দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুরকে ঘিরে একের পর এক নতুন প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে দেওয়ার সময়সীমা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটার আগেই দ্বিতীয় ইউনিটের পারমাণবিক জ্বালানি পরিবহন নিয়ে দেখা দিয়েছে নতুন জটিলতা।
রাশিয়া থেকে ইউরেনিয়াম বহনকারী কার্গো বিমানের নির্ধারিত ফ্লাইট পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি না পাওয়ায় সময়মতো বাংলাদেশে পৌঁছাতে পারেনি— এমন তথ্য জানিয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। তবে পাকিস্তান কেন অনুমতি দেয়নি, তার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো স্পষ্ট নয়। এর মধ্যে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন রোসাটম জানিয়েছে, রূপপুরের দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি সরবরাহ অক্টোবর থেকে শুরু হয়ে ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সংশোধিত সূচি অনুযায়ী ১ অক্টোবর থেকেই জ্বালানি পরিবহন শুরু হওয়ার কথা। অর্থাৎ জ্বালানি পরিবহন আপাতত বিকল্প ব্যবস্থায় এগিয়ে নেওয়ার কথা বলা হলেও প্রথম ইউনিটের বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুনির্দিষ্ট উদ্বোধন কবে হবে, তার উত্তর নেই কারো কাছেই। রূপপুরের প্রথম ইউনিটের উদ্বোধন নিয়ে চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে সরকার বেশ আশাবাদী সময়সূচি দিয়েছিল।
গত জুনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, আগস্টের শেষ দিকে প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সংসদেও তিনি আগস্টের শেষ নাগাদ প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে দেওয়ার কথা জানান। কিন্তু আগস্ট শেষে সেপ্টেম্বর পার হতে চললেও এখনো ওই ইউনিট কবে নাগাদ উদ্বোধন হবে— তার উত্তর নেই কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে।
এমনকি খোদ মন্ত্রীও বলতে পারছেন না গ্রিডে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে কবে। যদিও সেপ্টেম্বরে এসে নতুন জটিলতার কথা সামনে আসে। এ বিষয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম রূপালী বাংলাদেশকে তখন জানিয়েছিলেন, এর প্রথম ইউনিটের দুটি ভালভে ত্রুটি ধরা পড়েছে। এ কারণে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের সময়সূচি পিছিয়ে যাচ্ছে।
তিনি তখনো নির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি, কবে ত্রুটি মেরামত শেষ হবে এবং কবে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা যাবে। মাস শেষেও রূপপুরের প্রথম ইউনিটের উদ্বোধন বা বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরুর নির্দিষ্ট তারিখ নিয়ে কিছু বলতে পারেননি তিনি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রূপপুরের মতো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি পৌঁছানো উৎপাদন শুরুর একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলেও এটিই শেষ ধাপ নয়।
জ্বালানি লোডিং, কমিশনিং, বিভিন্ন নিরাপত্তা পরীক্ষা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন এবং পর্যায়ক্রমে রিঅ্যাক্টর চালুর পর বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করতে হয়। প্রথম ইউনিটের জ্বালানি লোডিং ও প্রাথমিক কমিশনিং পরীক্ষা শেষ হলেও বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের কমিশনিং লাইসেন্স ছাড়া রিঅ্যাক্টরকে পরবর্তী ধাপে নেওয়া সম্ভব নয়। অর্থাৎ প্রথম ইউনিটের ক্ষেত্রে বিষয়টি এখন শুধু ‘উদ্বোধনের তারিখ’ নির্ধারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের ধাপও গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে প্রথম ইউনিটের উৎপাদন শুরুর সময় অনিশ্চিত থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি পরিবহনেও জটিলতা দেখা দেওয়ায় প্রকল্পটির সামগ্রিক সময়সূচি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গত ২৪ সেপ্টেম্বর একটি ইউরেনিয়ামবাহী কার্গো বিমান বাংলাদেশে আসার কথা ছিল। কিন্তু বিমানটি আসেনি। পরে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী জানান, পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি না পাওয়ায় নির্ধারিত ফ্লাইটটি পরিচালনা করা যায়নি।
