ঢাকার নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর একটি বড় অংশের রান্নাঘরে এখন আর আস্ত গ্যাস সিলিন্ডার ঢুকছে না। সরকারি দরের তোয়াক্কা না করে কারসাজির মাধ্যমে এলপিজি বা লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাসের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে নিয়ে গেছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
ফলে রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের শ্রমজীবী মানুষের পাড়া-মহল্লায় গোপনে গড়ে উঠেছে এক বিপজ্জনক চক্র, যা পরিচিতি পেয়েছে ‘ক্রস-ফিলিং’ বা ‘লাইটার মহামারি’ নামে। পুরো ১২ কেজির সিলিন্ডার কেনার সামর্থ্য হারিয়ে মানুষ এখন বাধ্য হয়ে মহল্লার মোড়ের দোকান থেকে তেল চিনি কেনার মতো ১ কেজি, ২ কেজি কিংবা ৫ কেজির ছোট জারে বা গ্যাসলাইটারের মতো করে এলপিজি রিফিল করে নিচ্ছেন।
ফায়ার সার্ভিসের মতে, যথাযথ সুরক্ষানীতি ছাড়া জনবসতিপূর্ণ এলাকায় এই অবৈধ রিফিলিং একেকটি জীবন্ত টাইমবোমা, যা যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের ট্র্যাজেডি ডেকে আনতে পারে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কর্মকর্তারা বলছেন, আইন অনুযায়ী অনুমোদিত এলপিজি প্ল্যান্ট ছাড়া বাইরে গ্যাস সিলিন্ডার রিফিল করা সম্পূর্ণ অবৈধ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
এ ছাড়া এর ভয়াবহতার দিক হচ্ছে, লিকুইড গ্যাস এক পাত্র থেকে অন্য পাত্রে নেওয়ার সময় সামান্য ঘর্ষণ বা আগুনের স্ফুলিঙ্গ থেকে পুরো এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে পারে। এই ছোট ছোট সিলিন্ডারের কোনো প্রেসার টেস্ট বা মান নিয়ন্ত্রণ সার্টিফিকেট থাকে না। ফলে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এগুলো একেকটি চলমান বোমা। বিস্ফোরক পরিদপ্তরের প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক সত্যজিৎ ঘোষ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, অলিগলিতে অননুমোদিতভাবে গ্যাস রিফিল করা অবৈধ।
এলপিজি সিলিন্ডার সঠিকভাবে হ্যান্ডল বা পরিচালনা না করা গেলে এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। অনেক সময় সিলিন্ডার সরাসরি বিস্ফোরিত না হলেও এই ধরনের অবৈধ ও ত্রুটিপূর্ণ স্থানান্তরের কারণে সিলিন্ডার থেকে চুলা পর্যন্ত সংযোগকারী পাইপ বা ভালভে সূক্ষ্ম লিক তৈরি হয়। সেই লিকেজ থেকে বদ্ধঘরে বা দোকানে গ্যাস জমা হয়, যা পরে সামান্য স্পার্ক বা দেশলাইয়ের কাঠি জ্বালাতেই ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটায়।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থনৈতিক চরম অসহায়ত্ব আর তদারকি সংস্থার উদাসীনতার সুযোগে রাজধানীতে এই অদৃশ্য সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সরকার এলপিজির দাম নির্ধারণ করে দিলেও মাঠপর্যায়ে কোনো নজরদারি নেই। এলপিজি এখন আর বিলাসী পণ্য নয়, এটি মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক উপাদান। সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে এই অবৈধ ক্রস-ফিলিং ব্যবসা আরও জমজমাট হয়ে উঠবে।
এই অপকর্ম বন্ধ না হলে ঢাকায় বড় ধরনের অগ্নিদুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়তেই থাকবে। বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, এই অনৈতিক আর অবৈধ ব্যবসার ভেতরেও আবার রয়েছে আরেক অবৈধ কারবার। রিফিলিং স্পটগুলোয় সিলিন্ডারে ওজনে কম দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া সিলিন্ডারের ওজন বাড়াতে ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে লোনা পানি। লাইটার মহামারি ও ক্রস-ফিলিংয়ের আন্ডারওয়ার্ল্ড ব্যবসা নিয়ে রাজধানীর কুড়িল এলাকার ব্যবসায়ী শের আলী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, একটি ১২ কেজির সিলিন্ডার আড়াই হাজার টাকা দিয়ে একবারে কেনার সামর্থ্য অনেকেরই নেই; বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের।
গরিবদের এই সমস্যার কথা ভেবেই তারা কোনো রকম অনুমোদন বা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা ছাড়াই বড় সিলিন্ডার উপুড় করে পাইপের মাধ্যমে ছোট সিলিন্ডারে গ্যাস স্থানান্তর করছেন। একে বলা হচ্ছে ‘ক্রস-ফিলিং’। ১ কেজি গ্যাস খুচরা বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ২২০ টাকায়। অর্থাৎ, ভেঙে ভেঙে ১২ কেজি কিনতে সাধারণ মানুষের খরচ হচ্ছে ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৬৪০ টাকার মতো।
