আজ বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
২১ কার্তিক, ১৪৩৩ | ২৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
২৬°C
সর্বোচ্চ: ৩০°C
সর্বনিম্ন: ২৩°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ০%

৭ নভেম্বর ১৯৭৫: আমার চোখে সিপাহি-জনতার বিপ্লব

  • MIT ERP
  • Update Time : 06:54:22 pm, Thursday, 5 November 2026
  • 19

৭ নভেম্বর ১৯৭৫: আমার চোখে সিপাহি-জনতার বিপ্লব

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

ইতিহাসের কিছু দিন শুধু ক্যালেন্ডারের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না; সেগুলো মানুষের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে মিশে যায়। সময়ের ব্যবধানে অনেক কিছু ভুলে যাওয়া সম্ভব হলেও কিছু দৃশ্য, অনুভূতি ও মুহূর্ত কখনো বিস্মৃত হওয়া যায় না।

১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহ আমার জীবনের তেমনই এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। তখন আমি ঢাকা কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র। জীবনের একেবারে তরুণ সময়। চোখে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন, মনে ভবিষ্যৎ গড়ার প্রত্যাশা। কিন্তু দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তখন এমন এক অস্থির ও অনিশ্চিত পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, একজন সাধারণ ছাত্র হয়েও ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে নিজেকে আবিষ্কার করেছিলাম।

৩ নভেম্বর: রাজনৈতিক অস্থিরতার সূচনা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশ গভীর রাজনৈতিক সংকটে পড়ে। এরই ধারাবাহিকতায় ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। এ সময় জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয়। একই রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়।

দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছিল। নানা খবর, গুজব, অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছিল মানুষের মধ্যে। আমাদের মতো তরুণ শিক্ষার্থীদের মনেও দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা প্রশ্ন ও উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছিল। তাঁতীবাজারে সেই নির্ঘুম রাত ৩ থেকে ৬ নভেম্বর—এই কয়েকটি দিন ছিল গুজব ও আতঙ্কের। ৭ নভেম্বরের আগের রাতের কথা আজও স্পষ্ট মনে আছে।

তখন আমি ঢাকার তাঁতীবাজারে এক আত্মীয়ের বাসায় থাকতাম। এলাকাটি ছিল হিন্দু অধ্যুষিত। ৬ নভেম্বর মধ্যরাত থেকে নানা খবর শুনতে পেলাম—এলাকায় দাঙ্গা বা সংঘর্ষের পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। সেই রাতটি ছিল ভীষণ উদ্বেগের। কী ঘটবে, কোথায় কী হচ্ছে, পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে—কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। চারদিকে এক অজানা আতঙ্ক। সারারাত নির্ঘুম কাটালাম।

ভোরে গায়ে চাদর জড়িয়ে আত্মরক্ষার জন্য হাতে একটি লোহার রড নিয়ে বাসা থেকে বের হলাম। তাঁতীবাজারের রাস্তায় বের হয়ে এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের কয়েকজন মানুষের আমাদের দিকে আড়চোখে তাকানো লক্ষ করলাম। সেই দৃষ্টি আমার মনে আরও ভয় সৃষ্টি করেছিল। তখন আমার একটাই চিন্তা—যেভাবেই হোক, মূল সড়কে পৌঁছাতে হবে। আমার লক্ষ্য ছিল বাবুবাজার পুলিশ ফাঁড়ি।

মনে হয়েছিল, সেখানে পৌঁছাতে পারলেই মূল সড়কে ওঠা যাবে এবং হয়তো নিরাপদ বোধ করব। একজন কলেজপড়ুয়া তরুণের জীবনে এমন সকাল আসতে পারে, তা কখনো কল্পনাও করিনি। মূল সড়কে এক অভাবনীয় দৃশ্য বাবুবাজার পুলিশ ফাঁড়ির দিকে এগিয়ে মূল সড়কে পৌঁছানোর পর যে দৃশ্য দেখলাম, তা ছিল আমার কল্পনারও বাইরে। ট্রাকের ওপর হাজার হাজার মানুষের মিছিল। কোথাও ট্যাংকের ওপর ছাত্র-জনতা।

