আজ বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬
২১ আশ্বিন, ১৪৩৩ | ২৪ রবিউস সানি ১৪৪৮
ঢাকা
পরিষ্কার আকাশ
২৭°C
সর্বোচ্চ: ৩৫°C
সর্বনিম্ন: ২৭°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৬৯%

শিক্ষকের মর্যাদা ফিরলেই জাগবে শিক্ষা

  • MIT ERP
  • Update Time : 03:40:02 am, Wednesday, 7 October 2026
  • 24

শিক্ষকের মর্যাদা ফিরলেই জাগবে শিক্ষা

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

বিশ্ব শিক্ষক দিবস শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের কান্ডারি শিক্ষকদের সম্মান জানানোর এবং তাদের অধিকার ও মর্যাদার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির এক বৈশ্বিক উদযাপন। মানবজাতির টেকসই ভবিষ্যৎ এবং মেধা ও মূল্যবোধ গঠনের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের অবদান অপরিসীম।

এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা যাক। ঐতিহাসিক ভিত্তি : ১৯৬৬ সালের ৫ অক্টোবর প্যারিসে ইউনেস্কো এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক বিশেষ আন্তঃসরকারি সম্মেলনে শিক্ষকদের অধিকার, মর্যাদা, দায়িত্ব এবং কর্মপরিবেশ সংক্রান্ত একটি ঐতিহাসিক সুপারিশ গৃহীত হয়। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা : পরবর্তীতে ১৯৯৪ সালে ইউনেস্কো ৫ অক্টোবরকে ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে।

এরপর থেকেই প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী দিবসটি উদযাপিত হয়ে আসছে। মূল উদ্দেশ্য : মানসম্মত শিক্ষা বাস্তবায়নে শিক্ষকদের অধিকার রক্ষা, যথাযথ প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা, সম্মানজনক অর্থনৈতিক মর্যাদা প্রদান এবং শিক্ষার সার্বিক উন্নয়নে সমাজ ও সরকারের দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেওয়া। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষকদের ভূমিকা বাংলাদেশ একটি উদীয়মান ও দ্রুত বিকাশমান দেশ, যেখানে মানবসম্পদ উন্নয়নই উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি।

এই মানবসম্পদ গড়ার পেছনে বাংলাদেশের শিক্ষকদের অবদান অনস্বীকার্য। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কান্ডারি : গ্রামীণ ও শহরÑউভয় অঞ্চলেই শিক্ষক সমাজ কেবল পাঠদানের মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ থাকেন না, বরং সামাজিক চেতনাবোধ তৈরি, বাল্যবিবাহ রোধ, নিরক্ষরতা দূরীকরণ এবং সামাজিক মূল্যবোধ সংরক্ষণে অন্যতম ভূমিকা পালন করেন।

জাতীয় দুর্যোগে সহায়ক : দেশব্যাপী বিভিন্ন জাতীয় কর্মকা-, সংক্রামক ব্যাধি বা দুর্যোগের সময়ে সচেতনতামূলক প্রচারণায় শিক্ষক সমাজ সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছেন বাংলাদেশের শিক্ষকদের বর্তমান সংকট ও চ্যালেঞ্জ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাক্ষেত্রে নানা ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও বাংলাদেশের শিক্ষক সমাজ এখনো বহু মৌলিক সংকট ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি: বৈষম্যমূলক বেতন কাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা : সরকারি ও বেসরকারি (এমপিওভুক্ত) শিক্ষকদের বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার মধ্যে বিশাল পার্থক্য বিদ্যমান।

বহু বেসরকারি ও ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষক স্বল্প ও অনিশ্চিত ভাতায় জীবনযাপন করেন, যা বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় মোটেও পর্যাপ্ত নয়। শিক্ষার গুণগত মান ও প্রশিক্ষণের অভাব : দ্রুত পরিবর্তিত প্রযুক্তির যুগে শিক্ষকদের আধুনিক প্যাডাগোজি, আইসিটি এবং তথ্য-প্রযুক্তিতে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের সুযোগ এখনো সার্বজনীন হয়ে ওঠেনি। অবকাঠামোগত সীমা ও বড় শ্রেণিকক্ষ : অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাত সঠিক নয়।

