চোখের একটি নীরব ঘাতক রোগ হলো গ্লুকোমা। প্রাথমিক পর্যায়ে অনেকেরই এ রোগের কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। ধীরে ধীরে দৃষ্টিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকায় রোগী অনেক সময় বুঝতেই পারেন না যে তার চোখে গুরুতর সমস্যা তৈরি হয়েছে।
সময়মতো শনাক্ত ও চিকিৎসা না হলে গ্লুকোমা স্থায়ী অন্ধত্বের কারণ হতে পারে। গ্লুকোমা কী? গ্লুকোমা এমন একটি চোখের রোগ, যাতে চোখের সঙ্গে মস্তিষ্কের সংযোগকারী অপটিক স্নায়ু ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চোখের ভেতরের তরল ঠিকমতো বের হতে না পারলে চোখের অভ্যন্তরীণ চাপ বেড়ে যেতে পারে। দীর্ঘদিন এ চাপ বা অন্যান্য কারণে অপটিক স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হলে দৃষ্টিশক্তি কমতে থাকে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, গ্লুকোমার প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত তেমন কোনো উপসর্গ থাকে না। ফলে অনেকেই রোগটি শনাক্ত হওয়ার আগেই দৃষ্টিশক্তির একটি অংশ হারিয়ে ফেলেন। কী কী লক্ষণ দেখা দিতে পারে? রোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে চোখের পাশের বা কিনারার দৃষ্টিশক্তি কমে যেতে পারে। এ পরিবর্তন অনেক সময় রোগী সহজে বুঝতে পারেন না। পরে দেখা দিতে পারে— ঝাপসা দেখা বা পরিষ্কার দেখতে সমস্যা হওয়া।
আলোর চারপাশে রঙিন বা রংধনুর মতো বৃত্ত দেখা। চোখে ব্যথা ও চোখ লাল হয়ে যাওয়া। তীব্র মাথাব্যথা। বমি ভাব বা বমি। হঠাৎ তীব্র চোখের ব্যথা। চোখ লাল হয়ে যাওয়া। ঝাপসা দেখা ও বমির মতো উপসর্গ একসঙ্গে দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। গ্লুকোমার ধরন প্রাইমারি ওপেন-অ্যাঙ্গেল গ্লুকোমা: গ্লুকোমার সবচেয়ে প্রচলিত ধরন। চোখের তরল নিষ্কাশনের পথে ধীরে ধীরে সমস্যা তৈরি হওয়ায় দীর্ঘ সময় ধরে রোগটি বিকশিত হতে পারে।
অ্যাকিউট অ্যাঙ্গেল-ক্লোজার গ্লুকোমা: তুলনামূলক কম দেখা গেলেও এটি দ্রুত গুরুতর অবস্থার সৃষ্টি করতে পারে। চোখের তরল নিষ্কাশনের পথ হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে চোখের ভেতরের চাপ দ্রুত বেড়ে যায়। সেকেন্ডারি গ্লুকোমা: চোখের অন্য কোনো রোগ, আঘাত, প্রদাহ বা নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের কারণে এ ধরনের গ্লুকোমা হতে পারে। কনজেনিটাল গ্লুকোমা: এটি বিরল।
জন্মগত চোখের ত্রুটির কারণে শিশুদের মধ্যে এ সমস্যা দেখা দিতে পারে। কারা বেশি ঝুঁকিতে? বয়স বাড়ার সঙ্গে গ্লুকোমার ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে ৪০ বছর বয়সের পর নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করানো গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া পরিবারে বাবা-মা, ভাই-বোন বা ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের গ্লুকোমার ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। ডায়াবেটিস, চোখের দৃষ্টির বিভিন্ন ত্রুটি এবং চোখে আগে কোনো আঘাত বা রোগের ইতিহাস থাকলেও গ্লুকোমার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এশীয়, আফ্রিকান ও ক্যারিবীয় বংশোদ্ভূত মানুষের মধ্যেও কিছু ধরনের গ্লুকোমার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। কীভাবে শনাক্ত ও চিকিৎসা করা হয়? গ্লুকোমা শনাক্ত করতে চক্ষু বিশেষজ্ঞ বিভিন্ন পরীক্ষা করতে পারেন। এসব পরীক্ষার মাধ্যমে চোখের অভ্যন্তরীণ চাপ, অপটিক স্নায়ু এবং দৃষ্টিক্ষেত্রের অবস্থা মূল্যায়ন করা হয়। গ্লুকোমার কারণে একবার দৃষ্টিশক্তি স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে গেলে তা সাধারণত ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
তবে দ্রুত রোগ শনাক্ত করে চিকিৎসা শুরু করা গেলে দৃষ্টিশক্তির আরও অবনতি ঠেকানো সম্ভব। রোগের ধরন ও মাত্রা অনুযায়ী চিকিৎসক চোখের ড্রপ, লেজার চিকিৎসা কিংবা অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দিতে পারেন। সচেতনতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্লুকোমার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো—লক্ষণ প্রকাশের আগেই এটি দৃষ্টিশক্তির ক্ষতি করতে পারে। তাই বয়স, পারিবারিক ইতিহাস বা অন্য কোনো ঝুঁকি থাকলে নিয়মিত চক্ষু পরীক্ষা করা উচিত।
চোখের দৃষ্টিতে কোনো পরিবর্তন, হঠাৎ ব্যথা, চোখ লাল হওয়া বা ঝাপসা দেখার মতো উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কারও গ্লুকোমা শনাক্ত হলে পরিবারের অন্য সদস্যদেরও চোখ পরীক্ষা করানো উপকারী হতে পারে।



















