আজ মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬
২ ভাদ্র, ১৪৩৩ | ০৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি
২৬°C
সর্বোচ্চ: ৩০°C
সর্বনিম্ন: ২৫°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৯৯%

শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশকে আরও কঠোর হওয়ার তাগিদ

  • MIT ERP
  • Update Time : 11:03:13 pm, Sunday, 16 August 2026
  • 22

শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশকে আরও কঠোর হওয়ার তাগিদ

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

বিএনপি সরকারের ছয় মাসেও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক পর্যায়ে না ফিরলেও চুরি, ছিনতাই, নারী নির্যাতন ও ডাকাতির মতো কিছু অপরাধের মামলা কমেছে। তবে হত্যাসহ কিছু অপরাধের ঘটনায় মামলা অপরিবর্তিত রয়েছে কিংবা বেড়ে গেছে।

তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে দেশে মব ভায়োলেন্সের যে সংস্কৃতি শুরু হয়েছে, তা বিএনপি সরকারের সময়ে এসেও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পুলিশের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নিষ্ক্রিয়তা বিএনপি সরকারের ৬ মাসে কাটেনি। বরং বিএনপি সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে পুলিশের ভেতরে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা তৈরি করে মাঠ পর্যায়ে পুলিশকে সক্রিয় হতে এবং পেশাদারিত্বে ফিরতে বাধা দিচ্ছে একটি দুষ্ট চক্র।

ওই চক্রটি পুলিশের দক্ষ ও পেশাদার কিছু পুলিশ কর্মকর্তাকে টার্গেট করে নানামুখী অপপ্রচার চালাচ্ছে। এ অবস্থায় শৃঙ্খলা রক্ষায় শৃঙ্খল হতে পারেনি পুলিশ। এখনো মাঠ পর্যায়ে পুলিশের চেইন অব কমান্ড ঠিক হয়নি। এদিকে বিএনপি সরকারের গত ৬ মাসে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তায় একদিকে বেড়েছে অপরাধ, অন্যদিকে বেড়েছে মব সন্ত্রাসী কার্যক্রম। পদ ও পদায়ন পেতে ফ্যাসিস্ট সরকারের সুবিধাবাদী গ্রুপ আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে পদায়ন থেকে বিরত রাখা কর্মকর্তাদের হটিয়ে নিজেদের বর্তমান সরকারের অনুসারী দিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন।

এ ক্ষেত্রে এ চক্রটি ব্যবহার করছে বিএনপি সরকারের কিছু এমপি ও মন্ত্রীকে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গ্রেপ্তার করার পর ভালো ব্যবহার করে ওইসব নেতার সঙ্গে যোগাযোগ রাখা কর্মকর্তারা এখন বিএনপি নেতাদের সুপারিশে বিভিন্ন জেলার এসপি, রেঞ্জ ডিআইজি বা গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে পদায়ন পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এসব কর্মকর্তার নানামুখী ষড়যন্ত্রে পেশাদার এবং দক্ষ পুলিশ কর্মকর্তারা অপারেশনাল ইউনিটগুলোতে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে না।

পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শুরুতে পুলিশ কিছুটা অগোছালো ছিল। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও নাজুক অবস্থায় ছিল। কারণ ৫ আগস্টের পরপরই পুলিশের ওপর বড় ঝড় গেছে। যার ক্ষত এখনো পুলিশ কাটিয়ে উঠতে পারেনি। সেই ক্ষত সারিয়ে পুলিশ মাঠে সক্রিয় হতে চেষ্টা করেছে।

বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পুলিশের মাঠ পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় যে চিত্র ছিল, সেটি বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার ৬ মাসে ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে যেতে শুরু করে। এখন যেকোনো অপরাধের ঘটনায় দ্রুত উদঘাটন করে ব্যবস্থা নিচ্ছে পুলিশ। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের চেয়ে গণতান্ত্রিক সরকারের সময়গুলোতে পুলিশ সব সময় বেশি সক্রিয় থাকে।

এর কারণ গণতান্ত্রিক সরকারের সময়ে নানা জবাবদিহি থাকে, পাশাপাশি যেকোনো অপরাধ দমনে সরকারের পূর্ণ সহযোগিতা পাওয়া যায়। পুলিশের এ শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মাঠ পর্যায়ে যখন পুলিশকে যখন পেশাদারিত্বে ফেরানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তখন একটি চক্র টার্গেট করে পুলিশের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নানা অপ্রচার চালাতে শুরু করেছে।

