেকে অনুভূতিটা বেশ ভালো। ব্যাচেলর পয়েন্ট মূলত তরুণ প্রজন্মের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং ব্যাপক দর্শকপ্রিয় একটি ধারাবাহিক নাটক। বিপুলসংখ্যক দর্শক এটি উপভোগ করেন। স্বাভাবিকভাবেই এর একটি ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পর্বটি প্রচারিত হওয়ার পর থেকে সামাজিক মাধ্যমে এর ব্যাপক চর্চা হচ্ছে। নাটকের শেষের দিকে এসে দর্শকদের কাছ থেকে এমন সাড়া ও ভালোবাসা পাওয়া আমার জন্য অত্যন্ত চমৎকার একটি অভিজ্ঞতা এবং এক বড় প্রাপ্তি।
’ মাত্র কয়েক মিনিটের স্ক্রিনটাইমে দর্শকদের কাছ থেকে যে অভূতপূর্ব সাড়া এসেছে, সে প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘না, চরিত্রটি যে এভাবে দর্শকদের মন জয় করবে, তা আমরা কেউ আশা করিনি। প্রথম দর্শন, পোশাকের ধরন এবং অভিনয়ের ভাবভঙ্গিÑ সবকিছুই দর্শক দারুণভাবে পছন্দ করেছেন। বিশেষ করে বর্তমান তরুণ প্রজন্ম চরিত্রটিকে অত্যন্ত সাদরে গ্রহণ করেছে, যা দর্শকদের মাঝে গভীর প্রভাব ফেলেছে।
সেই দিক থেকে বলব, ব্যাচেলর পয়েন্টের নির্মাতা যেমন সফল, তেমনি অভিনেতা হিসেবে আমিও দর্শকদের চাহিদা ও মনস্তত্ত্ব অনুযায়ী চরিত্রটিকে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছি। ’ টিভি ও ইউটিউবের চেনা হাসির চরিত্রের বাইরে চরকির মতো আধুনিক ওটিটি প্ল্যাটফর্মে বৈচিত্র্যময় কাজে আত্মতৃপ্তির কথা জানাতে গিয়ে অভিনেতা হাসান বলেন, ‘এর তৃপ্তি সত্যিই অনেক বেশি।
আগে টেলিভিশন ও ইউটিউবসহ প্রায় সব প্ল্যাটফর্মেই আমাকে একটি নির্দিষ্ট ধাঁচের হাসির নাটকে অভিনয় করতে দেখা যেত, যা দেখে মানুষ বিনোদন পেত। কিন্তু চরকির মতো ওটিটি প্ল্যাটফর্মে আমাকে একেবারেই একটি গম্ভীর ও ভিন্ন ধাঁচের চরিত্রে দেখা গেছে। অন্যদিকে, ব্যাচেলর পয়েন্ট-ও কিন্তু ওটিটিরই কাজ, কারণ তা প্রথমে বঙ্গ প্ল্যাটফর্মে সম্প্রচারিত হয় এবং পরবর্তীতে টেলিভিশন ও ইউটিউবে আসে।
তাই এমন বৈচিত্র্যময় চরিত্রে কাজের সুযোগ পাওয়া একজন অভিনেতা হিসেবে আমাকে দারুণ আত্মতৃপ্তি দিয়েছে। ’ অতীতের সোনালি যুগ থেকে শুরু করে আজকের ‘জেন-জি’ প্রজন্মের কাছে নিজের প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখা ও দুই প্রজন্মের ভালোবাসার মেলবন্ধন নিয়ে আ খ ম হাসান বলেন, ‘একজন শিল্পী হিসেবে সবসময় কেবল অভিনয়টাই করে যেতে চেয়েছি।
অভিনয়ের নানা রূপ ও চরিত্র থাকলেও এতদিন হয়তো সব মাধ্যমে সেই বৈচিত্র্য ফুটিয়ে তোলার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। এখন সেই সুযোগটা পাচ্ছি। ভিন্ন ভিন্ন রুচিকর দর্শক যেভাবে কাজ দেখতে চান, আমি যখনই সেই সব গল্প ও চরিত্রে যুক্ত হচ্ছিÑ পরিচালনার মুন্সিয়ানা, গল্পের আবহ ও আমার অভিনয়ের মেলবন্ধনে দর্শকরা তা গভীর ভালোবাসায় গ্রহণ করছেন।
