আজ বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
১৪ আশ্বিন, ১৪৩৩ | ১৭ রবিউস সানি ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
২৮°C
সর্বোচ্চ: ৩৫°C
সর্বনিম্ন: ২৭°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৩৯%

কিশোর গ্যাং দমনের অভিযאן ও এর পেছনের চিত্র

  • MIT ERP
  • Update Time : 02:11:47 am, Wednesday, 30 September 2026
  • 14

কিশোর গ্যাং দমনের অভিযאן ও এর পেছনের চিত্র

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

একজন কিশোর রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। পাশে আরও কয়েকজন। কারো হাতে মোবাইল ফোন, কেউ গল্প করছে, কেউ কোচিং শেষে বাড়ি ফিরছে। হঠাৎ পুলিশের গাড়ি থামল। জিজ্ঞাসাবাদ। তারপর গাড়িতে তুলে থানায়। রাতভর যাচাই-বাছাই।

শেষে জানা গেল, তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। অভিভাবক এলেন। মুচলেকা দিলেন। কিশোর বাড়ি ফিরল। কিন্তু সেখানেই কি শেষ হলো ঘটনা? প্রতিবেশী, সহপাঠীরা দেখল, পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে গেছে। পরিবারের লোকজন ভয় পেল। এই কিশোরের মনেও থেকে গেল একটি প্রশ্ন— পুলিশ কি আমাকে ভয় পায়, নাকি আমি পুলিশকে ভয় পাব? কিশোর গ্যাং এখন এই সমাজের একটি আতঙ্ক।

খুন, চাঁদাবাজি, ধর্ষণ, ইভটিজিং, ছিনতাইসহ এমন কোনো অপরাধ নেই, যা তারা করছে না। এর পরিপ্রেক্ষিতেই সারা দেশে চলছে কিশোর গ্যাং দমন কার্যক্রম। অভিযান প্রয়োজন; কিন্তু এই গ্রেপ্তার পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অপরাধ বিশ্লেষকেরা। প্রশ্ন উঠছে অপরাধী শনাক্ত না করে কিশোরদের পাইকারি ধরপাকড় নিয়ে। অপরাধ দমন করতে গিয়ে যদি একটি শিশুর মনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সম্পর্কে ভয়, ক্ষোভ কিংবা শত্রুতার ধারণা তৈরি হয়, তাহলে আজকের অভিযান কাল নতুন সমস্যার জন্ম দিতে পারে।

অপরাধবিষয়ক আইনবিদ ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, সারা দেশেই কিশোর অপরাধ বেড়েছে। এটাকে অবশ্যই দমন করতে হবে। যারা ছিনতাই করছে, অস্ত্র বহন করছে, মাদক ব্যবসায় জড়িত, হামলা করছে, হত্যায় অংশ নিচ্ছে কিংবা গ্যাং পরিচালনা করছে— তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু এটাও মাথায় রাখতে হবে, কিশোর বয়সের একটা উদ্দীপনা, দুরন্ত মনোভাব থাকবেই।

তার মানে এই নয় যে, কিশোর হলেই সে অপরাধী। রাস্তায় দাঁড়ানো মানেই গ্যাং সদস্য নয়। সন্ধ্যার পর বাইরে থাকা মানেই অপরাধী নয়। আর গ্রেপ্তারের কারণ হতে পারে না শুধুই সন্দেহ। এটা যদি হয়, তাহলে সেটি অপরাধ দমন নয়, সেটি হয়ে যায় নির্বিচার ধরপাকড়ের আরেকটি অপরাধ। ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম আরও বলেন, সারা দেশে প্রতিদিন কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে হাজার হাজার জনকে আটকের কথা বলা হচ্ছে।

