আজ সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬
১৮ কার্তিক, ১৪৩৩ | ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
৩২°C
সর্বোচ্চ: ৩২°C
সর্বনিম্ন: ২৫°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৫৫%

কর্ণফুলীতে এস আলম গ্রুপের ৬ ইস্পাত কারখানা বন্ধ, বেকার ৬ হাজার শ্রমিক

  • MIT ERP
  • Update Time : 12:26:35 pm, Monday, 2 November 2026
  • 20

কর্ণফুলীতে এস আলম গ্রুপের ৬ ইস্পাত কারখানা বন্ধ, বেকার ৬ হাজার শ্রমিক

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে এস আলম গ্রুপের ছয়টি ইস্পাত কারখানা বন্ধ হয়ে রয়েছে। এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে প্রায় ৬ হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। ফলে উৎপাদন স্থবির হয়ে পড়ার পাশাপাশি ইস্পাতপণ্যের সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

অথচ কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, কারখানাগুলোর উৎপাদন অবকাঠামো এখনো রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, কয়েল আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলার সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে কারখানাগুলো আবারও চালু করা সম্ভব। বন্ধ কারখানাগুলো হলো এস আলম স্টিল, দুটি কোল্ড রোলড স্টিল ইউনিট, গ্যালকো স্টিল, কেমোন ইস্পাত ও ইনফিনিটি সিআর স্ট্রিপস। গত ২৪ জুলাই এস আলম গ্রুপ কর্ণফুলী এলাকায় তাদের ১১টি শিল্প ইউনিট বন্ধ করে দেয়।

এর মধ্যে ছিল এই ছয়টি ইস্পাত কারখানা। শ্রমিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এর ফলে মাসে প্রায় ৩০ কোটি টাকার মজুরি প্রদান বন্ধ হয়ে যায়। কারখানাগুলোতে চারটি গ্যালভানাইজিং উৎপাদন লাইন রয়েছে, যেগুলোর সম্মিলিত দৈনিক উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ৯৩০ টন। এ ছাড়া রয়েছে দুটি কোল্ড রোলিং মিল। প্রতিটির বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা ১ লাখ ২০ হাজার টন।

এসব কারখানায় ছাদ ও দেয়ালের জন্য গ্যালভানাইজড সিআই ও জিপি শিট, বাণিজ্যিক ভবন ও স্টিলের কাঠামোয় নির্মিত ভবনের জন্য রঙিন প্রলেপযুক্ত শিট, অন্যান্য গ্যালভানাইজিং কারখানা ও ঢেউটিন প্রস্তুতকারকদের ব্যবহারের জন্য কোল্ড-রোলড কয়েল এবং নির্মাণকাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন দীর্ঘ ইস্পাতপণ্য উৎপাদন করা হতো। দেশের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর মধ্যে ঘরের ছাউনি তৈরিতে গ্যালভানাইজড শিট বহুল ব্যবহৃত।

প্রতিষ্ঠানের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, গ্যালভানাইজিং ব্যবসার সম্পদের মূল্য ৩ হাজার ৯৩৪ কোটি টাকা এবং বার্ষিক টার্নওভার ১ হাজার ৫৪ কোটি টাকা। অন্যদিকে, ফ্ল্যাট রোলিং ব্যবসার সম্পদের মূল্য ২ হাজার ৬১২ কোটি টাকা এবং বার্ষিক টার্নওভার ৬৮৮ কোটি টাকা। কারখানাগুলোর উৎপাদন কার্যক্রম মূলত আমদানি করা কয়েলের ওপর নির্ভরশীল ছিল। গ্যালভানাইজিং ইউনিটগুলো অস্ট্রেলিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত ও চীন থেকে কয়েল সংগ্রহ করত।

পাশাপাশি, স্থানীয় মিল থেকেও এসব উপকরণ নেওয়া হতো। অন্যদিকে, রোলিং মিলগুলো জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, নেদারল্যান্ডস, রোমানিয়া, ভারত, তাইওয়ান ও চীন থেকে কয়েল আমদানি করত। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলোর দাবি, ইস্পাত কারখানাগুলো নিজেরা কখনো আর্থিক দায় পরিশোধে খেলাপি হয়নি। কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত তদারকির আওতায় কয়েল আমদানির জন্য এলসি খোলার সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে কারখানাগুলো পুনরায় চালু করা সম্ভব হবে।