একটি শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর উপস্থিতি শিক্ষকের পক্ষে মানসম্মত মনোযোগ দেওয়া কঠিন করে তোলে। সামাজিক মর্যাদা ও পেশাগত নিরাপত্তা : সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা হ্রাস এবং অনেক ক্ষেত্রে পেশাগত নিরাপত্তার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা উদীয়মান তরুণদের মধ্যে শিক্ষাকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার আগ্রহ কমায়। ভবিষ্যৎ ভাবনায় করণীয় শিক্ষাব্যবস্থার রূপান্তর ও একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার জন্য শিক্ষকদের অবস্থা ও জীবনযাত্রার মান উন্নত করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

একমুখী ও বৈষম্যহীন নীতিমালা : এমপিওভুক্ত ও নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জীবনযাত্রার মান নিশ্চিতে জাতীয় স্কেলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি সমন্বিত বেতন কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। মানসম্মত ও সার্বিক প্রশিক্ষণ : শিক্ষকদের তথ্যপ্রযুক্তি এবং আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতির ওপর বিশ্বমানের ও নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। মেধাবীদের শিক্ষকতায় আকর্ষণ : যোগ্যতা অনুযায়ী আকর্ষণীয় সুযোগ-সুবিধা এবং সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির মাধ্যমে তরুণ মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

পেশাগত স্বাধীনতা ও মর্যাদা সংরক্ষণ : শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের সম্মান, সম্মানজনক অবসর সুবিধা এবং নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা জরুরি। ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’ কেবল আনুষ্ঠানিক উদযাপনের মধ্যদিয়ে সীমাবদ্ধ না রেখে শিক্ষকদের মর্যাদা, ন্যায্য দাবি এবং জীবনের বাস্তব সমস্যাগুলো দূর করার অঙ্গীকার নেওয়ার দিন।

রাষ্ট্র ও সমাজের সার্বিক সহযোগিতায় আমাদের শিক্ষকরা যখন পূর্ণ মর্যাদা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে পাঠদান করতে পারবেন, তখনই একটি শিক্ষিত, মানবিক ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। বিশ্ব শিক্ষক দিবসে বর্তমান সরকারের করণীয় বিষয়াদি ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’ কেবল প্রথাগত সভা-সমাবেশ বা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার দিন নয়।

শিক্ষার মানোন্নয়ন ও একটি স্বনির্ভর জাতি গঠনের মূল কারিগর হচ্ছেনÑ শিক্ষকসমাজ। তাই ইউনেস্কোর সুপারিশ ও বর্তমান যুগের চাহিদা বিবেচনায় রেখে শিক্ষক দিবসে সরকারের জন্য বেশকিছু স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক, আর্থিক ও নীতিনির্ধারণী পদক্ষেপ গ্রহণ করা অতীব জরুরি। শিক্ষাকে জাতীয় উন্নয়নের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের খাত হিসেবে বিবেচনা করে এ খাতে বাজেট বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে জিডিপির তুলনায় বরাদ্দ আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় কম। এই বাস্তবতায় শিক্ষার বাজেট ধীরে ধীরে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতি গুরুত্ব বহন করে। পাশাপাশি দেশের গ্রামীণ ও প্রান্তিক এলাকার জরাজীর্ণ প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কলেজগুলোর অবকাঠামো সংস্কার এবং আধুনিকায়নের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নের ক্ষেত্রে শুধু সার্টিফিকেটনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের বিশ্ববাজারের উপযোগী দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কম্পিউটার কোডিংয়ের মতো বিষয়ে শিক্ষার্থীদের পরিচিত করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

একই সঙ্গে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও কর্মবাজারের প্রয়োজন বিবেচনায় নতুন ভাষা শেখার সুযোগ সম্প্রসারণের কথা বলা হয়েছে। কারিগরি ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার প্রসারও এই পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিটি উপজেলায় কারিগরি ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র কিংবা পলিটেকনিক শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো গেলে শিক্ষার্থীদের দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সহজ হবে।