কিন্তু এর মধ্যে কতজন প্রকৃত অপরাধী, কতজনের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা মামলা রয়েছে? অনেককেই তো ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে? পুলিশ বলছে, যারা অপরাধী তাদের বাদে বাকিদের ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। এটা ভালো কথা। কিন্তু পাল্টা প্রশ্ন থেকে যায়, যারা অপরাধী নয়, শিশু বয়সের সেই কিশোরদের কেন ধরা হলো? অপরাধ দমনের সবচেয়ে মৌলিক নিয়মই হলো— আগে অপরাধ শনাক্ত, তারপর অপরাধী শনাক্ত, এরপর গ্রেপ্তার।

উল্টো পথে হাঁটলে আইন প্রয়োগের জায়গায় আতঙ্ক তৈরি হয়। এখন ভালো কাজ করতে গিয়ে সেটাই হচ্ছে। শিশু মনোরোগ চিকিৎসক অধ্যাপক নাজমুল কবির রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমাদের দেশে ১৮ বছরের আগে পর্যন্ত সবাই শিশু। এই আইনের ফলে কিশোররাও শিশু। তারা অপরাধ করলে এবং সেটার নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেলে তার জন্য আইন আছে। তারা অবশ্যই গ্রেপ্তার হতে পারে।

থানা, আদালত, বিচার ব্যবস্থাপনা এবং সাজা— সব ক্ষেত্রেই তারা শিশু উপযোগী আইনের মুখোমুখি হয়। তাদের সাজার জন্য বিশেষ সংশোধনাগারও করেছে সরকার। কিন্তু একজন কিশোরকে যদি কোনো অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততার সুনির্দিষ্ট তথ্য ছাড়াই থানায় নেওয়া হয়, তাহলে তাকে কী বার্তা দিচ্ছে পুলিশ? আইন কি তাকে সুরক্ষা দিচ্ছে, নাকি সে কেবল পুলিশের সন্দেহের কারণেই অপরাধী হয়ে যাচ্ছে?

’ অধ্যাপক নাজমুল আরও বলেন, শিশুমন খুব সহজেই এসব অভিজ্ঞতা ধারণ করে। থানায় নেওয়া, পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদ, লক-আপের পরিবেশ— এসব একজন কিশোরের জন্য স্বাভাবিক অভিজ্ঞতা নয়। নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে বাড়ি ফিরলেও সেই অভিজ্ঞতা তার মনে ভয়, অপমান ও সামাজিক কলঙ্কের অনুভূতি তৈরি করতে পারে। এ ধরনের অভিজ্ঞতা দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ট্রমা এবং রাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি ক্ষোভ তৈরি করতে পারে।

অভিযান চলছে, চলুক। কিন্তু গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে এখানেই রাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। কারণ, একটি শিশুকে অপরাধ থেকে দূরে রাখার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। অথচ ভুল পদ্ধতিতে সেই শিশুর মনেই যদি পুলিশের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তৈরি হয়, তাহলে অপরাধ দমনের উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়ে। যে কিশোর আজ পুলিশের গাড়ি দেখে ভয় পেল, আগামী দিনে সে কি পুলিশকে সাহায্য করবে?

কোনো অপরাধের তথ্য পেলে কি থানায় যাবে? নাকি পুলিশকে এড়িয়ে চলবে? শিশু ও কিশোর মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোর অপরাধ কেবল আইনি সমস্যা নয়, এটি মূলত আচরণগত ও মানসিক স্বাস্থ্য সংকট। সঠিক পারিবারিক ও সামাজিকীকরণের অভাব এবং উপযুক্ত মানসিক চিকিৎসার অনুপস্থিতি কিশোরদের গ্যাং সংস্কৃতির দিকে ঠেলে দেয়। অন্যদিকে, অপরাধ দমনের নামে ‘গণগ্রেপ্তার’ বা ত্রুটিপূর্ণ আইনি প্রক্রিয়া সাধারণ ও নিরপরাধ শিশুদের মনে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ট্রমা ও তীব্র ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি করে।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও কিশোরদের সম্পর্ক হওয়া উচিত আস্থার। পুলিশকে দেখলে একজন কিশোরের মনে এই ধারণা তৈরি হওয়া উচিত, ‘বিপদে পড়লে পুলিশ আমাকে রক্ষা করবে। ’ এর বিপরীতে যদি ধারণা জন্ম নেয়, ‘পুলিশ দেখলেই ধরে নিয়ে যেতে পারে’, তাহলে সেটি শুধু তার সমস্যা নয়; এটি ভবিষ্যৎ নাগরিক ও রাষ্ট্রের সম্পর্কের সমস্যা।

শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ঝিলন বারী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, সুস্থ বিনোদনের অভাব, খেলার মাঠ না থাকা এবং কিশোর সংগঠনগুলোর নিষ্ক্রিয়তার কারণে কিশোরেরা অপরাধমূলক চক্রে জড়িয়ে পড়ে। অপরাধ দমনে শুধু পুলিশি অ্যাকশন নয়, বরং কিশোরদের মানসিক কাউন্সেলিং ও সামাজিক সংশোধন জরুরি। সাবেক একজন আইজিপি বলেন, অভিযান প্রয়োজন। তবে এভাবে অভিযান চালানো ঠিক হচ্ছে না।

অপরাধী ধরার সহজ পথ হিসেবে রাস্তা থেকে কিশোর ধরে নিয়ে গেলে প্রকৃত অপরাধের নেটওয়ার্ক আড়ালে থেকে যেতে পারে। কারণ গ্যাংয়ের সবচেয়ে দৃশ্যমান সদস্য অনেক সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি নয়। তার পেছনে থাকতে পারে সংগঠক, অর্থদাতা, অস্ত্র বা মাদক সরবরাহকারী কিংবা পৃষ্ঠপোষক। সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের বদলে দৃশ্যমান কিশোরদের ধরে ফেললে মূল নেটওয়ার্ক অক্ষত থাকার ঝুঁকি থাকে।

ফলে প্রশ্ন আসে, কেন সহজ শিকারকে ধরা হবে, যখন লক্ষ্য হওয়া উচিত অপরাধের মূল কাঠামো? সংখ্যা দিয়ে অভিযান সফল হয় না; সঠিক মানুষকে আইনের আওতায় আনতে পারলেই অভিযান সফল। তিনি আরও বলেন, পুলিশের কাজ গাড়ি ভর্তি করে মানুষ থানায় নেওয়া নয়। আসল কাজ গোয়েন্দা তথ্য, তদন্ত, প্রমাণ এবং সুনির্দিষ্ট অভিযান। কে কোন অপরাধে জড়িত, তার বিরুদ্ধে কী তথ্য রয়েছে, কখন কোথায় অপরাধ করেছে, কার সঙ্গে যোগাযোগ, অস্ত্র বা মাদকের সঙ্গে সম্পর্ক কী— এসব তথ্য সংগ্রহের পরই গ্রেপ্তার করতে হবে।

আরও একটি বিষয় ভুলে গেলে চলবে না। ১৮ বছরের নিচে প্রত্যেকেই শিশু হিসেবে আইনের বিশেষ সুরক্ষার আওতায়। শিশু আইন, ২০১৩ কিশোরদের সঙ্গে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষ সংবেদনশীলতার কথা বলে। ফলে অপরাধে জড়িত কিশোরের ক্ষেত্রেও লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু শাস্তি নয়, সংশোধন ও পুনর্বাসন। কিন্তু নিরপরাধ কিশোরকে অপরাধীর মতো আচরণের মুখোমুখি করা হলে সেটি সংশোধনের সুযোগ নয়; বরং তার সামাজিক পরিচয়ের ওপর আঘাত।

আর যদি তাকে দাগী অপরাধীদের সংস্পর্শে নেওয়া হয়, তাহলে ঝুঁকি আরও বাড়ে। অপরাধ থেকে একটি কিশোরকে ফেরাতে গিয়ে যদি তাকে অপরাধের পরিবেশের কাছাকাছি নেওয়া হয়, তাহলে প্রতিরোধের বদলে সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। অবসরপ্রাপ্ত পুলিশের ডিআইজি আজিজুল হক রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, এই কৌশল নিখুঁত করা দরকার। প্রথমে স্থানীয় পর্যায়ে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করতে হবে।

