কর্মফল ভোগ করতে হয়—সব ধর্মেই এটা স্বীকৃত। পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়—এটাও সর্বজনস্বীকৃত। পৃথিবীর সকল দেশেই ক্রিমিনাল এক্টসকে সজ্ঞায়িত করা হয়েছে এবং ক্রাইমের ধরন অনুযায়ী বিভিন্ন মেয়াদের সাজা প্রদানের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
যেসব দেশে আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত সেসব দেশে কেউ দুষ্কর্ম করে সাজা ভোগ না করে পার পেতে পারে না। তবে প্রভাবশালীরা দুষ্কর্মের সাজা এড়িয়ে যাবার জন্যে নানা ধরনের প্রচেষ্টা চালিয়ে থাকে কিন্তু সব প্রভাবশালীরা তাতে সফলতা অর্জন করে না। তবে ইসরায়েল রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বীকৃত এবং সমগ্র বিশ্বে প্রচলিত রীতিনীতির ও ব্যতিক্রম রয়েছে।
সে ধরনের ব্যতিক্রমী প্রভাব খাটিয়ে ইসরায়েল আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারিক কার্যক্রম এড়িয়ে যেতে সক্ষমতার পরিচয় দিলে ও স্রষ্টার/আল্লাহ্র/প্রকৃতির/নিয়তির/ঐশ্বরিক বিচারিক কার্যক্রম এড়িয়ে যাবার চুল পরিমাণ সম্ভাবনাও নেই। আমেরিকা এবং তার ইউরোপীয়ান মিত্ররা অত্যন্ত জোর দিয়ে বলে থাকেন ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে। কিন্তু প্যালেস্টাইনি জনগণের একই ধরনের অধিকার থাকার কথা তারা কেউ স্বীকার করে না।
এটা দ্বিমুখী আচরণÑ আমেরিকা এবং তার ইউরোপীয় মিত্র দেশসমূহের এরূপ দ্বিমুখী আচরণ যেকোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি কিংবা রাষ্ট্রের নিকট গ্রহণযোগ্য নহে। তাদের এরূপ দ্বিমুখী আচরণের কারণে মধ্যপ্রাচ্য সংকট দীর্ঘতর এবং জটিলতর রূপ পরিগ্রহ করছে। ইসরায়েলের সেরূপ আত্মরক্ষার এক পেশে অন্যায্য অধিকারের কথা বলে আমেরিকা এবং তার ইউরোপীয় মিত্ররা ইসরায়েলকে প্রচুর পরিমাণে অত্যাধুনিক বোমারু বিমানÑ অস্ত্র-গোলাবারুদ-শত শত টন বোমা তথা সামরিক সহায়তা জুগিয়ে যাচ্ছে।
আর ইসরায়েল সব ধরনের মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র গোলাবারুদ প্যালেস্টাইনি জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে যাচ্ছে। ইসরায়েলের এরুপ কর্মন্যায্য কি অন্যায্য সেই প্রশ্ন আমেরিকা কিংবা আমেরিকার মিত্র ইউরোপীয় দেশগুলো বিবেচনায় নিচ্ছে না। ইসরায়েলের এরুপ অন্যায্য অপকর্ম প্রতিরোধের জন্য এবং একটা স্বাধীন সার্বভৌম প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য পিএলও-হামাস- হিজবুল্লাহ নানা ধরনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
সেরূপ প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে হামাস ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর মাসে ইসরায়েলের মূল বাণিজ্যিক কেন্দ্র তেল আবিবসহ ইসরায়েলজুড়ে রকেট হামলা এবং স্থলভাগে অনুপ্রবেশ চালানো হয়। হামাসের এই আকস্মিক হামলায় প্রায় ১২০০ জন নিহত হনÑ যাদের মধ্যে সিংহ ভাগই ছিলেন বেসামরিক নাগরিক এবং বিদেশি নাগরিক। হামলায় ১৫০০ জনের বেশি মানুষ আহত হন। নারী-শিশু ও বৃদ্ধসহ প্রায় ২৫০ জনকে জিম্মি করে হামাস যোদ্ধারা গাজা উপত্যকায় নিয়ে যায়।
এই অতর্কিত হামলার পর ইসরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করে গাজায় ব্যাপক বিমান হামলা এবং স্থল অভিযান শুরু করে। হামাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার কোনো আবশ্যকতা ছিল কি? হামাস যে ধরনের হামলা চালিয়েছে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে হামাসের বিরুদ্ধে ইসরায়েল একই ধরনের সামরিক ব্যবস্থা নিতে পারত। সমান মর্যদার এক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অন্য রাষ্ট্রের যুদ্ধ ঘোষণা যুক্তিসংগত।