শিক্ষার মানোন্নয়নের অন্যতম প্রধান শর্ত শিক্ষকসমাজের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, বেতন কাঠামো পুনর্মূল্যায়ন এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে কার্যকর নীতি গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষক নিয়োগে মেধা ও যোগ্যতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দলীয় প্রভাবমুক্ত ও স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।

আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতি ও প্রযুক্তির সঙ্গে শিক্ষকদের পরিচিত করে তুলতে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের সুযোগও সম্প্রসারণ করা জরুরি। শিক্ষার সুযোগ সবার জন্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঝরে পড়া রোধের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। আর্থ-সামাজিক সংকটের কারণে যাতে কোনো মেধাবী শিশু শিক্ষার মূল স্রোত থেকে ছিটকে না পড়ে, সে জন্য দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের শিশুদের জন্য শিক্ষা সহায়তার পাশাপাশি বিনামূল্যে শিক্ষা ও পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

একই সঙ্গে নারী শিক্ষার প্রসারে প্রতিটি উপজেলায় অন্তত একটি নারী কলেজকে পর্যায়ক্রমে জাতীয়করণসহ প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেÑ মেয়েদের উচ্চশিক্ষার পথ আরও সুগম হবে। শিক্ষার পরিবেশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও মেধানির্ভর করাও জরুরি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের পরিবর্তে সুস্থ রাজনৈতিক চর্চা, শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ এবং শিক্ষার্থীদের মুক্ত-চিন্তার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে তরুণদের নতুন জ্ঞান ও প্রযুক্তি সৃষ্টিতে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা তহবিল গড়ে তোলা গেলে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষকদের বৈশ্বিক জ্ঞানভান্ডারে আরও কার্যকর অবদান রাখার সুযোগ তৈরি হবে।

সব মিলিয়ে ‘অবহেলিত শিক্ষাকে জাগ্রত করার অঙ্গীকার’-এর মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ শিক্ষক, কারিগরি শিক্ষা, গবেষণা এবং সমান সুযোগÑ সবকিছু একই ধারায় এগিয়ে যাবে। শিক্ষা শুধু সনদ অর্জনের মাধ্যম না হয়ে যেন দক্ষতা, মানবিকতা, সৃজনশীলতা ও কর্মসংস্থানের ভিত্তি হয়ে ওঠে, সেই লক্ষ্যেই প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবমুখী পরিকল্পনা।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

শিক্ষকের মর্যাদা ফিরলেই জাগবে শিক্ষা

Update Time : 03:40:02 am, Wednesday, 7 October 2026

বিশ্ব শিক্ষক দিবস শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের কান্ডারি শিক্ষকদের সম্মান জানানোর এবং তাদের অধিকার ও মর্যাদার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির এক বৈশ্বিক উদযাপন। মানবজাতির টেকসই ভবিষ্যৎ এবং মেধা ও মূল্যবোধ গঠনের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের অবদান অপরিসীম।

এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা যাক। ঐতিহাসিক ভিত্তি : ১৯৬৬ সালের ৫ অক্টোবর প্যারিসে ইউনেস্কো এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক বিশেষ আন্তঃসরকারি সম্মেলনে শিক্ষকদের অধিকার, মর্যাদা, দায়িত্ব এবং কর্মপরিবেশ সংক্রান্ত একটি ঐতিহাসিক সুপারিশ গৃহীত হয়। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা : পরবর্তীতে ১৯৯৪ সালে ইউনেস্কো ৫ অক্টোবরকে ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে।

এরপর থেকেই প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী দিবসটি উদযাপিত হয়ে আসছে। মূল উদ্দেশ্য : মানসম্মত শিক্ষা বাস্তবায়নে শিক্ষকদের অধিকার রক্ষা, যথাযথ প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা, সম্মানজনক অর্থনৈতিক মর্যাদা প্রদান এবং শিক্ষার সার্বিক উন্নয়নে সমাজ ও সরকারের দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেওয়া। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষকদের ভূমিকা বাংলাদেশ একটি উদীয়মান ও দ্রুত বিকাশমান দেশ, যেখানে মানবসম্পদ উন্নয়নই উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি।

