ঋতু পরিবর্তনের আবর্তে সুনিপুণভাবে পাল্টে যাচ্ছে প্রকৃতির রূপ। কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে আসছে শীত। প্রকৃতিতে শীতের এই আগমনী বার্তা যেমন একদল মানুষের মনে রোমাঞ্চ জাগায়, তেমনই অনেকের কপালে ফেলে চিন্তার ভাঁজ।
কারণ শীত আসার সাথে সাথেই আমাদের দেশে এক ধরনের চর্মরোগ বা ত্বকের নানান জটিলতা ও শুষ্কতা দেখা দেয়। শীতকালীন শুষ্ক হাওয়ায় বাতাসের আর্দ্রতা কমে যাওয়ায় আমাদের ত্বক তার স্বাভাবিক তৈলাক্ত ভাব বা সেবাম হারাতে শুরু করে। ফলে ত্বক হয়ে পড়ে খসখসে, প্রাণহীন এবং কালচে। এই সময়ে সঠিকভাবে যত্ন না নিলে একজিমা, সোরিয়াসিস, চুলকানি, ঠোঁট ও পা ফাটার মতো চর্মরোগ প্রকট আকার ধারণ করতে পারে।
শীতের এই রুক্ষ দিনগুলোতেও কীভাবে আপনার ত্বকের স্বাস্থ্য ভালো রাখা যায় এবং ত্বককে লাবণ্যময় ও সতেজ রাখা সম্ভব, তা নিয়ে আজ কিছু জানাতে চা্ই। বলতে পারেন সেয়ার করছি সবার সাথে। মনে রাখবেন শীতকালে সঠিক নিয়মে ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করতে হবে। শীতকালে হালকা লোশনের চেয়ে ঘন ক্রিম বা পেট্রোলিয়াম জেলি ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে বেশি কার্যকরী।
গোসল বা মুখ ধোয়ার পর ত্বক হালকা ভেজা থাকতেই (৩ মিনিটের মধ্যে) ময়েশ্চারাইজার লাগান। দেখবেন, এতে ত্বকের ভেতরের আর্দ্রতা লক হয়ে যাবে। তবে, একটা কথা মনে রাখবেন, ময়েশ্চারাইজার কেনার সময় সিরামাইড, হায়ালুরোনিক অ্যাসিড এবং গ্লিসারিনযুক্ত প্রোডাক্ট বেছে নিতে হবে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে গোসলের সময় সচেতনতা। শীতের সকালে গরম পানিতে গোসল আরামদায়ক হলেও তা ত্বকের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
প্রয়োজনে কুসুম কুসুম গরম পানি ব্যবহার করবেন। অতিরিক্ত গরম পানি ত্বকের প্রাকৃতিক তেল ধুয়ে ফেলে। তাই সবসময় কুসুম কুসুম গরম পানি ব্যবহার করুন এবং গোসলের সময় ১০ মিনিটের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখুন। একইসাথে ক্ষারযুক্ত সাবান পরিহার করে মৃদু বা গ্লিসারিনসমৃদ্ধ সোপ-ফ্রি ক্লিনজার ব্যবহার করুন। আর হ্যাঁ। দয়া করে সানস্ক্রিন বাদ দেবেন না।
অনেকেই মনে করেন শীতে রোদের তীব্রতা কম, তাই সানস্ক্রিনের প্রয়োজন নেই। এটি একটি ভুল ধারণা। শীতের মেঘলা আকাশেও ক্ষতিকর আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি ত্বকের ক্ষতি করে এবং অকাল বার্ধক্যের কারণ হয়। তাই ঘরের বাইরে যাওয়ার অন্তত ১৫-২০ মিনিট আগে অবশ্যই এসপিএফ ৩০ বা তার বেশি মাত্রার সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন। এই সময়টাতে কিন্তু ঠোঁট ও পায়ের বিশেষ যত্ন নিতে ভুলবেন না।
শীতের বাতাসে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ঠোঁট এবং পায়ের গোড়ালি। ঠোঁট বারবার জিব দিয়ে ভেজাবেন না, এতে ঠোঁট আরও বেশি ফাটবে। প্রয়োজনে ভালো মানের লিপবাম বা ভেসলিন ব্যবহার করুন। রাতে পায়ে ঘন ক্রিম বা ভেসলিন লাগিয়ে সুতি মোজা পরে ঘুমানোর অভ্যাস করুন। আরও মনে রাখবেন, অভ্যন্তরীণ আর্দ্রতা ও সুষম খাদ্য একান্ত দরকার। বাইরের যত্নের পাশাপাশি শরীরকে ভেতর থেকে হাইড্রেটেড রাখা সমান গুরুত্বপূর্ণ।
শীতে তৃষ্ণা কম লাগলেও দিনে অন্তত ৮-১০ গ্লাস পানি পান করুন। খাদ্যতালিকায় ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ খাবার (যেমন- মাছ, বাদাম) এবং ভিটামিন-সি ও ই যুক্ত শীতকালীন ফল ও রঙিন শাকসবজি রাখুন। এগুলো ত্বকের কোষ পুনর্গঠনে সাহায্য করে। আরেকটা কথা। শীতের এই সময়ে ত্বকে যেকোনো তীব্র চুলকানি, র‍্যাশ বা সংক্রমণ দেখা দিলে নিজে নিজে কোনো ওয়ান্টমেন্ট বা স্টেরয়েড ব্যবহার না করে সরাসরি একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কেননা, একটু সচেতনতা এবং নিয়মিত সঠিক যত্নই পারে এই শীতেও আপনার ত্বকের লাবণ্য ও উজ্জ্বলতা অক্ষুণ্ন রাখতে। ডা. জাকিয়া ফেরদৌসী খান প্রভাষক, ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা।






















