১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। ঢাকাই সিনেমার তৎকালীন আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা চিত্রনায়ক সালমান শাহর (ইমন) রহস্যময় মৃত্যু স্তব্ধ করে দিয়েছিল পুরো দেশকে। সেই থেকে আজ পর্যন্ত দীর্ঘ তিন দশক ধরে এই মৃত্যুকে ঘিরে যে কটি নাম সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম সালমানের স্ত্রী সামিরা হক।
সালমানের মা নীলা চৌধুরী শুরু থেকেই এই মৃত্যুকে ‘পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড’ বলে দাবি করে পুত্রবধূ সামিরার দিকে আঙুল তুলেছেন। অপরদিকে সামিরা একে সব সময় ‘আত্মহত্যা’ বলেই দাবি করে আসছেন। সম্প্রতি আইনি লড়াইয়ের নতুন মোড়ে সামিরাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন রহস্য। সামিরা হক ছিলেন তৎকালীন বিখ্যাত ক্রিকেটার শফিকুল হক হীরার মেয়ে।
১৯৯২ সালের ১২ আগস্ট ভালোবেসে তিনি সালমান শাহকে বিয়ে করেন। সালমান যখন চলচ্চিত্রে পা রাখেননি, তখন থেকেই তাদের পরিচয়। ফ্যাশন সচেতন সামিরা সালমানের পোশাক ও স্টাইল ডিজাইনেও বড় ভূমিকা রাখতেন। গত বছর সামিরা বিউটি পার্লার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। তবে সালমানের মৃত্যুর পর থেকেই তিনি খলনায়িকা হিসেবে দেশবাসীর একাংশের ক্ষোভের মুখে পড়েন।
সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীর অভিযোগ, সামিরা ও তার পরিবার পূর্বপরিকল্পিতভাবে সালমানকে হত্যা করেছে। তিনি অভিযোগ করেন, ঘটনার দিন সকালে তিনি সালমানের বাসায় গেলে সামিরা তাকে দেখা করতে দেননি এবং সালমান ঘুমাচ্ছেন বলে ফিরিয়ে দেন। পরবর্তীতে সালমানের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। অন্যদিকে, সামিরা বিভিন্ন সময়ে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
তার দাবি ছিল, নীলা চৌধুরী নিজেই সালমানের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করতেন এবং পারিবারিক কলহের কারণেই সালমান আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। এমনকি সালমানের সঙ্গে চিত্রনায়িকা শাবনূরের অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা নিয়ে তৈরি হওয়া পারিবারিক অশান্তিও এই মৃত্যুর পেছনে দায়ী ছিল বলে তিনি ইঙ্গিত দেন। এদিকে, সালমান শাহর মৃত্যুর পর থেকেই খল অভিনেতা ডন ও সালমানের স্ত্রী সামিরা হককে নিয়ে বিনোদন পাড়ায় কানাঘুষা কম ছিল না।
সম্প্রতি ডন গ্রেপ্তার হওয়ার পর নেটিজেনরা আবারও পুরোনো দুটি ছবি সামনে এনে দাবি করছেন, তাদের মধ্যে বিশেষ কোনো সম্পর্ক ছিল। তবে ছবিগুলোর নেপথ্যের গল্প মোটেও সরল নয়, বরং তা একাধিক রহস্যে ঘেরা। সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি করেছে ডনের সঙ্গে এক নারীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বা অন্তরঙ্গ একটি ছবি। অনেকেই ছবিতে থাকা নারীকে সামিরা বলে ধরে নিয়েছেন।
এই ছবি নিয়ে সামিরার দাবি, ছবির নারীটি আমি নই, বরং নব্বইয়ের দশকের পার্শ্বনায়িকা সাবরিনা। বিতর্কের মুখে সামিরা হক বরাবরই ডনের সঙ্গে যেকোনো অনৈতিক সম্পর্কের কথা অস্বীকার করে এসেছেন। সামিরার ভাষ্য মতে, ‘ডন আমার কাছে ছোট ভাইয়ের মতো ছিল। এমনকি প্রতি ঈদে ডন আমার পা ছুঁয়ে সালাম করত। ’ এই ছবিগুলো দেখিয়ে ইমনের (সালমান শাহ) ভালোবাসার মানুষকে ছোট করা হচ্ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সালমান শাহর মৃত্যুর কয়েক বছর