আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস আজ। বিশ্বজুড়ে যখন বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ সংরক্ষণের নানা বাণী উচ্চারিত হচ্ছে, ঠিক তখনই চরম অস্তিত্ব সংকটে দাঁড়িয়ে আমাদের জাতীয় গর্ব—সুন্দরবনের বিশ্বখ্যাত ‘রয়েল বেঙ্গল টাইগার’। বিশেষজ্ঞদের সাফ কথা : বাঘ বাঁচলে বাঁচবে সুন্দরবন, আর সুন্দরবন বাঁচলে রক্ষা পাবে উপকূলের কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা। সুন্দরবনে বাঘের বর্তমান অবস্থা : আশার আলো না কি শঙ্কা? সর্বশেষ ক্যামেরা ট্র্যাপিং ও আধুনিক জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের অংশে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২৫ (২০২৪ সালের জরিপ প্রতিবেদন অনুসারে)। যা ২০১৮ সালের জরিপে ছিল ১১৪টি। সংখ্যা কিছুটা বাড়লেও মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র কিন্তু এখনো চরম উদ্বেগজনক। বন বিভাগ বনের গহীনে ‘বাঘের কেল্লা’ নির্মাণ ও সুপেয় পানির পুকুর খননসহ নানা প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগের কথা বললেও, বাঘের সার্বিক নিরাপত্তা এখনো সুসংহত নয়। বাঘ কেবল একটি বন্যপ্রাণী বা সুন্দরবনের সৌন্দর্য নয়; এটি পুরো ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্রের (Ecosystem) মূল স্তম্ভ। খাদ্যশৃঙ্খলের শীর্ষে থাকা বাঘ হারিয়ে গেলে পুরো সুন্দরবনই ধ্বংস হয়ে যাবে বলে পরিবেশবিদ ও বন্যপ্রাণী গবেষকরা মনে করেন। অস্তিত্বের চতুর্মুখী সংকট : আজ সুন্দরবনের রাজকীয় রাজা কোনো একক বিপদে নয়, বরং চারপাশের বহুমুখী হুমকির মুখোমুখি জলবায়ু পরিবর্তন ও সুপেয় পানির সংকট বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ায় বনের পানিতে লবণাক্ততা মারাত্মক হারে বাড়ছে। মিঠাপানির তীব্র সংকটে বাঘ নানা চর্মরোগে ভুগছে এবং তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। আবাসস্থল সংকোচন ও কোলাহল : বনের সীমানা সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি বনের নদী-খালে অবৈধ ও অবাধ ইঞ্জিনচালিত নৌযান চলাচল করছে। বিকট শব্দে বাঘের শান্ত ও নির্জন বিচরণক্ষেত্র বিনষ্ট হচ্ছে। অপরদিকে চোরা শিকারি ও পাচারচক্র দুর্গম বনের সুযোগ নিয়ে চোরা শিকারিরা এখনো সক্রিয়। বাঘের চামড়া ও অঙ্গপ্রতঙ্গ পাচারের কুচক্রী চক্রান্ত বাঘের জীবনকে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। অন্যদিকে খাদ্য সংকট ও লোকালয়ে প্রবেশ : হরিণসহ বাঘের প্রধান শিকার কমে যাওয়া এবং বনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার কারণে মাঝেমধ্যেই বাঘ খাবারের সন্ধানে উপকূলীয় লোকালয়ে চলে আসছে, যা মানব-বাঘ দ্বন্দ্বে রূপ নিচ্ছে। বাঘ না থাকলে ধ্বংস হবে সমগ্র উপকূল : সুন্দরবন হচ্ছে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যূহ। প্রলয়ঙ্করি ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা পাওয়ার প্রধান ঢাল এই বন। আর সেই বনকে টিকিয়ে রাখে বাঘ। বাঘ না থাকলে বনে মানুষের অবৈধ অনুপ্রবেশ লাগামহীন হয়ে পড়বে, ধ্বংস হবে গাছপালা ও অন্যান্য বন্যপ্রাণী। ফলে সুন্দরবন তার স্বাভাবিক ভারসাম্য হারাবে এবং পুরো উপকূলীয় অঞ্চল মুখোমুখি হবে এক মহাসংকটের। প্রতিশ্রুতি থেকে কার্যকরে ফেরার এখনই সময় : ২০১০ সালে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক বাঘ সম্মেলনে ২৯ জুলাইকে ‘আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল বাঘের প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষা ও সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে। কিন্তু কেবল প্রথাগত পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। আজকের দিনে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত জিরো টলারেন্স : চোরা শিকারিদের দমনে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ ও কঠোর আইনি প্রয়োগ। এবং প্রযুক্তির সুব্যবহার : স্মার্ট পেট্রোলিং ও আধুনিক ড্রোন ট্র্যাপিং বাড়িয়ে পুরো বনে ২৪ ঘণ্টা নজরদারি নিশ্চিত করা। লোকালয়ের মানুষকে সম্পৃক্ত করা : উপকূলীয় জনগোষ্ঠীকে বিকল্প জীবিকার সুযোগ দিয়ে বাঘ রক্ষায় ‘কমিউনিটি টহল দল’ গঠনে উৎসাহিত করা। এ বিষয়ে সাতক্ষীরা পশ্চিম বন বিভাগের বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা ফজলুল হক বলেন, সুন্দরবনের প্রধান আকর্ষণ বাঘ টিকে থাকলে সুন্দরবন জাতীয় পশু রয়েল বেঙ্গল টাইগারের স্থায়ী নিরাপত্তা এবং সংখ্যা বৃদ্ধির এই ধারা বজায় রাখতে বন বিভাগের পাশাপাশি স্থানীয় সচেতন বাসিন্দাদেরও একযোগে কাজ করতে হবে। এলাকার বিশিষ্টজনদের মতে, সুন্দরবনের রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারকে রক্ষা করা শুধু বনের ভেতরের কাজ নয়; এটি আমাদের অস্তিত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার লড়াই। এখনই সঠিক ও কঠোর পদক্ষেপ না নিলে, আগামী প্রজন্ম হয়তো কেবল গল্পেই সুন্দরবনের রাজার গর্জন শুনবে।
12:23 am, Thursday, 30 July 2026
শিরোনাম :
অস্তিত্ব সংকটে ‘রয়েল বেঙ্গল টাইগার’ : রক্ষা করতে না পারলে বিপদ
-
MIT ERP
- Update Time : 09:54:23 pm, Wednesday, 29 July 2026
- 4
Tag :














