আজ রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬
২৪ কার্তিক, ১৪৩৩ | ২৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
পরিষ্কার আকাশ
৩১°C
সর্বোচ্চ: ৩২°C
সর্বনিম্ন: ২৩°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ০%

গোপালগঞ্জের সাতাপারে বেদে শিশুদের শিক্ষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় দিলশাদুল হক শিমুলের উদ্যোগ

  • MIT ERP
  • Update Time : 03:58:24 pm, Sunday, 8 November 2026
  • 11

গোপালগঞ্জের সাতাপারে বেদে শিশুদের শিক্ষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় দিলশাদুল হক শিমুলের উদ্যোগ

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

জল-ডাঙার চিরন্তন লড়াইয়ে যাযাবর জীবনযাপন করা বেদে সম্প্রদায়ের শিশুদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়ানো এবং তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ধরে রাখতে গোপালগঞ্জের সাতাপারে এক নীরব প্রচেষ্টা চলছে। সমাজে চরম অবহেলিত ও প্রান্তিক এই জনগোষ্ঠীর নতুন প্রজন্মকে মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে এবং আবহমান সংস্কৃতিকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে কাজ করে যাচ্ছেন সমাজকর্মী দিলশাদুল হক শিমুল।

২০১৮ সাল থেকে তিনি এই অনগ্রসর সম্প্রদায়ের উন্নয়নে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও একনিষ্ঠ ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। একটি সুন্দর আগামীর স্বপ্ন নিয়ে শুরু হওয়া তাঁর এই কর্মযজ্ঞ কেবল প্রথাগত শিক্ষার বিস্তার নয়, বরং অবহেলিত এই মানুষের টেকসই পুনর্বাসন ও তাদের নিজস্ব ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার এক অনন্য লড়াই। একক চেষ্টায় স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী বাসস্থান ও প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত বেদে পরিবারের জীবনে সবচেয়ে বড় সংকট ছিল মাথা গোঁজার নিজস্ব ঠাঁই।

দিলশাদুল হক শিমুল অনুধাবন করেছিলেন যে, স্থায়ী ঠিকানা ছাড়া এই জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন সম্ভব নয়। এরই ধারাবাহিকতায় গত কয়েক বছরে সরকারের সাথে বারবার যোগাযোগ করে তিনি সম্পূর্ণ নিজের একক চেষ্টায় পঞ্চাশটি বেদে পরিবারের জন্য সরকারি আবাসন প্রকল্পের ৫০ টি ঘরের ব্যবস্থা করেছেন। যাযাবর জীবনের অবসান ঘটিয়ে এই পরিবারগুলোর জীবনে এখন এসেছে স্থায়ী স্থিতিশীলতা।

সংস্কৃতি কেন্দ্র ও শিক্ষার নতুন আঙিনা স্থায়ী আবাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি বেদেদের কৃষ্টি-কালচার ধরে রাখতেও তিনি সরকারি পর্যায়ে জোরালো ভূমিকা রেখেছেন। বেদেদের সংস্কৃতি ও নিজস্ব ভাষার বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য তিনি সরকারকে অনুরোধ করে একটি বিশেষ ‘সংস্কৃতি কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠা করিয়েছেন। এই সংস্কৃতি কেন্দ্রটিই এখন বেদে সম্প্রদায়ের মিলনমেলা ও ঐতিহ্যের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

এই কেন্দ্রের ভেতরেই গড়ে উঠেছে তাঁর স্বপ্নের ‘আদর্শলিপি বেদেপল্লী’ স্কুল। যেখানে বেদে শিশুদের নিয়মিত পাঠদানের পাশাপাশি তাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি শেখার এক অপূর্ব সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। সংস্কৃতি ও ভাষা রক্ষার অভিনব সংগ্রাম বেদে জনগোষ্ঠীর রয়েছে নিজস্ব ভাষারীতি, কৃষ্টি ও জীবনবোধ। তবে যাযাবর জীবনের কঠিন বাস্তবতায় এবং আধুনিকতার করাল গ্রাসে এই ঐতিহ্য আজ বিলুপ্তপ্রায়।

‘আদর্শলিপি বেদেপল্লী’ এই সংকট মোকাবেলায় রাখছে অনন্য ভূমিকা: ভাষার প্রতি মমত্ববোধ: শিশুদের নিয়মিত শিক্ষার পাশাপাশি তাদের পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্যবাহী কথ্য ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখানো হয়। আত্মমর্যাদার বিকাশ: প্রান্তিকতার গণ্ডি পেরিয়ে শিশুরা যাতে নিজেদের বেদে পরিচয়কে আড়াল না করে সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে, সেই মানসিক আত্মবিশ্বাস জোগাচ্ছেন দিলশাদুল হক শিমুল।

এক আলোর দিশারী ও টেকসই ভবিষ্যৎ বলা হয়ে থাকে, “যদি তোমার মুখ থেকে নিজস্ব ভাষা হারিয়ে যায়, তবে মন থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে তোমার শেকড়। ” দিলশাদুল হক শিমুল তাঁর দীর্ঘ আট বছরের নিরলস প্রচেষ্টায় বেদে সম্প্রদায়ের সেই হারিয়ে যাওয়া শেকড়কেই রুখে দিয়েছেন। সমাজ সংস্কারক শিমুলের এই নিঃস্বার্থ উদ্যোগ আজ একঝাঁক সুবিধাবঞ্চিত শিশুকে নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখাচ্ছে।

তারা আজ সরকারি ঘরে ঘুমাচ্ছে, সংস্কৃতি কেন্দ্রে বসে বর্ণমালা শিখছে, দেশ ও সমাজকে চিনছে, এবং একই সাথে নিজেদের বুকেই বাঁচিয়ে রাখছে তাদের হাজার বছরের লোকজ সংস্কৃতিকে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