পর সামিরা সালমানেরই এক বন্ধু মোশতাক ওয়াইজকে বিয়ে করেছিলেন। সেই সংসারে তাদের তিনটি সন্তান হয়। তবে ২০২১ সালে মোশতাকের সঙ্গে তার বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। এরপর ২০২১ সালের আগস্টেই তিনি সাবেক ক্রিকেটার ও ধারাভাষ্যকার ইশতিয়াক আহমেদকে বিয়ে করেন এবং সন্তানদের নিয়ে নতুন জীবন শুরু করেন। ২০২৫ সালের অক্টোবরে ঢাকার আদালত সালমান শাহর অপমৃত্যুর মামলা বাতিল করে এটিকে ‘হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে নিয়মিত মামলা করার আদেশ দেন।
এই মামলায় সামিরা হককে প্রধান (১ নম্বর) আসামি করা হয়। এরপরই আদালত সামিরা এবং অভিনেতা ডনের ওপর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। আইনি জটিলতার কারণে বর্তমানে সামিরা হকের অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি বিমানবন্দর থেকে অভিনেতা ডন গ্রেপ্তার হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে যে, সামিরা হক গোপনে দেশ ছেড়েছেন এবং পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে অবস্থান করছেন।
তবে ইমিগ্রেশন পুলিশ ও তদন্তকারী সংস্থা সিআইডির পক্ষ থেকে তার সঠিক অবস্থান নিশ্চিত করা যায়নি, কারণ আদালতের আদেশের পর থেকেই তার ব্যবহৃত ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। ‘২৯ বছর ধরে শুধু একটা সত্য শোনার জন্য বেঁচে আছি। আমার ছেলেকে যারা খুন করেছে, তারা বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এবার অন্তত প্রধান আসামি সামিরাকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক।
ও মুখ খুললেই সালমান হত্যার পুরো রহস্য উন্মোচিত হবে। ’ লন্ডন থেকে অশ্রুসিক্ত চোখে এই দাবি জানান প্রয়াত চিত্রনায়ক সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী। তিনি শুরু থেকেই দাবি করে আসছেন, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সালমান শাহ আত্মহত্যা করেননি, তাকে সুপরিকল্পিতভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। আর এই পুরো ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন সালমানের স্ত্রী সামিরা হক।
নীলা চৌধুরীর মতে, সামিরাকে গ্রেপ্তার করা জরুরি। অভিনেতা ডন গ্রেপ্তার হওয়ার পর নীলা চৌধুরী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ডন গ্রেপ্তার হওয়ায় প্রমাণ হয় যে এই মামলার মেরিট আছে। ’ কিন্তু মামলার ১ নম্বর আসামি সামিরা হক কেন এখনো গ্রেপ্তার হননি, তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন। তার আশঙ্কা, আদালত দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করার আগেই সামিরাকে হয়তো কোনো প্রভাবশালী মহল দেশ ছাড়তে সাহায্য করেছিল।
সামিরাকে অবিলম্বে ইন্টারপোলের মাধ্যমে হলেও খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানান তিনি। দীর্ঘ ২৯ বছর পর পিবিআইয়ের দেওয়া ‘আত্মহত্যা’র প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে আদালত সিআইডিকে নতুন করে তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছেন। সামিরা হক, তার মা লতিফা হক লুসি, খল অভিনেতা ডন এবং আজিজ মোহাম্মদ ভাইসহ মোট ১১ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।
৩০ বছর ছুঁই ছুঁই এই মামলার জট সামিরার গ্রেপ্তার বা আত্মপ্রকাশের মাধ্যমেই শুধু খুলতে পারে বলে মনে করছেন চলচ্চিত্র অঙ্গন ও সালমান শাহর ভক্তরা।















