আজ শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
১০ আশ্বিন, ১৪৩৩ | ১৩ রবিউস সানি ১৪৪৮
ঢাকা
পরিষ্কার আকাশ
৩১°C
সর্বোচ্চ: ৩৪°C
সর্বনিম্ন: ২৬°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৭৪%

ডিজেলের দাম বৃদ্ধিতে অর্থনীতিতে বহুমুখী প্রভাব

  • MIT ERP
  • Update Time : 08:34:14 am, Saturday, 26 September 2026
  • 12

ডিজেলের দাম বৃদ্ধিতে অর্থনীতিতে বহুমুখী প্রভাব

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

এক লিটার ডিজেলের দাম ২০ টাকা বাড়লে কী হয়? অঙ্কের খাতায় উত্তর সোজা: ১১৫ থেকে ১৩৫, অর্থাৎ প্রায় ১৭.৪ শতাংশ বৃদ্ধি। কিন্তু অর্থনীতির হিসাব একটি খাতায় মেটে না। এই একটি সিদ্ধান্ত এখন অন্তত তিনটি খাতায় তিন রকম দাগ ফেলছে।

প্রথমটি, রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানির লালকালির খাতা। দ্বিতীয়টি, কোটি কোটি পরিবারের সংসারের খাতা। তৃতীয়টি, চোখে দেখা যায় না, কিন্তু সবচেয়ে ভঙ্গুর, জনগণের আস্থার খাতা। প্রথম খাতার ঘাটতি মেটাতে গিয়ে দ্বিতীয় খাতায় টান পড়লে, তৃতীয় খাতার হিসাব আর মেলে না। সরকারি সিদ্ধান্তটি ঘোষিত হয়েছে এভাবে, রোববার জারি করা প্রজ্ঞাপনে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেন, চার ধরনের তেলের দামই লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে, যা কার্যকর হয়েছে ২১ সেপ্টেম্বর থেকে।

ফলে ডিজেল ১৩৫, কেরোসিন ১৫৫, পেট্রোল ১৬০ ও অকটেন ১৬৫ টাকা। শতাংশের হিসাবে ডিজেল বেড়েছে সবচেয়ে বেশি (প্রায় ১৭.৪%)। কেরোসিন বেড়েছে প্রায় ১৪.৮%, পেট্রোল ১৪.৩% আর অকটেন ১৩.৮%। সরকার কেন এ পথে হাঁটল, তার ব্যাখ্যা নিছক অজুহাত নয়। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ও ফ্রেইট চার্জ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

দাম দ্বিগুণের বেশি হলেও জনস্বার্থে দেশে তা পুরোপুরি সমন্বয় করা হয়নি, ফলে মার্চ থেকে আগস্ট, এই ছয় মাসে বিপিসির লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা। ছয় ভাগ করলে মাসে গড়ে প্রায় ৩,৮১৩ কোটি টাকা। এ হিসাব আমাদের নিজের করা গড়, তবে অঙ্কটি যে বিশাল, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এখানেই গল্প শেষ নয়। প্রকাশিত হিসাব বলছে, নতুন দামেও ঘাটতি পুরোপুরি মিটছে না।

ডিজেলের প্রকৃত ব্যয় লিটারপ্রতি প্রায় ১৯৪ টাকা, আর নতুন দামে ১৩৫ টাকার খুচরা মূল্যের মধ্যে বিপিসির ভাগে আসবে মাত্র ১২৩ টাকা ৫৮ পয়সা। ফারাক থাকছে প্রায় ৭০ টাকা। ঢাকঢোল পিটিয়ে দাম বাড়ানোর পরও প্রতি লিটারে সত্তর টাকার ভর্তুকি রয়ে গেল। এই সত্যটি আমাদের দুই দিক থেকেই সতর্ক করে। যারা ভাবছেন সরকার নির্মমভাবে বোঝা চাপিয়েছে, তাদের মনে রাখা দরকার যে রাষ্ট্র এখনো বিপুল অঙ্কের ক্ষতি নিজের কাঁধে বইছে।

