সেনাবাহিনীতে ভর্তি পরীক্ষা দিতে যশোর যাওয়ার পথে গাজীপুরের ভোগরা বাইপাস ফ্লাইওভারের নিচে পুলিশের দুই সদস্যের বিরুদ্ধে এক শিক্ষার্থীকে মারধর করে আহত করার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ফাহিম নামের ওই শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়ে সেনাবাহিনীর ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি বলে অভিযোগ করেছেন।
তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। গত ৩০ আগস্ট দিবাগত রাত আনুমানিক সাড়ে ১২টার দিকে এ ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগকারী শিক্ষার্থী জানান। ফাহিম গাজীপুরের কোনাবাড়ী এলাকার বাসিন্দা। ওই রাতে সেনাবাহিনীর ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে যশোর যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হয়ে ভোগরা বাইপাস এলাকায় যান তিনি। ফাহিমের ভাষ্য, ভোগরা বাইপাস ফ্লাইওভারের নিচে দায়িত্বে থাকা দুই পুলিশ সদস্যের কাছে যশোর যাওয়ার বিষয়ে সহযোগিতা চান তিনি।
এ সময় পুলিশ সদস্যরা উল্টো তাকে তল্লাশি করার কথা বলে সড়কের পাশের অপেক্ষাকৃত অন্ধকার স্থানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তবে সেখানে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ফাহিম বলেন, তল্লাশি করতে হলে সবার সামনে যেন তল্লাশি করা হয়। অভিযোগ, এতে দুই পুলিশ সদস্য ক্ষিপ্ত হয়ে তার ওপর চড়াও হন এবং এলোপাতাড়ি মারধর শুরু করেন। একপর্যায়ে তাকে টেনেহিঁচড়ে ওই স্থানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ফাহিমের দাবি, তিনি সেখানে যেতে বারবার অস্বীকৃতি জানালে পুলিশ সদস্যরা তাকে মারধর করতে থাকেন। এতে তার মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত লাগে। একপর্যায়ে তার চিৎকার ও কান্নাকাটিতে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এসে তাকে পুলিশ সদস্যদের কাছ থেকে সরিয়ে নেন। অভিযোগকারী শিক্ষার্থীর দাবি, কনস্টেবল হুমায়ুন ও কনস্টেবল বুলবুল তাকে মারধর করেন।
পুলিশের মারধরে তার মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন তৈরি হয়। ফাহিম বলেন, আমি সেনাবাহিনীর ভর্তি পরীক্ষা দিতে যশোর যাচ্ছিলাম। পুলিশের কাছে যশোর যাওয়ার বিষয়ে সহযোগিতা চেয়েছিলাম। কিন্তু তারা আমাকে উল্টো তল্লাশির কথা বলে অন্ধকারে নিয়ে যেতে চায়। আমি বলেছিলাম, তল্লাশি করলে সবার সামনে করেন। এরপর তারা আমার ওপর চড়াও হয়ে মারধর করে।
পরে আশপাশের লোকজন আমাকে তাদের কাছ থেকে সরিয়ে নেয়। তিনি আরও বলেন, পুলিশের মারধরের কারণে আমি গুরুতর আহত হই। ফলে আর যশোরে গিয়ে সেনাবাহিনীর ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারিনি। সেনাবাহিনীতে চাকরি করার স্বপ্ন ছিল আমার। কিন্তু এই ঘটনার কারণে সেই সুযোগ নষ্ট হয়েছে। ফাহিমের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার কিছুক্ষণ পর সবুজ নামে এক পুলিশ কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে আসেন।
তার অবস্থা দেখে চিকিৎসার জন্য নিজের পকেট থেকে ৪ হাজার টাকা দেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। তবে ফাহিম টাকা না নিয়ে কোনাবাড়ীর আমবাগ এলাকার বাসায় ফিরে যান। পরে পরিবারের সদস্যরা তাকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করান। এরপর বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) চিকিৎসার জন্য তিনি গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান।
সেখানে চিকিৎসা নেওয়ার পর ঘটনার বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে বাসন থানায় যান তিনি। ফাহিম অভিযোগ করেন, থানায় গিয়ে তিনি ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত বলে অভিযুক্ত কনস্টেবল বুলবুলকে দেখতে পান। তাকে দেখে চিনে ফেলার পর ঘটনার রাতে দায়িত্বে থাকা এএসআই সবুজ তার কাছ থেকে জোরপূর্বক সাদা কাগজে মুচলেকা নেওয়ার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ফাহিম বলেন, আমার কাছ থেকে সাদা কাগজে জোর করে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। পরে চিকিৎসার জন্য সাড়ে ৪ হাজার টাকা দেওয়া হয়। এখন আমি আতঙ্কের মধ্যে আছি। সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেওয়ায় ভয় লাগছে। ওই কাগজে কী লেখা হয়েছে, আমি জানি না। আমার শারীরিক অবস্থাও ভালো না। মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা করছে। ডাক্তার তাকে চিকিৎসক সিটি স্ক্যান করার পরামর্শ দেন।
ঘটনার সময় দায়িত্বে থাকা বাসন থানার এএসআই সবুজের কাছে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেদিন তার ডিউটির গাড়িতে সমস্যা দেখা দিয়েছিল। তিনি চালককে নিয়ে কিছুটা দূরে গাড়ি ঠিক করার কাজে ছিলেন। পরে স্থানীয় লোকজনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীকে পুলিশ সদস্যরা নির্যাতন করেছেন জানতে পেরে তিনি ঘটনাস্থলে যান। এএসআই সবুজ বলেন, ঘটনাস্থলে গিয়ে আমি শিক্ষার্থীর অবস্থা দেখি।
পরে তাকে চিকিৎসার জন্য ২ হাজার টাকা দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সে টাকা না নিয়ে চলে যায়। তিনি আরও বলেন, পরে থানায় এসে পুলিশ সদস্য হুমায়ুনের বিরুদ্ধে একটি জিডি করি। এ ঘটনায় ওই পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। কনস্টেবল বুলবুলও ওই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এএসআই সবুজ বলেন, বুলবুল জড়িত থাকার বিষয়টি আমার জানা ছিল না।
যদি সে জড়িত থাকে, তাহলে ওসি স্যারকে জানাব এবং তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলব। এদিকে, শিক্ষার্থীর কাছ থেকে সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এএসআই সবুজ প্রথমে বলেন, মুচলেকা নয় এটি একটি সমযোতা পত্র। সাদা কাগজে কেন স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে, এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বিষয়টি ভুল হয়েছে বলে স্বীকার করেন।
ওসির দাবি, বিষয়টি জানা নেই অন্যদিকে, ঘটনার বিষয়ে বাসন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হারুন অর রশিদের কাছে মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়টি আমার জানা নেই। অভিযোগকারী শিক্ষার্থী ফাহিম ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে সেনাবাহিনীর ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ হারানোর বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তিনি।
















