মধ্যপ্রাচ্য সংকট, টার্মিনাল ত্রুটি ইত্যাদি নানা কারণে ক্ষমতায় এসেই বিএনপি সরকারকে জ্বালানি খাতে বড় ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। চলতি বছরের মার্চে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের বাজারে তৈরি হয় বিরাট সংকট।
তখনই সরকার জ্বালানি তেলের বাজার বেসরকারি খাতে উন্মুক্ত করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। দেশের জ্বালানি তেল আমদানির বাজারে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) প্রধান ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের অস্থিরতা, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকটের অভিজ্ঞতার পর বেসরকারি খাতকে জ্বালানি তেল আমদানিতে আরও বড় ভূমিকা দেওয়ার প্রশ্ন সামনে আসে।
ফলে জ্বালানি তেল আমদানিতে বেসরকারি খাতকে যুক্ত করার চিন্তা বড় হয়ে দাঁড়ায় সরকারের সামনে। তবে এই পরিকল্পনা কী আত্মঘাতী হবে, নাকি লাভজনক, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে সমালোচনা। বিশেষজ্ঞদের মধ্যে কেউ কেউ বলছেন, এতে সরকারের আমদানি ব্যয়ের সুযোগ কমলেও জ্বালানির বাজারে নতুন সিন্ডিকেট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বেসরকারি খাতে জ্বালানি তেল আমদানির বিষয়ে রূপালী বাংলাদেশের অনুসন্ধানে ইতোমধ্যে বেসরকারি কয়েকটি রিফাইনারিকে আমদানির প্রত্যয়নপত্র দেওয়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) নোটিশে চলতি বছর পেট্রোম্যাক্স রিফাইনারি লিমিটেড, সুপার পেট্রোকেমিক্যাল পিএলসি এবং একোয়া রিফাইনারি লিমিটেডের নামে আমদানির প্রত্যয়নপত্র প্রকাশিত হয়েছে। ফলে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে যে বেসরকারি খাতে তেল আমদানি বাড়ানো হলে সরকার কি আর্থিকভাবে লাভবান হবে, নাকি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই বাড়তি ব্যয়ের বোঝা পড়বে?
বিপিসির ওপর বিশাল আমদানি চাপ : বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এখনো আমদানিনির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলেই এর সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, পরিবহন খরচ, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্প খাতে। চলতি বছর মার্চে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতা তৈরি হলে দেশে জ্বালানি বিক্রিতে রেশনিং পর্যন্ত করতে হয়েছিল।
তখন বিপিসি জানিয়েছিল, দেশের জ্বালানি তেলের প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানিনির্ভর। একই সময় সরকার জ্বালানি ও এলএনজি আমদানি চালু রাখতে ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থায়ন সংগ্রহের চেষ্টা করে। আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট মার্কেটের উচ্চমূল্য আমদানি ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেয়। এ অবস্থায় বেসরকারি খাত নিজেদের অর্থায়নে জ্বালানি আমদানি করলে সরকারের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর তাৎক্ষণিক চাপ কিছুটা কমতে পারে।
সরকারের সম্ভাব্য লাভ কোথায় : বেসরকারি খাতে আমদানির সবচেয়ে বড় সুবিধা হতে পারে সরকারের অর্থায়ন ঝুঁকি কমানো। বর্তমানে বিপিসিকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানির জন্য এলসি খোলা, বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ, ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং সরবরাহ নিশ্চিত করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে গেলে রাষ্ট্রীয় অর্থের ওপর চাপও বাড়ে। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছিলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার কারণে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার জ্বালানি ব্যয় সরকারকে আর্থিক চাপের মধ্যে ফেলেছে।
