ড্রয়িংরুমে সোফা। শোকেসে দামি সামগ্রী। পাশে অ্যাকুরিয়াম। আর ঘরেরই কোনো এক কোণে রাখা বাক্স, প্লাস্টিকের কনটেইনার কিংবা কৃত্রিম ইনক্লোজারে নড়ছে বিষাক্ত এক প্রাণী। বাইরে থেকে স্বাভাবিক একটি বাসা।
ভেতরে চলছে সাপ পালন, প্রজনন কিংবা কেনাবেচার প্রস্তুতি। সাপ এখন শুধু বন-জঙ্গল কিংবা খেতের প্রাণী নয়। শৌখিনতা, কৌতূহল এবং বাণিজ্যের মিশেলে কিছু মানুষের ঘরের ভেতরেও ঢুকে পড়েছে বিভিন্ন প্রজাতির সাপ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্য প্রদর্শনের বাইরে একটি গোপন বাজার থাকার অভিযোগও সামনে এসেছে। ক্রেতা-বিক্রেতার যোগাযোগ হতে পারে ব্যক্তিগত মেসেজিং, বন্ধ গ্রুপ কিংবা পরিচিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে।
ফলে প্রকাশ্য বাজারে এর কোনো হিসাব নেই। সম্প্রতি বেসরকারী একটি টেলিভিশনে প্রচার হওয়া একটি প্রতিবেদনে আবাসিক পরিবেশে সাপ পালনের বিষয়টি সামনে আসার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। প্রশ্ন উঠেছে—কয়েকটি শৌখিন সংগ্রহের আড়ালে কি তৈরি হচ্ছে আরও বড় কোনো অবৈধ বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক? সবচেয়ে বড় উদ্বেগ অন্য জায়গায়। অবৈধভাবে সাপ আটকে রাখা বা পালন করা অবস্থায় প্রশাসনের অভিযান, প্রতিবেশীর অভিযোগ কিংবা মালিকের ভয় তৈরি হলে প্রাণীগুলো কোথায় যায়?
সেগুলো যদি লোকালয়, ড্রেন, লেক, পুকুর কিংবা অন্য কোনো প্রাকৃতিক পরিবেশে ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে সেটি শুধু বন্যপ্রাণী অপরাধের প্রশ্ন নয়; হয়ে উঠতে পারে জননিরাপত্তা ও পরিবেশের ঝুঁকি। বন্যপ্রাণী পালনের ক্ষেত্রে অনুমতি, উৎস, প্রজাতি এবং সংরক্ষণসংক্রান্ত বিধিবিধান গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ঘরে সাপ রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—বাইরে থেকে সেটি বোঝার কোনো সুযোগ নেই।
একটি বাসায় একটি সাপ রাখা হচ্ছে শখের কারণে, নাকি সেটি প্রজনন করে বিক্রির উদ্দেশ্যে রাখা হয়েছে—তা নির্ধারণে প্রয়োজন তদন্ত। বিশেষ করে একই স্থানে একাধিক সাপ, ডিম, বাচ্চা, ইনক্লোজার, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা, খাদ্য সংরক্ষণ এবং ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগের প্রমাণ পাওয়া গেলে বাণিজ্যিক কার্যক্রমের প্রশ্ন সামনে আসতে পারে।
বিদেশি কিছু পোষা সাপের আন্তর্জাতিক বাজারও রয়েছে। বল পাইথন বা কর্ন স্নেকের মতো প্রজাতি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পোষা প্রাণী হিসেবে পালনের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু কোনো দেশে বৈধ হওয়া মানেই বাংলাদেশে তা বৈধভাবে আমদানি, পালন বা বিক্রি করা যাবে—এমন নয়। আর এখানেই তৈরি হয় ঝুঁকি। বৈধ আমদানি ও অনুমোদিত captive breeding-এর সঙ্গে চোরাচালান, অবৈধ সংগ্রহ কিংবা অনুমতিবিহীন বাণিজ্যকে এক করে দেখা যাবে না।
প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রজাতি, উৎস, অনুমতি ও নথিপত্র যাচাই প্রয়োজন। গোপন বাজারের সবচেয়ে বড় সমস্যা—হিসাব নেই। প্রকাশ্য দোকানে কোনো প্রাণী বিক্রি হলে তার বিক্রেতা, স্থান ও লেনদেন শনাক্ত করা তুলনামূলক সহজ। কিন্তু ব্যক্তিগত বাসা থেকে ব্যক্তিগত বাসায় বিক্রি হলে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। একজন ক্রেতা পরিচিত কারও মাধ্যমে বিক্রেতার সন্ধান পেলেন।