আবার যারা ভাবছেন এটাই শেষ ধাক্কা, তাদেরও সাবধান হওয়া উচিত, কারণ ঘাটতির এই ফাঁক থাকলে ভবিষ্যতে আরও সমন্বয়ের চাপ তৈরি হবে। সংসারের খাতায় ঢোকার আগে একটা ছোট কল্পনা করা যাক। উত্তরবঙ্গের এক মিল থেকে ১০ টন চাল নিয়ে একটি ট্রাক রওনা হলো ঢাকার দিকে। ধরে নিই, দূরত্ব প্রায় ২৫০ কিলোমিটার, আর ট্রাকটি লিটারপ্রতি গড়ে চার কিলোমিটার চলে।

তাহলে যাত্রায় লাগে প্রায় ৬২ লিটার ডিজেল। লিটারে ২০ টাকা বাড়লে এ যাত্রায় বাড়তি খরচ প্রায় ১,২৫০ টাকা। ১০ টনে ভাগ করলে কেজিতে বাড়ে মাত্র ১২ পয়সার মতো। অর্থাৎ সরাসরি প্রভাব খুবই সামান্য। তাহলে এত দুশ্চিন্তা কেন? কারণ চালের যাত্রা একটি ট্রাকে শেষ হয় না। মাঠ থেকে সেচের পাম্প, কাটা ধান বহনের ভ্যান-পিকআপ, মিল থেকে আড়ত, আড়ত থেকে পাইকারি বাজার, সেখান থেকে খুচরা দোকান, প্রতিটি ধাপে কোথাও না কোথাও ডিজেল আছে।

প্রতিটি ধাপে ১২ পয়সা যোগ হয়, আর তার ওপর প্রতিটি হাত নিজের মুনাফার শতাংশ বসায়। বাজারে সবচেয়ে ধূর্ত জিনিস হলো ভয়। ব্যবসায়ীরা খরচ বাড়ার আগেই দাম বাড়িয়ে রাখেন। এ কারণে ১২ পয়সার প্রকৃত খরচ কেজিতে এক-দুই টাকার বাড়তি দামে রূপ নিতে পারে, যদি বাজার তদারকি দুর্বল থাকে। এবার যাত্রীর দিকে তাকানো যাক। নতুন দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাস মালিকরা কিলোমিটারপ্রতি ২০ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন।

ধরা যাক, একজন কর্মজীবী দৈনিক মোট ২০ কিলোমিটার আসা-যাওয়া করেন। তাহলে দিনে বাড়তি ৪ টাকা, মাসে ২৬ কর্মদিবসে প্রায় ১০৪ টাকা। প্রস্তাবটি চূড়ান্ত নয়, তবে অঙ্কটি ছোট মনে হলেও এই টাকাটা সেই মানুষটিরই পকেট থেকে যাবে, যার বাজেট আগেই টানাটানিতে চলছে। প্রথম দিনেই মাঠের চিত্র ছিল দ্বিধাগ্রস্ত। রাজধানীর একটি রুটে ভাড়া বদলায়নি, কিন্তু এক যাত্রী বলেছেন, ভাড়া বাড়লে মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে ঢাকায় টিকে থাকা কঠিন হবে।

অন্যদিকে মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্পষ্ট বলেছেন, সরকার অনুমোদন না দেওয়া পর্যন্ত কেউ যেন বাড়তি ভাড়া না নেন এবং প্রয়োজনে বিআরটিএ ব্যবস্থা নিতে পারে। এই আশ্বাস ভালো। তবে রাজধানীর ব্যস্ত সন্ধ্যায় বাসের হেলপারের সঙ্গে বচসার অভিজ্ঞতা আমাদের জানা আছে। ঘোষণা আর বাস্তবতার মধ্যে ফারাক বড় হয়ে যায় সেখানেই, যেখানে তদারকি থাকে না।