অতএব, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নিজস্ব অর্থে আমদানি করলে সরকারের জন্য কয়েকটি সুবিধা তৈরি হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব সুবিধার মধ্যে রয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার তাৎক্ষণিক চাপ কমা, সরকারি ঋণের প্রয়োজন কমা, আমদানির উৎস ও সরবরাহকারী বাড়া, বিপিসির আর্থিক ঝুঁকি কমা এবং বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরি হলে আমদানি ব্যয় কমার সম্ভাবনা। তবে এসব সুবিধা তখনই বাস্তব হবে, যদি বাজারে প্রকৃত প্রতিযোগিতা থাকে।
এ বিষয়ে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিগত সময়ে আমরা দেখেছি বেসরকারি খাতে ক্ষমতা দেওয়ার মানেই একটা সিন্ডিকেট তৈরি হওয়া; বিশেষ করে এলপিজির বাজারে আমরা দেখছি, কীভাবে জনগণকে জিম্মি করে বাড়তি অর্থ আদায় করছেন ব্যবসায়ীরা। এ ক্ষেত্রে তেলের বাজারেও যদি এমন সিন্ডিকেট তৈরি হয়, তাহলে ভোগান্তি বাড়বে বই কমবে না।
তাই যদি বেসরকারি খাতে দেওয়া হয়, তবে তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের নজরদারি বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়বে। ’ মূল্যের সামঞ্জস্য নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন : বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নিজেদের অর্থে তেল আনলে সরকারের জন্য একটি বড় সুবিধা হলো আমদানি ব্যয়ের পুরো অর্থ আগে থেকে রাষ্ট্রকে জোগাড় করতে হবে না। কিন্তু এখানে আরেকটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ।
বেসরকারি আমদানিকারক কি শেষ পর্যন্ত সেই অর্থ ভোক্তার কাছ থেকেই তুলে নেবে? যদি আমদানিকারক আন্তর্জাতিক বাজারদর, পরিবহন ব্যয়, ব্যাংকিং ব্যয় এবং নিজস্ব মুনাফা যোগ করে পণ্য বাজারজাত করে, তাহলে সরকারের নির্ধারিত খুচরা মূল্যের সঙ্গে সেই কাঠামোর সামঞ্জস্য কীভাবে হবে, তা স্পষ্ট হওয়া জরুরি। বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণ নিয়ে বিপিসি নিয়মিত প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করে।
চলতি বছরের জুনেও জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করা হয়েছে; অর্থাৎ বেসরকারি আমদানির সঙ্গে মূল্য নির্ধারণব্যবস্থার সমন্বয় না থাকলে বাজারে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য তৈরি হতে পারে। সীমিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে যাবে বাজারের নিয়ন্ত্রণ : বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেসরকারি খাতে আমদানি উন্মুক্ত করার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো প্রতিযোগিতা তৈরির বদলে যদি কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান বাজার নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে সরকারি একচেটিয়া ব্যবস্থার জায়গায় বেসরকারি অলিগোপলি (সীমিত কয়েকজনের নিয়ন্ত্রণ) তৈরি হতে পারে।
তারা বলছেন, ধরা যাক কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আমদানি লাইসেন্স, রিফাইনারি, ডিপো, স্টোরেজ এবং পরিবহন অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিল। তখন তারা বাজারে সরবরাহের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। এর ফলে তাত্ত্বিকভাবে তিনটি সমস্যা দেখা দিতে পারে। প্রথমত, আমদানির প্রকৃত ব্যয় যাচাই কঠিন হতে পারে। দ্বিতীয়ত, বাজারে সরবরাহ কমিয়ে বা নিয়ন্ত্রণ করে দাম বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তৃতীয়ত, রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতে কৌশলগত জ্বালানি বাজার কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, কতটি প্রতিষ্ঠানকে সুযোগ দেওয়া হবে এবং কীভাবে নিশ্চিত করা হবে যে কোনো প্রতিষ্ঠান বাজারের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না।