ছবি বা ভিডিও পাঠানো হলো। প্রজাতি, বয়স ও আকার অনুযায়ী দাম ঠিক হলো। এরপর নির্দিষ্ট জায়গায় প্রাণী পৌঁছে গেল। লেনদেনের কোনো প্রকাশ্য বিজ্ঞাপন থাকল না। এই ধরনের নেটওয়ার্ক সত্যিই সক্রিয় কি না, তা জানতে প্রয়োজন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন সংশ্লিষ্ট সংস্থার তদন্ত। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম, মোবাইল লেনদেন এবং কুরিয়ার ব্যবস্থার অপব্যবহারের বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
অবৈধভাবে কোনো প্রাণী ঘরে রাখার ঘটনা ধরা পড়লে সেটি উদ্ধার করা যায়। কিন্তু মালিক যদি অভিযানের আগেই প্রাণীটিকে বাইরে ছেড়ে দেন, তখন পরিস্থিতি অনেক জটিল হয়ে যায়। ঘরের কৃত্রিম পরিবেশে বেড়ে ওঠা কোনো সাপ বাইরে গিয়ে কীভাবে আচরণ করবে, তা প্রজাতি ও পরিবেশের ওপর নির্ভর করে। কোনো প্রাণী হয়তো টিকে থাকতে পারবে না। কোনোটি আবার উপযুক্ত পরিবেশ পেলে বেঁচে থাকতে পারে।
বিদেশি প্রজাতি হলে স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের প্রশ্নও আসে। এ কারণে ‘সাপ ছেড়ে দেওয়া’কে কোনোভাবেই নিরাপদ সমাধান হিসেবে দেখা যায় না। বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের বসতি, পুকুর, লেক, খাল কিংবা কৃষিজমিতে প্রাণী ছেড়ে দিলে মানুষ ও প্রাণী—দুই পক্ষই ঝুঁকিতে পড়ে। স্থানীয় মানুষ সাপটি বিষধর কি না বুঝতে না পেরে সেটিকে ধরতে বা মারতে গিয়ে আক্রান্ত হতে পারেন।
আবার কোনো বিষধর সাপ হলে সরাসরি প্রাণহানির ঝুঁকিও থাকে। বিষধর সাপের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি বাংলাদেশে গোখরা, কেউটে, রাসেলস ভাইপারসহ বিভিন্ন বিষধর সাপ রয়েছে। এসব সাপকে প্রশিক্ষণহীন অবস্থায় ঘরে রাখা শুধু মালিকের জন্য নয়, পরিবারের সদস্য, প্রতিবেশী এবং উদ্ধারকর্মীদের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে আবাসিক ভবনে একটি বিষধর সাপ পালানো মানে পুরো ভবনের বাসিন্দাদের ঝুঁকিতে ফেলা।
শিশুরা আক্রান্ত হতে পারে। গৃহকর্মী বা নিরাপত্তাকর্মী অজান্তে সাপের সংস্পর্শে আসতে পারেন। এমনকি সাপ উদ্ধারের সময় প্রশিক্ষণহীন ব্যক্তি আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সাপকে পোষ মানানো আর সাপের স্বাভাবিক আচরণ বদলে দেওয়া এক জিনিস নয়। দীর্ঘদিন মানুষের কাছে থাকা কোনো সাপও সুযোগ পেলে আত্মরক্ষার স্বাভাবিক আচরণ করতে পারে।
বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তার জন্য বিদ্যমান আইন অনুযায়ী অনুমতি ছাড়া বন্যপ্রাণী ধরা, রাখা, কেনাবেচা, পরিবহন বা সংশ্লিষ্ট অপরাধের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের শাস্তির বিধান রয়েছে। তবে কোন প্রজাতি, কী ধরনের অপরাধ এবং কোন ধারায় মামলা হচ্ছে—তার ওপর শাস্তির মাত্রা নির্ভর করে। তাই সব ধরনের সাপ রাখার অপরাধে ‘সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ড ও দুই লাখ টাকা জরিমানা’—এমন একক বক্তব্য না দিয়ে সংশ্লিষ্ট ধারাটি মামলার তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে প্রকাশ করা প্রয়োজন।
একইভাবে সব অপরাধ ‘জামিনঅযোগ্য’—এমন সাধারণীকরণও এড়িয়ে চলা উচিত। গ্রেপ্তার, জামিন ও বিচারপ্রক্রিয়া নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট আইন, ধারার প্রকৃতি ও আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর। উদ্ধার করলেই দায়িত্ব শেষ নয় অবৈধভাবে রাখা সাপ উদ্ধার করার পর কী হবে—এ প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। উদ্ধার করা প্রাণীকে কোথায় রাখা হচ্ছে? কে তার পরিচর্যা করছে?