চারদিকে মানুষের ঢল, স্লোগান, উচ্ছ্বাস ও এক অভূতপূর্ব পরিবেশ। কিছুক্ষণ আগেও যে শহরকে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তায় আচ্ছন্ন মনে হচ্ছিল, সেই শহরের রাস্তায় এসে দেখলাম সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃশ্য। ট্যাংকের ওপর ছাত্র-জনতাকে দেখে আমিও উঠে পড়লাম। সেই মুহূর্তে আমার মনে যে অনুভূতি হয়েছিল, তা আজও ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। মনে হয়েছিল, দেশ যেন নতুন করে স্বাধীন হলো!

চারদিকে মানুষের উচ্ছ্বাস, সিপাহি ও জনতার একাত্মতা এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে আমার তরুণ মনে এক নতুন আবেগের জন্ম হয়েছিল। মানুষের মুখে মুখে ধ্বনিত হচ্ছিল— ‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই! ’ সেই স্লোগানের মধ্যে যেন মানুষের ঐক্য, প্রত্যাশা ও নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন খুঁজে পেয়েছিলাম। জিয়াউর রহমানকে ঘিরে সেই সময়ের আবেগ সেদিনের সিপাহি-জনতার মধ্যে জেনারেল জিয়াউর রহমানকে ঘিরে এক বিশেষ আবেগ ও প্রত্যাশা অনুভব করেছিলাম।

আমার নিজের তরুণ মনে তখন ধারণা জন্মেছিল—জিয়াউর রহমানই হয়তো দেশের নেতৃত্ব দেবেন এবং দেশের মানুষ ও বাংলাদেশের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করবেন। তাঁকে কেন্দ্র করে মানুষের যে উচ্ছ্বাস ও প্রত্যাশা দেখেছিলাম, তা আমার স্মৃতিতে আজও অমলিন। সেই সময়ের একজন তরুণ ছাত্র হিসেবে এটি ছিল আমার কাছে এক নতুন রাজনৈতিক অনুভূতি। মনে হয়েছিল, দীর্ঘ অনিশ্চয়তার পর দেশ যেন নতুন কোনো পথের সন্ধান পেয়েছে।

আজ এত বছর পর ইতিহাসের সেই ঘটনাগুলো মূল্যায়ন করতে গিয়ে বুঝি, প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক ইতিহাসের বিশ্লেষণের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তবে সেই দিনের আবেগ ও অনুভূতি আমার ব্যক্তিগত স্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। পুরান ঢাকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা কলেজ: উত্তাল জনতার নগরী সেদিন পুরান ঢাকার পরিবেশ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।

একদিকে মানুষের উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে রাজনৈতিক পরিবর্তনকে ঘিরে উচ্ছ্বাস ও জনতার সক্রিয় উপস্থিতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার চিত্রও ছিল অনেকটা একই রকম। শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন আবেগ, প্রত্যাশা এবং রাজনৈতিক ঘটনাবলিকে ঘিরে প্রবল উত্তেজনা। ঢাকা কলেজের সামনে মিরপুর রোডে এসে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হলো। আমরা একত্রিত হলাম। চারদিকে তখন এক নতুন আবেগের পরিবেশ।

বন্ধুদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে সেদিনের দৃশ্য দেখছিলাম। মনে হচ্ছিল, আমরা সবাই যেন ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের অংশ হয়ে গেছি। ঢাকা কলেজের সামনে তরুণ শিক্ষার্থীদের আবেগ, আলোচনা, উচ্ছ্বাস এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রত্যাশার সেই দৃশ্য আজও মনে পড়ে। সেদিনের ঢাকা নগরীর চিত্র সেদিনের ঢাকা ছিল যেন এক বিশাল রাজনৈতিক মঞ্চ। পুরান ঢাকা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ থেকে শহরের বিভিন্ন সড়ক—সব জায়গায় মানুষের উপস্থিতি ও ঘটনাবলির ভিন্ন ভিন্ন চিত্র ছিল শিহরণ জাগানোর মতো।