এসব ক্ষেত্রে সরকারকে তীক্ষè নজরদারি করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তিন প্রতিষ্ঠান ঘিরে নতুন বাস্তবতা : বিপিসির ওয়েবসাইটে চলতি বছর পেট্রোম্যাক্স রিফাইনারি, সুপার পেট্রোকেমিক্যাল এবং একোয়া রিফাইনারির নামে আমদানির প্রত্যয়নপত্র প্রকাশিত হয়েছে। সরকারি শ্রম পরিদর্শনব্যবস্থার তথ্যেও পেট্রোম্যাক্স রিফাইনারি ও সুপার পেট্রোকেমিক্যালকে জ্বালানি তেল রিফাইনারি হিসেবে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের তথ্য পাওয়া যায়।
এর ফলে সরকারের সামনে একই সঙ্গে দুটি বাজার দাঁড়াবে। বিপিসি ও রাষ্ট্রীয় রিফাইনারি বনাম বেসরকারি রিফাইনারি। এই প্রতিযোগিতা দক্ষতা বাড়াতে পারে। আবার নীতিগত সুরক্ষা না থাকলে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের ওপর চাপও তৈরি করতে পারে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগে যত প্রশ্ন : এদিকে সরকার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডকে আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণে বড় বিনিয়োগ করছে।
বিপিসিও চলতি বছর প্রতিষ্ঠানটিকে এর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পের জন্য আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে। তাই এখানে নীতিগত প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি সরকার একদিকে রাষ্ট্রীয় অর্থে রিফাইনারির সক্ষমতা বাড়ায় এবং অন্যদিকে একই পণ্য আমদানিতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ব্যাপকভাবে সুযোগ দেয়, তাহলে দুই নীতির মধ্যে সমন্বয় কীভাবে হবে?
রাষ্ট্রীয় রিফাইনারির উৎপাদন যদি বাজারে জায়গা না পায়, তাহলে তার বিনিয়োগের অর্থনৈতিক সুফল কমে যেতে পারে। আবার বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যদি কম খরচে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে পণ্য এনে দিতে পারে, তাহলে তাদের প্রতিযোগিতার সুযোগ দেওয়া অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিকও হতে পারে; অর্থাৎ এখানে মূল বিষয় সরকারি না বেসরকারি এটি নয়; বরং কে কম খরচে, বেশি স্বচ্ছতায় এবং নির্ভরযোগ্যভাবে জ্বালানি সরবরাহ করতে পারে।
আন্তর্জাতিক সংকট দেখিয়ে দিয়েছে দুর্বলতা : চলতি বছর মার্চের জ্বালানি সংকট এই বিতর্ককে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জাহাজ চলাচল ও সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে বাংলাদেশে জ্বালানি বিক্রিতে দৈনিক সীমা নির্ধারণ করতে হয়েছিল। বিপিসি জানিয়েছিল, অতিরিক্ত চাহিদা ও মজুতদারির কারণে পরিস্থিতি আরও চাপের মধ্যে পড়েছিল।
তাই খাতটিকে বেসরকারীকরণ করলেও খুব বেশি সুবিধা পাওয়ার সুযোগ নেই উল্লেখ করে অপর জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, স্বাভাবিক সময়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান লাভ করবে, কিন্তু সংকটের সময় সরকার যদি তাদের কাছ থেকে বাধ্যতামূলক সরবরাহ নিতে না পারে, তাহলে এই মডেল জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে না। কতটি প্রতিষ্ঠান সুযোগ পাচ্ছে, কী দামে আমদানি করছে, কত মুনাফা করছে, কীভাবে দাম নির্ধারিত হচ্ছে, কত মজুত রাখছে এবং সংকটের সময় রাষ্ট্রের নির্দেশ কতটা মানছে তার ওপর।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সরকার যেন বিপিসির সরকারি একচেটিয়া বাজার ভেঙে কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া বাজার তৈরি না করে। তাই এ ক্ষেত্রে সরকারকে আরেকটু ভাবতে হবে। ‘সঠিক প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছ আমদানি মূল্য, কঠোর মজুত বাধ্যবাধকতা, বাজার আধিপত্য রোধ এবং কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে’ জানিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা যে সিদ্ধান্তই নিই না কেন, তা জনগণের কল্যাণের স্বার্থেই নেব।
’ গ্রাহক দুর্ভোগ নয়; বরং গ্রাহকদের সুবিধা দিতেই সব ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।














