জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার পুনট ইউনিয়নের একটি ছোট গ্রাম বান্ডইল সীমান্তপাড়া। এই গ্রামে প্রায় অর্ধশতাধিক পরিবারের বসবাস। প্রায় তিন দশক ধরে এখানে বসবাস করলেও গ্রামটির সঙ্গে প্রধান সড়কের সংযোগকারী কোনো রাস্তা এখনো নির্মিত হয়নি।
প্রায় দুই কিলোমিটার কাঁচা পথ পেরিয়ে জয়পুরহাট-বগুড়া প্রধান সড়কে উঠতে হয় গ্রামবাসীকে। পথে কোনো যানবাহন চলাচল না করায় হেঁটে কিংবা বাইসাইকেলেই যাতায়াত করতে হয় তাদের। স্থানীয়ভাবে ‘শিকটা সীমান্তপাড়া’ নামেও পরিচিত। গ্রামটি উপজেলার পুনট ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত। বগুড়া জেলার সীমান্তঘেঁষা নুনগোলা খালের পাড় দিয়ে যাওয়া কাঁচা পথটিই গ্রামবাসীর একমাত্র চলাচলের পথ।
গ্রামবাসী সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৫ সালে নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে জামালপুরের ইসলামপুর এলাকা থেকে কয়েকটি পরিবার এখানে এসে বসতি গড়ে। উপজেলার সরকারি বান্ডইল শ্মশানঘাটের ৮৩ শতক জায়গায় তাদের বসবাস শুরু হয়। এরপর কেটে গেছে প্রায় ৩০ বছর। বর্তমানে গ্রামটিতে অর্ধশতাধিক পরিবারের বসবাস। ভোটার রয়েছেন প্রায় ১২০ জন এবং সব মিলিয়ে জনসংখ্যা দুই শতাধিক।
তবে এত বছরেও গ্রামটির যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন হয়নি। ফলে প্রতিদিনই নানা ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে বাসিন্দাদের। সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন শিশু, শিক্ষার্থী, প্রবীণ ও গর্ভবতী নারীরা। স্থানীয়রা জানান, কোনো গর্ভবতী নারী বা গুরুতর অসুস্থ রোগীকে জরুরি প্রয়োজনে হাসপাতালে নিতে হলে প্রথমে প্রায় দুই কিলোমিটার কাঁচা পথ পাড়ি দিয়ে প্রধান সড়কে উঠতে হয়।
অনেক সময় কাঠের পাটাতনে রোগীকে শুইয়ে বহন করে নেওয়া হয়। এতে একদিকে যেমন সময় বেশি লাগে, অন্যদিকে রোগীর জীবন নিয়েও তৈরি হয় ঝুঁকি। বান্ডইল সীমান্তপাড়ার প্রবীণ বাসিন্দা আমিনুর ইসলাম বলেন, আমাদের বাড়ি ছিল জামালপুরের ইসলামপুরে। নদীভাঙনে ঘরবাড়ি ও ভিটেমাটি হারিয়ে এখানে এসে বসবাস শুরু করি। কিন্তু রাস্তা না থাকায় আমরা চরম ভোগান্তিতে আছি।
সরকারের কাছে আমাদের আবেদন, রাস্তাটি দ্রুত করে দেওয়া হোক। গ্রামের বাসিন্দা নাছি বেগম বলেন, প্রধান সড়ক থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে আমাদের গ্রাম। এখানে কোনো যানবাহন চলে না। গর্ভবতী নারীদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয়। আমার একটি মেয়ে বর্তমানে গর্ভবতী। জরুরি সময়ে তাকে হাসপাতালে নিতে হলে কীভাবে নেব, সেটাই বড় চিন্তা। হাসপাতালে নিতে দেরি হয়ে আমার মেয়ের কোনো ক্ষতি হলে এর দায়ভার কে নেবে?
আমরা চাই, সরকার দ্রুত রাস্তাটি নির্মাণ করুক, যাতে হাসপাতালে সময়মতো নিতে না পারার কারণে কোনো মায়ের বুক খালি না হয়। আরেক বাসিন্দা দেলোয়ার বলেন, শিকটা সীমান্তপাড়া গ্রামে দেড় থেকে দুইশ মানুষ বসবাস করে। আমাদের কোনো রাস্তা নেই। দীর্ঘদিন ধরে রাস্তার জন্য কষ্ট করছি। প্রায় দুই কিলোমিটার পথ নিয়ে আমাদের দুর্ভোগের শেষ নেই। সরকারের কাছে আবেদন, রাস্তাটি দ্রুত নির্মাণ করে দেওয়া হোক।
এদিকে গ্রামবাসীর অভিযোগ, নির্বাচন এলেই রাস্তাটি নির্মাণের প্রতিশ্রুতির কমতি থাকে না। কিন্তু ভোট শেষ হলে আর তেমন কেউ খোঁজ নেন না। ফলে বছরের পর বছর ধরে একই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে তাদের। গুরুতর অসুস্থ রোগীকে কাঁচা পথ পেরিয়ে প্রধান সড়কে নেওয়ার সময় অনেক মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। বিশেষ করে রাত কিংবা বর্ষার সময় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
পুনট ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মোর্শেদ ইসলাম বলেন, পুনট ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে বান্ডইল সীমান্তপাড়া নামে একটি গ্রাম আছে। এ গ্রামের ভোটার সংখ্যা ১২০ জন এবং সব মিলিয়ে জনসংখ্যা দুই শতাধিক। কিন্তু গ্রামটির কোনো রাস্তা নেই। শিশুদের লেখাপড়া এবং রোগীদের নিরাপদে ও দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার জন্য রাস্তাটি অত্যন্ত প্রয়োজন। আমি গ্রামের জনগণের দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করছি।
সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে দ্রুত রাস্তাটি নির্মাণের অনুরোধ জানাচ্ছি। এ বিষয়ে কালাই উপজেলা প্রকৌশলী সুমন কুমার দেবনাথ বলেন, জয়পুরহাট-বগুড়া সড়ক থেকে বান্ডইল গ্রামের যে রাস্তাটি রয়েছে, সেটি কিছুদিন আগে গেজেটভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ রাস্তাটি আইডিভুক্ত হয়েছে। আমরা পাকাকরণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। পাকাকরণের অনুমোদন পাওয়া গেলে দ্রুত কার্যক্রম শুরু করা হবে।
গ্রামবাসীর দাবি, প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দ্রুত প্রকল্প অনুমোদন ও নির্মাণকাজ শুরু করে তাদের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ সংকটের স্থায়ী সমাধান করা হোক।





