এটি পুলিশের মধ্যে একটি বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। এ কারণে অনেক পুলিশ কর্মকর্তা পেশদারিত্ব নিয়ে কাজ করতে পারছে না। যার ফলে মাঠ পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণেও প্রভাব পড়েছে। আওয়ামী লীগের সময় সব পুলিশ দলীয় ছিল না। চাকরি বাঁচাতে অনেক দক্ষ ও পেশাদার পুলিশ সদস্যকে চাপ দিয়ে অন্যায় কাজ করানো হয়েছে। এখন যদি সে কারণে পুলিশ কর্মকর্তাদের ফ্যাসিস্টের দোসর বানিয়ে অপ্রচার করা হয় আর ওই তথ্যে পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তাহলে এর প্রভাব মাঠে পড়ে।

অপরাধ থাকলে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। অপরাধ বিশ্লেষক ও সমাজ বিশ্লেষকরা বলছেন, পুলিশের প্রধান কাজ হচ্ছে দেশের আইনশৃঙ্খলা একটা নিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতির মধ্যে রেখে অপরাধীদের দমনে কাজ করা। এ ক্ষেত্রে পেশাদার অপরাধীদের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক অপরাধ কমিয়ে আনতে জনমুখী পুলিশিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

অপরাধী কোন দলের বা মতের সে বিষয় বিবেচনায় না নিয়ে নিরপেক্ষভাবে পুলিশিং করা। দক্ষ ও পেশাদার পুলিশ কর্মকর্তাদের অপারেশনালসহ গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে পদায়নের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পুলিশিং গড়ে তুলে সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচারের জন্য কাজ করবে পুলিশ। কিন্তু আওয়ামী লীগের সময়ে পুলিশ যেভাবে দলীয় পুলিশ হিসেবে পরিচালিত হয়েছে, সেই অবস্থান থেকে গত ২ বছরে পুলিশকে বেরিয়ে আনার চেষ্টা থাকলেও তা এখনো পুরোপুরি আনা যায়নি।

বর্তমান সরকারও পুলিশকে রাজনৈতিক পুলিশ না হয়ে জনগণের পুলিশ হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু কিছু দুর্নীতিবাজ ও অপেশাদার কর্মকর্তাদের কারণে সেটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন হচ্ছে না। ছয় মাসের অপরাধের চিত্র পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যান বিশ্লেষনে দেখা গেছে, গত ৫ মাসে (মার্চ থেকে জুলাই) হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে ১৫৩৯টি। ২০২৫ সালের মার্চ থেকে এপ্রিল পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে ১৬৯৯টি।

একইভাবে অন্তর্বর্তী সরকারের মার্চ থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ডাকাতি, ছিনতাই, অপহরণ, পুলিশ অ্যাসল্ট, চুরি ও দুর্ষর্ধ চুরি, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় মামলার চেয়ে বর্তমানে সরকারের সময়ে মার্চ থেকে এপ্রিল পর্যন্ত মামলার সংখ্যা কমেছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেড়েছে। অর্থাৎ অন্তর্বর্তী সরকারে সময়ে দেশের যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল, সেটি বিএনপি সরকারের গত ৬ মাসেও একই রকম রয়েছে।

২০২৫ সালের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মার্চ মাসে ডাকাতির ঘটনায় মামলা হয়েছে ৬০টি। একইভাবে দস্যুতার ঘটনায় ১৭১টি, হত্যার ঘটনায় ৩১৬টি, বিশেষ আইনে মামলা ৯০টি, দাঙ্গার ঘটনায় ১৬টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ২০৫৪টি, অপহরণের ঘটনায় ৮৩টি, পুলিশ অ্যাসল্টের ঘটনায় ৯৬টি, চুরি ও দুর্ধর্ষ চুরির ঘটনায় ১ হাজার ৭০টি, অন্যান্য ঘটনায় ৭ হাজার ৮৫৯টি মামলা হয়েছে।

একইভাবে ২০২৬ সালের মার্চ মাসে ডাকাতির ঘটনায় ৩৯টি, দস্যুতার ঘটনায় ১৪২টি, হত্যার ঘটনায় ৩১৭টি, বিশেষ আইনে ৯১টি, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ১৪৮৫টি, অপহরণের ঘটনায় ১০২টি, পুলিশ অ্যাসল্টের ঘটনায় ৬৩টি, চুরি ও দুর্ধর্ষ চুরির ঘটনায় ১১৪১টি মামলা হয়েছে। একইভাবে ২০২৫ সালের এপ্রিলে হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে ৩৩৬টি। যেটি ২০২৬ সালের এপ্রিলে এসে কমে দাঁড়িয়েছে ২৮-এ।

