দুর্নীতি কোনো রাষ্ট্রের জন্য শুধু একটি আইনগত বা নৈতিক সমস্যা নয়; এটি অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সুশাসন, সামাজিক ন্যায়বিচার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা এবং জনগণের আস্থার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
দুর্নীতির কারণে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় হয়, সরকারি সেবার ব্যয় বৃদ্ধি পায়, যোগ্যতার পরিবর্তে অনৈতিক সুবিধা প্রাধান্য পায় এবং সাধারণ নাগরিক তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে হয়। দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের প্রচলিত ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো, অপরাধ শনাক্ত করা, তদন্ত করা, মামলা করা এবং অপরাধ প্রমাণিত হলেÑ শাস্তি দেওয়া।
কিন্তু এর সীমাবদ্ধতা হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি দুর্নীতি সংঘটিত হওয়ার পর সক্রিয় হয়। অন্যদিকে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হলোÑ দুর্নীতি সংঘটিত হওয়ার পূর্বেই তার সুযোগ হ্রাস করা যে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করে, সেটিকে পরিবর্তন করা, অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত ক্ষমতা, অস্পষ্ট নিয়ম, দুর্বল পর্যবেক্ষণ এবং যে অস্বচ্ছতা রয়েছে সেসব জায়গা আগে থেকেই চিহ্নিত করা।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ ও শাস্তি অপরিহার্য হলেও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ফলের জন্য প্রতিরোধকে দুর্নীতি দমন কৌশলের কেন্দ্রীয় দর্শনে পরিণত করা প্রয়োজন। কোনো দেশের দুর্নীতির বর্তমান অবস্থা বোঝার ক্ষেত্রে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের করাপশন পারসেপশন ইনডেক্স (সিপিআই) একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সূচক। সিপিআই ২০২৫-এ বাংলাদেশ ১০০-এর মধ্যে ২৪ পয়েন্ট পেয়ে ১৮২টি দেশের মধ্যে ১৫০তম অবস্থানে রয়েছে।
তবে সিপিআইয়ের স্কোর বা অবস্থানকে সাধারণ মানুষের ঘুষ প্রদানের অভিজ্ঞতার সরাসরি প্রতিফলন হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না। সিপিআই মূলত বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীদের দৃষ্টিতে সরকারি খাতে দুর্নীতির ‘অনুভূত মাত্রা’ পরিমাপ করে; এটি জনগণ বাস্তবে কতবার ঘুষ দিয়েছে বা কতটি দুর্নীতির ঘটনার সম্মুখীন হয়েছে তার হিসাব করে না। দুর্নীতির আসল চিত্র পেতে হলেÑ শুধু দুর্নীতির উপলব্ধি নয়, নাগরিকদের বাস্তব অভিজ্ঞতার দিকে নজর দিতে হবে।
নভেম্বর ২০২৪ থেকে অক্টোবর ২০২৫ পর্যন্ত, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সেবা খাতে দুর্নীতির বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রকাশিত ২০২৫ সালের জাতীয় খানা জরিপ প্রতিবেদনে দুর্নীতি সম্পর্কে মোট ১৫,৭১৫টি পরিবারের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। জরিপে দেখা যায়, ৮১.৬ শতাংশ পরিবার অন্তত একটি সেবা খাতে দুর্নীতির অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে এবং ৬৩.৬ শতাংশ পরিবার ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছে।
এখানে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য হলোÑ ঘুষ প্রদানকারী পরিবার বলেছে, ঘুষ না দিলে সেবা পাওয়া যায় না। দুর্নীতি একটি অপরাধ; তাই দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগ, তদন্ত, বিচার এবং অপরাধীর শাস্তি অপরিহার্য। আইন প্রয়োগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হলো, দুর্নীতির সঙ্গে ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং সমাজে এই বার্তা প্রতিষ্ঠা করা যে সরকারি ক্ষমতা বা দায়িত্বের অপব্যবহারের পরিণতি রয়েছে।