কিন্তু গাজা তো কোনো স্বীকৃত রাষ্ট্র নহে। গাজার তো কোনো স্বীকৃত প্রতিরক্ষাবাহিনী নেই। কাজেই হামাসের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্যে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে কেন? ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় সম্পাদিত যুদ্ধবিরতির পূর্ব পর্যন্ত গাজায় ৭৫ হাজারের ও বেশি ফিলিস্তিনিকে ইসরায়েল ব্যাপক বোমা হামলা এবং স্থল অভিযান চালিয়ে নির্বিচারে হত্যা করে।
উল্লেখ্য, রকেটের জবাব রকেট দিয়ে দেওয়াই উত্তম। ১২ শত ইসরায়েলির হত্যার প্রতিশোধে ১২ শত ফিলিস্তিনির হত্যা যুক্তিসঙ্গত। ফিলিস্তিনিদের কোনো সামরিক বিমান নেই। কিন্তু ইসরায়েল শত শত বিমান দিয়ে ব্যাপক বিধ্বংসী বোমা হামলা চালিয়ে গাজার আবাসিক ভবনের প্রায় ৯০ পার্সেন্ট মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়- পানি এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে।
থাকার জায়গা, পানির অভাব এবং খাদ্যের অভাবে গাজাবাসী দিশাহারা হয়ে পড়ে। ইসরায়েল খাদ্যকে ও যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। গাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে বোমা হামলা চালিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। হাসপাতালগুলোতে হামলা চালিয়ে অকার্যকর করে দিতে ও ইসরায়েল কোনো কার্পণ্য করেনি। গাজার চতুর্দিক অবরুদ্ধ করে ইসরায়েল যে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায় তা হলোকাস্টের চাইতে অনেক বেশি নির্মম।
নিরপরাধ নারী-শিশু-যুবক-ছাত্র/ছাত্রী কেউ এই হত্যাযজ্ঞ থেকে রেহাই পায়নি। আমেরিকার মধ্যস্থতায় সম্পাদিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে ইসরায়েল প্রতিদিন গাজায় বোমা হামলা চালিয়ে নিরপরাধ ফিলিস্তিনিদের হত্যা করে চলেছে। এতে ধারণা করা যায় ১ জন ফিলিস্তিনি জীবিত থাকা পর্যন্ত ইসরায়েল বোমা হামলা চালিয়ে ফিলিস্তিনি হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যাবে।
উল্লেখ্য, হামাস তো যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে না, কিন্তু ইসরায়েল প্রতিনিয়ত যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে প্যালেস্টাইনিদের হত্যা করে চলেছে। আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্ব এ ব্যাপারে কেন নীরবতা পালন করে যাচ্ছে- নীরবতা মানে ইসরায়েলি কার্যক্রমকে সমর্থন করে যাওয়া। ইসরায়েলের এরূপ হত্যাযজ্ঞকে সমর্থনের মাধ্যমে আমেরিকা, যুক্তরাজ্য এবং আমেরিকার ইউরোপীয় মিত্র দেশগুলো গাজা গণহত্যা সহযোগিতা করে গণহত্যার অপরাধে অপরাধী রাষ্ট্রে পরিগণিত হচ্ছে।
পশ্চিম তীর এবং অন্যান্য জায়গায় ইসরায়েলি বাহিনীর সহযোগিতায় ইহুদি সেটেলররা আদিবাসী ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি এবং আবাদি সম্পত্তি দখল করে নিরীহ ফিলিস্তিনিদের তাদের বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করে তাড়িয়ে দিচ্ছে। জোরপূর্বক ফিলিস্তিনিদের বিতাড়িত করে সেটেলররা কি মহাসুখে-শান্তিতে সেখানে অনাদিকাল যাবত বসবাস করতে পারবে? ইহুদি সেনারা বেঁচে থাকা ফিলিস্তিনি যুবকদের ধরে নিয়ে জেলখানায় অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে।
