আজ বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
২১ কার্তিক, ১৪৩৩ | ২৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
২৬°C
সর্বোচ্চ: ৩০°C
সর্বনিম্ন: ২৩°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ০%

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে সামান্তা শারমিনের পদত্যাগ

  • MIT ERP
  • Update Time : 07:34:23 pm, Thursday, 5 November 2026
  • 4

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে সামান্তা শারমিনের পদত্যাগ

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগ করেছেন দলটির নেত্রী সামান্তা শারমিন। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট, ২০২৬ সালের নির্বাচন, নারীর রাজনৈতিক অধিকার এবং দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিয়ে মতপার্থক্যের কথা তুলে ধরে তিনি দল ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) নিজের ফেসবুক পোস্টে পদত্যাগের বিষয়টি জানিয়ে সামান্তা শারমিন বলেন, এনসিপি তার প্রতিষ্ঠাকালীন মূল্যবোধের প্রতি আর আন্তরিক থাকতে পারবে বলে তিনি মনে করেন না। পোস্টে তিনি জানান, প্রায় এক বছর আগে জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠনের প্রশ্নে তিনি ভিন্ন অবস্থান নিয়েছিলেন। জামায়াতে ইসলামী নীতিগত বা কৌশলগত কোনো ক্ষেত্রেই এনসিপির মিত্র হওয়ার যোগ্য নয়।

দলটির সঙ্গে জোট করার জন্য এনসিপিকে কঠিন মূল্য দিতে হবে বলেও তিনি সতর্ক করেছিলেন। সামান্তা শারমিন বলেন, গত ১১ মাসে দলের অতীত কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ এবং ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে লিখিত অভিযোগ, প্রস্তাব ও আলোচনার মাধ্যমে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন। দলের ভুল সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক পথচলা পরিবর্তনের লক্ষ্যে তিনি অভ্যন্তরীণ মতাদর্শিক সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন।

তবে এসব প্রচেষ্টার পরও দল তার অবস্থান পরিবর্তনে আগ্রহী হয়নি। পদত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি চারটি বিষয় তুলে ধরেন। এগুলো হলো—জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক জোট, ২০২৬ সালের নির্বাচনকেন্দ্রিক কৌশল, গণঅভ্যুত্থানে নারীদের ভূমিকা ও অধিকার এবং কাউন্সিল ছাড়াই দলের পুনর্গঠন। জামায়াতের সঙ্গে জোটের সমালোচনা করে সামান্তা শারমিন বলেন, এনসিপির রাজনীতির মূল ভিত্তি ছিল রাষ্ট্র সংস্কার।

কিন্তু জামায়াতে ইসলামী সাংবিধানিক, আইনি ও রাজনৈতিক দলের কাঠামোগত সংস্কারকে নিজেদের রাজনৈতিক প্রকল্পের অংশ মনে করে না। তাঁর অভিযোগ, জামায়াতের দার্শনিক ভিত্তি ও প্রস্তাবিত রাষ্ট্রকাঠামো গণতান্ত্রিক নয়। দলটির সঙ্গে জোটের কারণে সংস্কারের রাজনীতি থেকে সাধারণ মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে এবং এনসিপির নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় দুর্বল হয়ে পড়েছে।

২০২৬ সালের নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নির্বাচনটি কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনের পরিবর্তে রাজনৈতিক পরিবর্তনের উপলক্ষ হতে পারত। পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে নতুন রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার সুযোগ থাকলেও এনসিপি বড় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোট করে সেই সম্ভাবনা নষ্ট করেছে। নির্বাচনী জয়কে রাজনৈতিক জয়ের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়ায় দলটি অভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন রাজনীতির সম্ভাবনাও হারিয়েছে।

গণঅভ্যুত্থানে নারীদের ভূমিকা ও অধিকার প্রসঙ্গে সামান্তা শারমিন বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নারীরা সম্মুখসারির যোদ্ধা, প্রতিরোধকারী ও আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক ছিলেন। কিন্তু বিজয়ের পর তাঁদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার যথাযথভাবে স্বীকৃতি পায়নি।