একইভাবে ২০২৫ সালের এপ্রিলে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় মামলা কমলেও চলতি বছর এপ্রিলে তা বেড়েছে। একইভাবে ২০২৫ সালের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত এবং ২০২৬ সালের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কোনো মাসে হত্যার ঘটনায় মামলা কমেছে আবার কোনো মাসে বেড়েছে। একইভাবে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, অপহরণ, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, চাঁদাবাজি, দাঙ্গাসহ অন্যান্য অপরাধের ঘটনায় মামলা কমেছে বা বেড়েছে।

পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার ৬ মাসে পুলিশকে পেশাদারিত্বে ফেরাতে সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দক্ষ ও পেশাদার পুলিশ কর্মকর্তাদের মাঠ পর্যায়ে পদায়নের মাধ্যমে পুলিশিংকে আরো সক্রিয় করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারে সময়ে পুলিশ অনেকটা ট্রমার মধ্যে ছিল। সে ট্রমা কাটিয়ে পুলিশকে ধীরে ধীরে কাজে সক্রিয় করা হচ্ছে।

তবে এখনো কিছু সমস্যা রয়ে গেছে। এসব সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে। দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন আওয়ামী রেজিমের রক্ষাকবচ হয়ে কাজ করা কর্মকর্তারা আওয়ামী রেজিমে হাসিনাকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে রক্ষাকবচ হয়ে কাজ করা পুলিশ কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ এখনো দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। উচ্চ পদ থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ে আওয়ামী লীগের রক্ষাকবচ হয়ে কাজ কওে, এসব পুলিশ কর্মকর্তারা দেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে চরম উদাসীনতার পরিচয় দিচ্ছেন।

এ অবস্থায় গত দুই বছরেও বিশেষ করে বিএনপি ক্ষমতায় আসার ৬ মাস পার হয়ে গেলেও মাঠ পর্যায়ে পুলিশের শৃঙ্খলা ফেরানো যায়নি। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশে অস্থিরতা তৈরি করতে একটি বিশেষ মহল কাজ করছে। পুলিশ সদর দপ্তরসহ বিভিন্ন ইউনিটে কর্মরত সাবেক ও বর্তমান পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যদের এ অংশ বর্তমান পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাসহ পেশাদার ও নিষ্ঠাবান পুলিশ কর্মকর্তাদের টার্গেট করে নানা ধরনের অপ্রচার চালাচ্ছে।

এমনকি তারা সরকারের বিরুদ্ধেও নানা অপ্রচার চালাতে দেশি-বিদেশি ফেসবুক অ্যাক্টিভিস্টদের নানা তথ্য সরবরাহ করছে। একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পুলিশের পুলিশিং ছিল দলীয়ভাবে। যেখানে সাধারণ মানুষকে দল-মত-নির্বিশেষে আইনি সুবিধা দেওয়ার কথা সেখানে রাজনৈতিক বিবেচনায় সেবা দেওয়া হতো। বিশেষ করে সরকারকে টিকিয়ে রাখতে মাঠ পুলিশের কর্মকর্তারা বিএনপি, জামায়াতসহ আওয়ামী লীগ বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের দমন-পীড়ন, গুম করা মামলা দিয়ে হয়রানির কাজেই বেশি ব্যস্ত ছিল।

আওয়ামী লীগের সময় দেশের অপরাধ দমনে কাজ করার চেয়ে পুলিশ রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের দমনে বেশি সময় পার করেছে। এর মধ্যে জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে সরকারের পতনের আগে ও পরে এ কারণে পুলিশ সাধারণ মানুষের চরম প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে। পুলিশের ওপর হামলার অভিযানে মব তৈরি করে পুলিশের কাজে বাধা দেওয়া কখনো কখনো পুলিশকে প্রকাশ্যে গালাগাল বা হুমকি দেওয়ার কারণে মাঠ পর্যায়ে পুলিশের পুলিশিং করতে গিয়ে মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে।

৫ আগস্টের পর পুলিশের মধ্যে যে ভয়ভীতি তৈরি হয়েছিল সেটি কাটিয়ে নতুনভাবে জনমুখী পুলিশ গড়ে উঠবে দক্ষ ও পেশাদার নেতৃত্ব- এমন আশাই ছিল। কিন্তু গত ২ বছরেও সে আশার গুড়ে বালি পড়েছে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

