বছর ঘুরে আবারও শুরু হয়েছে বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার ক্ষণগণনা। এর মধ্যে পূজার আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। শহর থেকে গ্রাম সবখানেই বিভিন্ন আয়োজন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার আনন্দ ভাগাভাগি ও প্রাণবন্ত করতে পাবনার ভাঙ্গুড়ায় যুগ যুগ ধরে চলে আসছে পূজার মেলা। শারদীয় দুর্গাপূজার বিজয়া দশমীর দিন উপজেলার বড়াল ও গুমাণী নদীতে দেওয়া হয় প্রতিমা বিসর্জ্জন। এ কারণে হাজার হাজার মানুষ ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে পূজার মেলা প্রাঙ্গণ।
মেলায় সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় মাটির তৈরি আকর্ষণীয় খেলনা ও গৃহস্থালি সামগ্রী। সারা বছর মৃৎশিল্পীদের কদর না থাকলেও শারদীয় দুর্গাপূজার মেলা উপলক্ষ্যে ভাঙ্গুড়া উপজেলার পাল পাড়ার নারী-পুরুষ-শিশু সব বয়সী মৃৎশিল্পের কারিগররা দিন-রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। কেউ মাটি ঘুটছেন, কেউ সেই মাটি ছাঁচে দিয়ে তৈজসপত্র তৈরি করছেন। কেউবা খেলনা শুকানোর পর রং–তুলির আঁচড় দিচ্ছেন।
পূজার মেলা ঘিরে শিশুদের খেলনার পাশাপাশি কিছু নারীরাও তৈরি করছেন মসলা রাখার পাত্র, হাঁড়ি এবং দেয়ালে ঝোলানো শোপিস। যদিও আধুনিকতার ছোঁয়া ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তাঁদের অনেকে পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন। তবুও বংশ পরম্পরায় এবং জীবিকা নির্বাহের তাগিদে অনেকেই এখনো মৃৎশিল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। বছরের অধিকাংশ সময় তাদের তেমন ব্যস্ততা না থাকলেও, দুর্গাপূজার সময়ে তাদের ব্যস্ততা বেড়ে যায় কয়েকগুণ।
এসব পণ্যের বাহারি নকশা আর মাটির নিজস্ব গন্ধ পূজার আমেজ চারিদিকে ছড়িয়ে দিচ্ছে। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সরেজমিনে ভাঙ্গুড়া উপজেলার পালপাড়া ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন কারুকাজ করে মাটির তৈরি তৈজসপত্র ও খেলনা তৈরির পর রং দিয়ে সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন মৃৎশিল্পীরা। কারিগরদের হাতের ছোঁয়ায় গড়ে উঠছে মাটির পুতুল, হাতি, ঘোড়া, পাখি, হাঁস-মুরগি, মাটির ব্যাংক, চায়ের কাপ, পিঠা তৈরির ছাঁচ, নানা জাতের ফুল, ফুলদানি, হাঁড়ি-পাতিল, প্রদীপ, কলস, খেলনাসহ মাটির বিভিন্ন তৈজসপত্র।
জানা গেছে, সারা বছর তেমন আয় না হলেও পূজার মেলায় মাটির তৈজসপত্র বিক্রি করে বেশ আয় করেন মৃৎশিল্পীরা। মৃৎশিল্পীদের হাতের কারুকাজ তৈজসপত্র গ্রামীণ মেলাতে মুগ্ধতা ছড়ায়। যা ছোট বড় সব বয়সীদেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কলস, হাঁড়ি, মটকা, বাসন, ডালা ও পুতুল তৈরি করেন স্থানীয় মৃৎশিল্পীরা। প্লাস্টিকের জন্য মাটির খেলনা আগের মতো বিক্রি না হলেও দুর্গাপূজার মেলায় মাটির এসব খেলনার কদর থাকে বেশ।
ভাঙ্গুড়া পৌর শহরের কালীবাড়ি পাল পাড়ার মৃৎশিল্পী শ্রী সাধন চন্দ্র পাল জানান, একটা সময় মৃৎশিল্পীদের কদর থাকলেও সময়ের পরিবর্তনে সেই কদর কমেছে। এখন আর আমাদের সমৃদ্ধির আশা নেই। পূর্ব পুরুষের কাছ থেকে শেখা কাজের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও শিকড়ের টানে এখনো আঁকড়ে ধরে আছি। প্রতিবারের মতো এবারও পূজার মেলায় বিক্রির জন্য হরিণ, হাতি, গরু, ঘোড়া, খরগোশ, উটপাখি, হাঁস, বক, টিয়াসহ নানা ধরনের খেলনা তৈরি করছি।
প্লাস্টিক আর স্টিলের ভিড়ে তাঁদের এই মাটির পণ্য এখনো টিকে আছে শুধুমাত্র মানুষের ভালোবাসার কারণে। এ ব্যাপারে কবি, সাংবাদিক ও সমাজকর্মী এস এম নাহিদ হাসান রুপালী বাংলাদেশকে বলেন, প্রযুক্তির উন্নয়নে মাটির তৈরি জিনিসের বদলে বাজার দখল করছে প্লাস্টিক, অ্যালুমিনিয়াম, স্টিল ও সিরামিকে। তাই আধুনিক তৈজসপত্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে মাটির তৈরি অনেক পণ্য হারিয়েই গেছে।
ঐতিহ্যের স্বার্থে আমাদের মৃৎশিল্পের সোনালি দিন ফিরিয়ে আনতে হবে।






















