আগুনের কালো ধোঁয়া, মরিচ পোড়া ও মুখরোচক নানা রুচির খাবারের গন্ধ এবং রান্নার সরঞ্জাম সাজিয়ে অফিসের ভেতরই চলছে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দাপ্তরিক কার্যক্রম। নথিপত্র, কম্পিউটার ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কাগজপত্রের পাশেই চলছে রান্নাবান্না।
কখনো গ্যাসের চুলায়, আবার কখনো রাইস কুকারে তৈরি করা হচ্ছে দুপুরের খাবার। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে এটি কোনো সরকারি দপ্তর নয়, যেন ছোটখাটো রান্নাঘর! না! আসলে তা মোটেও নয়। এটি হচ্ছে নওগাঁর বদলগাছী উপজেলা পরিষদ প্রশাসনিক ভবনের চতুর্থ তলায় উপজেলা যুব উন্নয়ন অফিসের ভেতরের বাস্তব চিত্র। অফিস কক্ষের এক পাশে গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র রাখা আলমিরা, অন্য পাশে দরজাবিহীন আলমিরা।
আর এসবের পাশেই চলছে রান্নার কাজ। এতে একদিকে যেমন অফিসের স্বাভাবিক পরিবেশ ও পরিচ্ছন্নতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, অন্যদিকে অগ্নিকাণ্ডসহ নানা দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জানা গেছে, উপজেলা যুব উন্নয়ন অফিসে অফিস প্রধানসহ মোট ছয়জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। অফিস পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য নিজেদের খরচে একজন নারীকে রাখা হয়েছে। তবে গত প্রায় তিন মাস ধরে ওই নারীকে দিয়ে অফিসের ভেতরেই কর্মচারীদের দুপুরের খাবার রান্না করানো হচ্ছে।
সরকারি ছুটির দিন ছাড়া প্রায় প্রতিদিনই চলে এই রান্নার আয়োজন। কখনো গ্যাসের চুলা, কখনো বৈদ্যুতিক রাইস কুকারে রান্না হচ্ছে খাবার। অথচ একই কক্ষে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক নথি ও আসবাবপত্র। রান্নার স্থানটির পেছনেই চলছে সরকারি দাপ্তরিক কার্যক্রম। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, একই তলায় রয়েছে উপজেলা মৎস্য অফিস ও মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়।
ফলে একটি কক্ষে আগুন বা বৈদ্যুতিক ত্রুটি থেকে দুর্ঘটনা ঘটলে তার প্রভাব আশপাশের দপ্তরেও পড়তে পারে। এ নিয়ে পাশের দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও অস্বস্তি রয়েছে। তবে চাকরির পরিবেশ ও সহকর্মীদের বিষয় বিবেচনায় প্রকাশ্যে কেউ কথা বলতে চাইছেন না। স্থানীয়রা বলছেন, জনগণ সরকারি সেবা নিতে এসে যে অফিসে প্রবেশ করেন, সেখানে রান্নার ধোঁয়া, খাবারের গন্ধ ও রান্নার সরঞ্জাম থাকার বিষয়টি কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়।
তাদের মতে, কর্মকর্তারা যদি স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খেতে চান, তাহলে বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে আসতে পারেন। কিন্তু সরকারি অফিসকে রান্নাঘর হিসেবে ব্যবহার করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। উপজেলা যুব উন্নয়ন অফিসের অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার অপারেটর মো. আব্দুল জলিল বলেন, আমরা অফিসের স্টাফরা মিলে দুপুরে খাওয়ার জন্য অফিসের ভেতরে রান্না করি।
বাড়িতে খেতে গেলে সময় লাগে এবং অফিসের কাজে ব্যাঘাত ঘটে। অফিসের ভেতরে রান্না করা ঠিক হচ্ছে কি না বলতে পারব না। তবে আমাদের কাছে খারাপ মনে হচ্ছে না। নিজেদের মতো করে রান্না করে খাওয়া হয়। বাইরের হোটেলের খাবার শরীরে সহ্য হয় না। গত তিন মাস ধরে কখনো গ্যাসে, আবার কখনো রাইস কুকারে রান্না করে খাওয়া হচ্ছে। বদলগাছী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা এস.এম. মাঝহারুল আলম বলেন, অফিসের স্টাফরা মিলে রান্না করে খাওয়া হয়।
আমাদের বয়স হয়েছে। হোটেলে খাওয়া কষ্টসাধ্য। যদি কারও সমস্যা হয়, তাহলে আগামীতে আর রান্না করাব না। তবে পাশের অফিসের বক্তব্যে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা ফারুক আহমেদ বলেন, যুব উন্নয়ন ও মহিলাবিষয়ক অফিস পাশাপাশি। ওই অফিসে রান্নার কাজ হয়। আসলে ওই অফিস তো আর হোটেল নয়। এভাবে কার্যক্রম চললে ঝুঁকিপূর্ণ তো বটেই।
বিষয়টি নিয়ে ভেবেছি। কিন্তু কিছু বলা কতটুকু যুক্তিসঙ্গত হবে, এই ভেবেই বলা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে বদলগাছী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইসরাত জাহান ছনি বলেন, ভবনের যুব উন্নয়ন অফিসটি চতুর্থ তলায়। ওই অফিসে রান্নার কাজ করা হয় কি না, আমার জানা নেই। তবে বিষয়টি দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারি অফিসে যেখানে গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র, কম্পিউটার, বৈদ্যুতিক সংযোগ ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত কার্যক্রম চলে, সেখানে রান্নার আগুন বা বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি কতটা গ্রহণযোগ্য—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সরেজমিনে তদন্ত করে অফিস কক্ষে রান্নার অনুমোদন আছে কি না, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর এবং গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র কতটা নিরাপদ—এসব খতিয়ে দেখে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।