পূজা চেরির বিয়ের গুঞ্জন: পাত্র নাকি দেশের নামকরা ব্যবসায়ী

শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশকে আরও কঠোর হওয়ার তাগিদ

Update Time : 11:03:13 pm, Sunday, 16 August 2026

বিএনপি সরকারের ছয় মাসেও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক পর্যায়ে না ফিরলেও চুরি, ছিনতাই, নারী নির্যাতন ও ডাকাতির মতো কিছু অপরাধের মামলা কমেছে। তবে হত্যাসহ কিছু অপরাধের ঘটনায় মামলা অপরিবর্তিত রয়েছে কিংবা বেড়ে গেছে।

তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে দেশে মব ভায়োলেন্সের যে সংস্কৃতি শুরু হয়েছে, তা বিএনপি সরকারের সময়ে এসেও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পুলিশের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নিষ্ক্রিয়তা বিএনপি সরকারের ৬ মাসে কাটেনি। বরং বিএনপি সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে পুলিশের ভেতরে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা তৈরি করে মাঠ পর্যায়ে পুলিশকে সক্রিয় হতে এবং পেশাদারিত্বে ফিরতে বাধা দিচ্ছে একটি দুষ্ট চক্র।

ওই চক্রটি পুলিশের দক্ষ ও পেশাদার কিছু পুলিশ কর্মকর্তাকে টার্গেট করে নানামুখী অপপ্রচার চালাচ্ছে। এ অবস্থায় শৃঙ্খলা রক্ষায় শৃঙ্খল হতে পারেনি পুলিশ। এখনো মাঠ পর্যায়ে পুলিশের চেইন অব কমান্ড ঠিক হয়নি। এদিকে বিএনপি সরকারের গত ৬ মাসে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তায় একদিকে বেড়েছে অপরাধ, অন্যদিকে বেড়েছে মব সন্ত্রাসী কার্যক্রম। পদ ও পদায়ন পেতে ফ্যাসিস্ট সরকারের সুবিধাবাদী গ্রুপ আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে পদায়ন থেকে বিরত রাখা কর্মকর্তাদের হটিয়ে নিজেদের বর্তমান সরকারের অনুসারী দিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন।

এ ক্ষেত্রে এ চক্রটি ব্যবহার করছে বিএনপি সরকারের কিছু এমপি ও মন্ত্রীকে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গ্রেপ্তার করার পর ভালো ব্যবহার করে ওইসব নেতার সঙ্গে যোগাযোগ রাখা কর্মকর্তারা এখন বিএনপি নেতাদের সুপারিশে বিভিন্ন জেলার এসপি, রেঞ্জ ডিআইজি বা গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে পদায়ন পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এসব কর্মকর্তার নানামুখী ষড়যন্ত্রে পেশাদার এবং দক্ষ পুলিশ কর্মকর্তারা অপারেশনাল ইউনিটগুলোতে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে না।

পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শুরুতে পুলিশ কিছুটা অগোছালো ছিল। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও নাজুক অবস্থায় ছিল। কারণ ৫ আগস্টের পরপরই পুলিশের ওপর বড় ঝড় গেছে। যার ক্ষত এখনো পুলিশ কাটিয়ে উঠতে পারেনি। সেই ক্ষত সারিয়ে পুলিশ মাঠে সক্রিয় হতে চেষ্টা করেছে।

বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পুলিশের মাঠ পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় যে চিত্র ছিল, সেটি বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার ৬ মাসে ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে যেতে শুরু করে। এখন যেকোনো অপরাধের ঘটনায় দ্রুত উদঘাটন করে ব্যবস্থা নিচ্ছে পুলিশ। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের চেয়ে গণতান্ত্রিক সরকারের সময়গুলোতে পুলিশ সব সময় বেশি সক্রিয় থাকে।

এর কারণ গণতান্ত্রিক সরকারের সময়ে নানা জবাবদিহি থাকে, পাশাপাশি যেকোনো অপরাধ দমনে সরকারের পূর্ণ সহযোগিতা পাওয়া যায়। পুলিশের এ শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মাঠ পর্যায়ে যখন পুলিশকে যখন পেশাদারিত্বে ফেরানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তখন একটি চক্র টার্গেট করে পুলিশের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নানা অপ্রচার চালাতে শুরু করেছে।

