রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে গণপরিবহনের তুলনায় মানুষের যাতায়াতের চাহিদা অনেক বেশি। পর্যাপ্ত ও সহজলভ্য গণপরিবহনের অভাবে বিকল্প যানবাহন হিসেবে গত দেড় থেকে দুই দশকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে ব্যাটারিচালিত ও ইঞ্জিনচালিত অটোরিকশা।
শহর থেকে উপজেলা, পৌরসভা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়েও এখন এসব যানবাহনের উপস্থিতি চোখে পড়ে। স্বল্প দূরত্বে দ্রুত যাতায়াত, তুলনামূলক কম ভাড়া এবং সহজলভ্যতার কারণে অটোরিকশা সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে লাখো মানুষের কর্মসংস্থানের সঙ্গেও জড়িয়ে গেছে এই যানবাহন। তবে যথাযথ কারিগরি পরীক্ষা, চালকদের প্রশিক্ষণ, রুট ব্যবস্থাপনা ও কেন্দ্রীয় নীতিমালার ঘাটতির কারণে এর অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে।
বেপরোয়া গতি, অদক্ষ চালনা, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, যেখানে-সেখানে থামানো এবং প্রধান সড়কে চলাচলের কারণে দুর্ঘটনা ও যানজটের ঝুঁকিও বাড়ছে। দেশে বর্তমান বিদ্যুৎ-সংকটের সময় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চার্জিং নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এসব যানবাহনের বিদ্যুৎ ব্যবহার, নিবন্ধন, চলাচলের অনুমতি এবং নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সরকার বিভিন্ন সময়ে নীতিমালা ও বিধিনিষেধের কথা জানিয়েছে।
ফলে একদিকে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা এই যানবাহন, অন্যদিকে সড়কনিরাপত্তা, বিদ্যুৎ ব্যবহার ও নগর ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন—দুই দিক থেকেই অটোরিকশা এখন আলোচনার কেন্দ্রে। তবে বাংলাদেশের অটোরিকশার ইতিহাস বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হয় আরও অনেক বছর আগে। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার আগে এ দেশে জনপ্রিয় ছিল প্যাডেলচালিত রিকশা।
আর সেই রিকশার ইতিহাসও নানা পথ ঘুরে বাংলাদেশে এসে পৌঁছেছে। রিকশার উৎপত্তি জাপানে। পরে এটি এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশে রিকশা কবে প্রথম আসে, তা নিয়ে অবশ্য একাধিক মত রয়েছে। বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, মিয়ানমারের তৎকালীন রেঙ্গুন থেকে ১৯১৯ সালের দিকে চট্টগ্রামে প্রথম রিকশা আসে বলে ধারণা করা হয়। এরপর ধীরে ধীরে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে এর প্রচলন শুরু হয়।
অন্যদিকে, মুনতাসির মামুনের গবেষণার বরাতে বলা হয়, বাংলাদেশে প্যাডেলচালিত সাইকেল রিকশার প্রচলন শুরু হয় ১৯৩০-এর দশকে ভারত থেকে। তার গবেষণায় সিঙ্গাপুর থেকে সাইকেল রিকশা এশিয়ার বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাপিডিয়ার আরেক তথ্য অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জ ও নেত্রকোনায় বসবাসরত ইউরোপীয় পাট রপ্তানিকারকেরা ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য ১৯৩৮ সালে কলকাতা থেকে চেইনযুক্ত রিকশা আমদানি করেন।
এ বিষয়ে মোমিনুল হকের আত্মজীবনীতেও একটি নির্দিষ্ট ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। তার বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৪০ সালের জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারিতে নারায়ণগঞ্জের পাট কোম্পানি রেলি ব্রাদার্সের এক কেরানি কলকাতা থেকে একটি রিকশা নারায়ণগঞ্জে নিয়ে আসেন। তার দাবি ছিল, এর আগে পূর্ববঙ্গে কেউ রিকশা দেখেনি। মোমিনুল হকের বর্ণনা অনুযায়ী, ওই রিকশাটির মালিক ছিলেন যদু গোপাল দত্ত এবং প্রথম চালকের নাম ছিল নরেশ।
পরে যদু গোপাল দত্তের প্রতিবেশী শিশির মিত্র চারটি রিকশা আমদানি করেন। এরপর ধীরে ধীরে রিকশা আমদানির প্রবণতা বাড়তে থাকে। ঢাকায় রিকশার প্রচলন নিয়েও রয়েছে একাধিক তথ্য। বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৯৩০-এর দশকের মাঝামাঝি কলকাতা থেকে ঢাকায় প্যাডেলচালিত সাইকেল রিকশা আসতে শুরু করে। মুনতাসির মামুনের গবেষণায় ১৯৩৭ সালে ঢাকায় রিকশা চালুর কথা উল্লেখ রয়েছে।
আবার অন্য বর্ণনা অনুযায়ী, ঢাকায় রিকশার বিস্তার ঘটে ১৯৪০ সালের দিকে। ফলে ঢাকায় প্রথম রিকশা আসার সুনির্দিষ্ট বছর নিয়ে কিছুটা মতপার্থক্য রয়েছে। ঢাকার পৌরসভার রেকর্ড অনুযায়ী, ১৯৪১ সালে শহরে রিকশার সংখ্যা ছিল মাত্র ৩৭টি। ১৯৪৭ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৮১টিতে। ঢাকায় প্রথম রিকশার লাইসেন্স দেওয়া হয় ১৯৪৪ সালের দিকে বলেও বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
এরপর দ্রুত বাড়তে থাকে রিকশার সংখ্যা। ১৯৫১ সালে ঢাকার জনসংখ্যা ছিল প্রায় চার লাখ। কয়েক দশক পর নগরীর জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রিকশার সংখ্যাও বাড়তে থাকে। ১৯৯৮ সালে ঢাকার জনসংখ্যা প্রায় ৮০ লাখে পৌঁছালে নিবন্ধিত রিকশার সংখ্যা দাঁড়ায় ১ লাখ ১২ হাজার ৫৭২টি। শুধু ঢাকা নয়, সময়ের সঙ্গে দেশের অন্যান্য শহর ও গ্রামাঞ্চলেও রিকশার ব্যবহার বাড়তে থাকে।