সূত্রগুলো আরও জানায়, জাপান ও ইতালির প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতিতে নির্মিত এসব কারখানার উৎপাদন সরঞ্জাম বন্ধ থাকা অবস্থায়ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছে। কারখানাগুলো বন্ধ থাকায় ইস্পাতপণ্যের সরবরাহে ধীরগতি দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্ণফুলীর দক্ষিণাঞ্চলের ব্যবসায়ীরা। সাতকানিয়া ও লোহাগাড়ার হার্ডওয়্যারের দোকানগুলোতে পণ্য সরবরাহ করেন নুরুল হক।

তিনি বলেন, “শিট এখনো আসছে, তবে আরও দূরের জায়গা থেকে। সরবরাহ পেতেও বেশি দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এস আলম গ্রুপের কারখানাগুলো চালু না থাকায় সামগ্রিক নির্মাণশিল্প ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ” এস আলম গ্রুপের একটি গ্যালভানাইজিং উৎপাদন লাইনে ২১ বছর লাইন সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করেছেন ৪৭ বছর বয়সী আবুল কাশেম। তিনি বলেন, কারখানার উৎপাদন ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা হয়েছিল।

প্রথমে এক শিফটে উৎপাদন চলত। পরে কয়েক দিন পরপর এক শিফটে উৎপাদন করা হতো। একপর্যায়ে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় উৎপাদন। এই পুরো সময় কোম্পানি আমাদের বেতন দিয়েছে। উৎপাদন লাইনটি এখনো রয়েছে। বর্তমানে আমি আনোয়ারায় এক আত্মীয়ের দোকানে খণ্ডকালীন কাজ করছি। দীর্ঘদিনের কর্মস্থল আবার চালু হলে ফিরতে পারে আমাদের কর্মসংস্থানও। এদিকে দেশের বন্ধ কারখানাগুলো দ্রুত পুনরায় চালুর সম্ভাবনা যাচাই করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়ার তিন মাস পরও কর্ণফুলীর এই ছয়টি ইস্পাত কারখানা বন্ধ রয়েছে।

এর দুই মাস আগে বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের ১ হাজার ২০০টির বেশি বন্ধ বা আংশিক বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল। তবে কর্ণফুলীর কারখানাগুলো কবে নাগাদ পুনরায় চালু হবে, সে বিষয় এখনো ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

মঞ্চে আসছে ভিন্নধর্মী প্রযোজনা ‘ইনভিজিবল স্টোরিজ’

কর্ণফুলীতে এস আলম গ্রুপের ৬ ইস্পাত কারখানা বন্ধ, বেকার ৬ হাজার শ্রমিক

Update Time : 12:26:35 pm, Monday, 2 November 2026

কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে এস আলম গ্রুপের ছয়টি ইস্পাত কারখানা বন্ধ হয়ে রয়েছে। এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে প্রায় ৬ হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। ফলে উৎপাদন স্থবির হয়ে পড়ার পাশাপাশি ইস্পাতপণ্যের সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

অথচ কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, কারখানাগুলোর উৎপাদন অবকাঠামো এখনো রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, কয়েল আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলার সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে কারখানাগুলো আবারও চালু করা সম্ভব। বন্ধ কারখানাগুলো হলো এস আলম স্টিল, দুটি কোল্ড রোলড স্টিল ইউনিট, গ্যালকো স্টিল, কেমোন ইস্পাত ও ইনফিনিটি সিআর স্ট্রিপস। গত ২৪ জুলাই এস আলম গ্রুপ কর্ণফুলী এলাকায় তাদের ১১টি শিল্প ইউনিট বন্ধ করে দেয়।

এর মধ্যে ছিল এই ছয়টি ইস্পাত কারখানা। শ্রমিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এর ফলে মাসে প্রায় ৩০ কোটি টাকার মজুরি প্রদান বন্ধ হয়ে যায়। কারখানাগুলোতে চারটি গ্যালভানাইজিং উৎপাদন লাইন রয়েছে, যেগুলোর সম্মিলিত দৈনিক উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ৯৩০ টন। এ ছাড়া রয়েছে দুটি কোল্ড রোলিং মিল। প্রতিটির বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা ১ লাখ ২০ হাজার টন।