তারপর সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান চালাতে হবে। একজন কিশোরকে শুধু তার বয়স, পোশাক, বন্ধুবান্ধব কিংবা রাস্তায় অবস্থানের কারণে সন্দেহের তালিকায় তোলা যাবে না। সন্ধ্যার পর বাইরে থাকা কোনো কিশোরকে দেখেই গ্যাং সদস্য ধরে নেওয়া বিপজ্জনক। সে হয়তো কোচিং থেকে ফিরছে। হয়তো বাবার ওষুধ আনতে বেরিয়েছে কিংবা বন্ধুর সঙ্গে দেখা করছে।

হয়তো দোকানে কাজ করে। তার বিরুদ্ধে অপরাধের তথ্য থাকলে অবশ্যই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু শুধু সন্দেহের কারণে থানায় নেওয়া হলে সেই সন্দেহের মূল্য দিতে হতে পারে পুরো সমাজকে। আজিজুল হক আরও বলেন, কিশোর গ্যাং দমনে কঠোরতা অবশ্যই থাকবে। কিন্তু সেই কঠোরতার শিকার যেন নিরপরাধ কিশোর না হয়। কঠোরতা হবে অপরাধীর বিরুদ্ধে, নির্বিচার নয়।

পুলিশকে কিশোরদের শত্রু বানানোর প্রয়োজন নেই। বরং যে কিশোর গ্যাংয়ের প্রলোভনে পড়তে পারে, তাকেই পুলিশের সবচেয়ে বড় সহযোগী বানাতে হবে। তাকে বোঝাতে হবে— আইন তার বিরুদ্ধে নয়, আইন তার সুরক্ষার জন্য। পরিবারকে যুক্ত করতে হবে। স্কুলে কাউন্সেলিং বাড়াতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় খেলাধুলা ও সামাজিক কার্যক্রম বাড়াতে হবে। অপরাধে জড়িয়ে পড়া কিশোরের জন্য সংশোধন ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।

আর যারা কিশোরদের সামনে রেখে অপরাধের সাম্রাজ্য চালায়, তাদের খুঁজে বের করতে হবে। মনে রাখতে হবে, কিশোরকে ধরে নিয়ে আসা সহজ। কিন্তু কিশোরকে অপরাধের জগৎ থেকে ফিরিয়ে আনা কঠিন। আরও কঠিন হলো— একজন নিরপরাধ কিশোরের মনে একবার যদি এই ধারণা ঢুকে যায় যে, ‘পুলিশ তার রক্ষক নয়, তার শত্রু’— সেই ক্ষত সারানো।

পুলিশের আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির এ ব্যাপারে রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, কিশোর গ্যাং দমনে পুলিশ দেশব্যাপী অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং অপরাধীদের পাশাপাশি তাদের মূল হোতা বা পৃষ্ঠপোষকদেরও আইনের আওতায় আনার ওপর জোর দিচ্ছে। তবে নিরপরাধ কিশোররা যেন কোনোভাবেই হয়রানি বা অভিযানের শিকার না হয়, সে জন্য বিশেষ যাচাই-বাছাই ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

নিরপরাধ বা প্রথমবার ভুল পথে পা বাড়ানো কিশোরদের অভিভাবকদের ডেকে এনে বিশেষ কাউন্সেলিং বা ব্রিফিং দেওয়া হচ্ছে। কিশোররা সন্ধ্যায় বা রাতে যেন অযথা বাইরে ঘোরাঘুরি না করে, কার সঙ্গে মিশছে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় কী করছে— সেসব বিষয়ে নজর রাখতে অভিভাবকদের অনুরোধ জানানো হচ্ছে। আইজিপি আরও বলেন, কঠোর অভিযান চালালেও সাধারণ কিশোরদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল ট্র্যাকিং, গোয়েন্দা তথ্য এবং পারিবারিক যাচাই-বাছাইয়ের মতো ফিল্টারিং ব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে।