কিন্তু দুর্নীতির সব ঘটনা আইন প্রয়োগের আওতায় আসে না। অনেক দুর্নীতি গোপনে সংঘটিত হয় এবং ভুক্তভোগী বা প্রত্যক্ষদর্শী অভিযোগ করতে ভয় পান। কোথাও অভিযোগ করার নিরাপদ ব্যবস্থা থাকে না, কোথাও প্রমাণ সংগ্রহ কঠিন, আবার কোথাও ক্ষুদ্র অনিয়মকে মানুষ দৈনন্দিন সেবার অংশ হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হয়। ফলে শুধু মামলা ও শাস্তির পরিসংখ্যান দিয়ে একটি দেশের দুর্নীতির প্রকৃত চিত্র বা দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের সাফল্য পরিমাপ করা যায় না।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোÑ সমাজের অধিকাংশ মানুষ মনে করে যে ‘সবাই দুর্নীতি করে’, ‘ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না’ অথবা ‘অভিযোগ করে লাভ নেই’, তাই দুর্নীতি একটি সামাজিক আচরণে পরিণত হওয়ার মতো হয়ে গেছে। শুধু আইন প্রয়োগের ওপর নির্ভর করে দুর্নীতি স্থায়ীভাবে কমিয়ে আনা কঠিন।
একজন দুর্নীতিবাজকে শাস্তি দেওয়া হলে একটি ঘটনা নিষ্পত্তি হয়; কিন্তু যে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার দুর্বল নিয়ন্ত্রণ, অতিরিক্ত বিবেচনাধিকার, অস্বচ্ছতা বা যে জটিলতার সুযোগে দুর্নীতিটি সংঘটিত হয়েছিল, সেই ব্যবস্থার পরিবর্তন না হলে একই ধরনের দুর্নীতি আবার ঘটতে পারে। অর্থাৎ ব্যক্তি পরিবর্তিত হলেও দুর্নীতির সুযোগটি থেকে যায়।
সমাজবিজ্ঞানের মতে দুর্নীতি কমাতে একই সঙ্গে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে দুর্নীতির সুযোগ কমানো, সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, ব্যক্তির বিবেচনাধিকার যথাসম্ভব নিয়মের মধ্যে আনা, কার্যকর নজরদারি, নিশ্চিত জবাবদিহি, নাগরিকের অংশগ্রহণ এবং সামাজিকভাবে সততাকে উৎসাহিত করা। অর্থাৎ দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণকে শুধু ‘অপরাধী ধরার ব্যবস্থা’ হিসেবে না দেখে দুর্নীতির অনুকূল পরিবেশ পরিবর্তনের প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা অধিক কার্যকর।
দুর্নীতি প্রতিরোধে বাংলাদেশ দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইনি ক্ষমতা প্রয়োগের পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে তবে তা দুর্নীতি প্রতিরোধে এখনো উল্লেখযোগ্য কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। গণশুনানি, মহানগর, জেলা, উপজেলা পর্যায়ে গঠিত দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটিসমূহ দুর্নীতি প্রতিরোধে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।
এ সমস্ত কমিটির জেলা-উপজেলা পর্যায়ে বসার কোনো শোভন ব্যবস্থা নেই, নেই কোনো অর্থ সংস্থান যার মাধ্যমে কোনো সভা, সিম্পোজিয়াম বা দুর্নীতিবিরোধী প্রচারণা পরিচালিত করা যায়। তাছাড়া এ সমস্ত কমিটির সদস্য নির্বাচনে সমাজে প্রভাব বিস্তার করতে পারে এমন ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি নেই বললেই চলে এবং একই ব্যক্তি অনেক বছর ধরে কমিটিতে থাকেন। দুর্নীতি প্রতিরোধের বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনের একক দায়িত্ব হিসেবে না দেখে একে সব মন্ত্রণালয়, দপ্তর, অধিদপ্তর, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা এবং জনগণের অংশগ্রহণমূলক কার্যক্রমে পরিণত করতে হবে।
কার্যকরভাবে দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সেবাক্ষেত্রে ‘করাপশন রিক্স অ্যাসেসমেন্ট বা দুর্নীতির ঝুঁকি মূল্যায়ন’ চালু করতে হবে। কোন সেবায় ঘুষের অভিযোগ বেশি, কোথায় কর্মকর্তার ব্যক্তিগত বিবেচনাধিকার বেশি, কোথায় অর্থের পরিমাণ বড়, কোথায় একক কর্মকর্তার হাতে সিদ্ধান্তের ক্ষমতা বেশি এবং কোথায় নাগরিকের অভিযোগের সুযোগ কম এসব বিষয় বিশ্লেষণ করে উচ্চ ঝুঁকির ক্ষেত্র চিহ্নিত করা যেতে পারে।