শুধু তাই নহে ইসরায়েলি সৈন্যরা জেলখানায় বন্দি ফিলিস্তিনি যুবকদের ওপর বলৎকার সমেত নানা কায়দায় পাশবিক নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। এক কথায় ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলি জেলখানায় নরকের চাইতে কঠিন সাজা ভোগ করছে। আমেরিকা এবং তার ইউরোপীয় মিত্র দেশসমূহের জ্ঞাতসারেই ইসরায়েল এরূপ জঘন্য অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। অধিকৃত ভূমিতে অবৈধ বসতি স্থাপনসহ দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পথে সুপরিকল্পিত উপায়ে ইসরায়েল সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে যাচ্ছ।
এখন প্রশ্ন হচ্ছেÑ ফিলিস্তিনিদের সুপরিকল্পিত উপায়ে নিশ্চিহ্ন করে ইসরায়েল তার নিজের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে কি? ধরুন, আগামী ৫-১০ বছরের মধ্যে ইসরায়েল হামাস-হিজবুল্লাহ-হুথিসহ সকল সংগঠনকে নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষমতার পরিচয় দিল। তারপর ইসরায়েল কি মনের সুখে অতি আনন্দে চির শান্তিতে বসবাস করতে পারবে? গাজার লাখ লাখ লোকের বসতবাড়ি ধ্বংস করার বিষয়টা একটা ক্রিমিনাল অফেন্স/ওয়ার ক্রাইম।
গাজার বিদ্যুৎ এবং খাবার পানি সরবরাহব্যবস্থা ধ্বংস করে দেওয়ার বিষয়টাও একটা ক্রিমিনাল অফেন্স। গাজায় খাদ্যবাহী যানবাহন ঢুকতে না দেওয়া ওয়ার ক্রাইম। প্যালেস্টাইনি আদিবাসীদের জোরপূর্বক তাদের বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা ক্রিমিনাল অফেন্স। জেলখানায় সেনাবাহিনী কর্তৃক প্যালেস্টাইনি যুবকদের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালানো ওয়ার ক্রাইম। ৮০ হাজার নিরপরাধ ফিলিস্তিনিকে হত্যার বিষয়টি একটা ক্রিমিনাল অফেন্স/ওয়ার ক্রাইম।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার ইউরোপীয় মিত্রদের চাপে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে ইসরায়েলের বিচার করা সম্ভব হবে বলে মনে হচ্ছে না। তবে ঐশ্বরিক বিচার থেকে রেহাই পাবার কোনো ব্যবস্থা ইসরায়েল এবং তাকে সহযোগিতাকারী রাষ্ট্রসমূহের হাতে নেই। ৮০ হাজার প্যালেস্টাইনি হত্যার দায়ে ইসরায়েলকে তথা ইসরায়েলি ইহুদি জনগণকে ঐশ্বরিক বিচারিক আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে এবং ঐশ্বরিক বিচারিক আদালতের প্রদত্ত শাস্তি ইসরায়েলি ইহুদি সম্প্রদায়কে মাথা পেতে নিতে হবেÑ তবে ইশ্বর কোন ধরনের সাজা দেবেন এবং কবে দেবেন সেটা একমাত্র ইশ্বরই জানেন।
তবে ইসরায়েলের সহযোগী আমেরিকা এবং ইউরোপীয়ান ইউনিয়নভুক্ত রাষ্ট্রগুলো ইতোমধ্যে তার কিছু নমুনা দেখতে শুরু করেছেন। হিট ওয়েভ, বুশ ফায়ার, এলনিনো তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। হিট ওয়েভ এবং বুশ ফায়ার নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা আমেরিকা কিংবা পশ্চিমা বিশ্বের নেই। মৃত সাগরের অবস্থান ইসরায়েলের অতি সন্নিকটে। তার ইতিহাস ও ইসরায়েলিদের অবশ্যই জানা আছে।
তবে এখনো সময় আছেÑ ইসরায়েলিরা সব ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধ কর্মকা- থেকে সরে এসে ইশ্বরের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে পারেন। ক্ষমা প্রার্থনা করার পূর্বে ইসরায়েলকে অবশ্যই সব অধিকৃত আরব ভূমি ছেড়ে দিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজ শেষ করতে হবে। আমেরিকা এবং তার ইউরোপীয়ান মিত্রদেশগুলোর সরকার প্রধানরা ভ্যাটিকান সিটিতে সমবেত হয়ে পোপ চতুর্দশ লিও-এর সঙ্গে বিষয়টা নিয়ে আলোচনাক্রমে সঠিক সিদ্ধান্তে আসার চেষ্টা করতে পারেন।


