এটি পুলিশের মধ্যে একটি বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। এ কারণে অনেক পুলিশ কর্মকর্তা পেশদারিত্ব নিয়ে কাজ করতে পারছে না। যার ফলে মাঠ পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণেও প্রভাব পড়েছে। আওয়ামী লীগের সময় সব পুলিশ দলীয় ছিল না। চাকরি বাঁচাতে অনেক দক্ষ ও পেশাদার পুলিশ সদস্যকে চাপ দিয়ে অন্যায় কাজ করানো হয়েছে। এখন যদি সে কারণে পুলিশ কর্মকর্তাদের ফ্যাসিস্টের দোসর বানিয়ে অপ্রচার করা হয় আর ওই তথ্যে পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তাহলে এর প্রভাব মাঠে পড়ে।

অপরাধ থাকলে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। অপরাধ বিশ্লেষক ও সমাজ বিশ্লেষকরা বলছেন, পুলিশের প্রধান কাজ হচ্ছে দেশের আইনশৃঙ্খলা একটা নিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতির মধ্যে রেখে অপরাধীদের দমনে কাজ করা। এ ক্ষেত্রে পেশাদার অপরাধীদের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক অপরাধ কমিয়ে আনতে জনমুখী পুলিশিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

অপরাধী কোন দলের বা মতের সে বিষয় বিবেচনায় না নিয়ে নিরপেক্ষভাবে পুলিশিং করা। দক্ষ ও পেশাদার পুলিশ কর্মকর্তাদের অপারেশনালসহ গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে পদায়নের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পুলিশিং গড়ে তুলে সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচারের জন্য কাজ করবে পুলিশ। কিন্তু আওয়ামী লীগের সময়ে পুলিশ যেভাবে দলীয় পুলিশ হিসেবে পরিচালিত হয়েছে, সেই অবস্থান থেকে গত ২ বছরে পুলিশকে বেরিয়ে আনার চেষ্টা থাকলেও তা এখনো পুরোপুরি আনা যায়নি।

বর্তমান সরকারও পুলিশকে রাজনৈতিক পুলিশ না হয়ে জনগণের পুলিশ হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু কিছু দুর্নীতিবাজ ও অপেশাদার কর্মকর্তাদের কারণে সেটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন হচ্ছে না। ছয় মাসের অপরাধের চিত্র পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যান বিশ্লেষনে দেখা গেছে, গত ৫ মাসে (মার্চ থেকে জুলাই) হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে ১৫৩৯টি। ২০২৫ সালের মার্চ থেকে এপ্রিল পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে ১৬৯৯টি।

একইভাবে অন্তর্বর্তী সরকারের মার্চ থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ডাকাতি, ছিনতাই, অপহরণ, পুলিশ অ্যাসল্ট, চুরি ও দুর্ষর্ধ চুরি, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় মামলার চেয়ে বর্তমানে সরকারের সময়ে মার্চ থেকে এপ্রিল পর্যন্ত মামলার সংখ্যা কমেছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেড়েছে। অর্থাৎ অন্তর্বর্তী সরকারে সময়ে দেশের যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল, সেটি বিএনপি সরকারের গত ৬ মাসেও একই রকম রয়েছে।

২০২৫ সালের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মার্চ মাসে ডাকাতির ঘটনায় মামলা হয়েছে ৬০টি। একইভাবে দস্যুতার ঘটনায় ১৭১টি, হত্যার ঘটনায় ৩১৬টি, বিশেষ আইনে মামলা ৯০টি, দাঙ্গার ঘটনায় ১৬টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ২০৫৪টি, অপহরণের ঘটনায় ৮৩টি, পুলিশ অ্যাসল্টের ঘটনায় ৯৬টি, চুরি ও দুর্ধর্ষ চুরির ঘটনায় ১ হাজার ৭০টি, অন্যান্য ঘটনায় ৭ হাজার ৮৫৯টি মামলা হয়েছে।

একইভাবে ২০২৬ সালের মার্চ মাসে ডাকাতির ঘটনায় ৩৯টি, দস্যুতার ঘটনায় ১৪২টি, হত্যার ঘটনায় ৩১৭টি, বিশেষ আইনে ৯১টি, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ১৪৮৫টি, অপহরণের ঘটনায় ১০২টি, পুলিশ অ্যাসল্টের ঘটনায় ৬৩টি, চুরি ও দুর্ধর্ষ চুরির ঘটনায় ১১৪১টি মামলা হয়েছে। একইভাবে ২০২৫ সালের এপ্রিলে হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে ৩৩৬টি। যেটি ২০২৬ সালের এপ্রিলে এসে কমে দাঁড়িয়েছে ২৮-এ।

