হাসি মানুষকে কাছে আনে এবং মন ভালো করে। তবে কখনো কখনো সেই হাসিই চোখে পানি এনে দেয়, যা কারও কারও ক্ষেত্রে কয়েক মিনিট ধরে গড়িয়ে পড়ে। এর পেছনে রয়েছে চোখের অশ্রুগ্রন্থি, স্বায়ত্তশাসিত স্নায়ুতন্ত্র এবং তীব্র আবেগের এক জটিল সমন্বয়।
হাসি শুধু আনন্দ প্রকাশের একটি স্বাভাবিক মাধ্যম নয়; এটি মানুষের সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে গবেষণায় দেখা গেছে, হাসির সঙ্গে মানসিক চাপ, হৃদ্‌স্পন্দন এবং শরীরের কিছু শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তনের সম্পর্ক রয়েছে। হাসি-উদ্দীপক বিভিন্ন হস্তক্ষেপ নিয়ে করা একটি মেটা-বিশ্লেষণেও মানসিক ও কিছু শারীরবৃত্তীয় স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাবের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
তবে প্রশ্ন হলো—খুব জোরে হাসতে হাসতে চোখ দিয়ে পানি পড়তে শুরু করে কেন? চোখের অশ্রু তৈরি হয় মূলত অশ্রুগ্রন্থিতে। চোখের পৃষ্ঠকে আর্দ্র রাখা, চোখকে সুরক্ষা দেওয়া এবং ধুলোবালি বা উত্তেজক পদার্থ ধুয়ে ফেলতে অশ্রু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অশ্রুগ্রন্থির কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে স্বায়ত্তশাসিত স্নায়ুতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে, বিশেষ করে প্যারাসিমপ্যাথেটিক স্নায়ুতন্ত্রের।
এর উদ্দীপনা অশ্রু নিঃসরণ বাড়াতে পারে। অত্যন্ত জোরে হাসার সময় মুখ, গলা, বুক ও শ্বাসপ্রশ্বাসের পেশিতে ব্যাপক নড়াচড়া হয়। চোখের চারপাশের পেশিতেও চাপ পড়ে। এর সঙ্গে আবেগের তীব্রতা এবং স্বায়ত্তশাসিত স্নায়ুতন্ত্রের পরিবর্তন যুক্ত হলে অশ্রুগ্রন্থি বেশি সক্রিয় হতে পারে। তখন অশ্রু উৎপাদনের হার চোখের অশ্রুনালির নিষ্কাশনক্ষমতার চেয়ে বেশি হয়ে যায়।
ফলে অশ্রু চোখের পাতা উপচে গাল বেয়ে নামতে শুরু করে। অর্থাৎ, হাসতে হাসতে চোখে পানি আসার অর্থ এই নয় যে মানুষটি দুঃখিত। বরং তীব্র আনন্দ বা উত্তেজনার সময়ও একই ধরনের অশ্রু প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া হাসি এবং কান্নাকে আমরা সাধারণত একেবারে বিপরীত দুটি আবেগ হিসেবে দেখি। একটি আনন্দের, অন্যটি দুঃখের। কিন্তু শরীরের প্রতিক্রিয়ার দিক থেকে বিষয়টি এতটা সরল নয়।
তীব্র আবেগের মুহূর্তে শরীরে একাধিক শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন ঘটে। হৃদ্‌স্পন্দন, শ্বাসপ্রশ্বাস এবং স্বায়ত্তশাসিত স্নায়ুতন্ত্রের কার্যক্রম বদলে যেতে পারে। একটি পরীক্ষামূলক গবেষণায় দেখা গেছে, হাসির ফলে স্বায়ত্তশাসিত স্নায়ুতন্ত্রে শক্তিশালী কিন্তু সাময়িক পরিবর্তন ঘটতে পারে। তাই প্রবল হাসির পর শরীর যখন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে থাকে, তখন অশ্রুপাতও সেই সামগ্রিক আবেগীয় ও শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়ার অংশ হতে পারে।
এদিকে মানুষের চোখের পানি এক ধরনের নয়। সাধারণভাবে অশ্রুকে তিন ভাগে দেখা হয়—চোখকে সবসময় আর্দ্র রাখার বেসাল অশ্রু, ধুলো বা বাতাসের মতো উদ্দীপনায় তৈরি প্রতিবর্তী অশ্রু এবং আবেগের সঙ্গে সম্পর্কিত অশ্রু। প্রচণ্ড হাসির সময় চোখে পানি আসার ক্ষেত্রে একাধিক প্রক্রিয়া একসঙ্গে কাজ করতে পারে। চোখের চারপাশে শারীরিক উদ্দীপনা, অতিরিক্ত পেশির সংকোচন এবং তীব্র আবেগ—সব মিলিয়ে অশ্রুপাত বাড়তে পারে।
তাই একে শুধু ‘আনন্দের অশ্রু’ বা শুধু ‘প্রতিবর্তী অশ্রু’ বলে ব্যাখ্যা করা সবসময় যথেষ্ট নয়। অশ্রুর রাসায়নিক গঠন কি সত্যিই আবেগভেদে বদলে যায়? এই বিষয়টি নিয়ে বহুদিন ধরেই মানুষের আগ্রহ রয়েছে। আবেগজনিত অশ্রু এবং প্রতিবর্তী অশ্রুর মধ্যে কিছু রাসায়নিক পার্থক্যের কথা বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। তবে ‘দুঃখের অশ্রুতে নির্দিষ্ট হরমোন বেশি’ কিংবা ‘কান্নার মাধ্যমে শরীর থেকে স্ট্রেস হরমোন বের হয়ে যায়’—এ ধরনের জনপ্রিয় দাবিগুলোকে সরল সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়।