সেটি স্থানীয় প্রজাতি কি না? কোথা থেকে এসেছে? আবার প্রকৃতিতে অবমুক্ত করা নিরাপদ কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া শুধু ‘উদ্ধার’ করে ছেড়ে দেওয়া নতুন সমস্যার জন্ম দিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্যপ্রাণী উদ্ধারের পর এবং উপযুক্ত থাকা প্রয়োজন। বিদেশি প্রজাতিকে স্থানীয় পরিবেশে ছেড়ে দেওয়ার প্রশ্ন তো আরও স্পর্শকাতর।
কারণ একটি বহিরাগত প্রজাতি স্থানীয় পরিবেশে টিকে গেলে ভবিষ্যতে পরিবেশগত ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে। বন্যপ্রাণী অপরাধের বিরুদ্ধে অভিযান সাধারণত বন, পাহাড়, সীমান্ত, বাজার কিংবা পরিবহনকেন্দ্রিক। কিন্তু সাপের অবৈধ বাণিজ্য যদি সত্যিই আবাসিক এলাকায় ঢুকে থাকে, তাহলে তদন্তের পরিধিও বদলাতে হবে। একই ব্যক্তির কাছে একাধিক সাপ কেন? প্রাণীগুলোর উৎস কী?
আমদানির কাগজ কোথায়? প্রজননের অনুমতি আছে কি? ডিম বা বাচ্চা কোথা থেকে এসেছে? কার কাছে বিক্রি হচ্ছে? টাকা যাচ্ছে কোন মাধ্যমে? কুরিয়ার বা পরিবহনে কীভাবে যাচ্ছে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। প্রয়োজনে বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের সঙ্গে সাইবার অপরাধ তদন্তকারী সংস্থা ও কাস্টমসের সমন্বয় প্রয়োজন হতে পারে। কারণ প্রাণীটি ঘরের ভেতরে থাকলেও এর বাণিজ্যিক যোগাযোগ থাকতে পারে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ডিজিটাল জগতে।
একটি অবৈধ প্রাণী নিজের ঘরে রাখা যেমন দায়িত্বহীনতা, তেমনি ধরা পড়ার ভয় থেকে সেটিকে রাস্তা, পুকুর, লেক কিংবা জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়া আরও বড় দায়িত্বহীনতা। কারণ এতে অপরাধীর সমস্যা হয়তো সাময়িকভাবে দূর হয়। কিন্তু ঝুঁকিটা চলে যায় সাধারণ মানুষের ঘাড়ে। একটি সাপ কোনো মানুষের উঠানে ঢুকে পড়তে পারে। শিশুর ঘরে ঢুকতে পারে। কৃষকের পায়ের কাছে চলে আসতে পারে।
আবার কোনো বিদেশি প্রজাতি স্থানীয় পরিবেশে টিকে গেলে তার প্রভাব হতে পারে আরও দীর্ঘমেয়াদি। তাই প্রশ্নটি শুধু ‘কে সাপ পুষছে’—এখানে থামলে চলবে না। প্রশ্ন হতে হবে—কোথা থেকে আসছে, কে বিক্রি করছে, কারা কিনছে, কোথায় প্রজনন হচ্ছে এবং অবৈধ সাপগুলোর শেষ গন্তব্য কোথায়? অন্ধকার ঘরের সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর বের করা গেলে তবেই বোঝা যাবে, এটি বিচ্ছিন্ন কিছু শৌখিন মানুষের কাণ্ড, নাকি এর পেছনে সত্যিই তৈরি হয়েছে কোনো সংগঠিত বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক।
আর যদি অবৈধ বাণিজ্যের পাশাপাশি প্রাণী অবমুক্ত করার ঘটনাও তদন্তে প্রমাণিত হয়, তাহলে বিষয়টি আর শুধু বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তখন এটি হয়ে উঠবে মানুষের নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য এবং জীববৈচিত্র্য—তিন ক্ষেত্রেরই উদ্বেগ।






