ফলে এই অভিযানে পুলিশ নিয়ে কিশোরদের মনে কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া হওয়ার আশঙ্কা থাকার কথা নয়।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

নোয়াখালীতে চোরাই গরু বিক্রির অভিযোগে যুবদল নেতা বহিষ্কার

কিশোর গ্যাং দমনের অভিযאן ও এর পেছনের চিত্র

Update Time : 02:11:47 am, Wednesday, 30 September 2026

একজন কিশোর রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। পাশে আরও কয়েকজন। কারো হাতে মোবাইল ফোন, কেউ গল্প করছে, কেউ কোচিং শেষে বাড়ি ফিরছে। হঠাৎ পুলিশের গাড়ি থামল। জিজ্ঞাসাবাদ। তারপর গাড়িতে তুলে থানায়। রাতভর যাচাই-বাছাই।

শেষে জানা গেল, তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। অভিভাবক এলেন। মুচলেকা দিলেন। কিশোর বাড়ি ফিরল। কিন্তু সেখানেই কি শেষ হলো ঘটনা? প্রতিবেশী, সহপাঠীরা দেখল, পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে গেছে। পরিবারের লোকজন ভয় পেল। এই কিশোরের মনেও থেকে গেল একটি প্রশ্ন— পুলিশ কি আমাকে ভয় পায়, নাকি আমি পুলিশকে ভয় পাব? কিশোর গ্যাং এখন এই সমাজের একটি আতঙ্ক।

খুন, চাঁদাবাজি, ধর্ষণ, ইভটিজিং, ছিনতাইসহ এমন কোনো অপরাধ নেই, যা তারা করছে না। এর পরিপ্রেক্ষিতেই সারা দেশে চলছে কিশোর গ্যাং দমন কার্যক্রম। অভিযান প্রয়োজন; কিন্তু এই গ্রেপ্তার পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অপরাধ বিশ্লেষকেরা। প্রশ্ন উঠছে অপরাধী শনাক্ত না করে কিশোরদের পাইকারি ধরপাকড় নিয়ে। অপরাধ দমন করতে গিয়ে যদি একটি শিশুর মনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সম্পর্কে ভয়, ক্ষোভ কিংবা শত্রুতার ধারণা তৈরি হয়, তাহলে আজকের অভিযান কাল নতুন সমস্যার জন্ম দিতে পারে।

অপরাধবিষয়ক আইনবিদ ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, সারা দেশেই কিশোর অপরাধ বেড়েছে। এটাকে অবশ্যই দমন করতে হবে। যারা ছিনতাই করছে, অস্ত্র বহন করছে, মাদক ব্যবসায় জড়িত, হামলা করছে, হত্যায় অংশ নিচ্ছে কিংবা গ্যাং পরিচালনা করছে— তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু এটাও মাথায় রাখতে হবে, কিশোর বয়সের একটা উদ্দীপনা, দুরন্ত মনোভাব থাকবেই।

তার মানে এই নয় যে, কিশোর হলেই সে অপরাধী। রাস্তায় দাঁড়ানো মানেই গ্যাং সদস্য নয়। সন্ধ্যার পর বাইরে থাকা মানেই অপরাধী নয়। আর গ্রেপ্তারের কারণ হতে পারে না শুধুই সন্দেহ। এটা যদি হয়, তাহলে সেটি অপরাধ দমন নয়, সেটি হয়ে যায় নির্বিচার ধরপাকড়ের আরেকটি অপরাধ। ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম আরও বলেন, সারা দেশে প্রতিদিন কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে হাজার হাজার জনকে আটকের কথা বলা হচ্ছে।

কিন্তু এর মধ্যে কতজন প্রকৃত অপরাধী, কতজনের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা মামলা রয়েছে? অনেককেই তো ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে? পুলিশ বলছে, যারা অপরাধী তাদের বাদে বাকিদের ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। এটা ভালো কথা। কিন্তু পাল্টা প্রশ্ন থেকে যায়, যারা অপরাধী নয়, শিশু বয়সের সেই কিশোরদের কেন ধরা হলো? অপরাধ দমনের সবচেয়ে মৌলিক নিয়মই হলো— আগে অপরাধ শনাক্ত, তারপর অপরাধী শনাক্ত, এরপর গ্রেপ্তার।

