চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে তুরস্কে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশটিতে মোট রপ্তানি আয় হয়েছে ২১ কোটি ৫ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলার। এর আগের অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ছিল ১০ কোটি ৫২ লাখ ১০ হাজার ডলার।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে তুরস্কে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে ১০০ দশমিক ১১ শতাংশ। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানি বেড়েছে ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ। প্রথম প্রান্তিকে দেশের মোট রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩০৯ কোটি ৪১ লাখ ৩০ হাজার ডলারে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে আয় হয়েছিল ১ হাজার ২৩১ কোটি ৩১ লাখ ৭০ হাজার ডলার।
ফলে দেশের সামগ্রিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধির তুলনায় তুরস্কের বাজারে প্রবৃদ্ধির হার ছিল অনেক বেশি। তুরস্কে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের তালিকায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে তৈরি পোশাক। এর বাইরে পাট ও পাটজাত পণ্য, জুতা, অপটিক্যাল পণ্য এবং চিকিৎসা ও বস্ত্রশিল্পে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জামও রপ্তানি হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পোশাকের পাশাপাশি এসব পণ্যের বাজারেও বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসানের মতে, তুরস্কে মানুষের আয় ও জীবনযাত্রার মান বাড়ায় দেশটির শ্রমিকদের একটি অংশ ধীরে ধীরে পোশাকশিল্পের কাজ থেকে সরে যাচ্ছে। এতে স্থানীয় উৎপাদনে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে এবং সেই ঘাটতি পূরণে আমদানি করা পোশাকের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জন্য এই পরিস্থিতি তুরস্কের পোশাকের বাজারে আরও বেশি প্রবেশের সুযোগ তৈরি করেছে।
উৎপাদন সক্ষমতা, পণ্যের মান, প্রতিযোগিতামূলক মূল্য এবং নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহের সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ এ বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করতে পারে। তবে এর জন্য পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোর পাশাপাশি মূল্য সংযোজনেও জোর দিতে হবে। বিশেষ করে উচ্চমূল্যের পোশাক, মানবসৃষ্ট তন্তু, কারিগরি বস্ত্র, পাট ও পাটজাত পণ্য এবং জুতার মতো পণ্যে তুরস্কে বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
এ জন্য দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে যোগাযোগ আরও বাড়ানো প্রয়োজন। ফজলে শামীম এহসান আরও বলেন, নতুন বাজারে রপ্তানি বাড়াতে সরকার ও বেসরকারি খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণ, ক্রেতা-বিক্রেতা বৈঠক আয়োজন এবং নিয়মিত ব্যবসায়িক যোগাযোগের মাধ্যমে তুরস্কে বাংলাদেশের পণ্যের পরিচিতি ও বাজার অংশীদারত্ব বাড়ানো সম্ভব।
দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারে এরই মধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত এপ্রিলে তুরস্কের রাষ্ট্রদূত রামিস সেনের সঙ্গে বৈঠকে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করে। একই সঙ্গে বস্ত্র খাতে কৌশলগত সহযোগিতা জোরদারের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।
ওই আলোচনায় বাংলাদেশে মানবসৃষ্ট তন্তু ও কারিগরি বস্ত্র খাতে যৌথ বিনিয়োগ, তুরস্ক থেকে কাঁচামাল ও আধুনিক বস্ত্রযন্ত্র আমদানি এবং দ্রুত পণ্য পরিবহনে তুর্কি এয়ারলাইনস ও ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরের লজিস্টিক সুবিধা ব্যবহারের সম্ভাবনা উঠে আসে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের সহযোগিতা শুধু তৈরি পোশাক রপ্তানি বাড়াতেই নয়, নতুন পণ্যের বাজার তৈরিতেও সহায়ক হতে পারে।
তুরস্কের উন্নত শিল্প ও পরিশোধন সক্ষমতা বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সরবরাহে ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি দেশটি থেকে অর্গানিক তুলা ও আধুনিক বস্ত্রযন্ত্র আমদানি করা গেলে বাংলাদেশের শিল্পে উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা আরও বাড়তে পারে। দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ককে আরও বড় পর্যায়ে নেওয়ার লক্ষ্যও রয়েছে। গত জুনে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের বাংলাদেশ সফরের সময় দুই দেশের বর্তমান প্রায় ১৩০ কোটি ডলারের বাণিজ্য ২০০ কোটি ডলারে উন্নীত করার উদ্যোগের কথা জানানো হয়।
বাণিজ্য বাড়াতে আরও অনুকূল কাঠামো তৈরির বিষয়েও তখন আলোচনা হয়। ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফ বলেন, তুরস্কে রপ্তানি বৃদ্ধির এই ধারা ধরে রাখতে হলে পণ্যভিত্তিক সক্ষমতা এবং ক্রেতাদের চাহিদা নিয়ে আরও গভীরভাবে কাজ করতে হবে। প্রচলিত পণ্যের পাশাপাশি পাট ও পাটজাত পণ্য, জুতা, বিভিন্ন তৈরি পণ্য, অপটিক্যাল সামগ্রী এবং চিকিৎসা ও বস্ত্রশিল্পের সরঞ্জামের মতো সম্ভাবনাময় পণ্যের বাজার সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া দরকার।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকেই তুরস্কে বাংলাদেশের রপ্তানি দ্বিগুণের বেশি বেড়ে যাওয়া দেশটির বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের সম্ভাবনাকে নতুন করে সামনে এনেছে। এই প্রবৃদ্ধির ধারাকে কাজে লাগিয়ে পোশাকের পাশাপাশি নতুন পণ্য, বিনিয়োগ ও যৌথ উদ্যোগ বাড়ানো গেলে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে ২০০ কোটি ডলারের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের লক্ষ্যে পৌঁছানোও সহজ হবে।






