আগস্টের পরিসংখ্যানের ভেতরে একটি লুকোনো সংকেতও আছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে হয়েছে ৭.০২ শতাংশ, কিন্তু খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ও সেবার মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯.৩২ শতাংশ, যা জুলাইয়ে ছিল ৯.২৮ এবং গত বছরের আগস্টে ৮.৯০। দুইয়ের ব্যবধান ২.৩ পয়েন্ট। অর্থাৎ বাজারের যে অংশে জ্বালানি, পরিবহন, ভাড়া আর সেবার খরচ জড়িত, সেখানে চাপ আগে থেকেই বাড়ছিল।

দাম বাড়ার এই দিনে ঠিক সেই অংশেই নতুন বারুদ ঢালা হলো। কাগজে-কলমে মূল্যস্ফীতি কমছে, অথচ যে পরিবারের বড় খরচ যাতায়াত আর ভাড়া, সে টের পাচ্ছে উল্টোটা। গড় সংখ্যা সবার অভিজ্ঞতার প্রতিনিধিত্ব করে না। জ্বালানি বিভাগের একটি যুক্তি নিয়ে আলাদা করে ভাবা দরকার। বলা হচ্ছে, প্রতিবেশী দেশের তুলনায় আমাদের তেল সস্তা থাকায় পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল, তাই দাম সমন্বয় জরুরি ছিল।

কলকাতায় ডিজেলের দাম আমাদের নতুন দামের কাছাকাছি, আর মিয়ানমার, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানে তা আরও বেশি বলে বিভাগের তথ্য উদ্ধৃত হয়েছে। এই তুলনা অস্বীকার করার নয়। সীমান্তে একই পণ্যের দামে বড় ফারাক থাকলে চোরাচালানের প্রলোভন তৈরি হবেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, পাচার ঠেকানোর দায় কি কেবল দামের অঙ্কের? যে দেশ পাচার আটকাতে চায়, সে ঘাটতি পূরণের পাশাপাশি সীমান্ত নজরদারি, পরিবহনের ডিজিটাল ট্র্যাকিং আর সন্দেহজনক মজুতের নিরীক্ষা জোরদার করে।

শুধু দাম বাড়িয়ে পাচার ঠেকানোর অর্থ দাঁড়ায়, দেশের সাড়ে ষোলো কোটি ভোক্তাকে বাড়তি মূল্য দিতে বাধ্য করা, একটি সীমান্ত অঞ্চলের কিছু অসাধু চক্রকে ঠেকানোর জন্য। যুক্তির এই ভারসাম্যহীনতা নীতিনির্ধারকদের চোখে পড়া উচিত। মূল্য নির্ধারণ কাঠামোর আরেকটি জায়গা বিতর্কের। আমাদের কাঠামোয় পেট্রোল ও অকটেনকে তুলনামূলকভাবে উচ্চমূল্যের পণ্য বিবেচনা করা হয়।

ফলে ডিজেলের তুলনায় সেগুলোর দাম বেশি রাখা হয় এবং তাদের মুনাফা দিয়ে ডিজেলের লোকসান সামাল দেওয়ার একটা অলিখিত হিসাব থাকে। যুক্তিটির সামাজিক ভিত্তি বোঝা যায়Ñ ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেল চলে পেট্রোল-অকটেনে, আর কৃষি, পণ্য পরিবহন ও গণপরিবহন চলে ডিজেলে। এবার সেই খাতায় আসা যাক, যার হিসাব বিপিসির অডিটে ওঠে না। সরকার যখন বলে ‘আমরা বাধ্য হয়েছি’, জনতা তখন শুনতে চায় ‘কেন, আর কত দূর?

