ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঢাকায় ফেরত না পাঠানো পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেবেন না বা ভারত সফরে যাবেন না বলে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ট্রিবিউন।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে, গত ১০ আগস্ট ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে সাক্ষাতের সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাকে এ বার্তা দেন। ত্রিবেদীর দিল্লি যাওয়ার ঠিক আগের দিন এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশ ছাড়ার পর থেকে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা চলছিল।
তবে নতুন এই অবস্থানের কারণে দুই দেশের সম্পর্কে আবারও টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক আশ্রয়ের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে গত ৫ আগস্ট দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে শেখ হাসিনা ও তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনের পরই ঢাকার অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে হাসিনা ও তার ছেলে গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। এ সময় শেখ হাসিনার বক্তব্য ছিল বেশ আক্রমণাত্মক। তিনি আগামী ডিসেম্বরে ঢাকায় ফেরার অঙ্গীকার করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, তাকে হত্যা করা হতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার এমন বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং তার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার ক্ষুব্ধ হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে ঢাকা দিল্লিকে জানিয়েছে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের ওপরই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নির্ভর করবে। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জয়লাভের পরপরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। বিশ্বনেতাদের মধ্যে মোদিই ছিলেন অন্যতম প্রথম ব্যক্তি, যিনি তাকে অভিনন্দন জানিয়ে এ আমন্ত্রণ দেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণকে ব্রিকস সম্মেলনের আমন্ত্রণ থেকে আলাদা হিসেবে দেখা হচ্ছে। আঞ্চলিক জোটগুলোর প্রধানদের আমন্ত্রণ জানানোর প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগরীয় জোট বিমসটেকের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ভারত দ্রুত ৫ আগস্টের সংবাদ সম্মেলন থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নেয়।
ভারতীয় কর্মকর্তারা জানান, ওই অনুষ্ঠান আয়োজনের ক্ষেত্রে ভারতের কোনো ভূমিকা ছিল না। তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি, এরই মধ্যে দুই দেশের সম্পর্কে এর প্রভাব পড়েছে। এদিকে, গত ১০ আগস্ট ভারতের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর প্রধান পরাগ জৈন ঢাকায় এসে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এ কে এম শামসুল ইসলামের সঙ্গে বৈঠক করেন।
শামসুল ইসলামকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই দিনে সকালে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। প্রায় ৪৫ মিনিট স্থায়ী ওই বৈঠকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তুলে ধরেন। সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রীকে বোঝানোর চেষ্টা করেন।
তিনি বলেন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে কোনো সীমা নেই এবং সম্পর্ক পুনর্গঠনে ভারত সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার অবস্থানে অনড় ছিলেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। বৈঠকের পর গণমাধ্যমের কাছে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী এটিকে দুই দেশের সম্পর্ককে ‘ইতিবাচক, গঠনমূলক ও ভবিষ্যৎমুখী’ করার জন্য ভারতের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ভারত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সফরের জন্য অপেক্ষা করছে। একই সঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন, দুই দেশের মধ্যে এমন কোনো বিষয় নেই, যা সমাধান করা সম্ভব নয়। গত কয়েক দিনে দিল্লিতে ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ঢাকার পরিবর্তিত অবস্থান সম্পর্কে অবহিত করেছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এর আগে ত্রিবেদী বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে ‘বহুমাত্রিক ও দীর্ঘস্থায়ী’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ব্যক্তিগতভাবে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে গুরুত্ব দিচ্ছেন। তার নবায়িত ‘লুক ইস্ট’ উদ্যোগের কেন্দ্রবিন্দুতে বাংলাদেশ রয়েছে। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কঠোর অবস্থান দিল্লির জন্য কিছুটা ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে উভয় পক্ষই এখন নিজেদের অবস্থান কিছুটা নরম করার চেষ্টা করছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে।
কারণ, দ্রুত পরিবর্তনশীল ও বহুমুখী বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ও ভারত—দুই দেশই একে অপরের সহযোগিতা প্রয়োজন বলে মনে করছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীনে প্রথম বিদেশ সফরও ভারত সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এদিকে, শেখ হাসিনার বিষয়ে কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলেছে, ভারত তার পুরোনো ও ঘনিষ্ঠ মিত্র শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যাকে সহজে পরিত্যাগ করতে পারে না।
বিশেষ করে, তিনি জীবনে দ্বিতীয়বারের মতো ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছেন—এ বিষয়টিও দিল্লির অবস্থানে গুরুত্বপূর্ণ বলে সূত্রগুলো উল্লেখ করেছে। তবে একই সূত্রগুলো স্বীকার করেছে, শেখ হাসিনার ৫ আগস্টের সংবাদ সম্মেলন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক উন্নয়নের পথে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। এক কূটনৈতিক সূত্রের ভাষ্য, ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তের নিরাপত্তার চাহিদা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে দিল্লি।
ফলে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণকে কেন্দ্র করে ঢাকা-দিল্লির কূটনৈতিক সম্পর্ক এখন নতুন এক পরীক্ষার মুখে পড়েছে। সূত্র : দ্য ট্রিবিউন।














