স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের বিধিমালায় বেশ কিছু কঠোরতা আনছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নতুন বিধিমালায় চেয়ারম্যান প্রার্থীদের জামানত পাঁচ গুণ বাড়িয়ে ২৫ হাজার টাকা এবং সাধারণ ও সংরক্ষিত নারী সদস্য প্রার্থীদের জামানত ৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
পাশাপাশি নির্বাচনি ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমাও দ্বিগুণ করা হচ্ছে। নতুন বিধানে নির্বাচনি অপরাধের শাস্তি বাড়ানোর পাশাপাশি ভোটকেন্দ্রে অনিয়মের প্রমাণ মিললে নির্বাচন বাতিল বা বন্ধ করার ক্ষমতা ইসির হাতে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা হচ্ছে না। ফলে আগের মতোই যোগ্যতা পূরণকারী যেকোনো ব্যক্তি ইউপি নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন।
এসব পরিবর্তনসহ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন বিধিমালার সংশোধনী ইতোমধ্যে চূড়ান্ত হয়েছে। ২০১৬ সালের স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) নির্বাচন বিধিমালায় সংশোধন এনে তৈরি করা নতুন বিধিমালাটি আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে ইসিতে ফেরত এসেছে। আগামী সপ্তাহে এসআরও নম্বর দেওয়ার জন্য এটি আবার আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এরপর সংশোধিত বিধিমালার চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ করা হবে।
এদিকে স্থানীয় সরকারের অন্য চার প্রতিষ্ঠান—উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদের নির্বাচন বিধিমালাতেও সংশোধন আনা হচ্ছে। এসব বিধিমালা আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। পাঁচ গুণ বাড়ছে জামানত সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী, ইউপি চেয়ারম্যান পদে প্রার্থিতার জন্য জামানত ৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ হাজার টাকা করা হচ্ছে।
একইভাবে সাধারণ সদস্য ও সংরক্ষিত নারী সদস্য পদের প্রার্থীদের জামানত ১ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন নিয়মে মোট প্রদত্ত ভোটের অন্তত ১৫ শতাংশ না পেলে প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হবে। বর্তমানে প্রদত্ত ভোটের আট ভাগের এক ভাগ অর্থাৎ ১২ দশমিক ৫ শতাংশের কম ভোট পেলে জামানত বাতিল বা বাজেয়াপ্ত হয়।
অন্যদিকে চেয়ারম্যান প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমা ৫ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ লাখ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সাধারণ সদস্য ও সংরক্ষিত নারী সদস্যদের ক্ষেত্রে ব্যয়সীমা ১ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করা হচ্ছে। ইসি সূত্রে জানা গেছে, এবার থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় ও প্রতীকবিহীন পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হওয়ায় বিশেষ করে ইউপি নির্বাচনে প্রার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।
অন্যান্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও প্রার্থী বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে ব্যালটে বিপুলসংখ্যক প্রার্থী ও তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজন হতে পারে। এ ছাড়া বেশি প্রার্থী, তাদের এজেন্ট, কর্মী ও সমর্থকদের উপস্থিতির কারণে নির্বাচন পরিচালনা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে নির্বাচন পরিচালনার ব্যয়ও বাড়বে।
এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রার্থী সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিধিমালায় বিভিন্ন বিধিনিষেধ যুক্ত করছে ইসি। যোগ্য প্রার্থী কমার আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের মতে, জামানত পাঁচ গুণ বাড়ানো এবং জামানত রক্ষার জন্য ভোটের হার বাড়ানোর ফলে ইউপি নির্বাচনে প্রার্থী সংখ্যা কমে যেতে পারে। বিশেষ করে আর্থিক সামর্থ্য তুলনামূলক কম হলেও যোগ্য ও জনপ্রিয় ব্যক্তিদের অনেকেই প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত হতে পারেন।