এনসিপির বিরুদ্ধে নারীবিরোধী রক্ষণশীল রাজনৈতিক প্রবণতার সঙ্গে মিলে যাওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, দলটি নারীদের শুধু সাংগঠনিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করলেই দায়িত্ব শেষ হতো না; নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সাংগঠনিক ক্ষমতায় তাঁদের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল। অথচ পুরুষ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা দলটির মধ্যে রয়ে গেছে।

দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। সামান্তা শারমিনের অভিযোগ, কাউন্সিল না করে আবারও আহ্বায়ক কমিটি পুনর্গঠন দলের গণতান্ত্রিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এতে নেতৃত্বের জবাবদিহি, নিরপেক্ষতা ও সাধারণ কর্মীদের অংশগ্রহণের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। যে দল নিজের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারে না, সেই দলের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবি কতটা বিশ্বাসযোগ্য, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

পদত্যাগের ঘোষণার পাশাপাশি বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিভাজনের পরিবর্তে ঐক্যের রাজনীতির আহ্বান জানিয়েছেন সামান্তা শারমিন। তিনি বলেন, দেশের প্রয়োজন এমন একটি রাজনৈতিক শক্তি, যার ভিত্তি হবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, সার্বভৌমত্ব, নারীর সমান অংশগ্রহণ, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও জাতীয় স্বার্থ। তিনি আরও বলেন, ভারতের বিরোধিতা করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ নেওয়া কিংবা যুক্তরাষ্ট্রবিরোধিতা করতে গিয়ে চীনের স্বার্থের সঙ্গে অবস্থান মেলানো স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতি হতে পারে না।

পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারিত হওয়া উচিত বাংলাদেশের স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের কল্যাণের ভিত্তিতে। নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার প্রত্যয় জানিয়ে সামান্তা শারমিন তার সঙ্গে বিস্তারিত মতবিনিময়ে আগ্রহীদের যোগাযোগের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, তরুণদের সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু নতুন দল গঠন নয়, বরং ভিন্নমত ও পরিচয়ের মানুষকে নিয়ে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নির্মাণের জন্য নতুন রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলা।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

খাগড়াছড়িতে হর্টিকালচার সেন্টার ও বিএডিসি কার্যালয় পরিদর্শনে জেলা পরিষদ সদস্য ক্যরী মগ

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে সামান্তা শারমিনের পদত্যাগ

Update Time : 07:34:23 pm, Thursday, 5 November 2026

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগ করেছেন দলটির নেত্রী সামান্তা শারমিন। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট, ২০২৬ সালের নির্বাচন, নারীর রাজনৈতিক অধিকার এবং দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিয়ে মতপার্থক্যের কথা তুলে ধরে তিনি দল ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) নিজের ফেসবুক পোস্টে পদত্যাগের বিষয়টি জানিয়ে সামান্তা শারমিন বলেন, এনসিপি তার প্রতিষ্ঠাকালীন মূল্যবোধের প্রতি আর আন্তরিক থাকতে পারবে বলে তিনি মনে করেন না। পোস্টে তিনি জানান, প্রায় এক বছর আগে জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠনের প্রশ্নে তিনি ভিন্ন অবস্থান নিয়েছিলেন। জামায়াতে ইসলামী নীতিগত বা কৌশলগত কোনো ক্ষেত্রেই এনসিপির মিত্র হওয়ার যোগ্য নয়।

দলটির সঙ্গে জোট করার জন্য এনসিপিকে কঠিন মূল্য দিতে হবে বলেও তিনি সতর্ক করেছিলেন। সামান্তা শারমিন বলেন, গত ১১ মাসে দলের অতীত কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ এবং ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে লিখিত অভিযোগ, প্রস্তাব ও আলোচনার মাধ্যমে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন। দলের ভুল সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক পথচলা পরিবর্তনের লক্ষ্যে তিনি অভ্যন্তরীণ মতাদর্শিক সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন।