’ এই দুটি প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর ছাড়া দাম সমন্বয় কেবল একটি প্রজ্ঞাপন হয়ে থাকে, বোঝাপড়া হয়ে ওঠে না। আমাদের প্রস্তাব চারটি। এক, প্রতি লিটারের ব্রেক-আপ প্রকাশ করা হোক নিয়মিত। আন্তর্জাতিক দাম, ফ্রেইট, শুল্ক-কর, পরিশোধন, বিপণন, ডিলার কমিশন, সব মিলিয়ে ১৩৫ টাকার ভেতরে কোন অংশ কোথায় যাচ্ছে, তা মাসিক ভিত্তিতে ওয়েবসাইটে দেওয়া হোক।

ঘাটতি ৭০ টাকা কি ৮০, তার হিসাব গোপন না রাখলে সমালোচকের মুখ যেমন বন্ধ হয়, আস্থাও তেমন বাড়ে। দুই, স্বয়ংক্রিয় মূল্য সূত্রের কার্যকর বাস্তবায়ন ও তার প্রতিফলন। আন্তর্জাতিক দাম বাড়লে দেশের দাম বাড়বে, আবার কমলে কমবে, এই নীতি কাগজে থাকলে চলবে না। জনগণ একতরফা বৃদ্ধি দেখতে দেখতে ক্লান্ত। কমার সময় সুফল একই গতিতে না এলে সূত্রটির নৈতিক ভিত্তি নড়ে যায়।

তিন, বাড়তি রাজস্বের ব্যবহার নিয়ে নিশ্চয়তা। সরকারি হিসাবে দাম বৃদ্ধির ফলে বিপিসির বার্ষিক লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমতে পারে। এই সাশ্রয়ের অর্থ কোথায় যাবে, তা স্পষ্ট হওয়া জরুরি। তা যদি অদক্ষতা, অপচয় বা সিস্টেম লসের গর্তে হারিয়ে যায়, তবে ভোক্তার বোঝা আসলে অন্যায্য হয়ে দাঁড়াবে। সেই টাকা বরং জ্বালানি আমদানির বহুমুখীকরণ, মজুত সক্ষমতা ও সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতায় বিনিয়োগ হতে পারে, যাতে পরের বৈশ্বিক ঝাঁকুনিতে আমরা কম ভঙ্গুর থাকি।

চার, ভাড়া ও বাজার তদারকির জন্য জরুরি কাঠামো। বিআরটিএ আর জেলা প্রশাসনের একটি সমন্বিত হটলাইন ও মোবাইল কোর্ট চালু হোক, যাতে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ জানানো যায় এবং তাৎক্ষণিক প্রতিকার মেলে। একই সঙ্গে চাল, ডাল, সবজি, মাছ ও ডিমের মতো নিত্যপণ্যের পাইকারি ও খুচরা দামের সাপ্তাহিক বুলেটিন প্রকাশ হোক। ভোক্তা যেন জানতে পারে কোন দাম বাড়া ন্যায্য, আর কোনটি সুযোগসন্ধানী।

তেলের দামে ২০ টাকার এই লাফ একটি সংখ্যা মাত্র, কিন্তু সংখ্যাটির পেছনে তিনটি হিসাবের খাতা খোলা। প্রথম খাতায় লালকালির দাগ কিছুটা ফিকে হয়েছে, পুরোপুরি মোছেনি। দ্বিতীয় খাতায় ট্রাকের চাকা থেকে বাসের ভাড়া পর্যন্ত নতুন বোঝা জমছে, আর সেখানে সবচেয়ে বেশি ভুগবেন সীমিত আয়ের মানুষ। তৃতীয় খাতায় আস্থার পুঁজি খরচ হচ্ছে, অথচ এটিই এমন পুঁজি, যা একবার শেষ হলে আর কোনো প্রজ্ঞাপনে ফেরানো যায় না।

সরকারের সামনে এখন একটাই পরীক্ষাÑ নতুন দামের সুফল কি ভোক্তা টের পাবে? যদি পরিবহন ভাড়া ন্যায্য থাকে, বাজারে অযৌক্তিক দাম না বাড়ে, বিপিসির ঘাটতি সত্যিই কমে, আর বাড়তি অর্থ সত্যিই কাজে লাগে, তাহলে ইতিহাস এই সিদ্ধান্তকে কঠিন কিন্তু দায়িত্বশীল বলে মনে রাখবে। আর যদি তা না হয়, তাহলে ১৩৫ টাকা কেবল একটি বাড়তি মূল্য হয়ে থাকবে না, হয়ে উঠবে জনআস্থার ঘাটতির প্রতীকী অঙ্ক।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