উল্টো পথে হাঁটলে আইন প্রয়োগের জায়গায় আতঙ্ক তৈরি হয়। এখন ভালো কাজ করতে গিয়ে সেটাই হচ্ছে। শিশু মনোরোগ চিকিৎসক অধ্যাপক নাজমুল কবির রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমাদের দেশে ১৮ বছরের আগে পর্যন্ত সবাই শিশু। এই আইনের ফলে কিশোররাও শিশু। তারা অপরাধ করলে এবং সেটার নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেলে তার জন্য আইন আছে। তারা অবশ্যই গ্রেপ্তার হতে পারে।

থানা, আদালত, বিচার ব্যবস্থাপনা এবং সাজা— সব ক্ষেত্রেই তারা শিশু উপযোগী আইনের মুখোমুখি হয়। তাদের সাজার জন্য বিশেষ সংশোধনাগারও করেছে সরকার। কিন্তু একজন কিশোরকে যদি কোনো অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততার সুনির্দিষ্ট তথ্য ছাড়াই থানায় নেওয়া হয়, তাহলে তাকে কী বার্তা দিচ্ছে পুলিশ? আইন কি তাকে সুরক্ষা দিচ্ছে, নাকি সে কেবল পুলিশের সন্দেহের কারণেই অপরাধী হয়ে যাচ্ছে?

’ অধ্যাপক নাজমুল আরও বলেন, শিশুমন খুব সহজেই এসব অভিজ্ঞতা ধারণ করে। থানায় নেওয়া, পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদ, লক-আপের পরিবেশ— এসব একজন কিশোরের জন্য স্বাভাবিক অভিজ্ঞতা নয়। নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে বাড়ি ফিরলেও সেই অভিজ্ঞতা তার মনে ভয়, অপমান ও সামাজিক কলঙ্কের অনুভূতি তৈরি করতে পারে। এ ধরনের অভিজ্ঞতা দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ট্রমা এবং রাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি ক্ষোভ তৈরি করতে পারে।

অভিযান চলছে, চলুক। কিন্তু গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে এখানেই রাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। কারণ, একটি শিশুকে অপরাধ থেকে দূরে রাখার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। অথচ ভুল পদ্ধতিতে সেই শিশুর মনেই যদি পুলিশের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তৈরি হয়, তাহলে অপরাধ দমনের উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়ে। যে কিশোর আজ পুলিশের গাড়ি দেখে ভয় পেল, আগামী দিনে সে কি পুলিশকে সাহায্য করবে?

কোনো অপরাধের তথ্য পেলে কি থানায় যাবে? নাকি পুলিশকে এড়িয়ে চলবে? শিশু ও কিশোর মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোর অপরাধ কেবল আইনি সমস্যা নয়, এটি মূলত আচরণগত ও মানসিক স্বাস্থ্য সংকট। সঠিক পারিবারিক ও সামাজিকীকরণের অভাব এবং উপযুক্ত মানসিক চিকিৎসার অনুপস্থিতি কিশোরদের গ্যাং সংস্কৃতির দিকে ঠেলে দেয়। অন্যদিকে, অপরাধ দমনের নামে ‘গণগ্রেপ্তার’ বা ত্রুটিপূর্ণ আইনি প্রক্রিয়া সাধারণ ও নিরপরাধ শিশুদের মনে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ট্রমা ও তীব্র ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি করে।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও কিশোরদের সম্পর্ক হওয়া উচিত আস্থার। পুলিশকে দেখলে একজন কিশোরের মনে এই ধারণা তৈরি হওয়া উচিত, ‘বিপদে পড়লে পুলিশ আমাকে রক্ষা করবে। ’ এর বিপরীতে যদি ধারণা জন্ম নেয়, ‘পুলিশ দেখলেই ধরে নিয়ে যেতে পারে’, তাহলে সেটি শুধু তার সমস্যা নয়; এটি ভবিষ্যৎ নাগরিক ও রাষ্ট্রের সম্পর্কের সমস্যা।

শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ঝিলন বারী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, সুস্থ বিনোদনের অভাব, খেলার মাঠ না থাকা এবং কিশোর সংগঠনগুলোর নিষ্ক্রিয়তার কারণে কিশোরেরা অপরাধমূলক চক্রে জড়িয়ে পড়ে। অপরাধ দমনে শুধু পুলিশি অ্যাকশন নয়, বরং কিশোরদের মানসিক কাউন্সেলিং ও সামাজিক সংশোধন জরুরি। সাবেক একজন আইজিপি বলেন, অভিযান প্রয়োজন। তবে এভাবে অভিযান চালানো ঠিক হচ্ছে না।

অপরাধী ধরার সহজ পথ হিসেবে রাস্তা থেকে কিশোর ধরে নিয়ে গেলে প্রকৃত অপরাধের নেটওয়ার্ক আড়ালে থেকে যেতে পারে। কারণ গ্যাংয়ের সবচেয়ে দৃশ্যমান সদস্য অনেক সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি নয়। তার পেছনে থাকতে পারে সংগঠক, অর্থদাতা, অস্ত্র বা মাদক সরবরাহকারী কিংবা পৃষ্ঠপোষক। সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের বদলে দৃশ্যমান কিশোরদের ধরে ফেললে মূল নেটওয়ার্ক অক্ষত থাকার ঝুঁকি থাকে।

ফলে প্রশ্ন আসে, কেন সহজ শিকারকে ধরা হবে, যখন লক্ষ্য হওয়া উচিত অপরাধের মূল কাঠামো? সংখ্যা দিয়ে অভিযান সফল হয় না; সঠিক মানুষকে আইনের আওতায় আনতে পারলেই অভিযান সফল। তিনি আরও বলেন, পুলিশের কাজ গাড়ি ভর্তি করে মানুষ থানায় নেওয়া নয়। আসল কাজ গোয়েন্দা তথ্য, তদন্ত, প্রমাণ এবং সুনির্দিষ্ট অভিযান। কে কোন অপরাধে জড়িত, তার বিরুদ্ধে কী তথ্য রয়েছে, কখন কোথায় অপরাধ করেছে, কার সঙ্গে যোগাযোগ, অস্ত্র বা মাদকের সঙ্গে সম্পর্ক কী— এসব তথ্য সংগ্রহের পরই গ্রেপ্তার করতে হবে।

আরও একটি বিষয় ভুলে গেলে চলবে না। ১৮ বছরের নিচে প্রত্যেকেই শিশু হিসেবে আইনের বিশেষ সুরক্ষার আওতায়। শিশু আইন, ২০১৩ কিশোরদের সঙ্গে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষ সংবেদনশীলতার কথা বলে। ফলে অপরাধে জড়িত কিশোরের ক্ষেত্রেও লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু শাস্তি নয়, সংশোধন ও পুনর্বাসন। কিন্তু নিরপরাধ কিশোরকে অপরাধীর মতো আচরণের মুখোমুখি করা হলে সেটি সংশোধনের সুযোগ নয়; বরং তার সামাজিক পরিচয়ের ওপর আঘাত।

আর যদি তাকে দাগী অপরাধীদের সংস্পর্শে নেওয়া হয়, তাহলে ঝুঁকি আরও বাড়ে। অপরাধ থেকে একটি কিশোরকে ফেরাতে গিয়ে যদি তাকে অপরাধের পরিবেশের কাছাকাছি নেওয়া হয়, তাহলে প্রতিরোধের বদলে সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। অবসরপ্রাপ্ত পুলিশের ডিআইজি আজিজুল হক রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, এই কৌশল নিখুঁত করা দরকার। প্রথমে স্থানীয় পর্যায়ে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করতে হবে।

