বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই দিনেশ ত্রিবেদীকে বেশ সক্রিয়, বিচক্ষণ ও কৌশলী কূটনীতিক হিসেবে দেখা যাচ্ছে। দায়িত্ব পালনের শুরু থেকেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং বিভিন্ন পর্যায়ের অংশীজনের সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগের মধ্য দিয়ে তিনি ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ককে আরও কার্যকর ও অর্থবহ করার একটি সুস্পষ্ট প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন।
কূটনীতিতে সময়ের গুরুত্ব অপরিসীম। কখন কার সঙ্গে সাক্ষাৎ করা হচ্ছে, কোন বার্তা কোন মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে এবং কোন ইস্যুকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছেÑ এসবের মধ্যেই একজন কূটনীতিকের দক্ষতার পরিচয় ফুটে ওঠে। দিনেশ ত্রিবেদীর সাম্প্রতিক কর্মকা- বিশ্লেষণ করলে সেই কূটনৈতিক বিচক্ষণতারই একটি চিত্র পাওয়া যায়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারেÑ এ ধরনের ধারাবাহিক যোগাযোগের মধ্য দিয়ে কি ঢাকা ও দিল্লির সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে পারস্পরিক বার্তা ও মনোভাব আদান-প্রদানের একটি কার্যকর সেতু তৈরি হচ্ছে? কূটনৈতিক বাস্তবতায় এমন সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। একজন হাইকমিশনারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলোÑ স্বাগতিক দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সরকারের সঙ্গে নিজ দেশের সরকারের যোগাযোগকে সহজ, কার্যকর ও ধারাবাহিক রাখা।
সেই বিবেচনায় দিনেশ ত্রিবেদীর কর্মকা-ে একটি বিষয় স্পষ্টÑ তিনি শুধু আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক দায়িত্ব পালনের মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখছেন না; বরং বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে তার সৌজন্য সাক্ষাৎও এরই অংশ হিসেবে বিবেচনা করা যায়।
২০ আগস্টের ওই সাক্ষাতে স্বাস্থ্যসেবা খাতে জনগণের মধ্যে সহযোগিতা আরও জোরদার করার লক্ষ্যে পারস্পরিক স্বার্থ ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। স্বাস্থ্য খাত এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের পাশাপাশি সরাসরি মানুষের জীবন ও কল্যাণের সঙ্গে সহযোগিতা যুক্ত থাকে। ফলে এ খাতে বাংলাদেশ-ভারত সহযোগিতা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।
এর আগে ও পরে বাংলাদেশের বিভিন্ন মন্ত্রী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনের সঙ্গে তার যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। এর মাধ্যমে কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের আনুষ্ঠানিকতা রক্ষা নয়, বরং পারস্পরিক বোঝাপড়া আরও গভীর করার চেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বহুমাত্রিক। দুই দেশের সম্পর্কের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি, পানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং জনগণের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের মতো অসংখ্য বিষয়।
ফলে একজন হাইকমিশনার যত বেশি কার্যকরভাবে এসব ক্ষেত্রে যোগাযোগ ও সমন্বয় করতে পারেন, দুই দেশের সম্পর্ক তত বেশি ফলপ্রসূ হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফরকে সামনে রেখে দিনেশ ত্রিবেদীর ধারাবাহিক যোগাযোগ আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। একটি সফল রাষ্ট্রীয় সফরের আগে দুই দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।
এ ক্ষেত্রে হাইকমিশনারের ভূমিকা অনেকটা সেতুবন্ধনের মতো। তিনি একদিকে ঢাকার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতা বোঝার চেষ্টা করেন, অন্যদিকে দিল্লির নীতিনির্ধারকদের কাছে বাংলাদেশের অবস্থান ও প্রত্যাশাগুলো তুলে ধরেন। তবে কূটনীতির সৌন্দর্য এখানেই যে সব বার্তা প্রকাশ্যে উচ্চারিত হয় না। অনেক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয় নীরবে, আনুষ্ঠানিকতার আড়ালে।
একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ কখনো কখনো ভবিষ্যতের বড় কোনো উদ্যোগের ভিত্তি তৈরি করতে পারে। আবার নিয়মিত যোগাযোগের মধ্য দিয়ে এমন আস্থার পরিবেশ তৈরি হয়, যা পরবর্তী সময়ে কঠিন ইস্যু নিয়েও আলোচনার পথ সহজ করে। দিনেশ ত্রিবেদীর কর্মকা-ে সেই নীরব কিন্তু কার্যকর কূটনীতির প্রবণতাই লক্ষণীয়। তিনি যে ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন, তা দুই দেশের সম্পর্ককে ব্যক্তিনির্ভর না করে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে আরও বিস্তৃত করার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশের জনগণ সবসময়ই প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে মর্যাদা, পারস্পরিক সম্মান ও স্বার্থের ভিত্তিতে সুসম্পর্ক প্রত্যাশা করে। একইভাবে ভারতেরও বাংলাদেশের সঙ্গে স্থিতিশীল ও পারস্পরিকভাবে লাভজনক সম্পর্ক প্রয়োজন। তাই কূটনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিতÑভুল বোঝাবুঝি কমানো, আস্থা বাড়ানো এবং দুই দেশের মানুষের স্বার্থে বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ।
সেই জায়গা থেকে দিনেশ ত্রিবেদীর বর্তমান তৎপরতা ইতিবাচক বার্তা বহন করছে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং স্বাস্থ্যসহ জনকল্যাণমূলক খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ তার দায়িত্ব পালনের একটি সক্রিয় ও বাস্তবমুখী দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত দেয়। ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের সামনে যেমন সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি রয়েছে নানা জটিলতা ও সংবেদনশীল ইস্যু।
এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজন ধৈর্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং সর্বোপরি বিচক্ষণ কূটনীতি। দিনেশ ত্রিবেদী যদি তার বর্তমান ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারেন, তাহলে তিনি দুই দেশের মধ্যে আস্থা ও বোঝাপড়ার নতুন ক্ষেত্র তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। শেষ পর্যন্ত কূটনীতির সাফল্য কোনো একটি সাক্ষাৎ বা একটি ঘোষণায় পরিমাপ করা যায় না।
এর প্রকৃত সাফল্য প্রকাশ পায় দীর্ঘমেয়াদি আস্থা, কার্যকর যোগাযোগ এবং জনগণের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তনের মাধ্যমে। সেই বিচারে দিনেশ ত্রিবেদীর সক্রিয় ও সংযত কূটনৈতিক তৎপরতা বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় ও ফলপ্রসূ করার ক্ষেত্রে একটি আশাব্যঞ্জক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।






















