পা নেই তো কি হইছে, আল্লাহ হাত দুইখান তো এখনো ভালো রাইখছে। এই হাত দিয়াই কাজ কইরা খাই, সংসার চালাই, কারুর কাছে হাত পাতি না।’ মনে চাপা কষ্ঠ থাকলেও অনেক দৃঢ়তা নিয়ে কথাগুলো বললেন শারীরিক প্রতিবন্ধী আলাউদ্দিন মন্ডল। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার দুর্গানগর ইউনিয়নের রাউতান গ্রামের দিনমজুর সোবাহান মন্ডলের ছেলে আলাউদ্দিন। ভৌগোলিক কারণে চলনবিল বেষ্ঠিত নিচু এলাকায় তার গ্রামের অবস্থান। পাশাপাশি রয়েছে ভাটবেড়া ও নন্দীবেড়া গ্রাম। বছরের বেশির ভাগ সময় এসব গ্রামে পানি থাকে। গ্রামের লোকজনকে বাইরে যেতে নৌকায় করে পাশের উঁচু সড়কে আসতে হয়। আলাউদ্দিন তার ডিঙ্গি নৌকায় করে এসব গ্রামের লোকজনকে পারাপার করেন। নৌকার আয় দিয়েই তার স্ত্রী, দুই ছেলে মেয়েসহ ৪ সদস্যের পরিবার পরিচালানা করেন। শুধু দুই হাতে ভর করে চলছে তার জীবন সংগ্রাম। আলাউদ্দিনের সঙ্গে কথা হলে তিনি শোনালেন তার দুঃসহ জীবন কাহিনি। ১৩ বছর বয়সে তিনি পোলিও রোগে আক্রান্ত হন। বাবা সোবাহান মন্ডল তার চিকিৎসার জন্য ৩৫ শতক ফসলি জমি বিক্রি করে চিকিৎসা করান। কিন্তু তাতে কোনো ফল হয়নি। তার পা দুটি আস্তে আস্তে অবশ হয়ে যায়। শিশুবেলায় গ্রামের গণশিক্ষা কেন্দ্রে কিছুদিন পড়ালেখা করে নিজের স্বাক্ষরটা করতে শিখেন। তার পরে আর এগোতে পারেননি। তারা সাত ভাই। ভাইয়েরা বিয়ে করে সবাই আলাদা হয়ে যান। আমাকে নিয়ে চরম বিপদে পড়েন মা-বাবা। আমি এ অবস্থায় বাবার ঘাড়ে বোঝা হয়ে আর বেশি দিন থাকতে পারিনি। মনে মনে ঠিক করলাম হাত দুটি যখন সচল আছে তখন কাজ করে খাব। প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় বৈঠা দিয়ে নৌকা চালানো শিখলাম। বাবা অনেক কষ্টে ধার দেনা করে একটা ডিঙ্গি নৌকা বানিয়ে দেন। সেই নৌকা দিয়েই আমার কর্মজীবন শুরু। দু’হাত দিয়েই উল্লিখিত ৩টি গ্রামের মানুষকে নৌকায় পারাপার করতে শুরু করি। প্রথম দিকে যে যা দিতেন তাই নিয়েই চলতাম। পরবর্তীতে দুরত্ব অনুযায়ী ৩ থেকে ৫ টাকা করে ভাড়া নির্ধারণ করেছি। এখন লোকজন সেই ভাড়াটাই আমাকে দেন। তবে অভাবি পরিবারের লোকজনের কাছ থেকে তিনি কোনো ভাড়া নেন না। সারা দিন শুধু দু’হাতের সাহায্যে নৌকা চালিয়ে ২৫০-৩০০ টাকা পর্যন্ত আয় রোজগার হয়। এতে কোনোমতে চলে সংসার। বাবার দেওয়া নৌকাটি ভেঙে গেলে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের বাসিন্দা পরিবেশবাদী ব্যক্তিত্ব মামুন বিশ্বাস বছর ৫ আগে তার অবস্থা জেনে তাকে একটি নৌকা কিনে দিয়েছিলেন। ওই নৌকাটিই এখন চালাই। এই নৌকারও এখন নিচের অংশের অনেক জায়গায় কাঠ পচে গেছে। নৌকা দিয়ে পানি ওঠে। আমার পক্ষে বার বার পানি সেচাও খুব কষ্টকর। তারপরেও সেচতে হয়। ৫০ বছর পেরিয়ে গেছে বয়স। এখন আর আগের মতো হাত চলে না। একটি ইঞ্চিন চালিত নৌকার ব্যবস্থা হলে তিনি এক দিকে যেমন বৈঠা বওয়া থেকে মুক্ত হতেন। পাশাপাশি তার আয় রোজগারও বেশি হতো। কিন্তু ইঞ্চিনচালিত নৌকা কেনার সামর্থ নেই তার। স্থানীয় স্কুল শিক্ষক ইন্দ্রজিত কুমার চক্রবর্তী জানান, দু’হাতের ওপর ভর করেই চলছে এখন তার করুণ জীবন সংগ্রাম। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকলেও একটা মানুষ ইচ্ছে করলে সৎ পথে কাজ করে খেতে পারে,- আলাউদ্দিন এর উদাহরণ। স্থানীয় ইউপি সদস্য ইসরাফিল হোসেন টুটুল বলেন, আলাউদ্দিন অত্যন্ত সৎ ও কর্মঠ মানুষ। পা দুটি না অবশ হলেও শুধু হাত দিয়েই নৌকা চালিয়ে জীবন জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। কারো ওপর নির্ভরশীল নয় সে। তার এ অবস্থা দেখে কষ্ট হয়। ওর জন্য ইঞ্জিনচালিত একটি ছোট নৌকার ব্যবস্থা করতে পারলে প্রকৃতই সে উপকৃত হতো।
5:02 pm, Saturday, 1 August 2026
শিরোনাম :
পাহীন দুই হাতেই চলে আলাউদ্দিনের জীবন সংগ্রাম
-
MIT ERP
- Update Time : 03:46:20 pm, Saturday, 1 August 2026
- 4
Tag :
Popular Post

