সংসদ ভবন এলাকার কাছাকাছি এসে জানতে পারলাম, ৭ নভেম্বর সকালে সংসদ ভবনের কাছাকাছি শেরেবাংলা নগর ও তৎকালীন ১০ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ক্যাম্পের প্রাঙ্গণে পাল্টা অভ্যুত্থানের সময় মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বীর সেনানী ও উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তারা নিহত হয়েছেন। নিহত সামরিক কর্মকর্তারা হলেন— মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ, বীর উত্তম; কর্নেল খন্দকার নাজমুল হুদা; লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ. টি. এম. হায়দার।

৭ নভেম্বর সকালে বিদ্রোহী সেনাসদস্যদের গুলিতে ও বেয়নেটের আঘাতে তাঁরা প্রাণ হারান। একদিকে মানুষের উচ্ছ্বাস, রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রত্যাশা ও নতুন আবেগ; অন্যদিকে মৃত্যু, সহিংসতা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার নির্মম বাস্তবতা। সেদিন উপলব্ধি করেছিলাম, ইতিহাসের কোনো মুহূর্তই একমাত্রিক নয়। একই সময়ে মানুষের আনন্দ, আশা, ভয়, শোক ও অনিশ্চয়তা পাশাপাশি অবস্থান করতে পারে।

ক্যান্টনমেন্ট এলাকার চিত্র ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় মানুষের যে উচ্ছ্বাস ও জনসমাগম দেখেছিলাম, ক্যান্টনমেন্ট এলাকার পরিস্থিতি ছিল তার থেকে ভিন্ন। সেখানে পরিবেশের মধ্যে ছিল অন্য ধরনের সামরিক বাস্তবতা, নিয়ন্ত্রণ ও সতর্কতা। শহরের জনতার আবেগ এবং ক্যান্টনমেন্টের পরিস্থিতির মধ্যে যে পার্থক্য ছিল, তা আমার কাছে বিশেষভাবে লক্ষণীয় মনে হয়েছিল।

একই শহর, একই দিন, অথচ বিভিন্ন এলাকায় ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতি—এ যেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। স্মৃতিতে অমলিন ৭ নভেম্বর গোটা ঢাকা শহরজুড়ে সেদিন ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব অধ্যায় রচিত হয়েছিল। শহরের বিভিন্ন জায়গায় যে দৃশ্য দেখেছি, তা আজও আমার স্মৃতিতে জীবন্ত। ট্রাকের ওপর হাজার হাজার মানুষ, ট্যাংকের ওপর ছাত্র-জনতা, মানুষের মিছিল, স্লোগান, রাজনৈতিক আবেগ এবং এক নতুন ভবিষ্যতের প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে ছিল এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা।

এক রাতের আতঙ্কের পর সকালে এমন অভূতপূর্ব জনসমাগমের মধ্যে নিজেকে আবিষ্কার করা ছিল আমার জীবনের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা। সেদিন আরও অনেক ঘটনা নিজের চোখে দেখেছি। সময়ের ব্যবধানে কিছু স্মৃতি অস্পষ্ট হয়েছে, কিন্তু অনেক দৃশ্য আজও চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তখন বুঝতে পারিনি, ইতিহাসের এত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়ের প্রত্যক্ষ সাক্ষী হয়ে যাচ্ছি।

