ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলেই যে প্রচলিত জ্বর, মাথাব্যথা বা শরীর ব্যথার মতো লক্ষণ দেখা যাবে এমনটা সব সময় নয়। চলতি মৌসুমে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে তুলনামূলক ভিন্ন উপসর্গ দেখা যাচ্ছে। ফলে ডেঙ্গু সন্দেহ না হওয়ায় অনেকে চিকিৎসা নিতে দেরি করছেন।
এতে জটিলতা বাড়ার পাশাপাশি মৃত্যুঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া রোগীদের বড় একটি অংশ হাসপাতালে ভর্তির পর প্রথম কয়েক দিনের মধ্যেই মারা গেছেন। তাই ডেঙ্গুর পরিবর্তিত উপসর্গ সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং ঝুঁকিপূর্ণ লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়া জরুরি। কেন উপসর্গে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, চলতি মৌসুমে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের অনেকেই এর আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। আগে এক ধরনের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার পর পরবর্তী সময়ে ভিন্ন ধরনের সংক্রমণ হলে রোগের প্রকাশ ও জটিলতায় পার্থক্য দেখা দিতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে ডেঙ্গুর পাশাপাশি বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গে জটিলতা তৈরি হতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ ধরনের অবস্থাকে জটিল বা এক্সটেনডেড ডেঙ্গু সিনড্রোম হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
যেসব উপসর্গ অবহেলা করবেন না দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া : টানা তিন-চার দিন ডায়রিয়া চলতে থাকলে এবং সাধারণ চিকিৎসায় অবস্থার উন্নতি না হলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে জ্বর ছাড়াও ডায়রিয়ার মতো উপসর্গের মাধ্যমে ডেঙ্গু শনাক্ত হতে পারে। জ্বর না থাকাও সম্ভব : ডেঙ্গু মানেই উচ্চ জ্বর—এ ধারণা সব ক্ষেত্রে সঠিক নয়।
কারও ক্ষেত্রে সামান্য জ্বর হয়ে তা দ্রুত সেরে যেতে পারে, আবার কোনো কোনো রোগীর জ্বর নাও থাকতে পারে। তাই জ্বর না থাকলে ডেঙ্গুর সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া ঠিক নয়। বারবার বমি : জ্বরের সময় বা জ্বর কমে যাওয়ার পরও যদি ঘন ঘন বমি হতে থাকে এবং তা নিয়ন্ত্রণে না আসে, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। তীব্র মাথাব্যথা ও স্নায়বিক সমস্যা : প্রচণ্ড মাথাব্যথা, ঘাড় বা হাত-পা শক্ত হয়ে যাওয়া, খিঁচুনি কিংবা আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তনের মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।
হাত-পা বা শরীর ফুলে যাওয়া : শরীরের কোনো অংশ অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যাওয়া ডেঙ্গুর জটিলতার ইঙ্গিত হতে পারে। এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি। বুক বা পেটে পানি জমা : ডেঙ্গু গুরুতর পর্যায়ে গেলে শরীরের বিভিন্ন স্থানে তরল জমার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। শ্বাসকষ্ট, পেট ফুলে যাওয়া বা অস্বস্তি হলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।
তীব্র পেটব্যথা : পেটে অসহনীয় বা ক্রমাগত ব্যথা ডেঙ্গুর সতর্কসংকেত হতে পারে। বিশেষ করে জ্বর কমার সময় এ ধরনের ব্যথা দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। এসব উপসর্গ এককভাবে কিংবা একাধিক লক্ষণ একসঙ্গে দেখা দিতে পারে। তাই ডেঙ্গু মৌসুমে শরীরে অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। কেন জটিলতা বাড়ছে?
ডেঙ্গুর সাধারণত তিনটি পর্যায় রয়েছে— জ্বরের পর্যায়, গুরুতর বা ক্রিটিক্যাল পর্যায় এবং সুস্থ হওয়ার পর্যায়। জ্বর কমে যাওয়ার পর অনেক রোগী মনে করেন তিনি সুস্থ হয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে এই সময়েই রোগী ক্রিটিক্যাল পর্যায়ে প্রবেশ করতে পারেন। এ পর্যায়ে বারবার বমি, রক্তচাপ কমে যাওয়া, শরীরে তরলের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া এবং বিভিন্ন অঙ্গের কার্যকারিতা ব্যাহত হওয়ার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।
পরিস্থিতি গুরুতর হলে নিবিড় পরিচর্যা বা আইসিইউ সাপোর্টের প্রয়োজন হতে পারে। কখন দ্রুত হাসপাতালে যাবেন? ডেঙ্গুর মৌসুমে জ্বর থাকুক বা না থাকুক, তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক রক্তপাত, প্রচণ্ড দুর্বলতা, হাত-পা বা শরীর ফুলে যাওয়া, খিঁচুনি কিংবা চেতনায় পরিবর্তনের মতো লক্ষণ দেখা দিলে অপেক্ষা না করে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।
ডেঙ্গু সন্দেহ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো উচিত। বিশেষ করে জ্বর কমে যাওয়ার পরও রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর নজর রাখা জরুরি। সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা গেলে গুরুতর জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।



