এসব কারখানায় ছাদ ও দেয়ালের জন্য গ্যালভানাইজড সিআই ও জিপি শিট, বাণিজ্যিক ভবন ও স্টিলের কাঠামোয় নির্মিত ভবনের জন্য রঙিন প্রলেপযুক্ত শিট, অন্যান্য গ্যালভানাইজিং কারখানা ও ঢেউটিন প্রস্তুতকারকদের ব্যবহারের জন্য কোল্ড-রোলড কয়েল এবং নির্মাণকাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন দীর্ঘ ইস্পাতপণ্য উৎপাদন করা হতো। দেশের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর মধ্যে ঘরের ছাউনি তৈরিতে গ্যালভানাইজড শিট বহুল ব্যবহৃত।

প্রতিষ্ঠানের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, গ্যালভানাইজিং ব্যবসার সম্পদের মূল্য ৩ হাজার ৯৩৪ কোটি টাকা এবং বার্ষিক টার্নওভার ১ হাজার ৫৪ কোটি টাকা। অন্যদিকে, ফ্ল্যাট রোলিং ব্যবসার সম্পদের মূল্য ২ হাজার ৬১২ কোটি টাকা এবং বার্ষিক টার্নওভার ৬৮৮ কোটি টাকা। কারখানাগুলোর উৎপাদন কার্যক্রম মূলত আমদানি করা কয়েলের ওপর নির্ভরশীল ছিল। গ্যালভানাইজিং ইউনিটগুলো অস্ট্রেলিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত ও চীন থেকে কয়েল সংগ্রহ করত।

পাশাপাশি, স্থানীয় মিল থেকেও এসব উপকরণ নেওয়া হতো। অন্যদিকে, রোলিং মিলগুলো জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, নেদারল্যান্ডস, রোমানিয়া, ভারত, তাইওয়ান ও চীন থেকে কয়েল আমদানি করত। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলোর দাবি, ইস্পাত কারখানাগুলো নিজেরা কখনো আর্থিক দায় পরিশোধে খেলাপি হয়নি। কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত তদারকির আওতায় কয়েল আমদানির জন্য এলসি খোলার সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে কারখানাগুলো পুনরায় চালু করা সম্ভব হবে।

সূত্রগুলো আরও জানায়, জাপান ও ইতালির প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতিতে নির্মিত এসব কারখানার উৎপাদন সরঞ্জাম বন্ধ থাকা অবস্থায়ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছে। কারখানাগুলো বন্ধ থাকায় ইস্পাতপণ্যের সরবরাহে ধীরগতি দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্ণফুলীর দক্ষিণাঞ্চলের ব্যবসায়ীরা। সাতকানিয়া ও লোহাগাড়ার হার্ডওয়্যারের দোকানগুলোতে পণ্য সরবরাহ করেন নুরুল হক।

তিনি বলেন, “শিট এখনো আসছে, তবে আরও দূরের জায়গা থেকে। সরবরাহ পেতেও বেশি দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এস আলম গ্রুপের কারখানাগুলো চালু না থাকায় সামগ্রিক নির্মাণশিল্প ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ” এস আলম গ্রুপের একটি গ্যালভানাইজিং উৎপাদন লাইনে ২১ বছর লাইন সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করেছেন ৪৭ বছর বয়সী আবুল কাশেম। তিনি বলেন, কারখানার উৎপাদন ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা হয়েছিল।

প্রথমে এক শিফটে উৎপাদন চলত। পরে কয়েক দিন পরপর এক শিফটে উৎপাদন করা হতো। একপর্যায়ে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় উৎপাদন। এই পুরো সময় কোম্পানি আমাদের বেতন দিয়েছে। উৎপাদন লাইনটি এখনো রয়েছে। বর্তমানে আমি আনোয়ারায় এক আত্মীয়ের দোকানে খণ্ডকালীন কাজ করছি। দীর্ঘদিনের কর্মস্থল আবার চালু হলে ফিরতে পারে আমাদের কর্মসংস্থানও। এদিকে দেশের বন্ধ কারখানাগুলো দ্রুত পুনরায় চালুর সম্ভাবনা যাচাই করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়ার তিন মাস পরও কর্ণফুলীর এই ছয়টি ইস্পাত কারখানা বন্ধ রয়েছে।

এর দুই মাস আগে বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের ১ হাজার ২০০টির বেশি বন্ধ বা আংশিক বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল। তবে কর্ণফুলীর কারখানাগুলো কবে নাগাদ পুনরায় চালু হবে, সে বিষয় এখনো ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।