আজ এত বছর পর জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ফিরে তাকালে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর আমার কাছে শুধু একটি রাজনৈতিক তারিখ নয়; এটি আমার ছাত্রজীবনের এক আবেগময়, উত্তাল ও স্মরণীয় দিন। সেদিনের তরুণ মনে যে অনুভূতি জন্মেছিল, তা আজও স্মৃতির গভীরে রয়ে গেছে। মনে হয়েছিল, দেশ নতুন করে স্বাধীন হলো, সিপাহি ও জনতা এক হয়ে গেছে এবং জিয়াউর রহমান দেশের নেতৃত্ব দেবেন।

এটি ছিল সেই সময়ের আমার ব্যক্তিগত অনুভূতি ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার প্রতিফলন। ইতিহাসের রাজনৈতিক মূল্যায়ন নিয়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীর স্মৃতি ইতিহাসের একটি মূল্যবান অংশ। আমি কোনো ইতিহাসবিদ নই। আমি সেই সময়ের একজন তরুণ ছাত্র, যিনি তাঁতীবাজারের নির্ঘুম রাত, ভোরের আতঙ্ক, পুরান ঢাকার পরিস্থিতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তাল পরিবেশ, ঢাকা কলেজের সামনে বন্ধুদের সঙ্গে নতুন আবেগ এবং সংসদ ভবন ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকার ভিন্ন বাস্তবতা নিজের চোখে দেখেছি।

আজ প্রায় অর্ধশতাব্দী পর সেই স্মৃতিগুলো লিখে রাখার চেষ্টা করছি। ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় লেখা থাকে না; ইতিহাস বেঁচে থাকে মানুষের চোখে দেখা ঘটনা, অনুভূতি ও স্মৃতির মধ্যে। আমি সেই দিনগুলো দেখেছি একজন তরুণ ছাত্র হিসেবে। আজ স্মরণ করছি একজন পরিণত মানুষ হিসেবে। ৭ নভেম্বর ১৯৭৫—আমার জীবনের এমন একটি দিন, যার স্মৃতি কখনো মুছে যাওয়ার নয়।

উপাচার্য, নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি একজন প্রত্যক্ষদর্শী, ঢাকা কলেজের তৎকালীন প্রথম বর্ষের ছাত্র।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

প্রধানমন্ত্রীর কণ্ঠে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস সিজন-২ এর শুভ উদ্বোধন

৭ নভেম্বর ১৯৭৫: আমার চোখে সিপাহি-জনতার বিপ্লব

Update Time : 06:54:22 pm, Thursday, 5 November 2026

ইতিহাসের কিছু দিন শুধু ক্যালেন্ডারের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না; সেগুলো মানুষের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে মিশে যায়। সময়ের ব্যবধানে অনেক কিছু ভুলে যাওয়া সম্ভব হলেও কিছু দৃশ্য, অনুভূতি ও মুহূর্ত কখনো বিস্মৃত হওয়া যায় না।

১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহ আমার জীবনের তেমনই এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। তখন আমি ঢাকা কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র। জীবনের একেবারে তরুণ সময়। চোখে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন, মনে ভবিষ্যৎ গড়ার প্রত্যাশা। কিন্তু দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তখন এমন এক অস্থির ও অনিশ্চিত পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, একজন সাধারণ ছাত্র হয়েও ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে নিজেকে আবিষ্কার করেছিলাম।

৩ নভেম্বর: রাজনৈতিক অস্থিরতার সূচনা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশ গভীর রাজনৈতিক সংকটে পড়ে। এরই ধারাবাহিকতায় ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। এ সময় জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয়। একই রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়।

দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছিল। নানা খবর, গুজব, অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছিল মানুষের মধ্যে। আমাদের মতো তরুণ শিক্ষার্থীদের মনেও দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা প্রশ্ন ও উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছিল। তাঁতীবাজারে সেই নির্ঘুম রাত ৩ থেকে ৬ নভেম্বর—এই কয়েকটি দিন ছিল গুজব ও আতঙ্কের। ৭ নভেম্বরের আগের রাতের কথা আজও স্পষ্ট মনে আছে।

