অভিজাত শ্রেণির ক্রেতা, বিশেষ করে বিলাসবহুল চাইনিজ রেস্টুরেন্ট, পর্যটনকেন্দ্রিক নামিদামি হোটেল-মোটেল ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের লক্ষ্য করে দৃষ্টিনন্দন বোতল ও আকর্ষণীয় মোড়কে উন্নতমানের পণ্যের আদলে তৈরি করা হচ্ছিল উচ্চমূল্যের বোতলজাত পানি।
বাইরে থেকে দেখে পণ্যগুলোকে স্বাস্থ্যসম্মত ও মানসম্পন্ন মনে হলেও ভেতরের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রয়োজনীয় কোনো বৈধ অনুমোদন ছাড়াই চলছিল এসব পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতের কার্যক্রম। গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআইয়ের তথ্যের ভিত্তিতে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে একটি অনুমোদনহীন পানীয় ও শিশুখাদ্য উৎপাদন কারখানায় অভিযান চালিয়েছেন জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত।
অভিযানে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বৈধ অনুমোদন ছাড়া পণ্য উৎপাদন, বাজারজাত এবং পণ্যের মোড়কে বিএসটিআইয়ের অনুমোদনহীন বা ভুয়া লোগো ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া যায়। পরে প্রতিষ্ঠানটিকে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা এবং কারখানাটি সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে। গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার মৌচাক এলাকার অদূরে দুর্গম ও গহীন বারাব এলাকায় ‘ট্রিপলি এ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ’ নামের প্রতিষ্ঠানটিতে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
অভিযানে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই), জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই), স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। অভিযানসংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতিষ্ঠানটিতে আকর্ষণীয় স্টিকারযুক্ত প্লাস্টিকের বোতলে পানি ভরে তা উন্নতমানের ও অভিজাত পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছিল।
উন্নত দেশগুলোতে উৎপাদিত বোতলজাত পানির আদলে বোতল ও মোড়ক তৈরি করে এসব পণ্য বাজারজাতের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব পানীয় দেশের বিভিন্ন অভিজাত হোটেল-মোটেল ও পর্যটনকেন্দ্রিক এলাকায় সরবরাহ করা হতো বলে অভিযানে তথ্য পাওয়া যায়। বিশেষ করে পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজারসহ বিভিন্ন এলাকার নামিদামি হোটেলে এসব বোতলজাত পানি বিক্রি করা হচ্ছিল বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. সালেহুর রহমান।
তবে অভিযানে শুধু বোতলজাত পানীয় উৎপাদনের বিষয়টিই সামনে আসেনি। একই প্রতিষ্ঠানে অনুমোদনহীনভাবে শিশুখাদ্য উৎপাদন ও বাজারজাতের অভিযোগও পাওয়া যায়। শিশুদের জন্য ব্যবহৃত খাদ্যপণ্য কোনো ধরনের বৈধ অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় মান নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে উৎপাদন করা হচ্ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। অভিযানের সময় আরও গুরুতর একটি বিষয় নজরে আসে।
প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদিত পণ্যের মোড়কে বিএসটিআইয়ের লোগো ব্যবহার করা হচ্ছিল। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এ লোগো ব্যবহারের জন্য প্রতিষ্ঠানের কোনো বৈধ অনুমোদন ছিল না। ফলে সাধারণ ক্রেতাদের কাছে পণ্যগুলোকে অনুমোদিত ও মানসম্মত হিসেবে উপস্থাপনের মাধ্যমে বিভ্রান্ত করার আশঙ্কা তৈরি হয়। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. সালেহুর রহমান বলেন, প্রতিষ্ঠানটির কোনো বৈধ অনুমোদন ছিল না।
আকর্ষণীয় স্টিকারযুক্ত প্লাস্টিকের বোতলে পানি ভরে তা বিভিন্ন নামিদামি ও উন্নতমানের হোটেলে বিক্রি করা হচ্ছিল। একই সঙ্গে অনুমোদনহীনভাবে শিশুখাদ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করা হচ্ছিল। পণ্যের মোড়কে বিএসটিআইয়ের অনুমোদনহীন বা ভুয়া লোগো ব্যবহারের অভিযোগও পাওয়া গেছে। এসব অনিয়মের কারণে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
পরবর্তী সময়ে অবৈধ উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ করতে কারখানাটি সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সূত্র ও অভিযানসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণত রাতের বেলায় উৎপাদন কার্যক্রম চালানোর কারণে আশপাশের মানুষের কাছে কারখানাটির প্রকৃত কার্যক্রম সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা ছিল না। বাইরে থেকে এটি সাধারণ একটি খাদ্য ও পানীয় উৎপাদন প্রতিষ্ঠান হিসেবে মনে হলেও অভিযান চালানোর পর সেখানে অনুমোদনহীনভাবে বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতের বিষয়টি সামনে আসে।
অভিযানসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আকর্ষণীয় বোতল, উন্নতমানের মোড়ক ও পরিচিত প্রতিষ্ঠানের আদলে প্যাকেজিং ব্যবহার করে কোনো পণ্যকে মানসম্মত প্রমাণ করা যায় না। বিশেষ করে শিশুদের খাদ্যপণ্য ও পানীয়ের ক্ষেত্রে অনুমোদন, মান নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপদ উৎপাদন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে অনুমোদনহীন উৎপাদন ভোক্তাদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
গাজীপুর জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালতের এ অভিযানকে অবৈধ খাদ্য ও পানীয় উৎপাদনের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে জেলার বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় এ ধরনের অনুমোদনহীন কারখানা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত রাখার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন তারা।















