১৪ আগস্ট। ক্যালেন্ডারের পাতায় দিনটি হয়তো আর দশটা দিনের মতোই একটি দিন। কিন্তু আমাদের দুই বোনের কাছে ১৪ আগস্ট মানে একটি অসমাপ্ত ভালোবাসার গল্প। আম্মু আর আব্বুর ৩৮তম বিবাহবার্ষিকী।
আজ তারা কেউ নেই। তবু আশ্চর্যের ব্যাপার, তাদের ভালোবাসাটা আছে। আগের চেয়েও বেশি করে আছে। কারণ কিছু ভালোবাসা মানুষ বেঁচে থাকতে যতটা বোঝা যায়, মানুষ চলে যাওয়ার পর তার গভীরতা তার চেয়েও বেশি করে অনুভব করা যায়। আমার আব্বু, প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান। তিনি বানিয়েছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় প্রেমের সিনেমা ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’।
সিনেমায় তিনি ভালোবাসার গল্প বলেছিলেন। কিন্তু আজ মনে হয়, আসলে তার নিজের জীবনটাই ছিল আরও বড় এক প্রেমের গল্প। আব্বু যেদিন প্রথম আম্মুকে দেখেছিলেন, সেদিনই নাকি তার মনে হয়েছিল—এই মানুষটাই তার মানুষ। তারপর তারা একে অপরকে বেছে নিয়েছিলেন। বিয়ে করেছিলেন। একসঙ্গে একটি সংসার গড়েছিলেন। আমরা তিন বোন সেই সংসারের ভালোবাসার ভেতরেই বড় হয়েছি।
জীবন অবশ্য তাদের সব সময় ফুল দিয়ে সাজানো ছিল না। ছিল ঝড়। ছিল অভিমান। ছিল রাগ, কষ্ট, ভুল-বোঝাবুঝি, হাজারো উত্থান-পতন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—কোনো কিছুই তাদের আলাদা করতে পারেনি। তাঁরা কখনো আমাদের সামনে ভালোবাসার প্রদর্শন করেননি। হাত ধরে হাঁটেননি। একে অপরকে নিয়ে বড় বড় কথা বলেননি। তাদের ভালোবাসা ছিল খুব নীরব। এতটাই নীরব যে, আমরা তিন মেয়েও বুঝতে পারিনি—এই নীরবতার ভেতর কত গভীর ভালোবাসা লুকিয়ে ছিল।
২০২০ সালের মহামারিতে দুজনেরই একসঙ্গে কোভিড হয়েছিল। দীর্ঘ ২৮টা দিন। একই সময়ে অসুস্থ। একই ঘরে ভয়। একই সঙ্গে লড়াই। আমরা শুধু দোয়া করেছি—দুজন যেন একসঙ্গে সুস্থ হয়ে ওঠেন। আলহামদুলিল্লাহ, তারা একসঙ্গেই ফিরে এসেছিলেন। আজ মনে হয়, হয়তো সেদিনও তারা একে অপরকে ছেড়ে যেতে চাননি। কিন্তু আমরা জানতাম না, তাদের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটা তখনও বাকি।
২০২৩ সালে প্রথমে আম্মু চলে গেলেন। একজন মাকে হারানোর শোক কতটা গভীর, সেটা ভাষায় বলা যায় না। আমরা তিন বোন তখনও সেই শোকটা বুঝে উঠতে পারিনি। তার মাত্র ২৪ ঘণ্টা পর আব্বুও চলে গেলেন। মাত্র ২৪ ঘণ্টা। আমি আজও এই সময়ের ব্যবধানটাকে মেনে নিতে পারি না। একজন মানুষকে হারানোর পর তার শূন্যতাটা বুকের মধ্যে জায়গা করে নেওয়ার আগেই আরেকজন মানুষও চলে গেলেন।
তখন প্রথমবার মনে হয়েছিল—আব্বু হয়তো সত্যিই আম্মুকে ছাড়া থাকতে পারেননি। যে মানুষটির সঙ্গে ৩৫ বছর সকাল শুরু হয়েছে, রাত শেষ হয়েছে; যে মানুষটির সঙ্গে অসুস্থতা, সুস্থতা, হাসি, কান্না, রাগ, অভিমান—জীবনের প্রতিটি ঋতু পার হয়েছে, হঠাৎ সেই মানুষটি নেই। হয়তো আব্বুর কাছে পৃথিবীটাও তখন আর আগের মতো ছিল না। আমার আব্বু ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ বানিয়েছিলেন।