মানুষের যাতায়াতের চাহিদা, সড়ক অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং তুলনামূলক কম খরচের কারণে রিকশা হয়ে ওঠে বাংলাদেশের নগর ও গ্রামীণ জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাহন। এরপর প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে রিকশাতেও পরিবর্তন আসে। প্যাডেলচালিত রিকশায় ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক মোটর যুক্ত করা শুরু হয়। এতে চালকের শারীরিক শ্রম কমে যায় এবং তুলনামূলক দ্রুত চলাচল সম্ভব হয়।
একপর্যায়ে প্যাডেলচালিত রিকশা থেকে আলাদা বৈশিষ্ট্যের তিন চাকার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বা ইজিবাইকের ব্যাপক বিস্তার ঘটে। দেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ব্যাপক প্রচলন শুরু হয় রাজশাহী থেকে। ২০১০ সালের দিকে রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচলের অনুমোদন দেন তৎকালীন মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন। এরপর ধীরে ধীরে রাজশাহী অটোরিকশার শহর হিসেবে পরিচিতি পেতে শুরু করে।
রাজশাহীর পর দেশের অন্যান্য শহরেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এই যানবাহন। [159913] বড় শহরের পাশাপাশি পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়েও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইকের ব্যবহার বাড়তে থাকে। স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন সময়ে এসব যানবাহনের অনুমোদন বা নিবন্ধন দেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ কারিগরি সমীক্ষা, সড়কের সক্ষমতা যাচাই এবং সমন্বিত পরিবহন পরিকল্পনার অভাব ছিল।
ফলে অনেক এলাকায় অটোরিকশার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বর্তমানে অটোরিকশা বাংলাদেশের পরিবহনব্যবস্থার একটি বাস্তবতা। বিশেষ করে যেখানে বড় বাস বা অন্যান্য গণপরিবহনের সংকট রয়েছে, সেখানে স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতে অটোরিকশা মানুষের বড় ভরসা। প্রত্যন্ত এলাকা থেকে উপজেলা বা পৌর শহরে যাতায়াতেও এসব যান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা নির্ভর করছে অটোরিকশা চালানো, মেরামত, ব্যাটারি সরবরাহ ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসার ওপর। কিন্তু এর বিপরীত চিত্রও রয়েছে। অনিয়ন্ত্রিতভাবে অটোরিকশার সংখ্যা বাড়ায় অনেক এলাকায় সড়কের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স ছাড়া চালকের হাতে যানবাহন চলে যাওয়া, অতিরিক্ত গতি, যান্ত্রিক ত্রুটি, ব্যস্ত সড়কে চলাচল এবং যাত্রী ওঠানামার সময় যেখানে-সেখানে দাঁড়িয়ে পড়ার কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।
শহরের প্রধান সড়কে এসব যান চলাচলকে কেন্দ্র করে যানজটও তৈরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনাহীনভাবে অটোরিকশার বিস্তার ঘটতে দেওয়ার কারণে এখন হঠাৎ করে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সমস্যার সমাধান করা কঠিন। কারণ এটি শুধু একটি যানবাহনের বিষয় নয়; এর সঙ্গে মানুষের যাতায়াত, কর্মসংস্থান, নগর ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় অর্থনীতি জড়িয়ে আছে।
তাই প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক ও সমন্বিত নীতিমালা। এ ক্ষেত্রে যানবাহনের কারিগরি মান নির্ধারণ, নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষা, চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স, নির্দিষ্ট রুট নির্ধারণ, গতি নিয়ন্ত্রণ এবং কোন সড়কে এসব যান চলতে পারবে তার সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রয়োজন। পাশাপাশি চার্জিং ব্যবস্থাপনা ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিষয়টিও পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।
শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে নয়, নিরাপদ ও সুশৃঙ্খলভাবে অটোরিকশাকে পরিবহনব্যবস্থার অংশ করার উদ্যোগই দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হতে পারে। রিকশা ও অটোরিকশা এখন শুধু বাংলাদেশের পরিবহনব্যবস্থার অংশ নয়, দেশের নগরজীবন ও সংস্কৃতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে ঢাকার রিকশাচিত্র ও রিকশার নকশা আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত। ২০১৪ সালের ২২ নভেম্বর গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস ঢাকাকে ‘রিকশার নগরী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাপান থেকে শুরু হয়ে ভারত ও মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশে আসা রিকশা শতবর্ষেরও বেশি সময় ধরে এ দেশের মানুষের যাতায়াতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। চট্টগ্রামে এর আগমন বিংশ শতাব্দীর শুরুতে, ঢাকায় বিস্তার ১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দশকে এবং পরে প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে প্যাডেলচালিত রিকশা থেকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার আবির্ভাব—সব মিলিয়ে এটি দীর্ঘ এক বিবর্তনের ইতিহাস।


















