কিছু জায়গায় গেলে মনে হয়, আমরা আসলে কোনো স্থানে নয়; একটি সময়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছি। চারপাশের বাতাস, পুরোনো দেয়ালের গন্ধ, ভাঙা জানালার ফাঁক দিয়ে আসা আলো—সবকিছু মিলে যেন বহু বছর আগের কোনো গল্পের দরজা খুলে দেয়।
তিতাসপাড়ের হরিপুর বড়বাড়ি ঠিক তেমনই এক জায়গা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার হরিণবেড় গ্রামে তিতাস নদীর ধারে দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রাচীন প্রাসাদ আজ অনেকটাই জীর্ণ। তবু তার ভাঙা দেয়ালেও রাজকীয়তার ছাপ, নীরব বারান্দাতেও অতীতের পদচারণার শব্দ, আর নদীর জলে আজও যেন ভেসে ওঠে হারিয়ে যাওয়া এক সময়ের প্রতিচ্ছবি। স্থানীয় মানুষের কাছে এটি ‘বড়বাড়ি’ কিংবা ‘রাজবাড়ি’ নামে পরিচিত।
একসময় জমিদার পরিবারের আচার-অনুষ্ঠান, উৎসব, গান, নাচ ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের কেন্দ্র ছিল এই প্রাসাদ। জমিদারবাড়ির আঙিনায় তখন হয়তো মানুষের আনাগোনা ছিল, সন্ধ্যায় জ্বলে উঠত প্রদীপ, সংগীতের সুর ভেসে যেত নদীর ওপারে। আজ সেখানে নীরবতা। ইট-চুনে লেখা এক ইতিহাস প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জমিদার গৌরীপ্রসাদ ও কৃষ্ণপ্রসাদ রায় চৌধুরী ১৮৪৩ থেকে ১৮৫০ সালের মধ্যে এই প্রাসাদ নির্মাণ করেন।
প্রায় পাঁচ একর জায়গার ওপর গড়ে ওঠা বিশাল বাড়িটিতে ছিল প্রায় ৬০টি কক্ষ। দরবার হল, সংগীতালয়, নৃত্যাগার, কোষাগার, স্নানঘাট, খেলাঘরÑসব মিলিয়ে এটি ছিল যেন একটি ছোট্ট রাজ্য। স্থাপত্যের দিক থেকেও বাড়িটি অনন্য। ইট, চুন ও দেশীয় উপকরণে নির্মিত এই প্রাসাদে ব্যবহার করা হয়নি কোনো লোহার রড। মোগল স্থাপত্যের নকশা আর ঔপনিবেশিক নির্মাণশৈলীর সূক্ষ্ম মিশ্রণে তৈরি এর খিলান, কারুকাজ ও বারান্দাগুলো আজও দর্শনার্থীদের থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করে।
তিতাসের ঘাটে দাঁড়িয়ে প্রাসাদের পশ্চিম দিকে তিতাস নদীর তীরে রয়েছে জমিদারপতœী উমা রানি রায় চৌধুরীর স্মরণে নির্মিত শান বাঁধানো ঘাট। পাশে রয়েছে দুটি মন্দির। এই ঘাটটিই হয়তো বাড়িটির সবচেয়ে আবেগময় অংশ। একসময় নদীপথে আসা অতিথিদের নৌকা ভিড়ত এখানে। নদীর জল ছুঁয়ে প্রাসাদে উঠতেন অতিথিরা। হয়তো কোনো বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় নৌকার ছই থেকে ভেসে আসত গান, আর ঘাটের সিঁড়িতে বসে কেউ দেখতেন তিতাসের কালো জলে আকাশের প্রতিচ্ছবি।
আজ নৌকা আসে, মানুষ আসে, পর্যটক আসেÑকিন্তু সেই রাজকীয় অভ্যর্থনা আর নেই। আছে শুধু তিতাস। দেশভাগের পর যে নেমে এলো অন্ধকার ১৯৪৭ সালের দেশভাগ হরিপুর জমিদারবাড়ির ইতিহাসেও নিয়ে আসে বড় পরিবর্তন। জমিদার পরিবার কলকাতায় চলে গেলে ধীরে ধীরে প্রাসাদটির ওপর নেমে আসে অবহেলার ছায়া। পরে এটি অর্পিত সম্পত্তি আইনের আওতায় চলে যায়। সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছিল ২০১৬ সালে।