ডিজেলের দাম বৃদ্ধিতে অর্থনীতিতে বহুমুখী প্রভাব

Update Time : 08:34:14 am, Saturday, 26 September 2026

এক লিটার ডিজেলের দাম ২০ টাকা বাড়লে কী হয়? অঙ্কের খাতায় উত্তর সোজা: ১১৫ থেকে ১৩৫, অর্থাৎ প্রায় ১৭.৪ শতাংশ বৃদ্ধি। কিন্তু অর্থনীতির হিসাব একটি খাতায় মেটে না। এই একটি সিদ্ধান্ত এখন অন্তত তিনটি খাতায় তিন রকম দাগ ফেলছে।

প্রথমটি, রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানির লালকালির খাতা। দ্বিতীয়টি, কোটি কোটি পরিবারের সংসারের খাতা। তৃতীয়টি, চোখে দেখা যায় না, কিন্তু সবচেয়ে ভঙ্গুর, জনগণের আস্থার খাতা। প্রথম খাতার ঘাটতি মেটাতে গিয়ে দ্বিতীয় খাতায় টান পড়লে, তৃতীয় খাতার হিসাব আর মেলে না। সরকারি সিদ্ধান্তটি ঘোষিত হয়েছে এভাবে, রোববার জারি করা প্রজ্ঞাপনে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেন, চার ধরনের তেলের দামই লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে, যা কার্যকর হয়েছে ২১ সেপ্টেম্বর থেকে।

ফলে ডিজেল ১৩৫, কেরোসিন ১৫৫, পেট্রোল ১৬০ ও অকটেন ১৬৫ টাকা। শতাংশের হিসাবে ডিজেল বেড়েছে সবচেয়ে বেশি (প্রায় ১৭.৪%)। কেরোসিন বেড়েছে প্রায় ১৪.৮%, পেট্রোল ১৪.৩% আর অকটেন ১৩.৮%। সরকার কেন এ পথে হাঁটল, তার ব্যাখ্যা নিছক অজুহাত নয়। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ও ফ্রেইট চার্জ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

দাম দ্বিগুণের বেশি হলেও জনস্বার্থে দেশে তা পুরোপুরি সমন্বয় করা হয়নি, ফলে মার্চ থেকে আগস্ট, এই ছয় মাসে বিপিসির লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা। ছয় ভাগ করলে মাসে গড়ে প্রায় ৩,৮১৩ কোটি টাকা। এ হিসাব আমাদের নিজের করা গড়, তবে অঙ্কটি যে বিশাল, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এখানেই গল্প শেষ নয়। প্রকাশিত হিসাব বলছে, নতুন দামেও ঘাটতি পুরোপুরি মিটছে না।

ডিজেলের প্রকৃত ব্যয় লিটারপ্রতি প্রায় ১৯৪ টাকা, আর নতুন দামে ১৩৫ টাকার খুচরা মূল্যের মধ্যে বিপিসির ভাগে আসবে মাত্র ১২৩ টাকা ৫৮ পয়সা। ফারাক থাকছে প্রায় ৭০ টাকা। ঢাকঢোল পিটিয়ে দাম বাড়ানোর পরও প্রতি লিটারে সত্তর টাকার ভর্তুকি রয়ে গেল। এই সত্যটি আমাদের দুই দিক থেকেই সতর্ক করে। যারা ভাবছেন সরকার নির্মমভাবে বোঝা চাপিয়েছে, তাদের মনে রাখা দরকার যে রাষ্ট্র এখনো বিপুল অঙ্কের ক্ষতি নিজের কাঁধে বইছে।