এই মানবসম্পদ গড়ার পেছনে বাংলাদেশের শিক্ষকদের অবদান অনস্বীকার্য। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কান্ডারি : গ্রামীণ ও শহরÑউভয় অঞ্চলেই শিক্ষক সমাজ কেবল পাঠদানের মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ থাকেন না, বরং সামাজিক চেতনাবোধ তৈরি, বাল্যবিবাহ রোধ, নিরক্ষরতা দূরীকরণ এবং সামাজিক মূল্যবোধ সংরক্ষণে অন্যতম ভূমিকা পালন করেন।

জাতীয় দুর্যোগে সহায়ক : দেশব্যাপী বিভিন্ন জাতীয় কর্মকা-, সংক্রামক ব্যাধি বা দুর্যোগের সময়ে সচেতনতামূলক প্রচারণায় শিক্ষক সমাজ সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছেন বাংলাদেশের শিক্ষকদের বর্তমান সংকট ও চ্যালেঞ্জ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাক্ষেত্রে নানা ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও বাংলাদেশের শিক্ষক সমাজ এখনো বহু মৌলিক সংকট ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি: বৈষম্যমূলক বেতন কাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা : সরকারি ও বেসরকারি (এমপিওভুক্ত) শিক্ষকদের বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার মধ্যে বিশাল পার্থক্য বিদ্যমান।

বহু বেসরকারি ও ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষক স্বল্প ও অনিশ্চিত ভাতায় জীবনযাপন করেন, যা বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় মোটেও পর্যাপ্ত নয়। শিক্ষার গুণগত মান ও প্রশিক্ষণের অভাব : দ্রুত পরিবর্তিত প্রযুক্তির যুগে শিক্ষকদের আধুনিক প্যাডাগোজি, আইসিটি এবং তথ্য-প্রযুক্তিতে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের সুযোগ এখনো সার্বজনীন হয়ে ওঠেনি। অবকাঠামোগত সীমা ও বড় শ্রেণিকক্ষ : অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাত সঠিক নয়।

একটি শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর উপস্থিতি শিক্ষকের পক্ষে মানসম্মত মনোযোগ দেওয়া কঠিন করে তোলে। সামাজিক মর্যাদা ও পেশাগত নিরাপত্তা : সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা হ্রাস এবং অনেক ক্ষেত্রে পেশাগত নিরাপত্তার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা উদীয়মান তরুণদের মধ্যে শিক্ষাকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার আগ্রহ কমায়। ভবিষ্যৎ ভাবনায় করণীয় শিক্ষাব্যবস্থার রূপান্তর ও একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার জন্য শিক্ষকদের অবস্থা ও জীবনযাত্রার মান উন্নত করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

একমুখী ও বৈষম্যহীন নীতিমালা : এমপিওভুক্ত ও নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জীবনযাত্রার মান নিশ্চিতে জাতীয় স্কেলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি সমন্বিত বেতন কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। মানসম্মত ও সার্বিক প্রশিক্ষণ : শিক্ষকদের তথ্যপ্রযুক্তি এবং আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতির ওপর বিশ্বমানের ও নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। মেধাবীদের শিক্ষকতায় আকর্ষণ : যোগ্যতা অনুযায়ী আকর্ষণীয় সুযোগ-সুবিধা এবং সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির মাধ্যমে তরুণ মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

পেশাগত স্বাধীনতা ও মর্যাদা সংরক্ষণ : শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের সম্মান, সম্মানজনক অবসর সুবিধা এবং নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা জরুরি। ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’ কেবল আনুষ্ঠানিক উদযাপনের মধ্যদিয়ে সীমাবদ্ধ না রেখে শিক্ষকদের মর্যাদা, ন্যায্য দাবি এবং জীবনের বাস্তব সমস্যাগুলো দূর করার অঙ্গীকার নেওয়ার দিন।

রাষ্ট্র ও সমাজের সার্বিক সহযোগিতায় আমাদের শিক্ষকরা যখন পূর্ণ মর্যাদা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে পাঠদান করতে পারবেন, তখনই একটি শিক্ষিত, মানবিক ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। বিশ্ব শিক্ষক দিবসে বর্তমান সরকারের করণীয় বিষয়াদি ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’ কেবল প্রথাগত সভা-সমাবেশ বা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার দিন নয়।