একইভাবে ২০২৫ সালের এপ্রিলে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় মামলা কমলেও চলতি বছর এপ্রিলে তা বেড়েছে। একইভাবে ২০২৫ সালের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত এবং ২০২৬ সালের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কোনো মাসে হত্যার ঘটনায় মামলা কমেছে আবার কোনো মাসে বেড়েছে। একইভাবে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, অপহরণ, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, চাঁদাবাজি, দাঙ্গাসহ অন্যান্য অপরাধের ঘটনায় মামলা কমেছে বা বেড়েছে।

পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার ৬ মাসে পুলিশকে পেশাদারিত্বে ফেরাতে সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দক্ষ ও পেশাদার পুলিশ কর্মকর্তাদের মাঠ পর্যায়ে পদায়নের মাধ্যমে পুলিশিংকে আরো সক্রিয় করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারে সময়ে পুলিশ অনেকটা ট্রমার মধ্যে ছিল। সে ট্রমা কাটিয়ে পুলিশকে ধীরে ধীরে কাজে সক্রিয় করা হচ্ছে।

তবে এখনো কিছু সমস্যা রয়ে গেছে। এসব সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে। দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন আওয়ামী রেজিমের রক্ষাকবচ হয়ে কাজ করা কর্মকর্তারা আওয়ামী রেজিমে হাসিনাকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে রক্ষাকবচ হয়ে কাজ করা পুলিশ কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ এখনো দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। উচ্চ পদ থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ে আওয়ামী লীগের রক্ষাকবচ হয়ে কাজ কওে, এসব পুলিশ কর্মকর্তারা দেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে চরম উদাসীনতার পরিচয় দিচ্ছেন।

এ অবস্থায় গত দুই বছরেও বিশেষ করে বিএনপি ক্ষমতায় আসার ৬ মাস পার হয়ে গেলেও মাঠ পর্যায়ে পুলিশের শৃঙ্খলা ফেরানো যায়নি। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশে অস্থিরতা তৈরি করতে একটি বিশেষ মহল কাজ করছে। পুলিশ সদর দপ্তরসহ বিভিন্ন ইউনিটে কর্মরত সাবেক ও বর্তমান পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যদের এ অংশ বর্তমান পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাসহ পেশাদার ও নিষ্ঠাবান পুলিশ কর্মকর্তাদের টার্গেট করে নানা ধরনের অপ্রচার চালাচ্ছে।

এমনকি তারা সরকারের বিরুদ্ধেও নানা অপ্রচার চালাতে দেশি-বিদেশি ফেসবুক অ্যাক্টিভিস্টদের নানা তথ্য সরবরাহ করছে। একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পুলিশের পুলিশিং ছিল দলীয়ভাবে। যেখানে সাধারণ মানুষকে দল-মত-নির্বিশেষে আইনি সুবিধা দেওয়ার কথা সেখানে রাজনৈতিক বিবেচনায় সেবা দেওয়া হতো। বিশেষ করে সরকারকে টিকিয়ে রাখতে মাঠ পুলিশের কর্মকর্তারা বিএনপি, জামায়াতসহ আওয়ামী লীগ বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের দমন-পীড়ন, গুম করা মামলা দিয়ে হয়রানির কাজেই বেশি ব্যস্ত ছিল।

আওয়ামী লীগের সময় দেশের অপরাধ দমনে কাজ করার চেয়ে পুলিশ রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের দমনে বেশি সময় পার করেছে। এর মধ্যে জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে সরকারের পতনের আগে ও পরে এ কারণে পুলিশ সাধারণ মানুষের চরম প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে। পুলিশের ওপর হামলার অভিযানে মব তৈরি করে পুলিশের কাজে বাধা দেওয়া কখনো কখনো পুলিশকে প্রকাশ্যে গালাগাল বা হুমকি দেওয়ার কারণে মাঠ পর্যায়ে পুলিশের পুলিশিং করতে গিয়ে মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে।

৫ আগস্টের পর পুলিশের মধ্যে যে ভয়ভীতি তৈরি হয়েছিল সেটি কাটিয়ে নতুনভাবে জনমুখী পুলিশ গড়ে উঠবে দক্ষ ও পেশাদার নেতৃত্ব- এমন আশাই ছিল। কিন্তু গত ২ বছরেও সে আশার গুড়ে বালি পড়েছে।