আবার যারা ভাবছেন এটাই শেষ ধাক্কা, তাদেরও সাবধান হওয়া উচিত, কারণ ঘাটতির এই ফাঁক থাকলে ভবিষ্যতে আরও সমন্বয়ের চাপ তৈরি হবে। সংসারের খাতায় ঢোকার আগে একটা ছোট কল্পনা করা যাক। উত্তরবঙ্গের এক মিল থেকে ১০ টন চাল নিয়ে একটি ট্রাক রওনা হলো ঢাকার দিকে। ধরে নিই, দূরত্ব প্রায় ২৫০ কিলোমিটার, আর ট্রাকটি লিটারপ্রতি গড়ে চার কিলোমিটার চলে।

তাহলে যাত্রায় লাগে প্রায় ৬২ লিটার ডিজেল। লিটারে ২০ টাকা বাড়লে এ যাত্রায় বাড়তি খরচ প্রায় ১,২৫০ টাকা। ১০ টনে ভাগ করলে কেজিতে বাড়ে মাত্র ১২ পয়সার মতো। অর্থাৎ সরাসরি প্রভাব খুবই সামান্য। তাহলে এত দুশ্চিন্তা কেন? কারণ চালের যাত্রা একটি ট্রাকে শেষ হয় না। মাঠ থেকে সেচের পাম্প, কাটা ধান বহনের ভ্যান-পিকআপ, মিল থেকে আড়ত, আড়ত থেকে পাইকারি বাজার, সেখান থেকে খুচরা দোকান, প্রতিটি ধাপে কোথাও না কোথাও ডিজেল আছে।

প্রতিটি ধাপে ১২ পয়সা যোগ হয়, আর তার ওপর প্রতিটি হাত নিজের মুনাফার শতাংশ বসায়। বাজারে সবচেয়ে ধূর্ত জিনিস হলো ভয়। ব্যবসায়ীরা খরচ বাড়ার আগেই দাম বাড়িয়ে রাখেন। এ কারণে ১২ পয়সার প্রকৃত খরচ কেজিতে এক-দুই টাকার বাড়তি দামে রূপ নিতে পারে, যদি বাজার তদারকি দুর্বল থাকে। এবার যাত্রীর দিকে তাকানো যাক। নতুন দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাস মালিকরা কিলোমিটারপ্রতি ২০ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন।

ধরা যাক, একজন কর্মজীবী দৈনিক মোট ২০ কিলোমিটার আসা-যাওয়া করেন। তাহলে দিনে বাড়তি ৪ টাকা, মাসে ২৬ কর্মদিবসে প্রায় ১০৪ টাকা। প্রস্তাবটি চূড়ান্ত নয়, তবে অঙ্কটি ছোট মনে হলেও এই টাকাটা সেই মানুষটিরই পকেট থেকে যাবে, যার বাজেট আগেই টানাটানিতে চলছে। প্রথম দিনেই মাঠের চিত্র ছিল দ্বিধাগ্রস্ত। রাজধানীর একটি রুটে ভাড়া বদলায়নি, কিন্তু এক যাত্রী বলেছেন, ভাড়া বাড়লে মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে ঢাকায় টিকে থাকা কঠিন হবে।

অন্যদিকে মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্পষ্ট বলেছেন, সরকার অনুমোদন না দেওয়া পর্যন্ত কেউ যেন বাড়তি ভাড়া না নেন এবং প্রয়োজনে বিআরটিএ ব্যবস্থা নিতে পারে। এই আশ্বাস ভালো। তবে রাজধানীর ব্যস্ত সন্ধ্যায় বাসের হেলপারের সঙ্গে বচসার অভিজ্ঞতা আমাদের জানা আছে। ঘোষণা আর বাস্তবতার মধ্যে ফারাক বড় হয়ে যায় সেখানেই, যেখানে তদারকি থাকে না।

আগস্টের পরিসংখ্যানের ভেতরে একটি লুকোনো সংকেতও আছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে হয়েছে ৭.০২ শতাংশ, কিন্তু খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ও সেবার মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯.৩২ শতাংশ, যা জুলাইয়ে ছিল ৯.২৮ এবং গত বছরের আগস্টে ৮.৯০। দুইয়ের ব্যবধান ২.৩ পয়েন্ট। অর্থাৎ বাজারের যে অংশে জ্বালানি, পরিবহন, ভাড়া আর সেবার খরচ জড়িত, সেখানে চাপ আগে থেকেই বাড়ছিল।