জানা যায়, যে চালানটি আটকে যায়, সেটি প্রথম ইউনিটের এক বছর পরের জ্বালানি পুনঃ লোডের জন্য নির্ধারিত ৪৮টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলির অংশ ছিল। দ্বিতীয় ইউনিটের প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহের ফ্লাইটগুলো মূলত অক্টোবর থেকে শুরু হওয়ার কথা ছিল।
রূপপুর প্রকল্প পরিচালক ড. মো. কবির হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, পাকিস্তানের আকাশসীমা-সংক্রান্ত জটিলতাকে সরাসরি ‘দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি বন্ধ’ হিসেবে দেখার চেয়ে বলা যায়, এটি রূপপুরের পারমাণবিক জ্বালানি পরিবহনব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত, যার প্রভাব প্রথম ইউনিটের রিলোড এবং দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি সরবরাহ— দুই ক্ষেত্রেই নজরদারির বিষয় হয়ে উঠেছে।
এদিকে পাকিস্তানের অনুমতি না পাওয়ার কারণ জানতে চাইলে ফকির মাহবুব আনাম বলেন, কেন পাকিস্তান আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি, তার সঠিক কারণ বাংলাদেশ জানে না। এর আগে একই রুটে অনুমতি পাওয়া গিয়েছিল। পাকিস্তানের পক্ষ থেকেও সরাসরি ‘নিষেধাজ্ঞা’ শব্দ ব্যবহার করে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়নি।
পাকিস্তান হাইকমিশনের একজন কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেন, কূটনৈতিক ফ্লাইট ও ওভারফ্লাইটের অনুমতি নির্ধারিত নিয়ম ও বেসামরিক বিমান চলাচলবিধি অনুযায়ী প্রক্রিয়াকরণ করা হয় এবং রুট-সংক্রান্ত কারিগরি ও প্রক্রিয়াগত সমন্বয়ের কারণে কখনো কখনো ফ্লাইটের সময়সূচিতে পরিবর্তন হতে পারে। ফলে ‘পাকিস্তান নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে’— এটিকে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত ও চূড়ান্ত ব্যাখ্যা হিসেবে না দেখে ‘অনুমতি না পাওয়ার কারণে ফ্লাইট স্থগিত’ হিসেবে উপস্থাপন করাই বেশি তথ্যনির্ভর।
তবে এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যে রয়েছে অস্পষ্টতা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, একটি দেশের আকাশসীমা শুধু ওই দেশের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। অনেকগুলো দেশ এর সঙ্গে জড়িত। তাই বলা যাবে না শুধু পাকিস্তানের নিষেধাজ্ঞার কারণে জ্বালানি আসেনি। রোসাটমের সঙ্গে সমন্বয় করে নতুন সময়সূচি করা হচ্ছে। রোসাটম জানিয়েছে, অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত কয়েকটি বিশেষ ফ্লাইটে দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি সরবরাহ করা হবে।
তিনি জানান, রূপপুর প্রকল্পের জন্য মোট সাতটি ফ্লাইটে দ্বিতীয় ইউনিটের ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। নতুন সূচিতে ১ অক্টোবর থেকে ফ্লাইট শুরু করার কথা বলা হয়েছে। তবে পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারে জটিলতার পর বিকল্প রুট ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কিন্তু এসবের চেয়ে এখন বড় যে প্রশ্ন সামনে আসছে তা হলো, প্রথম ইউনিটের উদ্বোধন কবে।
জুনে আগস্টের শেষ নাগাদ গ্রিডে বিদ্যুৎ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। পরে আগস্টে নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের বিষয়টি সামনে আসে। সেপ্টেম্বরে আবার দুটি ভালভের ত্রুটির কথা জানানো হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত নির্দিষ্টভাবে বলা হয়নি কোন তারিখে প্রথম ইউনিট জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ দেবে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে বাণিজ্যিক কার্যক্রমের উদ্বোধন হবে উল্লেখ করে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, দেশের জ্বালানি খাতে এখন যে সংকট বিরাজ করছে, সেটি হয়তো থাকত না যদি রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্র উদ্বোধন হয়ে যেত।
কিন্তু তারিখের বেড়াজালে প্রকল্পটি এমনভাবে আটকে গেছে যে কবে এর উদ্বোধন হবে তা নিয়ে দিনের পর দিন ধোঁয়াশা তৈরি হচ্ছে। প্রকল্পের দুই ইউনিটের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। প্রতিটি ইউনিটের ক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। ফলে প্রথম ইউনিটের সময়সূচি শুধু একটি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানকে ঘিরে নয়। এর সঙ্গে জাতীয় গ্রিডে নতুন বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার প্রত্যাশাও জড়িত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।


