অতীতে যখন সালাউদ্দিন লাভলু ভাইয়ের নাটকগুলোতে অভিনয় করতাম, তখনও দর্শকরা তা যেভাবে আপন করে নিয়েছিলেন, ঠিক একইভাবে লাইফলাইনের মতো কাজেও এক ভিন্ন গম্ভীর চরিত্রে আমাকে গ্রহণ করেছেন এবং গল্পের ভেতরে হারিয়ে গেছেন। আমার মনে হয়, দর্শকের সেই প্রত্যাশা পূর্ণ করতে পেরেছি। আবার তরুণ প্রজন্মের জনপ্রিয় সৃষ্টি ব্যাচেলর পয়েন্টে কাজ করার সময়ও তাদের চাহিদা ও আবেগ স্পর্শ করতে পেরেছি।
বিভিন্ন প্রজন্মের দর্শকের চাওয়া পূরণ করতে পারাটা একজন অভিনেতা হিসেবে অত্যন্ত আনন্দের, আমার কাছে মনে হয়েছে অভিনেতা হিসেবে পরিপূর্ণতা পেয়েছি। ’ দীর্ঘ ক্যারিয়ারের এই সময়টাকে কেবল ঘুরে দাঁড়ানো হিসেবে দেখতে নারাজ এই অভিনেতা। ওটিটি মাধ্যমে কাজের পরিধি বাড়ানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটিকে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানো বলা যাবে না।
দীর্ঘ অভিনয় জীবনে মনে হয়, এটি নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর কিছু নয়; বরং এটি আমার অভিনয়ে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচনের মতো। আগে ওটিটি প্ল্যাটফর্মে সেভাবে সক্রিয় ছিলাম না। আমার সমসাময়িক চঞ্চল বা মোশাররফ করিমকে যেভাবে ওটিটিতে দেখা গেছে, আমি ঠিক সেভাবে ছিলাম না। তবে কিছুটা দেরিতে হলেও ওটিটিতে যুক্ত হয়ে দর্শকদের সেই চাহিদা ও রুচি আমি স্পর্শ করতে পেরেছি।
সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বলব, আমি সফল হতে পেরেছি, ব্যর্থ হইনি। ’ বর্তমান প্রজন্মের নির্মাতাদের সঙ্গে অভিজ্ঞ অভিনেতাদের কাজের সমীকরণ ও ইন্ডাস্ট্রির পরিবেশ নিয়ে তিনি বলেন, ‘এখানে নতুন বা পুরোনোর কোনো বিষয় নয়। যেকোনো অভিনয়ে দর্শক যখন মুগ্ধ হয়ে গল্পের ভেতর ডুবে যান, তখনই সেটি সাফল্য পায়। অভিনয়ে বা গল্পে যদি গভীরতা না থাকে, তবে অভিনেতা যত বড়ই হন না কেন, দর্শক তার সঙ্গে একাত্ম হতে পারেন না।
আমি বলব এটি আমার পরম সৌভাগ্য যে, সাম্প্রতিক সময়ে চমৎকার সব গল্প, দক্ষ পরিচালক এবং ভালো কাজগুলোর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছি। দর্শক হৃদয় স্পর্শ করেÑ এমন কাজের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পেরেছি বলেই আজ তাদের কাছ থেকে এমন ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছি। গল্প কিংবা নির্মাণ মানসম্মত না হলে হয়তো কখনোই দর্শকদের কাছ থেকে এই ভালোবাসা পেতাম না।