গরিব মানুষ একবারে টাকা দিতে না পারায় প্রতি সিলিন্ডারে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা বেশি দিয়ে তাদের কাছ থেকে এভাবে গ্যাস নিচ্ছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বিইআরসি বা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন প্রতি মাসের শুরুতে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রোপেন ও বিউটেনের দামের ওপর ভিত্তি করে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে দেয়।
কিন্তু সরকারি সেই দর কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। বাস্তবে যেটা দেখা যায়, আইনের তোয়াক্কা না করে আমদানিকারক থেকে শুরু করে লোকাল ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের একটি সমন্বিত ‘সিন্ডিকেট’ কৃত্রিম সংকট তৈরি করে এলপিজির দাম নিয়ন্ত্রণ করছে। এ কারণেই এলপিজির বাজার এত চড়া। বিশ্লেষকদের মতে, চলতি অক্টোবর মাসেই বিইআরসি ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করলেও ঢাকার কারওয়ান বাজার, যাত্রাবাড়ী, মিরপুর এবং আশুলিয়ার খুচরা বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়।
উল্টো দিকে, বেশি লাভের দাবিতে খুচরা ব্যবসায়ীরা ধর্মঘটের ডাক দিয়ে কৃত্রিম সংকটকে আরও উসকে দিচ্ছেন। এই সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। গত দুই বছরে এলপিজির দাম ওঠানামা করলেও দীর্ঘমেয়াদে তা কেবল সাধারণ মানুষের বোঝা বাড়িয়েছে। ডলারের সংকট, টাকার অবমূল্যায়ন এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির অজুহাতে দফায় দফায় দাম বাড়ানো হয়েছে।
২০২৪ সালের শুরুর দিকে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকার ঘরে থাকলেও বছরের শেষ দিকে তা ১ হাজার ৪৫০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি— জুলাই মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ বাড়ায় দাম কিছুটা কমে ১ হাজার ৫২৮ টাকায় নেমেছিল। কিন্তু এরপর থেকে শুরু হয় লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি। আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে দফায় দফায় দাম বেড়ে সেপ্টেম্বরের শেষদিকে তা ১ হাজার ৫৮৫ টাকায় দাঁড়ায়।
সর্বশেষ গত ৪ অক্টোবর এক ধাক্কায় প্রতি কেজিতে ২১ টাকা বাড়িয়ে ১২ কেজির সিলিন্ডারে ২৫২ টাকা বাড়ানো হয়। ফলে সরকারি দাম দাঁড়ায় ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। তবে মাঠপর্যায়ে ভোক্তাদের গুনতে হচ্ছে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকারও বেশি। এই অব্যবস্থাপনার কারণেই শুরু হয়েছে সিলিন্ডার রিফিলের বিশাল অবৈধ চক্র।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আন্তর্জাতিক বাজারের প্রোপেন ও বিউটেনের দামের ওপর ভিত্তি করে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে দিলেও তদারকি না থাকায় মাঠপর্যায়ে তার কোনো প্রতিফলন নেই। আমদানিকারক থেকে শুরু করে লোকাল ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের একটি সমন্বিত সিন্ডিকেট কৃত্রিম সংকট তৈরি করে এলপিজির দাম নিয়ন্ত্রণ করছে।
সিন্ডিকেটের এই লাগামহীন দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। এই সুযোগে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী কোনো রকম অনুমোদন বা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা ছাড়াই বড় সিলিন্ডার উপুড় করে পাইপের মাধ্যমে ছোট সিলিন্ডারে গ্যাস স্থানান্তর করছে। এই ছোট ছোট সিলিন্ডারের কোনো প্রেসার টেস্ট বা মান নিয়ন্ত্রণ সার্টিফিকেট থাকে না। অর্থনৈতিক চরম অসহায়ত্ব আর তদারকি সংস্থার উদাসীনতার সুযোগে রাজধানীর অন্ধকার কোণে এভাবেই প্রতিনিয়ত জমছে অদৃশ্য সিন্ডিকেটের বিস্ফোরক বারুদ।
ফলে সব সময়ই বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম এই পুরো প্রক্রিয়ার পেছনে তদারকির অভাবকে দায়ী করেন। তার মতে, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বা সরকারি সংস্থাগুলো শুধু মূল্য নির্ধারণ করেই দায়িত্ব শেষ করে। যে শক্তিশালী বাজার মনিটরিং প্রয়োজন, তা একেবারেই অনুপস্থিত।
তিনি এই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ ও অবৈধ ব্যবসাকে কঠোর হস্তে দমনের তাগিদ দেন। বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, এলপিজি সিলিন্ডারগুলো রিফিল করার জন্য নির্দিষ্ট প্রেসার, স্বয়ংক্রিয় রিফিলিং সেটআপ এবং প্রতিটি রিফিলের পর বাধ্যতামূলক সেফটি বা লিকেজ চেক করার নিয়ম রয়েছে। সাধারণ দোকানে এক সিলিন্ডার থেকে অন্য সিলিন্ডারে পাইপ দিয়ে টেনে যে গ্যাস ভরা হয়, তাতে সিলিন্ডারের ধাতব গায়ে ঘর্ষণ তৈরি হয় এবং সেখানে কোনো সেফটি লক বা পরিমাপক থাকে না।
এটি যেকোনো মুহূর্তে একটি বড় আকারের বোমা হিসেবে বিস্ফোরিত হতে পারে। তিনি সাধারণ মানুষকে কম দামে বা কেজি দরে খোলা গ্যাস কেনা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকার পরামর্শ দেন।





