তবে এসব প্রচেষ্টার পরও দল তার অবস্থান পরিবর্তনে আগ্রহী হয়নি। পদত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি চারটি বিষয় তুলে ধরেন। এগুলো হলো—জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক জোট, ২০২৬ সালের নির্বাচনকেন্দ্রিক কৌশল, গণঅভ্যুত্থানে নারীদের ভূমিকা ও অধিকার এবং কাউন্সিল ছাড়াই দলের পুনর্গঠন। জামায়াতের সঙ্গে জোটের সমালোচনা করে সামান্তা শারমিন বলেন, এনসিপির রাজনীতির মূল ভিত্তি ছিল রাষ্ট্র সংস্কার।

কিন্তু জামায়াতে ইসলামী সাংবিধানিক, আইনি ও রাজনৈতিক দলের কাঠামোগত সংস্কারকে নিজেদের রাজনৈতিক প্রকল্পের অংশ মনে করে না। তাঁর অভিযোগ, জামায়াতের দার্শনিক ভিত্তি ও প্রস্তাবিত রাষ্ট্রকাঠামো গণতান্ত্রিক নয়। দলটির সঙ্গে জোটের কারণে সংস্কারের রাজনীতি থেকে সাধারণ মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে এবং এনসিপির নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় দুর্বল হয়ে পড়েছে।

২০২৬ সালের নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নির্বাচনটি কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনের পরিবর্তে রাজনৈতিক পরিবর্তনের উপলক্ষ হতে পারত। পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে নতুন রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার সুযোগ থাকলেও এনসিপি বড় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোট করে সেই সম্ভাবনা নষ্ট করেছে। নির্বাচনী জয়কে রাজনৈতিক জয়ের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়ায় দলটি অভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন রাজনীতির সম্ভাবনাও হারিয়েছে।

গণঅভ্যুত্থানে নারীদের ভূমিকা ও অধিকার প্রসঙ্গে সামান্তা শারমিন বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নারীরা সম্মুখসারির যোদ্ধা, প্রতিরোধকারী ও আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক ছিলেন। কিন্তু বিজয়ের পর তাঁদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার যথাযথভাবে স্বীকৃতি পায়নি।

এনসিপির বিরুদ্ধে নারীবিরোধী রক্ষণশীল রাজনৈতিক প্রবণতার সঙ্গে মিলে যাওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, দলটি নারীদের শুধু সাংগঠনিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করলেই দায়িত্ব শেষ হতো না; নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সাংগঠনিক ক্ষমতায় তাঁদের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল। অথচ পুরুষ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা দলটির মধ্যে রয়ে গেছে।

দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। সামান্তা শারমিনের অভিযোগ, কাউন্সিল না করে আবারও আহ্বায়ক কমিটি পুনর্গঠন দলের গণতান্ত্রিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এতে নেতৃত্বের জবাবদিহি, নিরপেক্ষতা ও সাধারণ কর্মীদের অংশগ্রহণের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। যে দল নিজের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারে না, সেই দলের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবি কতটা বিশ্বাসযোগ্য, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

পদত্যাগের ঘোষণার পাশাপাশি বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিভাজনের পরিবর্তে ঐক্যের রাজনীতির আহ্বান জানিয়েছেন সামান্তা শারমিন। তিনি বলেন, দেশের প্রয়োজন এমন একটি রাজনৈতিক শক্তি, যার ভিত্তি হবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, সার্বভৌমত্ব, নারীর সমান অংশগ্রহণ, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও জাতীয় স্বার্থ। তিনি আরও বলেন, ভারতের বিরোধিতা করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ নেওয়া কিংবা যুক্তরাষ্ট্রবিরোধিতা করতে গিয়ে চীনের স্বার্থের সঙ্গে অবস্থান মেলানো স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতি হতে পারে না।

পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারিত হওয়া উচিত বাংলাদেশের স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের কল্যাণের ভিত্তিতে। নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার প্রত্যয় জানিয়ে সামান্তা শারমিন তার সঙ্গে বিস্তারিত মতবিনিময়ে আগ্রহীদের যোগাযোগের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, তরুণদের সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু নতুন দল গঠন নয়, বরং ভিন্নমত ও পরিচয়ের মানুষকে নিয়ে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নির্মাণের জন্য নতুন রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলা।