সাগরের নোনা হাওয়ায় পতেঙ্গার লাল-সবুজ লেনে এখন গতি আর তারুণ্যের জয়গান। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) হাত ধরে গড়া দেশের প্রথম ডেডিকেটেড সাইকেল ট্র্যাকে মাত্র ২১ দিনেই সূচিত হয়েছে নতুন এক যুগ।
সঠিক নিরাপত্তা পেলে বন্দরনগরী যে পরিবেশবান্ধব যাতায়াতে প্রস্তুত—পতেঙ্গার ২.২ কিলোমিটার লেন আজ তারই স্মারক। তবে সাগরের তীরের এই ‘প্যাডেল বিপ্লব’কে কেবল পর্যটনে বন্দি না রেখে, পুরো বাণিজ্যিক নগরজুড়ে ‘সবুজ সড়কজাল’ বোনার জোরালো দাবি এখন নগরবাসীর কণ্ঠে। পতেঙ্গার লেনটি যখন শত শত রাইডারের স্বস্তির ঠিকানা, ঠিক তখনই উল্টো ছবি ধরা পড়ে নগরের মূল শিল্প ও বাণিজ্যিক ধমনীগুলোতে।
নগরের জিইসি, আগ্রাবাদ, চকবাজার, ইপিজেড কিংবা কালুরঘাট বেল্টে প্রতিদিন জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করেন প্রায় অর্ধলক্ষ কর্মজীবী মানুষ, পোশাক শ্রমিক আর শিক্ষার্থী। পতেঙ্গার এই ‘পাইলট প্রজেক্ট’ স্পষ্ট প্রমাণ করেছে—অবকাঠামো ও নিরাপত্তা পেলে সাধারণ মানুষ গণপরিবহনের ক্ষতিকর চাপ কমিয়ে দুই চাকার বাহনেই ভরসা রাখতে প্রস্তুত।
এমন বাস্তবতায় নগর পরিকল্পনাবিদরা মনে করেন, চট্টগ্রাম নগরের ট্রাফিক প্রবাহ ও ভৌগোলিক বিন্যাস বিশ্লেষণ করে আপাতত নয়টি পয়েন্টে সাইকেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করা সম্ভব:- পয়েন্টগুলো হলো- ১. ইপিজেড–আগ্রাবাদ এক্সেস করিডোর: লক্ষাধিক গার্মেন্টস শ্রমিকের দৈনন্দিন যাতায়াত খরচ একধাক্কায় শূন্যে নামিয়ে আনার নিরাপদ মাধ্যম। ২. সিআরবি–টাইগারপাস–এমএ আজিজ করিডোর: সিআরবি থেকে লালখান বাজার হয়ে স্টেডিয়াম এলাকা পর্যন্ত এক নান্দনিক ইকো-ট্যুরিজম ও হেলথ বেল্ট।
৩. সিডিএ এভিনিউ (জিইসি–২ নম্বর গেট–অক্সিজেন): নগরের ব্যস্ততম মূল ধমনীতে শিক্ষার্থী ও করপোরেট চাকরিজীবীদের জন্য সুরক্ষিত রুট। ৪. বহদ্দারহাট–কালুরঘাট রোড: কালুরঘাট শিল্পাঞ্চলের নিম্নআয়ের চাকরিজীবীদের সাশ্রয়ী ও দ্রুত যাতায়াতের স্থায়ী ব্যবস্থা। ৫. চকবাজার–জামালখান–আসকার দিঘীর পাড়: নগরীর প্রধান ‘এডুকেশন হাব’-এ হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীর যাতায়াত ব্যয় ও দুর্ঘটনা এড়ানোর মূল পথ।
৬. চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) ও সংযোগ রোড: পাহাড়ঘেরা বিশাল ক্যাম্পাসে অভ্যন্তরীণ যানবাহন কমিয়ে সবুজ ও যানজটমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিতকরণ। ৭.পতেঙ্গা–বিমানবন্দর–ড্রাইডক রোড: বিদ্যমান লেনটিকে ড্রাইডক মোড় পর্যন্ত বর্ধিত করে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগামী যাত্রী ও ভ্রমণপিপাসুদের জন্য বিশ্বমানের রুট। ৮. বায়েজিদ লিংক রোড (অক্সিজেন–কুয়াইশ): নতুন ভূমি অধিগ্রহণ ছাড়াই কেবল ডিভাইডার বা কালার পেইন্টিং করে দ্রুত ‘হিল-ভিউ সাইকেল ট্র্যাক’ চালুর অনন্য সুযোগ।
৯. ফয়েজ লেক–খুলশী–জাকির হোসেন রোড: পর্যটন ও শান্ত আবাসিক বেল্টে প্রাতঃভ্রমণকারী ও ফিটনেসপ্রেমীদের জন্য প্রথাবিরোধী গ্রিন ট্র্যাক। নগরবিদদের মতে, একটি আধুনিক ও টেকসই শহরের (Sustainable City) প্রধান শর্ত হলো পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী যাতায়াত। পতেঙ্গায় সফলভাবে সাইকেল ট্র্যাক পরিচালনা করে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন প্রমাণ করেছে, চট্টলাবাসী সবুজ যাতায়াতে প্রস্তুত।
নগরের ব্যস্ত রুটগুলোতে এই ‘পতেঙ্গা মডেল’ প্রসারিত হলে বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণ কমার পাশাপাশি ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় এক বৈপ্লবিক রূপান্তর আসবে। নগরের প্রবীণ বাসিন্দা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, পতেঙ্গার সফল সাইকেল ট্র্যাক এখন পুরো চট্টগ্রামজুড়ে ছড়িয়ে দেয়ার উপযুক্ত সময়। চসিকের দূরদর্শী নেতৃত্বেই সম্ভব পতেঙ্গা মডেলকে ভিত্তি করে আমাদের এই বাণিজ্যিক নগরীকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আধুনিক ও সাইকেলবান্ধব ‘ইকো-সিটি’তে রূপান্তর করা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, নগরীতে আরো সাইকেল ট্র্যাক করা এখন সমযের দাবি। চসিক প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেনকে এমন উদ্যোগের জন্য সাধুবাদ জানাই। ভারতের কোলকাতায় এমন অসংখ্য সাইকেল ট্র্যাক আছে। আমাদের চট্টগ্রাম নগরীতে এর সংখ্যা বাড়াতে পারলে যানজট কিছুটা কমবে।
তিনি বলেন, সিডিএ মেঘা প্রকল্পে সাইকেল ট্র্যাক কিভাবে করা যায়, তা নিয়ে আমরা চিন্তা করছি। একইসাথে নগরীর মাস্টারপ্ল্যানেও এই বিষয়টি রাখার জন্য কাজ করছি। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, বতর্মান বিমান বন্দর সড়কের সাইকেল ট্র্যাকটি পতেঙ্গা সীবিচ পর্যন্ত সম্প্রসারণ করার লক্ষ্যে চসিকের প্রকৌশলীরা করছেন।
সিডিএ ৩৬টি খাল চসিককে বুঝিয়ে দিলে এইসব খালের পাড়ে যেখানে সম্ভব, সেখানে সাইকেল ট্র্যাক করার পরিকল্পনা আমার আছে। একইসাথে নগরীর একসেস রোড সমূহে এবং আগ্রাবাদের সিডিএ এলাকায় নতুন রাস্তায় সিংগেল সাইকেল ট্র্যাক করা যায় কি-না আমরা চিন্তা করছি। সাইকেল ট্র্যাকের জন্য বিদেশী সংস্থার সাথে তহবিলের ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রশাসক বলেন, এ নিয়ে আমাদের পরিকল্পনা আছে।
মূলত উন্নত বিশ্বের উন্নত প্রযুক্তির খেসারত দিচ্ছে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো। আমরা কোন অপরাধ না করেও এর খেসারত দিচ্ছি। এই বিষয়টি মাথায় রেখে আগামীতে তুরস্কে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতিসংঘের জলবায়ু কপ-৩১ সম্মেলনে আমি এ ব্যাপারে বক্তব্য পাঠাব। মূলত শব্দ দূষন, বায়ু দূষনমুক্ত চট্টগ্রাম গড়তে এ সব কিছুই আমার পরিকল্পনায় আছে, তা বাস্তবায়নে আমরা নিরলসভাবে কাজ করছি।






















