ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন অনেক তরুণের। উন্নত জীবন, ভালো আয় আর পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তনের আশায় কেউ কেউ দালালের প্রলোভনে পড়ে অনিয়মিত পথে স্পেনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু এই স্বপ্ন পূরণের পথ অনেক সময় শুরু হয় ঋণ, প্রতারণা ও অনিশ্চয়তা দিয়ে এবং শেষ হতে পারে সমুদ্রের গভীরে।
আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল থেকে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জ হয়ে স্পেনে যাওয়ার অনিয়মিত সমুদ্রপথকে বিশ্বের অন্যতম প্রাণঘাতী অভিবাসন রুট হিসেবে চিহ্নিত করেছে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)। ২০২৫ সালে এই পথে ১৭ হাজার ৭৮৮ জন ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছালেও অন্তত ৫৪টি নৌদুর্ঘটনায় ১ হাজার ২১৪ জন মারা গেছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন। আইওএম বলছে, এসব সংখ্যা ন্যূনতম হিসাব; প্রকৃত প্রাণহানি আরও বেশি হতে পারে।
সমুদ্রপথে ইউরোপে যাওয়ার ক্ষেত্রে অনেক অভিবাসী দীর্ঘ ও অনিশ্চিত যাত্রায় বের হন। নৌযানের ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি মানুষ ওঠানো, সমুদ্রের আবহাওয়া, দীর্ঘ সময় খাবার ও পানির সংকট এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি যাত্রাকে ভয়াবহ করে তুলতে পারে। বিশেষ করে পশ্চিম আফ্রিকা থেকে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের পথটি দীর্ঘ আটলান্টিক সমুদ্রযাত্রার সঙ্গে যুক্ত।
আইওএম-এর তথ্য অনুযায়ী, এই পথে নৌকা পথ হারানো, দুর্ঘটনা এবং নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে যাত্রার আগে বলা হয়, নির্দিষ্ট অর্থ দিলেই নিরাপদে স্পেনে পৌঁছে দেওয়া হবে। কিন্তু সমুদ্রে ওঠার পর বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে। নৌযানের অবস্থা, যাত্রার সময়কাল কিংবা আবহাওয়ার বিষয়ে যাত্রীদের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য না থাকাও বড় ঝুঁকি।
পরিবারের কাছ থেকে বিপুল অর্থ নেওয়ার পর মাঝপথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া, অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা কিংবা যাত্রীর নিরাপত্তার কোনো নিশ্চয়তা না দেওয়ার মতো অভিযোগও অনিয়মিত অভিবাসনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। ফলে শুধু ইউরোপে পৌঁছানোর প্রতিশ্রুতি শুনে সিদ্ধান্ত নেওয়া বিপজ্জনক। স্থলপথে বিপদের সঙ্গে লড়াই করে কোনোভাবে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হলেও সমুদ্রে বিপদ দেখা দিলে সহায়তা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
ছোট বা অনিরাপদ নৌযান ডুবে গেলে যাত্রীদের বেঁচে থাকার সুযোগ দ্রুত কমে যায়। ২০২৫ সালে পশ্চিম আফ্রিকা থেকে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জগামী রুটে ৫৪টি জাহাজডুবির ঘটনা নথিভুক্ত করেছে আইওএম। এসব ঘটনায় ১ হাজার ২১৪ জনের মৃত্যু বা নিখোঁজ হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। একই সংস্থা এই রুটকে বিশ্বের অন্যতম প্রাণঘাতী অভিবাসনপথ হিসেবে উল্লেখ করেছে। অনিয়মিতভাবে স্পেনে পৌঁছানো মানেই কাজের অনুমতি বা স্থায়ীভাবে থাকার অধিকার পাওয়া নয়।
দেশে প্রবেশের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরিচয়, অভিবাসন পরিস্থিতি এবং ব্যক্তির আইনি অবস্থার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। এরপর আশ্রয়, সুরক্ষা বা অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়ার সুযোগ থাকলে তা সংশ্লিষ্ট নিয়মের মাধ্যমে করতে হয়। তাই ‘স্পেনে পৌঁছালেই কাজ পাওয়া যাবে’ কিংবা ‘কয়েক মাসের মধ্যেই কাগজ হয়ে যাবে’Ñ এ ধরনের নিশ্চয়তাকে বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা জরুরি।
সমুদ্রপথে অনিয়মিত অভিবাসন কমে গেলেও ঝুঁকি কমেনি। আইওএমের ২০২৬ সালের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সংঘাত, অর্থনৈতিক দুর্বলতা, জলবায়ুজনিত চাপ এবং সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ কঠোর হওয়ার কারণে অভিবাসনযাত্রা আরও দীর্ঘ, খ-িত ও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। আইওএম ২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসেই ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে অনিয়মিতভাবে ১ হাজার ২৭৪ জন পৌঁছানোর তথ্য দিয়েছে আইওএমের ডেটা।
অর্থাৎ ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রা এখনো বন্ধ হয়নি।



