শিক্ষার মানোন্নয়ন ও একটি স্বনির্ভর জাতি গঠনের মূল কারিগর হচ্ছেনÑ শিক্ষকসমাজ। তাই ইউনেস্কোর সুপারিশ ও বর্তমান যুগের চাহিদা বিবেচনায় রেখে শিক্ষক দিবসে সরকারের জন্য বেশকিছু স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক, আর্থিক ও নীতিনির্ধারণী পদক্ষেপ গ্রহণ করা অতীব জরুরি। শিক্ষাকে জাতীয় উন্নয়নের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের খাত হিসেবে বিবেচনা করে এ খাতে বাজেট বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে জিডিপির তুলনায় বরাদ্দ আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় কম। এই বাস্তবতায় শিক্ষার বাজেট ধীরে ধীরে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতি গুরুত্ব বহন করে। পাশাপাশি দেশের গ্রামীণ ও প্রান্তিক এলাকার জরাজীর্ণ প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কলেজগুলোর অবকাঠামো সংস্কার এবং আধুনিকায়নের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নের ক্ষেত্রে শুধু সার্টিফিকেটনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের বিশ্ববাজারের উপযোগী দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কম্পিউটার কোডিংয়ের মতো বিষয়ে শিক্ষার্থীদের পরিচিত করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

একই সঙ্গে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও কর্মবাজারের প্রয়োজন বিবেচনায় নতুন ভাষা শেখার সুযোগ সম্প্রসারণের কথা বলা হয়েছে। কারিগরি ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার প্রসারও এই পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিটি উপজেলায় কারিগরি ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র কিংবা পলিটেকনিক শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো গেলে শিক্ষার্থীদের দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সহজ হবে।

শিক্ষার মানোন্নয়নের অন্যতম প্রধান শর্ত শিক্ষকসমাজের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, বেতন কাঠামো পুনর্মূল্যায়ন এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে কার্যকর নীতি গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষক নিয়োগে মেধা ও যোগ্যতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দলীয় প্রভাবমুক্ত ও স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।

আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতি ও প্রযুক্তির সঙ্গে শিক্ষকদের পরিচিত করে তুলতে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের সুযোগও সম্প্রসারণ করা জরুরি। শিক্ষার সুযোগ সবার জন্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঝরে পড়া রোধের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। আর্থ-সামাজিক সংকটের কারণে যাতে কোনো মেধাবী শিশু শিক্ষার মূল স্রোত থেকে ছিটকে না পড়ে, সে জন্য দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের শিশুদের জন্য শিক্ষা সহায়তার পাশাপাশি বিনামূল্যে শিক্ষা ও পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

একই সঙ্গে নারী শিক্ষার প্রসারে প্রতিটি উপজেলায় অন্তত একটি নারী কলেজকে পর্যায়ক্রমে জাতীয়করণসহ প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেÑ মেয়েদের উচ্চশিক্ষার পথ আরও সুগম হবে। শিক্ষার পরিবেশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও মেধানির্ভর করাও জরুরি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের পরিবর্তে সুস্থ রাজনৈতিক চর্চা, শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ এবং শিক্ষার্থীদের মুক্ত-চিন্তার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে তরুণদের নতুন জ্ঞান ও প্রযুক্তি সৃষ্টিতে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা তহবিল গড়ে তোলা গেলে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষকদের বৈশ্বিক জ্ঞানভান্ডারে আরও কার্যকর অবদান রাখার সুযোগ তৈরি হবে।

সব মিলিয়ে ‘অবহেলিত শিক্ষাকে জাগ্রত করার অঙ্গীকার’-এর মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ শিক্ষক, কারিগরি শিক্ষা, গবেষণা এবং সমান সুযোগÑ সবকিছু একই ধারায় এগিয়ে যাবে। শিক্ষা শুধু সনদ অর্জনের মাধ্যম না হয়ে যেন দক্ষতা, মানবিকতা, সৃজনশীলতা ও কর্মসংস্থানের ভিত্তি হয়ে ওঠে, সেই লক্ষ্যেই প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবমুখী পরিকল্পনা।