তারপর সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান চালাতে হবে। একজন কিশোরকে শুধু তার বয়স, পোশাক, বন্ধুবান্ধব কিংবা রাস্তায় অবস্থানের কারণে সন্দেহের তালিকায় তোলা যাবে না। সন্ধ্যার পর বাইরে থাকা কোনো কিশোরকে দেখেই গ্যাং সদস্য ধরে নেওয়া বিপজ্জনক। সে হয়তো কোচিং থেকে ফিরছে। হয়তো বাবার ওষুধ আনতে বেরিয়েছে কিংবা বন্ধুর সঙ্গে দেখা করছে।

হয়তো দোকানে কাজ করে। তার বিরুদ্ধে অপরাধের তথ্য থাকলে অবশ্যই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু শুধু সন্দেহের কারণে থানায় নেওয়া হলে সেই সন্দেহের মূল্য দিতে হতে পারে পুরো সমাজকে। আজিজুল হক আরও বলেন, কিশোর গ্যাং দমনে কঠোরতা অবশ্যই থাকবে। কিন্তু সেই কঠোরতার শিকার যেন নিরপরাধ কিশোর না হয়। কঠোরতা হবে অপরাধীর বিরুদ্ধে, নির্বিচার নয়।

পুলিশকে কিশোরদের শত্রু বানানোর প্রয়োজন নেই। বরং যে কিশোর গ্যাংয়ের প্রলোভনে পড়তে পারে, তাকেই পুলিশের সবচেয়ে বড় সহযোগী বানাতে হবে। তাকে বোঝাতে হবে— আইন তার বিরুদ্ধে নয়, আইন তার সুরক্ষার জন্য। পরিবারকে যুক্ত করতে হবে। স্কুলে কাউন্সেলিং বাড়াতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় খেলাধুলা ও সামাজিক কার্যক্রম বাড়াতে হবে। অপরাধে জড়িয়ে পড়া কিশোরের জন্য সংশোধন ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।

আর যারা কিশোরদের সামনে রেখে অপরাধের সাম্রাজ্য চালায়, তাদের খুঁজে বের করতে হবে। মনে রাখতে হবে, কিশোরকে ধরে নিয়ে আসা সহজ। কিন্তু কিশোরকে অপরাধের জগৎ থেকে ফিরিয়ে আনা কঠিন। আরও কঠিন হলো— একজন নিরপরাধ কিশোরের মনে একবার যদি এই ধারণা ঢুকে যায় যে, ‘পুলিশ তার রক্ষক নয়, তার শত্রু’— সেই ক্ষত সারানো।

পুলিশের আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির এ ব্যাপারে রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, কিশোর গ্যাং দমনে পুলিশ দেশব্যাপী অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং অপরাধীদের পাশাপাশি তাদের মূল হোতা বা পৃষ্ঠপোষকদেরও আইনের আওতায় আনার ওপর জোর দিচ্ছে। তবে নিরপরাধ কিশোররা যেন কোনোভাবেই হয়রানি বা অভিযানের শিকার না হয়, সে জন্য বিশেষ যাচাই-বাছাই ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

নিরপরাধ বা প্রথমবার ভুল পথে পা বাড়ানো কিশোরদের অভিভাবকদের ডেকে এনে বিশেষ কাউন্সেলিং বা ব্রিফিং দেওয়া হচ্ছে। কিশোররা সন্ধ্যায় বা রাতে যেন অযথা বাইরে ঘোরাঘুরি না করে, কার সঙ্গে মিশছে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় কী করছে— সেসব বিষয়ে নজর রাখতে অভিভাবকদের অনুরোধ জানানো হচ্ছে। আইজিপি আরও বলেন, কঠোর অভিযান চালালেও সাধারণ কিশোরদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল ট্র্যাকিং, গোয়েন্দা তথ্য এবং পারিবারিক যাচাই-বাছাইয়ের মতো ফিল্টারিং ব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে।

ফলে এই অভিযানে পুলিশ নিয়ে কিশোরদের মনে কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া হওয়ার আশঙ্কা থাকার কথা নয়।