গ্যাস, কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়রিয়াসহ নানা ধরনের হজমের সমস্যা বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষকে ভোগায়। বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোতে প্রায় ১৫ শতাংশ মানুষ ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম (আইবিএস) নামের অন্ত্রের সংবেদনশীলতাজনিত সমস্যায় আক্রান্ত। খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন হজমশক্তি ভালো রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু খাবার অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে এবং সাধারণ গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সমস্যার ঝুঁকি কমাতে পারে। আস্ত শস্য সাদা চাল নাকি বাদামি চাল? সাদা পাউরুটি নাকি হোল-হুইট পাউরুটি— এমন প্রশ্নের উত্তরে পুষ্টিবিদরা সাধারণত আস্ত শস্য বা হোল গ্রেইন বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেন। আস্ত শস্যে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার থাকে, যা কোলনের স্বাভাবিক কার্যকারিতা বজায় রাখতে সহায়তা করে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন অন্তত ২৫ গ্রাম ফাইবার গ্রহণ করা উপকারী। সাদা পাউরুটি ও পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেটের তুলনায় আস্ত শস্য শুধু ফাইবারই দেয় না, বরং ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদানও সরবরাহ করে। অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়া যখন ফাইবার ভাঙে, তখন শর্ট-চেইন ফ্যাটি অ্যাসিড তৈরি হয়, যা কোলনের কোষগুলোর কার্যকারিতা বাড়াতে সাহায্য করে। ওজন কমানোর জন্য অনেকেই কম-কার্বোহাইড্রেট খাদ্য বেছে নেন। তবে শস্যজাতীয় খাবার পুরোপুরি বাদ দেওয়া অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে, কারণ এসব ব্যাকটেরিয়া ফাইবারের ওপর নির্ভরশীল। সবুজ শাকসবজি পালং শাক, কেলসহ সবুজ শাকসবজি ফাইবারের ভালো উৎস। এতে রয়েছে ফোলেট, ভিটামিন সি, ভিটামিন কে এবং ভিটামিন এ-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান। গবেষণায় দেখা গেছে, সবুজ শাকসবজিতে থাকা বিশেষ ধরনের শর্করা অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। নিয়মিত ফাইবারসমৃদ্ধ সবজি খেলে অন্ত্রে একটি স্বাস্থ্যকর মাইক্রোবায়োম তৈরি হতে পারে। এই মাইক্রোবায়োমে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন অণুজীব বসবাস করে, যা শরীরের নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজে ভূমিকা রাখে। অন্ত্র ও মস্তিষ্কের সম্পর্ক অনেক সময় আমরা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ‘অন্তরের কথা’ শুনি বা উদ্বেগের সময় পেটে অস্বস্তি অনুভব করি। এর পেছনে রয়েছে অন্ত্র ও মস্তিষ্কের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। পরিপাকতন্ত্রের ভেতরে থাকা স্নায়ুতন্ত্রকে অনেক সময় শরীরের ‘দ্বিতীয় মস্তিষ্ক’ বলা হয়। এটি হজম, মেজাজ, স্বাস্থ্য এমনকি চিন্তাভাবনার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। আইবিএস বা অন্ত্রের সংবেদনশীলতা থাকলে চর্বিহীন প্রোটিন খাওয়া এবং অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার, বিশেষ করে ভাজাপোড়া খাবার এড়িয়ে চলা ভালো। কম ফ্রুক্টোজযুক্ত ফল যাদের গ্যাস ও পেট ফাঁপার সমস্যা বেশি, তাদের ফল বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও সতর্ক হওয়া উচিত। আপেল, নাশপাতি ও আমের মতো কিছু ফলে ফ্রুক্টোজের পরিমাণ বেশি থাকায় অনেকের ক্ষেত্রে অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে, বেরি জাতীয় ফল, কমলা ও জাম্বুরার মতো সাইট্রাস ফলে ফ্রুক্টোজ তুলনামূলক কম থাকে। এগুলো সহজে হজম হয় এবং গ্যাসের সমস্যা কম তৈরি করতে পারে। কলাও কম ফ্রুক্টোজযুক্ত একটি ফল। এতে রয়েছে প্রচুর ফাইবার ও ইনুলিন, যা অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। পুষ্টিগুণে ভরপুর খাবার অ্যাভোকাডোকে অনেকেই সুপারফুড হিসেবে বিবেচনা করেন। এতে রয়েছে প্রচুর ফাইবার, পটাশিয়াম এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান, যা স্বাস্থ্যকর হজম প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে পারে। এটি কম ফ্রুক্টোজযুক্ত খাবার হওয়ায় অনেকের ক্ষেত্রে গ্যাসের সমস্যা কম হতে পারে। তবে অ্যাভোকাডো ও বাদামের মতো স্বাস্থ্যকর খাবারেও চর্বির পরিমাণ বেশি থাকে। তাই উপকারী হলেও এগুলো পরিমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত। সুস্থ অন্ত্রের জন্য খাদ্যাভ্যাসে ভারসাম্য জরুরি শুধু একটি খাবার নয়, বরং বৈচিত্র্যময় ও ভারসাম্যপূর্ণ খাদ্যাভ্যাসই সুস্থ হজমের মূল চাবিকাঠি। পর্যাপ্ত ফাইবার, স্বাস্থ্যকর শস্য, সবুজ শাকসবজি ও সঠিক পরিমাণে স্বাস্থ্যকর চর্বি গ্রহণ করলে অন্ত্রের কার্যকারিতা ভালো রাখা সম্ভব।
শিরোনাম :

























