মাত্র ৫৭ কিলোমিটার সড়ক পাড়ি দিতে সময় লাগে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা, কখনো তারও বেশি। পথে আছে প্রায় ১৩৫টি বাঁক। কোথাও সড়ক মাত্র ১২ ফুট প্রশস্ত, কোথাও খানাখন্দ ও ভাঙাচোরা অংশ। এরপর মেঘনা পার হতে ফেরিঘাটে অপেক্ষা করতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
অথচ এই ভোগান্তি কমাতে প্রায় এক হাজার ১৩৫ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। প্রকল্প অনুমোদনের তিন বছর পেরিয়ে গেলেও পুরো সুবিধা এখনো পাননি এ পথে চলাচলকারী মানুষ। ভুলতা থেকে আড়াইহাজার-বাঞ্ছারামপুর হয়ে নবীনগর-শিবপুর-রাধিকা পর্যন্ত বিস্তৃত সড়কটি এ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ পথ। এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন তিন হাজারের বেশি যানবাহন চলাচল করে বলে জানিয়েছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ।
কিন্তু এর বিভিন্ন অংশের প্রস্থ এখনো ১২ ফুটের মতো। অথচ আঞ্চলিক মহাসড়কের জন্য প্রয়োজন প্রায় ৩৪ ফুট প্রস্থ। ফলে অনেক জায়গায় দুটি যানবাহন পাশাপাশি চলাচল করাও কঠিন। কড়ইকান্দি থেকে নবীনগর পর্যন্ত অংশে রয়েছে প্রায় ১৩৫টি বাঁক। সরু সড়কের সঙ্গে এসব বাঁক যুক্ত হওয়ায় যানবাহনের গতি কমে যায়, বাড়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও। কোথাও সড়কের পাশে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় বিপরীত দিক থেকে আসা যানবাহনকে পাশ কাটিয়ে চলতে হয় সতর্কতার সঙ্গে।
এর সঙ্গে আছে ফেরিঘাটের বিড়ম্বনা। বাঞ্ছারামপুরের কড়ইকান্দি থেকে মেঘনা পার হয়ে আড়াইহাজারের বিশনন্দী যেতে ফেরির ওপর নির্ভর করতে হয়। ঘাটে যানবাহনের চাপ বাড়লে দীর্ঘ সারি হয়। ফেরি কখন আসবে, কখন নদী পার হওয়া যাবেÑ তা নিয়ে যাত্রী ও চালকদের অনিশ্চয়তায় থাকতে হয়। ফলে এক ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে কখনো দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা লেগে যায়।
রোগী, শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী ও পণ্যবাহী যানবাহনের মানুষের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি। জরুরি প্রয়োজনে ঢাকামুখী যাত্রায় সময়ের হিসাবও অনেক সময় মেলে না বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। নবীনগর ও বাঞ্ছারামপুর উপজেলার অন্তত ২০ থেকে ৩০টি গ্রামের মানুষ নিয়মিত এ সড়ক ব্যবহার করেন। কড়ইকান্দি ফেরিঘাট দিয়ে মেঘনা পার হয়ে আড়াইহাজার হয়ে তারা রাজধানী ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
এ ছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও আশপাশের জেলার মানুষের জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ। দীর্ঘদিনের এই সমস্যা সমাধানে ২০২৩ সালের ৪ এপ্রিল একনেক সভায় প্রায় এক হাজার ১৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্পের আওতায় সড়ক প্রশস্ত ও টেকসইভাবে পুনর্নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যমান বাঁকগুলো সরলীকরণ এবং নতুন অ্যালাইনমেন্ট করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পের কাজ শেষ হলে বর্তমানে প্রায় ৫৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটি কমে প্রায় সাড়ে ৩২ কিলোমিটারে নেমে আসবে। অর্থাৎ বাঁক সরল ও নতুন অ্যালাইনমেন্টের কারণে পথের দৈর্ঘ্যও কমবে। এতে যাতায়াতের সময় কমার পাশাপাশি সড়কটি আরও নিরাপদ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ইউনুস আলী বলেন, ভুলতা থেকে বাঞ্ছারামপুর হয়ে নবীনগর সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পটি পাঁচটি প্যাকেজে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
এর মধ্যে চারটি প্যাকেজের ওয়ার্ক অর্ডার হয়ে গেছে। আরেকটি প্যাকেজের সিএস প্রস্তুত করে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, সড়কটি ১২ ফুট থেকে ৩৪ ফুটে উন্নীত করতে ভূমি অধিগ্রহণ প্রয়োজন। এ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। আগামী তিন-চার মাসের মধ্যে এ বিষয়ে ভালো অগ্রগতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে স্থানীয় মানুষের বড় প্রত্যাশা মেঘনার ওপর প্রস্তাবিত কড়ইকান্দি-বিশনন্দী সেতু ঘিরে।
প্রায় ৩ দশমিক ১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সেতু নির্মাণ করা হলে ফেরিনির্ভরতা অনেকটাই কমে আসবে। বর্তমানে ফেরির জন্য যে সময় অপেক্ষা করতে হয়, সেতু হলে তা আর করতে হবে না। এতে নবীনগর ও বাঞ্ছারামপুর থেকে নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী ও রাজধানী ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ আরও সহজ ও দ্রুত হবে। একই সঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, সিলেট ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থাও শক্তিশালী হবে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন।
আড়াইহাজার, বিশনন্দী, বাঞ্ছারামপুর ও নবীনগর সড়কের দুরবস্থার বিষয়টি জাতীয় সংসদেও তুলে ধরেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ (নবীনগর) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. আব্দুল মান্নান। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, শুধু সড়ক প্রশস্ত করলেই হবে না, প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করতে হবে। হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের সুফল কবে পুরোপুরি মিলবেÑ এখন সেই অপেক্ষায় রয়েছেন নবীনগর ও বাঞ্ছারামপুরের মানুষ।


















