সৌদি আরবের কাছে ৪৮টি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রায় ২৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের এ চুক্তি বাস্তবায়িত হলে বিশ্বের অন্যতম অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমানগুলোর মালিক হবে সৌদি আরব।
তবে রিয়াদের কাছে এফ-৩৫ হস্তান্তরের সিদ্ধান্তে ইসরায়েলের উদ্বেগের পাশাপাশি চীনের সম্ভাব্য গোয়েন্দা তৎপরতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) এক বিবৃতিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানায়, প্রস্তাবিত এ বিক্রির মাধ্যমে উপসাগরীয় অঞ্চলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা ন্যাটোর বাইরের মিত্র সৌদি আরবের নিরাপত্তা আরও জোরদার হবে।
একই সঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার লক্ষ্য বাস্তবায়নেও সহায়ক হবে বলে জানিয়েছে দপ্তরটি। ট্রাম্প প্রশাসনের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে আধুনিক যুদ্ধবিমান হিসেবে বিবেচিত এফ-৩৫ সৌদি আরবকে সরবরাহ করা হলেও আঞ্চলিক সামরিক ভারসাম্যে কোনো পরিবর্তন ঘটবে না। দীর্ঘদিনের মার্কিন নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
ওই নীতি অনুযায়ী, সম্ভাব্য আঞ্চলিক প্রতিপক্ষগুলোর তুলনায় ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতা এগিয়ে থাকা নিশ্চিত করতে হয়। এমন ঘোষণার মধ্যেই গত বুধবার ইয়েমেনের হুতিরা দাবি করেছে, তারা মারিবের আকাশে একটি সৌদি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এ শহরটি হুতিদের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি।
ঘটনার পর হুতিরা একটি ভিডিও প্রকাশ করে। এতে শহরের একটি জ্বলন্ত ধ্বংসাবশেষের সামনে তাদের যোদ্ধাদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। ধ্বংসাবশেষটি যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি সৌদি চিহ্নযুক্ত এফ-১৫ যুদ্ধবিমানের বলে ধারণা করা হচ্ছে। হুতিদের দাবি, ‘স্থানীয়ভাবে তৈরি’ ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে বিমানটি নামানো হয়েছে।
দাবি সত্য প্রমাণিত হলে, ইয়েমেনের যুদ্ধে হুতিদের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলতে পারে। এতদিন ইয়েমেনে সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে সৌদি আরব আকাশপথে তুলনামূলক আধিপত্য ধরে রেখেছে এবং প্রতিবেশী দেশটিতে বিমান হামলার সক্ষমতার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করেছে। এদিকে সৌদি আরব ও হুতিদের সংঘাতের তীব্রতার মধ্যে বৃহস্পতিবার অন্তত পাঁচজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
নিহতদের মধ্যে তিনজন শিশু রয়েছে। ইরান-সমর্থিত হুতি, সৌদি আরব এবং সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের মধ্যকার সংঘাতে ওয়াশিংটনকে আরও সরাসরি ভূমিকা নেয়ার জন্য দীর্ঘদিন ধরে আহ্বান জানিয়ে আসছে রিয়াদ। তবে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, এ সংঘাতে তারা সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে না। অন্যদিকে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের প্রযুক্তি চীনের হাতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রে উদ্বেগ রয়েছে।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমস চলতি সপ্তাহে জানিয়েছে, সৌদি আরবের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠ অংশীদারত্বের সুযোগ নিয়ে বেইজিং এফ-৩৫-এর প্রযুক্তিগত তথ্য পেতে পারে বলে মার্কিন গোয়েন্দা বিশ্লেষকেরা আশঙ্কা করছেন। এই আশঙ্কার কারণে চুক্তিটির বিরোধিতা করেছেন মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি রাজা কৃষ্ণমূর্তি। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির এ সদস্য প্রতিনিধি পরিষদের গোয়েন্দা কমিটির সঙ্গেও যুক্ত।
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যখন সতর্ক করছে যে চুক্তির ফলে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ সামরিক প্রযুক্তি চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নাগালের মধ্যে চলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, তখন এ চুক্তি এগিয়ে নেয়া উচিত নয়। এর আগে গত মাসে সৌদি আরব পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে। ‘মক্কা চুক্তি’ নামে পরিচিত ওই সমঝোতা থেকে ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের উদ্যোগের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরেই এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কেনার আগ্রহ প্রকাশ করে আসছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে একমাত্র এফ-৩৫ পরিচালনাকারী দেশ ইসরায়েলের কর্মকর্তারা রিয়াদের কাছে এ যুদ্ধবিমান বিক্রি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আসছেন। একই সময়ে সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্যও বিভিন্ন মহল থেকে চাপ রয়েছে। এদিকে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের বহুদেশীয় উন্নয়ন কর্মসূচিতে অংশ নেয়া ন্যাটো সদস্য তুরস্ককে ২০১৯ সাল থেকে এ যুদ্ধবিমান সরবরাহ বন্ধ রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র।
ওই বছর রাশিয়ার কাছ থেকে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার পর আঙ্কারার বিরুদ্ধে এ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।


