আলমাছের পরিবর্তে কারাবন্দি নিরপরাধ আলমাসকে মুক্তির নির্দেশ হাইকোর্টের

গোপালগঞ্জের সাতাপারে বেদে শিশুদের শিক্ষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় দিলশাদুল হক শিমুলের উদ্যোগ

Update Time : 03:58:24 pm, Sunday, 8 November 2026

জল-ডাঙার চিরন্তন লড়াইয়ে যাযাবর জীবনযাপন করা বেদে সম্প্রদায়ের শিশুদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়ানো এবং তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ধরে রাখতে গোপালগঞ্জের সাতাপারে এক নীরব প্রচেষ্টা চলছে। সমাজে চরম অবহেলিত ও প্রান্তিক এই জনগোষ্ঠীর নতুন প্রজন্মকে মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে এবং আবহমান সংস্কৃতিকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে কাজ করে যাচ্ছেন সমাজকর্মী দিলশাদুল হক শিমুল।

২০১৮ সাল থেকে তিনি এই অনগ্রসর সম্প্রদায়ের উন্নয়নে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও একনিষ্ঠ ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। একটি সুন্দর আগামীর স্বপ্ন নিয়ে শুরু হওয়া তাঁর এই কর্মযজ্ঞ কেবল প্রথাগত শিক্ষার বিস্তার নয়, বরং অবহেলিত এই মানুষের টেকসই পুনর্বাসন ও তাদের নিজস্ব ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার এক অনন্য লড়াই। একক চেষ্টায় স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী বাসস্থান ও প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত বেদে পরিবারের জীবনে সবচেয়ে বড় সংকট ছিল মাথা গোঁজার নিজস্ব ঠাঁই।

দিলশাদুল হক শিমুল অনুধাবন করেছিলেন যে, স্থায়ী ঠিকানা ছাড়া এই জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন সম্ভব নয়। এরই ধারাবাহিকতায় গত কয়েক বছরে সরকারের সাথে বারবার যোগাযোগ করে তিনি সম্পূর্ণ নিজের একক চেষ্টায় পঞ্চাশটি বেদে পরিবারের জন্য সরকারি আবাসন প্রকল্পের ৫০ টি ঘরের ব্যবস্থা করেছেন। যাযাবর জীবনের অবসান ঘটিয়ে এই পরিবারগুলোর জীবনে এখন এসেছে স্থায়ী স্থিতিশীলতা।

সংস্কৃতি কেন্দ্র ও শিক্ষার নতুন আঙিনা স্থায়ী আবাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি বেদেদের কৃষ্টি-কালচার ধরে রাখতেও তিনি সরকারি পর্যায়ে জোরালো ভূমিকা রেখেছেন। বেদেদের সংস্কৃতি ও নিজস্ব ভাষার বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য তিনি সরকারকে অনুরোধ করে একটি বিশেষ ‘সংস্কৃতি কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠা করিয়েছেন। এই সংস্কৃতি কেন্দ্রটিই এখন বেদে সম্প্রদায়ের মিলনমেলা ও ঐতিহ্যের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

এই কেন্দ্রের ভেতরেই গড়ে উঠেছে তাঁর স্বপ্নের ‘আদর্শলিপি বেদেপল্লী’ স্কুল। যেখানে বেদে শিশুদের নিয়মিত পাঠদানের পাশাপাশি তাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি শেখার এক অপূর্ব সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। সংস্কৃতি ও ভাষা রক্ষার অভিনব সংগ্রাম বেদে জনগোষ্ঠীর রয়েছে নিজস্ব ভাষারীতি, কৃষ্টি ও জীবনবোধ। তবে যাযাবর জীবনের কঠিন বাস্তবতায় এবং আধুনিকতার করাল গ্রাসে এই ঐতিহ্য আজ বিলুপ্তপ্রায়।

‘আদর্শলিপি বেদেপল্লী’ এই সংকট মোকাবেলায় রাখছে অনন্য ভূমিকা: ভাষার প্রতি মমত্ববোধ: শিশুদের নিয়মিত শিক্ষার পাশাপাশি তাদের পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্যবাহী কথ্য ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখানো হয়। আত্মমর্যাদার বিকাশ: প্রান্তিকতার গণ্ডি পেরিয়ে শিশুরা যাতে নিজেদের বেদে পরিচয়কে আড়াল না করে সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে, সেই মানসিক আত্মবিশ্বাস জোগাচ্ছেন দিলশাদুল হক শিমুল।

এক আলোর দিশারী ও টেকসই ভবিষ্যৎ বলা হয়ে থাকে, “যদি তোমার মুখ থেকে নিজস্ব ভাষা হারিয়ে যায়, তবে মন থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে তোমার শেকড়। ” দিলশাদুল হক শিমুল তাঁর দীর্ঘ আট বছরের নিরলস প্রচেষ্টায় বেদে সম্প্রদায়ের সেই হারিয়ে যাওয়া শেকড়কেই রুখে দিয়েছেন। সমাজ সংস্কারক শিমুলের এই নিঃস্বার্থ উদ্যোগ আজ একঝাঁক সুবিধাবঞ্চিত শিশুকে নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখাচ্ছে।

তারা আজ সরকারি ঘরে ঘুমাচ্ছে, সংস্কৃতি কেন্দ্রে বসে বর্ণমালা শিখছে, দেশ ও সমাজকে চিনছে, এবং একই সাথে নিজেদের বুকেই বাঁচিয়ে রাখছে তাদের হাজার বছরের লোকজ সংস্কৃতিকে।