তখন আমি ঢাকার তাঁতীবাজারে এক আত্মীয়ের বাসায় থাকতাম। এলাকাটি ছিল হিন্দু অধ্যুষিত। ৬ নভেম্বর মধ্যরাত থেকে নানা খবর শুনতে পেলাম—এলাকায় দাঙ্গা বা সংঘর্ষের পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। সেই রাতটি ছিল ভীষণ উদ্বেগের। কী ঘটবে, কোথায় কী হচ্ছে, পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে—কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। চারদিকে এক অজানা আতঙ্ক। সারারাত নির্ঘুম কাটালাম।

ভোরে গায়ে চাদর জড়িয়ে আত্মরক্ষার জন্য হাতে একটি লোহার রড নিয়ে বাসা থেকে বের হলাম। তাঁতীবাজারের রাস্তায় বের হয়ে এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের কয়েকজন মানুষের আমাদের দিকে আড়চোখে তাকানো লক্ষ করলাম। সেই দৃষ্টি আমার মনে আরও ভয় সৃষ্টি করেছিল। তখন আমার একটাই চিন্তা—যেভাবেই হোক, মূল সড়কে পৌঁছাতে হবে। আমার লক্ষ্য ছিল বাবুবাজার পুলিশ ফাঁড়ি।

মনে হয়েছিল, সেখানে পৌঁছাতে পারলেই মূল সড়কে ওঠা যাবে এবং হয়তো নিরাপদ বোধ করব। একজন কলেজপড়ুয়া তরুণের জীবনে এমন সকাল আসতে পারে, তা কখনো কল্পনাও করিনি। মূল সড়কে এক অভাবনীয় দৃশ্য বাবুবাজার পুলিশ ফাঁড়ির দিকে এগিয়ে মূল সড়কে পৌঁছানোর পর যে দৃশ্য দেখলাম, তা ছিল আমার কল্পনারও বাইরে। ট্রাকের ওপর হাজার হাজার মানুষের মিছিল। কোথাও ট্যাংকের ওপর ছাত্র-জনতা।

চারদিকে মানুষের ঢল, স্লোগান, উচ্ছ্বাস ও এক অভূতপূর্ব পরিবেশ। কিছুক্ষণ আগেও যে শহরকে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তায় আচ্ছন্ন মনে হচ্ছিল, সেই শহরের রাস্তায় এসে দেখলাম সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃশ্য। ট্যাংকের ওপর ছাত্র-জনতাকে দেখে আমিও উঠে পড়লাম। সেই মুহূর্তে আমার মনে যে অনুভূতি হয়েছিল, তা আজও ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। মনে হয়েছিল, দেশ যেন নতুন করে স্বাধীন হলো!

চারদিকে মানুষের উচ্ছ্বাস, সিপাহি ও জনতার একাত্মতা এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে আমার তরুণ মনে এক নতুন আবেগের জন্ম হয়েছিল। মানুষের মুখে মুখে ধ্বনিত হচ্ছিল— ‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই! ’ সেই স্লোগানের মধ্যে যেন মানুষের ঐক্য, প্রত্যাশা ও নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন খুঁজে পেয়েছিলাম। জিয়াউর রহমানকে ঘিরে সেই সময়ের আবেগ সেদিনের সিপাহি-জনতার মধ্যে জেনারেল জিয়াউর রহমানকে ঘিরে এক বিশেষ আবেগ ও প্রত্যাশা অনুভব করেছিলাম।

আমার নিজের তরুণ মনে তখন ধারণা জন্মেছিল—জিয়াউর রহমানই হয়তো দেশের নেতৃত্ব দেবেন এবং দেশের মানুষ ও বাংলাদেশের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করবেন। তাঁকে কেন্দ্র করে মানুষের যে উচ্ছ্বাস ও প্রত্যাশা দেখেছিলাম, তা আমার স্মৃতিতে আজও অমলিন। সেই সময়ের একজন তরুণ ছাত্র হিসেবে এটি ছিল আমার কাছে এক নতুন রাজনৈতিক অনুভূতি। মনে হয়েছিল, দীর্ঘ অনিশ্চয়তার পর দেশ যেন নতুন কোনো পথের সন্ধান পেয়েছে।

