গ্রামীণ মানুষের নিরাপদ পানির সংকট নিরসনে প্রায় ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে সাটুরিয়া উপজেলায় স্থাপন করা হয়েছে এক হাজারের বেশি গভীর নলকূপ। তবে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত এসব নলকূপের পানিই এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কোথাও পানিতে মিলছে আর্সেনিক, কোথাও অতিমাত্রায় আয়রনের উপস্থিতি। অনেক নলকূপের পানি হলুদ বর্ণের হওয়ায় পান করা তো দূরের কথা, ব্যবহার করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, স্থাপিত নলকূপের প্রায় ৬০ শতাংশের পানিতে আর্সেনিক ও আয়রন পাওয়া গেছে। উপকারভোগীদের অভিযোগ, নলকূপ স্থাপনে নির্ধারিত গভীরতা ও নির্মাণপদ্ধতি অনুসরণ করা হয়নি।
কোথাও প্রয়োজনীয় পাইপ কম ব্যবহার, কোথাও উপকরণের মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এমনকি নলকূপ স্থাপনের সময় ঠিকাদারের লোকজন অতিরিক্ত টাকা দাবি করেন বলেও অভিযোগ উঠে। ফলে সরকারি অর্থ ব্যয়ের পরও নিরাপদ পানির সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন অনেক পরিবার। জানা গেছে, ডিপিএইচই প্রকল্পের আওতায় এ উপজেলায় এক হাজার ১৭০টি সাবমারসিবল গভীর নলকূপ ও ১৮টি পরিবারের জন্য কমিউনিটিভিত্তিক গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়।
এসব নলকূপ নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ হাজার ১৭০টির বিপরীতে ১২ কোটি ও ১৮টি কমিউনিটিভিত্তিক নলকূপের জন্য বরাদ্দ প্রায় ৭৮ লাখ টাকা। দরগ্রাম ইউনিয়নের বাসিন্দা আলিনূর বকস রতন সুপেয় পানির আশায় নিজের বাড়িতে গভীর নলকূপ স্থাপন করান। এ নলকূপ থেকে ১০টি পরিবারের পানি পাওয়ার কথা। কিন্তু পানিতে অতিমাত্রায় আর্সেনিক ও আয়রন থাকায় তা পান করতে পারছেন।
বিষয়টি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরকে জানিয়েও কার্যকর সমাধান মেলেনি। বাধ্য হয়ে ঝুঁকি জেনেও ওই পানি ব্যবহার করছে কয়েকটি পরিবার। তাদের অভিযোগ, নির্ধারিত পরিমাণ পাইপ ব্যবহার না করে মাত্র ৩৫০-৪০০ ফুট গভীরতায় নলকূপ স্থাপন করেই কাজ শেষ করা হয়েছে। বলতলা গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন পিটু জানান, ১০টি পরিবারের জন্য কমিউনিটিভিত্তিক গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়।
কিন্তু সেই নলকূপের পানিও হলুদ বর্ণের এবং তাতে রয়েছে আয়রন ও আর্সেনিক। তার অভিযোগ, নিরাপদ পানির আশায় সরকারি কোষাগারে ১০ হাজার টাকা জমা দিয়েও মিলছে দূষিত পানি। গভীর নলকূপ স্থাপনে সরকার চার লাখ ৩০ হাজার টাকার বেশি বরাদ্দ দিলেও ঠিকাদারের লোকজন নিয়ম মেনে কাজ করে নি। উল্টো তাদের আপ্যায়নের কথা বলে ৪-৫ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। বালিয়াটি ইউনিয়নের খলিলাবাদ গ্রামের রিপন হোসেনের বাড়িতে স্থাপন করা হয়েছে সাবমারসিবল নলকূপ।
এটি ৫০০ ফুট গভীরে স্থাপনের কথা থাকলেও ঠিকাদার ৪০০ ফুট পর্যন্ত পাইপ বসিয়ে কাজ শেষ করে। পরে নলকূপের পানি হলুদ বর্ণের হলে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে নিয়ে পরীক্ষার পর পানিতে আর্সেনিকের উপস্থিতি ধরা পড়ে। তবে এরপরও সমস্যার সমাধানে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ তার। উপকারভোগী শামীমা আক্তার বলেন, নলকূপের পানি দিয়ে গোসল কিংবা কাপড় পরিষ্কার করলে হলুদ দাগ পড়ে।
তাই বাইরে থেকে পানি এনে গোসল ও কাপড় ধোয়ার কাজ করতে হচ্ছে। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. রোকয়া বেগম বলেন, আর্সেনিকযুক্ত পানি মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। দীর্ঘদিন এ পানি পান করলে ত্বকে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। এমনকি ক্যানসারের ঝুঁকিও রয়েছে। শরীরে ফুসকুড়িসহ নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া কিডনি ও লিভারের সমস্যার আশঙ্কাও রয়েছে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকৌশলী আজিজুল হাকিম বলেন, সাটুরিয়ার অধিকাংশ ইউনিয়নের ভূগর্ভস্থ পানির মান ভালো নয়। প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সিডিউল অনুযায়ী হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ঠিকাদার ও বাড়ির মালিকদের মধ্যে সমন্বয় করেই কাজ করা হয়েছে।





