ঝুঁকি শনাক্ত হওয়ার পর প্রতিটি ঝুঁকির জন্য নির্দিষ্ট প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সরলীকরণ করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় অনুমোদন, অতিরিক্ত কাগজপত্র, একাধিক দপ্তরে যাতায়াত এবং দীর্ঘসূত্রতা দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি করে। তাই কোন সেবার জন্য কতটি ধাপ প্রয়োজন, কোন ধাপটি বাদ দেওয়া যায়, কোন অনুমোদন একীভূত করা যায় এবং নাগরিককে কত দিনের মধ্যে সেবা দিতে হবে এসব নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
সম্ভাব্য সকল ক্ষেত্রে ডিজিটাল সেবা পদ্ধতি সম্প্রসারণ করতে হবে। সরকারি ক্রয় ও প্রকিউরমেন্ট ব্যবস্থায় পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। টেন্ডার আহ্বান থেকে শুরু করে মূল্যায়ন, চুক্তি প্রদান, বাস্তবায়ন, বিল পরিশোধ এবং চূড়ান্ত মূল্যায়ন পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে তথ্যের স্বচ্ছতা এবং ডিজিটাল রেকর্ড থাকতে হবে। প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ এবং অভ্যন্তরীণ অডিট ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে।
অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষার উদ্দেশ্য শুধু পুরোনো ভুল খুঁজে বের করা নয়; বরং কোনো প্রক্রিয়ায় ভবিষ্যতে অনিয়ম ঘটতে পারে তা শনাক্ত করে সংশোধনের পরামর্শ দেওয়া। অর্থাৎ নিরীক্ষাকে ‘ভুল ধরার ব্যবস্থা’ থেকে দুর্নীতির ‘ঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থা’তে রূপান্তর করতে হবে। নাগরিকের অভিযোগ জানানোর জন্য নিরাপদ ও কার্যকর রিপোর্টিং মেকানিজম থাকতে হবে।
অভিযোগকারীর পরিচয় সুরক্ষা, অভিযোগের অগ্রগতি জানার সুযোগ এবং প্রতিশোধমূলক আচরণ থেকে সুরক্ষা থাকলে অনিয়মের তথ্য আগে পাওয়া সম্ভব হয়। দুর্নীতির বিরুদ্ধে নাগরিককে শুধু ভুক্তভোগী হিসেবে নয়, বরং প্রতিরোধ ব্যবস্থার অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। প্রতিটি বড় দুর্নীতির ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা প্রয়োজন। কোনো দুর্নীতির মামলা নিষ্পত্তির পর শুধু অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া যথেষ্ট নয়।
এ মামলা থেকে জানতে হবে, কোন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ব্যর্থ হয়েছিল, কোথায় তদারকি দুর্বল ছিল, কোন প্রশাসনিক ফাঁকটি ব্যবহার করা হয়েছিল। এর থেকে একই দুর্নীতি যাতে অন্য জায়গায় পুনরায় না ঘটে, তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এভাবে একটি দুর্নীতির ঘটনাকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের কাজে লাগাতে হবে। দুর্নীতি প্রতিরোধ কোনো পৃথক প্রকল্প নয়; এটি সুশাসনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
একটি দক্ষ, স্বচ্ছ, নিয়মভিত্তিক এবং নাগরিকবান্ধব প্রশাসন একই সঙ্গে জনসেবার মান উন্নত করে এবং দুর্নীতির সুযোগ সংকুচিত করে। এ জন্য সরকারি সেবার প্রক্রিয়া সহজীকরণ, অপ্রয়োজনীয় বিবেচনাধিকার কমানো, ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ, সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা, স্বার্থের সংঘাত নিয়ন্ত্রণ, কার্যকর অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও নজরদারি, নিরাপদ অভিযোগ ব্যবস্থা এবং নাগরিকের অংশগ্রহণকে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মূল কাঠামোর অংশ করতে হবে।
অর্থাৎ দুর্নীতি সংঘটনের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার আগেই তা শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। অতএব, দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের দর্শন হওয়া উচিত শাস্তি থাকবে, কিন্তু প্রতিরোধ হবে অগ্রাধিকার। দুর্নীতি হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধ করা অধিক কার্যকর ও টেকসই সুশাসনের পথ। এই প্রতিরোধকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিই হতে পারে বাংলাদেশে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের একটি নতুন ও কার্যকর পথ।





