দাম বাড়ার এই দিনে ঠিক সেই অংশেই নতুন বারুদ ঢালা হলো। কাগজে-কলমে মূল্যস্ফীতি কমছে, অথচ যে পরিবারের বড় খরচ যাতায়াত আর ভাড়া, সে টের পাচ্ছে উল্টোটা। গড় সংখ্যা সবার অভিজ্ঞতার প্রতিনিধিত্ব করে না। জ্বালানি বিভাগের একটি যুক্তি নিয়ে আলাদা করে ভাবা দরকার। বলা হচ্ছে, প্রতিবেশী দেশের তুলনায় আমাদের তেল সস্তা থাকায় পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল, তাই দাম সমন্বয় জরুরি ছিল।

কলকাতায় ডিজেলের দাম আমাদের নতুন দামের কাছাকাছি, আর মিয়ানমার, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানে তা আরও বেশি বলে বিভাগের তথ্য উদ্ধৃত হয়েছে। এই তুলনা অস্বীকার করার নয়। সীমান্তে একই পণ্যের দামে বড় ফারাক থাকলে চোরাচালানের প্রলোভন তৈরি হবেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, পাচার ঠেকানোর দায় কি কেবল দামের অঙ্কের? যে দেশ পাচার আটকাতে চায়, সে ঘাটতি পূরণের পাশাপাশি সীমান্ত নজরদারি, পরিবহনের ডিজিটাল ট্র্যাকিং আর সন্দেহজনক মজুতের নিরীক্ষা জোরদার করে।

শুধু দাম বাড়িয়ে পাচার ঠেকানোর অর্থ দাঁড়ায়, দেশের সাড়ে ষোলো কোটি ভোক্তাকে বাড়তি মূল্য দিতে বাধ্য করা, একটি সীমান্ত অঞ্চলের কিছু অসাধু চক্রকে ঠেকানোর জন্য। যুক্তির এই ভারসাম্যহীনতা নীতিনির্ধারকদের চোখে পড়া উচিত। মূল্য নির্ধারণ কাঠামোর আরেকটি জায়গা বিতর্কের। আমাদের কাঠামোয় পেট্রোল ও অকটেনকে তুলনামূলকভাবে উচ্চমূল্যের পণ্য বিবেচনা করা হয়।

ফলে ডিজেলের তুলনায় সেগুলোর দাম বেশি রাখা হয় এবং তাদের মুনাফা দিয়ে ডিজেলের লোকসান সামাল দেওয়ার একটা অলিখিত হিসাব থাকে। যুক্তিটির সামাজিক ভিত্তি বোঝা যায়Ñ ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেল চলে পেট্রোল-অকটেনে, আর কৃষি, পণ্য পরিবহন ও গণপরিবহন চলে ডিজেলে। এবার সেই খাতায় আসা যাক, যার হিসাব বিপিসির অডিটে ওঠে না। সরকার যখন বলে ‘আমরা বাধ্য হয়েছি’, জনতা তখন শুনতে চায় ‘কেন, আর কত দূর?

’ এই দুটি প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর ছাড়া দাম সমন্বয় কেবল একটি প্রজ্ঞাপন হয়ে থাকে, বোঝাপড়া হয়ে ওঠে না। আমাদের প্রস্তাব চারটি। এক, প্রতি লিটারের ব্রেক-আপ প্রকাশ করা হোক নিয়মিত। আন্তর্জাতিক দাম, ফ্রেইট, শুল্ক-কর, পরিশোধন, বিপণন, ডিলার কমিশন, সব মিলিয়ে ১৩৫ টাকার ভেতরে কোন অংশ কোথায় যাচ্ছে, তা মাসিক ভিত্তিতে ওয়েবসাইটে দেওয়া হোক।