কিন্তু তার নিজের জীবনের শেষ গল্পটা যেন তার চেয়েও বড় হয়ে গেল। আম্মু গেলেন। আব্বু ২৪ ঘণ্টা পর গেলেন। যেন ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সত্যিই তাদের জীবনের গল্প হয়ে গেল। পার্থক্য শুধু একটাই—সিনেমার গল্প আমরা পর্দায় দেখি। আর তাদের গল্প আমরা বেঁচে বেঁচে দেখেছি। তাদের চলে যাওয়ার আট মাস পর আমাদের বড় বোনও চলে গেলেন।
আজ আমরা দুই বোন। আমি আর আমার ছোট বোন। তিনজন প্রিয় মানুষকে হারিয়ে আমরা এখনও পৃথিবীর নিয়ম মেনে বেঁচে আছি। হাসি। কথা বলি। কাজ করি। মানুষের সঙ্গে মিশি। কিন্তু কিছু শূন্যতা মানুষকে দেখানো যায় না। রাতের নীরবতায়, কোনো পরিচিত গন্ধে, পুরোনো কোনো ছবিতে, হঠাৎ কোনো স্মৃতিতে বুকটা যখন হাহাকার করে ওঠে—সেই কষ্টটা শুধু আমরা দুই বোন জানি।
মানুষ বলে, সময় সব কষ্ট কমিয়ে দেয়। আমি তা বিশ্বাস করি না। সময় শুধু মানুষকে কষ্টটা সঙ্গে নিয়ে বাঁচতে শেখায়। আম্মু-আব্বু আমাদের ভালোবাসার কোনো সংজ্ঞা শিখিয়ে যাননি। তারা কোনো দিন বলেননি—‘আমরা একে অপরকে কতটা ভালোবাসি। ’ তাদের বলতে হয়নি। কারণ তাদের শেষ ২৪ ঘণ্টা আমাদের সব বলে দিয়েছে। ভালোবাসা হয়তো এটাই—একজন চলে গেলে অন্যজনের পৃথিবীটাও আর আগের মতো না থাকা।
আজ তাদের ৩৮তম বিবাহবার্ষিকী। আজ তাঁরা পৃথিবীর কোনো ঘরে পাশাপাশি বসে নেই। কোনো কেক নেই। কোনো ছবি নেই। কোনো শুভেচ্ছা জানানো নেই। তবুও আমি বিশ্বাস করতে চাই—কোথাও, কোনো এক অদৃশ্য পৃথিবীতে, তারা আবার পাশাপাশি আছেন। হয়তো আব্বু এখনও আম্মুর দিকে তাকিয়ে সেই প্রথম দিনের মতোই ভাবছেন—‘এই মানুষটাই তো। ’ আর আম্মু হয়তো আগের মতোই চুপচাপ তাঁর পাশে বসে আছেন।
কারণ তাদের ভালোবাসার গল্পের শেষ লাইন মৃত্যু লিখতে পারেনি। কিছু ভালোবাসা কবরের মাটির নিচেও বেঁচে থাকে। আমার আম্মু আর আব্বুর ভালোবাসা তেমনই। আর তাঁদের তিন মেয়ের মধ্যে আজ আমরা যে দুইজন বেঁচে আছি, আমাদের কাছে তাদের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার কোনো সম্পদ নয়, কোনো নাম নয়। তাদের ভালোবাসা। যে ভালোবাসা আমাদের শিখিয়েছে—ভালোবাসা মানে শুধু কাউকে পাওয়া নয়।
ভালোবাসা মানে, জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত একই মানুষকে নিজের মানুষ বলে ধরে রাখা। এমনভাবে ভালোবাসা, যেন মৃত্যুও দুজনকে আলাদা করতে না পারে। আমার আম্মু আর আব্বু ঠিক তেমনভাবেই ভালোবেসেছিলেন। আর তাই আজ, তাদের ৩৮তম বিবাহবার্ষিকীতে, পৃথিবীর কাছে আমার একটাই কথা—ভালোবাসলে এমনভাবে ভালোবাসুন, যেন একদিন আপনাদের গল্প শুনে কেউ চোখের পানি মুছে বলে— ‘হ্যাঁ, ভালোবাসা আসলে এমনই হয়।