ধীরে ধীরে বারান্দা, মন্দির, ছাদ ও ঘাটের কিছু অংশ সংস্কার করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের কর্মপরিকল্পনায় প্রাসাদটির পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ২০২৩ সালে বাড়িটি দখলমুক্ত করার পর সংরক্ষণের কাজ আরও পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। সিনেমার পর্দায় হরিপুর হরিপুর বড়বাড়ির দেয়াল শুধু ইতিহাসের সাক্ষী নয়, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রেরও সাক্ষী।
১৯৯১ সালে ‘মধু মালতী’, ২০০১ সালে ‘নাইয়রী’, ২০০৮ সালে ‘দ্য লাস্ট ঠাকুর’ এবং ২০১২ সালে হুমায়ূন আহমেদের আলোচিত চলচ্চিত্র ‘ঘেটুপুত্র কমলা’র শুটিং হয়েছিল এই বাড়িতে। ক্যামেরার ফ্রেমে ধরা পড়া সেই পুরোনো দেয়ালগুলো যেন প্রাসাদটির হারিয়ে যাওয়া সৌন্দর্যকে নতুন করে মানুষের সামনে তুলে ধরেছিল।
বর্ষায় অন্য এক হরিপুর হরিপুর বড়বাড়ির সৌন্দর্য সবচেয়ে বেশি অনুভব করা যায় বর্ষায়। তিতাস তখন ভরে ওঠে। নদীর জল বাড়তে বাড়তে প্রাসাদের আরও কাছে চলে আসে। আকাশে মেঘ, বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ, নদীতে ঢেউÑআর তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো প্রাসাদ। কখনো কখনো নদীর শান্ত জলে পুরো বাড়িটির প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। তখন মনে হয়, প্রাসাদটি বুঝি নিজের হারিয়ে যাওয়া মুখটি জলের আয়নায় খুঁজছে।
ভাঙা দেয়াল, পুরোনো খিলান আর শ্যাওলা ধরা কার্নিশের মধ্যেও তখন এক ধরনের সৌন্দর্য জন্ম নেয়Ñ যে সৌন্দর্য নতুন কোনো স্থাপনায় পাওয়া যায় না। কারণ এর সঙ্গে মিশে আছে সময়ের গন্ধ। ইতিহাসের সঙ্গে দেখা করতে প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য হরিপুর বড়বাড়ি খোলা থাকে। বর্ষাকালে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্তও খোলা রাখা হয়।
এখানে গেলে শুধু ছবি তুলে ফিরে আসার মতো জায়গা এটি নয়। একটু সময় নিয়ে দাঁড়ানো দরকার। পুরোনো দেয়ালের দিকে তাকানো দরকার। তিতাসের দিকে তাকিয়ে ভাবা দরকারÑ এই নদী কত প্রজন্মের গল্প দেখেছে! স্থানীয়দের বিশ্বাস, বাড়িটিকে ঘিরে পর্যটন সুবিধা গড়ে তোলা গেলে এটি হয়ে উঠতে পারে এলাকার অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
থাকার ব্যবস্থা, খাবারের আয়োজন, পরিচ্ছন্নতা ও পর্যটন অবকাঠামো তৈরি হলে দূর-দূরান্তের মানুষ আরও সহজে এখানে আসতে পারবেন। কারণ, হরিপুর বড়বাড়ি শুধু একটি জমিদারবাড়ি নয়। এটি আমাদের অতীতের একটি দরজা। আপনি যাচ্ছেন এমন এক বাড়ির কাছে, যে বাড়ি অনেক কিছু দেখেছে, অনেক কিছু হারিয়েছে। তিতাসের জল এখনো বয়ে যায়। পাখিরা এখনো ডাকে। বর্ষায় নদীর ঢেউ এখনো এসে ঘাট ছুঁয়ে যায়।
শুধু নেই সেই জমিদারদের পদচারণা, নেই সন্ধ্যার আসর, নেই রাজকীয় কোলাহল। তবু হরিপুর বড়বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। নিঃশব্দে। একটি পুরোনো বাংলার শেষ কয়েকটি পৃষ্ঠা বুকে নিয়ে। তিতাসের জলে ভেসে থাকা এক হারানো রাজকীয়তার গল্প হয়ে।



