বিশেষ করে কান্নার মাধ্যমে কর্টিসল বা অ্যাড্রেনালিন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে শরীর থেকে বের হয়ে যায় এবং এ কারণেই মানুষ স্ট্রেসমুক্ত হয়—এমন শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। একটি পরীক্ষায় কান্নার পর কর্টিসলের মাত্রায় প্রত্যাশিত হ্রাস পাওয়া যায়নি। গবেষকরা বরং কান্নার সঙ্গে হৃদ্‌স্পন্দন ও শ্বাসপ্রশ্বাসের পরিবর্তনের সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন।
অন্যদিকে, হাসি নিয়ে করা সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোতে হাসি-উদ্দীপক কার্যক্রমের সঙ্গে কর্টিসল কমার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। একটি মেটা-বিশ্লেষণে হাসি-উদ্দীপক হস্তক্ষেপের পর কর্টিসল গড়ে প্রায় ৩২ শতাংশ কমার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তবে এটিও মনে রাখা জরুরি—হাসি কোনো রোগের চিকিৎসার বিকল্প নয়। হাসির সঙ্গে হৃদ্‌যন্ত্র ও রক্তনালির কার্যক্রমের সম্পর্ক নিয়ে বেশ কিছু গবেষণা হয়েছে।
কিছু গবেষণায় হাসির পর রক্তনালির কার্যকারিতায় সাময়িক উন্নতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। আবার দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় নিয়মিত হাসার সঙ্গে কিছু জনগোষ্ঠীর রক্তচাপ ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকির সূচকের সম্পর্কও দেখা গেছে। তবে এসব ফলাফল থেকে সরাসরি বলা যায় না যে শুধু হাসলেই উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। অর্থাৎ, হাসি স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে—কিন্তু এটি চিকিৎসার বিকল্প নয়।
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে হাসির সঙ্গে অশ্রুপাত খুব সামান্য হয়, আবার কারও ক্ষেত্রে তা বেশ প্রবল হতে পারে। এর পেছনে ব্যক্তিভেদে আবেগের তীব্রতা, অশ্রুগ্রন্থির প্রতিক্রিয়া, চোখের অশ্রুনালির গঠন এবং স্নায়ুতন্ত্রের প্রতিক্রিয়ার পার্থক্য ভূমিকা রাখতে পারে। তাই কেউ যদি প্রচণ্ড হাসির সময় কয়েক মিনিট ধরে কাঁদেন, অথচ অন্য সময় চোখে অস্বাভাবিক পানি না আসে, সেটি অনেক ক্ষেত্রেই শরীরের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ার অংশ হতে পারে।
অবশ্যই, কখনো কখনো মানুষ অত্যন্ত অস্বস্তিকর, বিব্রতকর বা মানসিকভাবে চাপপূর্ণ পরিস্থিতিতেও হাসতে পারেন। একে সবসময় আনন্দের প্রকাশ হিসেবে দেখা ঠিক নয়। তীব্র আবেগের মুহূর্তে মানুষের শরীর এমন কিছু প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে, যা পরিস্থিতির সঙ্গে বাইরে থেকে পুরোপুরি মেলে না। তাই কোনো দুঃসংবাদ বা কঠিন পরিস্থিতিতে কাউকে হাসতে দেখা গেলেই ধরে নেওয়া উচিত নয় যে তিনি বিষয়টিকে হালকাভাবে নিচ্ছেন।
হাসি কখনো কখনো উত্তেজনা বা অস্বস্তি সামলানোর একটি অনৈচ্ছিক প্রতিক্রিয়াও হতে পারে। তবে এটিকে সবার ক্ষেত্রে একইভাবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই। শুধু হাসির সময় চোখে পানি আসা সাধারণত উদ্বেগের কারণ নয়। কিন্তু যদি হাসি ছাড়াও নিয়মিত অতিরিক্ত চোখ দিয়ে পানি পড়ে, চোখে ব্যথা বা লালভাব থাকে, দৃষ্টিতে পরিবর্তন আসে, চোখে কোনো কিছু আটকে থাকার অনুভূতি হয় কিংবা হঠাৎ অস্বাভাবিক অশ্রুপাত শুরু হয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
কারণ অতিরিক্ত অশ্রুপাতের পেছনে চোখের শুষ্কতা, অ্যালার্জি, চোখের প্রদাহ, অশ্রুনালির সমস্যাসহ বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে।