আজ এত বছর পর ইতিহাসের সেই ঘটনাগুলো মূল্যায়ন করতে গিয়ে বুঝি, প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক ইতিহাসের বিশ্লেষণের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তবে সেই দিনের আবেগ ও অনুভূতি আমার ব্যক্তিগত স্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। পুরান ঢাকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা কলেজ: উত্তাল জনতার নগরী সেদিন পুরান ঢাকার পরিবেশ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।

একদিকে মানুষের উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে রাজনৈতিক পরিবর্তনকে ঘিরে উচ্ছ্বাস ও জনতার সক্রিয় উপস্থিতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার চিত্রও ছিল অনেকটা একই রকম। শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন আবেগ, প্রত্যাশা এবং রাজনৈতিক ঘটনাবলিকে ঘিরে প্রবল উত্তেজনা। ঢাকা কলেজের সামনে মিরপুর রোডে এসে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হলো। আমরা একত্রিত হলাম। চারদিকে তখন এক নতুন আবেগের পরিবেশ।

বন্ধুদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে সেদিনের দৃশ্য দেখছিলাম। মনে হচ্ছিল, আমরা সবাই যেন ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের অংশ হয়ে গেছি। ঢাকা কলেজের সামনে তরুণ শিক্ষার্থীদের আবেগ, আলোচনা, উচ্ছ্বাস এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রত্যাশার সেই দৃশ্য আজও মনে পড়ে। সেদিনের ঢাকা নগরীর চিত্র সেদিনের ঢাকা ছিল যেন এক বিশাল রাজনৈতিক মঞ্চ। পুরান ঢাকা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ থেকে শহরের বিভিন্ন সড়ক—সব জায়গায় মানুষের উপস্থিতি ও ঘটনাবলির ভিন্ন ভিন্ন চিত্র ছিল শিহরণ জাগানোর মতো।

সংসদ ভবন এলাকার কাছাকাছি এসে জানতে পারলাম, ৭ নভেম্বর সকালে সংসদ ভবনের কাছাকাছি শেরেবাংলা নগর ও তৎকালীন ১০ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ক্যাম্পের প্রাঙ্গণে পাল্টা অভ্যুত্থানের সময় মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বীর সেনানী ও উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তারা নিহত হয়েছেন। নিহত সামরিক কর্মকর্তারা হলেন— মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ, বীর উত্তম; কর্নেল খন্দকার নাজমুল হুদা; লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ. টি. এম. হায়দার।

৭ নভেম্বর সকালে বিদ্রোহী সেনাসদস্যদের গুলিতে ও বেয়নেটের আঘাতে তাঁরা প্রাণ হারান। একদিকে মানুষের উচ্ছ্বাস, রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রত্যাশা ও নতুন আবেগ; অন্যদিকে মৃত্যু, সহিংসতা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার নির্মম বাস্তবতা। সেদিন উপলব্ধি করেছিলাম, ইতিহাসের কোনো মুহূর্তই একমাত্রিক নয়। একই সময়ে মানুষের আনন্দ, আশা, ভয়, শোক ও অনিশ্চয়তা পাশাপাশি অবস্থান করতে পারে।

ক্যান্টনমেন্ট এলাকার চিত্র ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় মানুষের যে উচ্ছ্বাস ও জনসমাগম দেখেছিলাম, ক্যান্টনমেন্ট এলাকার পরিস্থিতি ছিল তার থেকে ভিন্ন। সেখানে পরিবেশের মধ্যে ছিল অন্য ধরনের সামরিক বাস্তবতা, নিয়ন্ত্রণ ও সতর্কতা। শহরের জনতার আবেগ এবং ক্যান্টনমেন্টের পরিস্থিতির মধ্যে যে পার্থক্য ছিল, তা আমার কাছে বিশেষভাবে লক্ষণীয় মনে হয়েছিল।