ঘাটতি ৭০ টাকা কি ৮০, তার হিসাব গোপন না রাখলে সমালোচকের মুখ যেমন বন্ধ হয়, আস্থাও তেমন বাড়ে। দুই, স্বয়ংক্রিয় মূল্য সূত্রের কার্যকর বাস্তবায়ন ও তার প্রতিফলন। আন্তর্জাতিক দাম বাড়লে দেশের দাম বাড়বে, আবার কমলে কমবে, এই নীতি কাগজে থাকলে চলবে না। জনগণ একতরফা বৃদ্ধি দেখতে দেখতে ক্লান্ত। কমার সময় সুফল একই গতিতে না এলে সূত্রটির নৈতিক ভিত্তি নড়ে যায়।

তিন, বাড়তি রাজস্বের ব্যবহার নিয়ে নিশ্চয়তা। সরকারি হিসাবে দাম বৃদ্ধির ফলে বিপিসির বার্ষিক লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমতে পারে। এই সাশ্রয়ের অর্থ কোথায় যাবে, তা স্পষ্ট হওয়া জরুরি। তা যদি অদক্ষতা, অপচয় বা সিস্টেম লসের গর্তে হারিয়ে যায়, তবে ভোক্তার বোঝা আসলে অন্যায্য হয়ে দাঁড়াবে। সেই টাকা বরং জ্বালানি আমদানির বহুমুখীকরণ, মজুত সক্ষমতা ও সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতায় বিনিয়োগ হতে পারে, যাতে পরের বৈশ্বিক ঝাঁকুনিতে আমরা কম ভঙ্গুর থাকি।

চার, ভাড়া ও বাজার তদারকির জন্য জরুরি কাঠামো। বিআরটিএ আর জেলা প্রশাসনের একটি সমন্বিত হটলাইন ও মোবাইল কোর্ট চালু হোক, যাতে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ জানানো যায় এবং তাৎক্ষণিক প্রতিকার মেলে। একই সঙ্গে চাল, ডাল, সবজি, মাছ ও ডিমের মতো নিত্যপণ্যের পাইকারি ও খুচরা দামের সাপ্তাহিক বুলেটিন প্রকাশ হোক। ভোক্তা যেন জানতে পারে কোন দাম বাড়া ন্যায্য, আর কোনটি সুযোগসন্ধানী।

তেলের দামে ২০ টাকার এই লাফ একটি সংখ্যা মাত্র, কিন্তু সংখ্যাটির পেছনে তিনটি হিসাবের খাতা খোলা। প্রথম খাতায় লালকালির দাগ কিছুটা ফিকে হয়েছে, পুরোপুরি মোছেনি। দ্বিতীয় খাতায় ট্রাকের চাকা থেকে বাসের ভাড়া পর্যন্ত নতুন বোঝা জমছে, আর সেখানে সবচেয়ে বেশি ভুগবেন সীমিত আয়ের মানুষ। তৃতীয় খাতায় আস্থার পুঁজি খরচ হচ্ছে, অথচ এটিই এমন পুঁজি, যা একবার শেষ হলে আর কোনো প্রজ্ঞাপনে ফেরানো যায় না।

সরকারের সামনে এখন একটাই পরীক্ষাÑ নতুন দামের সুফল কি ভোক্তা টের পাবে? যদি পরিবহন ভাড়া ন্যায্য থাকে, বাজারে অযৌক্তিক দাম না বাড়ে, বিপিসির ঘাটতি সত্যিই কমে, আর বাড়তি অর্থ সত্যিই কাজে লাগে, তাহলে ইতিহাস এই সিদ্ধান্তকে কঠিন কিন্তু দায়িত্বশীল বলে মনে রাখবে। আর যদি তা না হয়, তাহলে ১৩৫ টাকা কেবল একটি বাড়তি মূল্য হয়ে থাকবে না, হয়ে উঠবে জনআস্থার ঘাটতির প্রতীকী অঙ্ক।