তাই ভালো কাজগুলোর অংশ হতে পারাটাকে নিজের সৌভাগ্য বলেই মনে করি। ’ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও নতুন কাজ নিয়ে তিনি ভক্তদের জন্য জানান, ‘ইতোমধ্যে হইচই’র একটি কাজের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছি। এ ছাড়া আরও একটি নতুন কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছি, যার শুটিং আগামী অক্টোবর থেকে শুরু হয়ে ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে। আর চলচ্চিত্রের বিষয়টি ব্যাটে-বলে মিললে করব।
’ ব্যস্ত শিডিউলের কারণে ‘ব্যাচেলর পয়েন্ট’ আগে দেখা না হলেও চরিত্রটি ফুটিয়ে তোলার প্রয়াসে কিছু পর্ব দেখার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আগে কখনোই এর কোনো সিজন দেখিনি। তবে এই নাটকে যুক্ত হওয়ার পর চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে কিছু কিছু পর্ব দেখতে শুরু করেছি। ’ পরিচালক অমির সঙ্গে পুরোনো সম্পর্কের কথা স্মরণ করে এবং শেষের দিকে যুক্ত হওয়ার অনুভূতি প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘ব্যাচেলর পয়েন্ট যে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি নাটক, তা আমার জানা ছিল, তাই প্রস্তাবটি পাওয়ার পর অনুভূতি বেশ ভালোই ছিল।
আর পরিচালক অমির গুরু ফাহমির সঙ্গে যখন কাজ করতাম, তখন অমি সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করত। ফলে অমিকে অনেক আগে থেকেই চিনি। এমন একটি ব্যাপক জনপ্রিয় নাটকে কাজের সুযোগ পেয়ে আমার সত্যিই খুব ভালো লেগেছিল। কোনো আফসোস কাজ করছে না, বরং বেশ ভালোই লাগছে। শেষ মুহূর্তে এসে যেন যুদ্ধ জয় করলাম! ’ নাটকটির ভাষা ও বহুল আলোচিত সংলাপ প্রসঙ্গে একজন শিল্পী হিসেবে নিজের দায়িত্বশীল মতামত তুলে ধরে এই অভিনেতা বলেন, ‘পরিচালক অমি কাউকেই কখনো গালি দেওয়ার জন্য বলেন না।
চরিত্রের প্রয়োজনে বা অভিনেতার স্বতঃস্ফূর্ততার জায়গা থেকে যদি স্বাভাবিকভাবে কোনো গালি চলে আসে, অমি সেটিতে বাধা দেন না। পরবর্তীতে চরিত্রের স্বাভাবিকতা বজায় রাখতে সেগুলোতে শব্দ সংকেত (বিপ সাউন্ড) বসিয়ে দেওয়া হয়। অভিনয়ের ক্ষেত্রে আমার ওপর এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই যে আমাকে গালি দিতেই হবে; আমি না দিলে আমাকে কেউ কিছুই বলবে না।
আরেকটি বিষয় গভীরভাবে খেয়াল করেছি, এই গালি ব্যবহারের বিষয়টি কেবল ব্যাচেলর চরিত্রগুলোর আড্ডার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ব্যাচেলর পয়েন্টে শুধু ব্যাচেলরদেরই দেখানো হয় না, পাশাপাশি বিভিন্ন পারিবারিক দৃশ্যও তুলে ধরা হয়। আর সেই পরিবারের দৃশ্যগুলোতে কিন্তু কোনো গালি ব্যবহার করা হয় না। বাস্তব জীবনে ব্যাচেলর বন্ধুবান্ধবরা যখন একসঙ্গে জড়ো হয়, তখন তাদের কথাচ্ছলে বা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে নিজেদের অজান্তেই মুখ থেকে কিছু গালি বেরিয়ে যায়।
মূলত সেই বাস্তব চিত্রটিই নাটকে তুলে ধরা হয়েছে।


