একই শহর, একই দিন, অথচ বিভিন্ন এলাকায় ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতি—এ যেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। স্মৃতিতে অমলিন ৭ নভেম্বর গোটা ঢাকা শহরজুড়ে সেদিন ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব অধ্যায় রচিত হয়েছিল। শহরের বিভিন্ন জায়গায় যে দৃশ্য দেখেছি, তা আজও আমার স্মৃতিতে জীবন্ত। ট্রাকের ওপর হাজার হাজার মানুষ, ট্যাংকের ওপর ছাত্র-জনতা, মানুষের মিছিল, স্লোগান, রাজনৈতিক আবেগ এবং এক নতুন ভবিষ্যতের প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে ছিল এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা।

এক রাতের আতঙ্কের পর সকালে এমন অভূতপূর্ব জনসমাগমের মধ্যে নিজেকে আবিষ্কার করা ছিল আমার জীবনের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা। সেদিন আরও অনেক ঘটনা নিজের চোখে দেখেছি। সময়ের ব্যবধানে কিছু স্মৃতি অস্পষ্ট হয়েছে, কিন্তু অনেক দৃশ্য আজও চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তখন বুঝতে পারিনি, ইতিহাসের এত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়ের প্রত্যক্ষ সাক্ষী হয়ে যাচ্ছি।

আজ এত বছর পর জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ফিরে তাকালে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর আমার কাছে শুধু একটি রাজনৈতিক তারিখ নয়; এটি আমার ছাত্রজীবনের এক আবেগময়, উত্তাল ও স্মরণীয় দিন। সেদিনের তরুণ মনে যে অনুভূতি জন্মেছিল, তা আজও স্মৃতির গভীরে রয়ে গেছে। মনে হয়েছিল, দেশ নতুন করে স্বাধীন হলো, সিপাহি ও জনতা এক হয়ে গেছে এবং জিয়াউর রহমান দেশের নেতৃত্ব দেবেন।

এটি ছিল সেই সময়ের আমার ব্যক্তিগত অনুভূতি ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার প্রতিফলন। ইতিহাসের রাজনৈতিক মূল্যায়ন নিয়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীর স্মৃতি ইতিহাসের একটি মূল্যবান অংশ। আমি কোনো ইতিহাসবিদ নই। আমি সেই সময়ের একজন তরুণ ছাত্র, যিনি তাঁতীবাজারের নির্ঘুম রাত, ভোরের আতঙ্ক, পুরান ঢাকার পরিস্থিতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তাল পরিবেশ, ঢাকা কলেজের সামনে বন্ধুদের সঙ্গে নতুন আবেগ এবং সংসদ ভবন ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকার ভিন্ন বাস্তবতা নিজের চোখে দেখেছি।

আজ প্রায় অর্ধশতাব্দী পর সেই স্মৃতিগুলো লিখে রাখার চেষ্টা করছি। ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় লেখা থাকে না; ইতিহাস বেঁচে থাকে মানুষের চোখে দেখা ঘটনা, অনুভূতি ও স্মৃতির মধ্যে। আমি সেই দিনগুলো দেখেছি একজন তরুণ ছাত্র হিসেবে। আজ স্মরণ করছি একজন পরিণত মানুষ হিসেবে। ৭ নভেম্বর ১৯৭৫—আমার জীবনের এমন একটি দিন, যার স্মৃতি কখনো মুছে যাওয়ার নয়।

উপাচার্য, নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি একজন প্রত্যক্ষদর্শী, ঢাকা কলেজের তৎকালীন প্রথম বর্ষের ছাত্র।