এতে নাগরিকের নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে বলে মনে করছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা। নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. আবদুল আলীম সমকালকে বলেন, জামানত বাড়ানো এবং জামানত বাজেয়াপ্তের শর্ত কঠোর হলে প্রার্থী সংখ্যা কমবে, নির্বাচন পরিচালনার ব্যয়ও কমতে পারে এবং ব্যবস্থাপনা সহজ হবে। তবে এর নেতিবাচক দিকও রয়েছে। বেশি জামানতের কারণে অনেক যোগ্য ও জনপ্রিয় ব্যক্তির নির্বাচনে অংশ নেওয়া কঠিন হয়ে যেতে পারে।
আবার জামানত হারানোর আশঙ্কায় কেউ কেউ প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত থেকেও সরে আসতে পারেন। এতে যোগ্য নাগরিকের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার গণতান্ত্রিক অধিকার বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে এ ব্যবস্থার কিছু ইতিবাচক দিকও দেখছেন তিনি। তাঁর মতে, বর্তমানে অনেক প্রার্থী নিজের জয়ের সম্ভাবনা বাড়াতে ‘ডামি’ প্রার্থী দাঁড় করান। পরে এসব প্রার্থীর নামে অতিরিক্ত এজেন্ট নিয়োগ করে ভোটকেন্দ্রে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করা হয়।
জামানতের পরিমাণ বাড়লে এ ধরনের ‘ডামি’ প্রার্থী দেওয়া এবং এজেন্ট কেনাবেচার প্রবণতা কমতে পারে। বর্তমান সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচনী ব্যয়সীমা বাড়ানোর উদ্যোগকেও সমর্থন করেন আবদুল আলীম। তবে নির্ধারিত সীমার মধ্যেই প্রার্থীরা যেন নির্বাচনি ব্যয় করেন, তা কঠোরভাবে তদারকির মাধ্যমে নিশ্চিত করার দায়িত্ব ইসির বলে মনে করেন তিনি।
অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জামানত বাড়ানোর কারণে যোগ্য প্রার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ার আশঙ্কা নাকচ করেছেন। তিনি বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়েছে। তাই ২৫ হাজার টাকা জামানত একজন প্রার্থীর জন্য অতিরিক্ত হওয়ার কথা নয়। তাছাড়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থীদের জামানত আগে থেকেই ২৫ হাজার টাকা নির্ধারিত রয়েছে।
এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতেই ইউপি নির্বাচনে জামানত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নির্বাচনী ব্যয়সীমাও বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। তিনি জানান, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন বিধিমালার সংশোধনী আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে ইসিতে এসেছে। স্থানীয় সরকারের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচন বিধিমালাও দ্রুত ভেটিংয়ের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
আরও যেসব পরিবর্তন সংশোধিত বিধিমালায় নির্বাচনি হলফনামায় প্রার্থীদের আরও কিছু তথ্য দেওয়ার বাধ্যবাধকতা যুক্ত করা হচ্ছে। নতুন তথ্য সংযোজনের পাশাপাশি হলফনামায় মিথ্যা বা অসত্য তথ্য দিলে প্রার্থিতা বাতিলের বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। কোনো পদে মাত্র একজন প্রার্থী থাকলে আগের মতোই তাকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণার বিধান বহাল রাখা হয়েছে।
নির্বাচনের দায়িত্ব পালনরত কোনো ব্যক্তিকে হুমকি দেওয়া, ভয় দেখানো বা আঘাত করা কিংবা কোনো ভোটারকে ভোটদানে বাধা দেওয়ার ঘটনায় সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ডের বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় রিটার্নিং কর্মকর্তা বা উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে জরিমানা করার ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাচনি অপরাধের শাস্তিও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত বিধানে নির্বাচনি অপরাধের জন্য সর্বনিম্ন ছয় মাস থেকে সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ডের বিধান রাখার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া নির্বাচনে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে ভোট বাতিল বা বন্ধ করার ক্ষমতা ইসির হাতে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। কোনো প্রার্থীর এজেন্ট না থাকলেও সংশ্লিষ্ট নির্বাচন বৈধ হিসেবে গণ্য হবে—এমন বিধানও যুক্ত করা হচ্ছে।
পাশাপাশি নির্বাচনে ব্যবহৃত প্রতীকেও পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে কমিশন।


















